Thursday, December 22, 2011

খালিদী, আপনার সাথে একমত নই


সম্প্রতি বিডিনিউজ২৪ ডট কমের কর্ণধার তৌফিক ইমরোজ খালিদী রাজনীতিকদের প্রতি ব্লগ নিয়ন্ত্রণে আইন প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন [১]। তার নিজেরই প্রতিষ্ঠানে প্রকাশিত সংবাদ থেকে উদ্ধৃত করে তার কিছু কথা আমরা মনোযোগ দিয়ে পড়ে দেখতে পারি।
তৌফিক খালিদী বলেন, “যে কেউ একটি সংবাদ মাধ্যমের (টেলিভিশন চ্যানেল, সংবাদপত্র ইত্যাদি) মালিক হয়ে যাবে, এটা হতে পারে না। সেই সঙ্গে মোবাইল ফোনে যে কেউ সংবাদ সেবা দেবে, এটাও হতে পারে না। নিয়মের মধ্য দিয়ে এটা করতে হবে। এ জন্য একটি নীতিমালা প্রয়োজন।”
বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবনে রাজনীতিবিদদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম প্রধান সম্পাদক বলেন, “সংবাদ মাধ্যম যদি এ রকম লাগামহীন হয়, তবে তার জন্য রাজনীতিবিদদেরই যে বেশি ভুগতে হয়, তা আপনারা (রাজনীতিক) অভিজ্ঞতা দিয়েই বুঝতে পারবেন।”
মুক্ত মত প্রকাশের প্রসঙ্গ ধরে ব্লগিংয়ের বিষয়টি তুলে ধরে তৌফিক ইমরোজ খালিদী বলেন, “আমি সবিনয়ে বলতে চাই, মত প্রকাশের নামে যা ইচ্ছা তাই প্রকাশের আমি বিরোধিতা করি। মত প্রকাশ করতে হবে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে। মূলত স্বাধীনভাবে প্রকাশের ক্ষেত্র তৈরি করে দেওয়াটা সবচেয়ে জরুরি।”
তার মতে, কোনো ব্যক্তির নামে কল্পকাহিনী, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার মতো কথা ব্লগ কিংবা ফেইসবুক ও টুইটারের মতো সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটেও প্রকাশ অনুচিত।
তৌফিক ইমরোজ খালিদীর তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠা বিডিনিউজ২৪ ডট কম পাঠকপ্রিয় একটি ওয়েবসাইট, পেশাদারিত্বের সাথে প্রতিনিয়ত খবর প্রকাশের কারণে এটি দেশে ও প্রবাসে মানুষের মনোযোগ কাড়তে সক্ষম হয়েছে। সম্ভবত এই সাফল্যই খালিদীকে প্ররোচিত করেছে, "যে কেউ" একটি সংবাদ মাধ্যমের মালিক হতে পারবে না, এমন একটি কথা বলে ফেলতে। আমি বিনয়ের সাথে খালিদীকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, তিনিও এই "যে কেউ"-এর অন্তর্ভুক্ত। তিনি আকাশ থেকে অবতরণ করেননি, মাটি ফুঁড়েও বের হননি। তার মতো "যে কেউ" যদি বিডিনিউজ২৪ ডট কমের মতো একটি গোছানো সংবাদ পরিবেশক সংস্থা চালাতে পারে, তাহলে অন্য ব্যক্তি কেন পারবে না? সারবস্তু না থাকলে মানুষ কোনো কিছুই গ্রহণ করে না, সারা বাংলাদেশে মাটি ফুঁড়ে গজিয়ে ওঠা সংবাদ পরিবেশক ওয়েবসাইটগুলোর করুণ হাল দেখলেই তা বোঝা যায়। সংবাদ পরিবেশনে মানুষের সক্ষমতা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তুলতেই পারেন, কিন্তু অধিকার নিয়ে পারেন কি? তিনি নিজে কোন নিয়ামকের অধীনে সংবাদ বিক্রি শুরু করেছিলেন, সেটাও তিনি জানাননি, অন্যের জন্য নিয়ামক প্রণয়নে নেমে পড়েছেন। এই অচিন দেশের রাজকুমার সিনড্রোম থেকে বেরিয়ে আসতে পারা সুস্থতার লক্ষণ হিসেবে কেউ কেউ বিবেচনা করতে পারেন।
মত প্রকাশের ক্ষেত্রে ব্লগে "যা ইচ্ছা তাই" প্রকাশের সমস্যা সম্পর্কে আমরা অনবগত নই। কিন্তু কোনটা "যা ইচ্ছা তাই" আর কোনটা "দায়িত্বশীল বক্তব্য", সেটা কে কীভাবে ঠিক করে দেবে? উত্তর হতে পারে, ব্লগের পাঠক। ব্লগ সংবাদপত্র বা ইলেকট্রনিক মিডিয়ার মতো সিমপ্লেক্স বা একমুখী মাধ্যম নয়, বরং পাঠকের সক্রিয় অংশগ্রহণে একটি ক্রমশ চলমান মাধ্যম, যেখানে প্রত্যেকেই প্রত্যেকের বক্তব্যকে খণ্ডনের সামর্থ্য রাখেন। যাচ্ছেতাই আধেয়কে পাঠক তেমন গুরুত্ব দেন না, আর গুরুত্ব দিলেও তার যাচ্ছেতাই বক্তব্যকে ধুয়ে ছেড়ে দেন। সংবাদপত্র বা ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় পরিবেশিত তথ্যের সংশোধনী আসতে অনেক সময় লাগে, ব্লগে সেটা কয়েক মিনিটের মধ্যেই যুক্তি-তর্ক-রেফারেন্সসহ চলে আসে। এক জায়গায় প্রকাশিত বক্তব্যের প্রতিবাদ অন্য জায়গায় উঠে আসে। ব্লগ সাধারণ মানুষের মাধ্যম, তাই এখানে প্রতিরোধ আর প্রতিবাদও করে সাধারণ মানুষ। সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে চলমান থিসিস আর অ্যান্টিথিসিসের সমন্বয়ে যদি সাংবাদিকরা আস্থা রাখতে না পারে, এবং তার জন্যে রাষ্ট্রযন্ত্রকে আইন প্রণয়ন করে সাধারণ মানুষের চিন্তাস্রোতে বাঁধ দেয়ার জন্যে ডাকাডাকি করে, বুঝতে হবে, সাংবাদিকতা নয়, এখানে উদ্দেশ্য অন্য কিছু।
"লাগামহীন" সংবাদ মাধ্যমের কারণে রাজনীতিকদের ভোগান্তির দিকে ইঙ্গিত করে এ্কে নিয়ন্ত্রণের জন্য রাজনীতিকদের হাতছানি দিচ্ছেন একজন খবরবণিক, এটি বিস্মিত হওয়ার মতোই একটি ঘটনা। রাজনীতিকরা নিজের ভোগান্তি হ্রাসের জন্যে সংবাদ মাধ্যমে লাগাম পরাবেন, এটিই খালিদীর কাছে কাম্য? তাহলে কেবল রাজনীতিকের ভোগান্তি আলোচিত হচ্ছে কেন? কেন সাধারণ মানুষের ভোগান্তির কথা আসছে না? প্রকাশিত সংবাদ বা চেপে যাওয়া সংবাদ তো সাধারণ মানুষের বিপুল ভোগান্তিও ঘটাতে পারে। বিডিনিউজের খবর পড়ে, সাধারণ মানুষ খালিদীর কাছে কোনো ধর্তব্য বিষয় বলে মনে হয় না। তিনি এদের শুধু মোবাইলে খবরের ভোক্তা হিসেবে দেখেই সন্তুষ্ট।
কল্পকাহিনী বা ধমীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগার ব্যাপারটিও বহুল আলোচনায় দীর্ণ একটি বিরক্তিকর প্রসঙ্গ। কারো নামে সংবাদ মাধ্যমে কল্পকাহিনী ছড়ানো অবশ্যই গর্হিত অপরাধ, কিন্তু ব্লগে বা সামাজিক যোগাযোগ সাইটে এর কনটেক্সটটিও বিচার্য। সাধারণ মানুষ বড় বড় লোকদের নিয়ে কৌতুক বানায়, সেগুলোর সত্যতা নয়, বরং তার পেছনে হাস্যরসই সাধারণ মানুষের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কৌতুক প্রচলনের কারণে সোভিয়েত ই্‌উনিয়নে স্তালিন আমলে মানুষজনকে গুলাগে যেতে হতো, খালিদীর কথা শুনে মনে হয় তিনি বাংলাদেশে একটি গুলাগের অভাব বোধ করছেন। বিনা রেফারেন্সে কারো নামে কল্পকাহিনী ছড়ালে সেটি লোকে তো বিশ্বাস করেই না, বরং তর্ক করে এর অসারতা প্রমাণ করে। আর ধর্মীয় অনুভূতি কথাটা এতো অসংজ্ঞায়িত, যে এটি নিয়ে আলাপ শুরু করাও মুশকিল। কার ধর্মীয় অনুভূতির পায়ের মাপে জুতো তৈরি করবো আমরা? প্রতিটি মানুষই প্রতিটি কথায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত পাওয়ার অধিকার সংরক্ষণ করেন। ধমীয় অনুভূতির দোহাই দিয়ে আমরা নিরীহ কার্টুনিস্ট আরিফুর রহমানকে দেখেছি মোল্লাদের হাতে নিগৃহীত হতে, দাউদ হায়দার আর তসলিমা নাসরিনকে দেখেছি দেশত্যাগে বাধ্য হতে, হুমায়ূন আজাদকে আক্রান্ত হতে দেখেছি। ধর্মীয় অনুভূতিকে যত সহজে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে মুক্ত মতকে আক্রমণ করা যায়, আর কোনো কিছুকে তত সহজে ব্যবহার করা যায় না। এই মধ্যযুগীয় অজুহাতটি একবিংশ শতাব্দীতে ব্যবহৃত হতে দেখতে চান না অনেকেই। দুঃখের বিষয়, সেই দলে খালিদী নেই। আমি যদি আগামীকাল একটি ধর্ম প্রচার করি, যে ধর্মে "তৌফিক ইমরোজ খালিদী" নামটি শ্রবণ করলে পরকাল ঝরঝরে হয়ে যাওয়ার হুমকি আছে, আমার বিশ্বাস, হাজার পাঁচেক অনুসারী আমি পাবো। আমাদের সেই ধমীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখিয়ে খালিদী কি নিজের নাম উচ্চারণ থেকে বিরত থাকবেন?
ডয়চে ভেলে আজ তার একটি সাক্ষাৎকার [৩] নিয়েছে, সেখানে তিনি বেশ ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলছেন, সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটে লেখা জনসভায় বক্তৃতার সমতুল্য। সেখানে প্রধানমন্ত্রী বা বিরোধী দলীয় নেত্রীর নামে অশালীন কথাবার্তা বলা চলবে না। আমি এ ব্যাপারে তার সাথে একমত, আমরা আমাদের নেত্রীদের বিরুদ্ধে অশালীন কথাবার্তা শুনতে চাই না। শুধু নেত্রী কেন, আমরা কারো সম্পর্কেই অশালীন কথা শুনতে চাই না। আমরা শুনতে চাই না, আমাদের বিরোধী দলীয় নেত্রী বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর ধর্ম কী [৪]। এটি শালীনতার মাত্রা লঙ্ঘন করে। আমরা শুনতে চাই না, আমাদের প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলীয় নেত্রীর প্রতি ইঙ্গিত করে বলছেন, উনি রাতে কী করেন [৫]। এটিও শালীনতার মাত্রা লঙ্ঘন করে। তৌফিক ইমরোজ খালিদী তরুণদের ক্রুদ্ধ কণ্ঠে হুমকি দিয়ে শালীনতার সিরাতুল মোস্তাকিমে আনার জন্যে আইন ও নিয়ন্ত্রণ (রেগুলেশন) চাইছেন, তার কি হিম্মত আছে, এই দুই নেত্রীকে অশালীন বক্তব্য দিতে বাধা দেয়ার জন্য কোনো আইন বা রেগুলেশন প্রণয়নের দাবি জানানোর? দুই নেত্রী দূরে থাক, সাংসদদের আচরণবিধি নির্দেশ করে সাবের হোসেন চৌধুরী কর্তৃক প্রস্তাবিত আইন [৬], যেটি আর পাশ হয়নি, আর আলোর মুখ দেখেনি, সেটি কার্যকর করতে কোনো আহ্বান, কোনো চাপাচাপি করার সাহস কি তার আছে? আমি এ প্রশ্নের উত্তর জানি না। আশা করবো বিডিনিউজ২৪ ডট কমের ছয় বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে কোনো বক্তৃতায় তিনি ব্লগে সাধারণ মানুষের মুখে কাপাই পরানোর বায়না না ধরে রাজনীতিকদের আচরণ নিয়ন্ত্রণে বিধিমালা প্রণয়নের জন্য রাজনীতিকদের প্রতি আহ্বান জানানোর সৎসাহস অর্জন করবেন। এই এক বছর ধরে পড়ার জন্যে যুক্তরাজ্যের হাউস অব কমনসের সদস্যদের আচরণবিধির [৭] লিঙ্কটি তার করকমলে পেশ করছি।
পাঁচ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে খালিদী হঠাৎ কেন ব্লগের বিরুদ্ধে ডুকরে উঠলেন, যখন তিনি নিজেই ডিসেম্বর ৬, ২০১১তে টুইট করেছেন [২],
Web is a two-edged sword. Use or manipulate it to your advantage. But if you ABUSE it or TRY to STRANGLE it, you risk losing more.
এই রোমাঞ্চাভিলাষে ভরা স্ববিরোধিতার পেছনের সম্ভাব্য কারণটি নিয়ে আলাপ করবো পরবর্তী পোস্টে।
আপাতত একটি ছোট্ট আখ্যান (অ্যানেকডোট)। তৌফিক ইমরোজ খালিদীর বক্তব্য তাঁরই পত্রিকায় ছাপা হয়েছিলো [১]। ব্লগে এর প্রতিক্রিয়া আসার কারণেই কি না, আমি নিশ্চিত নই, সেই বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ খবরটি থেকে বিনা নোটিশে অপসারিত হয়। এই সুযোগটি কেবল ওয়েবেই রয়েছে, সংবাদপত্র বা ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ক্ষেত্রে নয়। খবরটির প্রথম সংস্করণ দেখতে পাবেনএখানে, পরিবর্তিত সংস্করণটি পাবেন এখানে। প্রথম সংস্করণে খবরে ছিলো,
এটা এক ধরনের অপরাধ, আর এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে সরকারকে অবশ্যই নতুন আইন করতে হবে। স¤প্রতি শীর্ষ পর্যায়ের এক রাজনীতিকও বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন। তার সঙ্গে আমি একমত, আর এত দিন ধরে তা না করার দায় রাজনীতিক হিসেবে তারও স্বীকার করতে হবে।
দ্বিতীয় সংস্করণে "আর এত দিন ধরে তা না করার দায় রাজনীতিক হিসেবে তারও স্বীকার করতে হবে।" বাক্যাংশটি গায়েব করে দেয়া হয়েছে। জানি না, কাল সকালে আবার এটিকে ঠিক করে আগের চেহারায় নিয়ে আসা হবে কি না। এভাবে অতীতেও তারা খবর বদল করেছেন কি না, কিংবা ভবিষ্যতেও করবেন কি না, তা-ও জানি না।
এই যে পাঠকের অগোচরে খবর পাল্টে দেয়া হলো, এটি কি রীতিসিদ্ধ, জনাব খালিদী? আপনি কি প্রকাশিত ঐ অংশটি বলেননি? যদি বলে থাকেন, তাহলে কেন সরিয়ে নিলেন? আমরা কি ধরে নিতে পারি, আপনার কথিত "দায়িত্বশীলতা" থেকেই ঐ অংশটি এক্সপাঞ্জ করা হয়েছে? যদি তা-ই হয়, তাহলে কেন পাঠককে এ ব্যাপারে জানানোর প্রয়োজন বোধ করলেন না? একটা ছোট্ট সংশোধনী তো দিতে পারতেন। আর যদি ঐ অংশটি প্রকাশের অযোগ্য বলে মনে করে থাকেন, তাহলে কেন একটি ছোটো নোট দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করলেন না, বললেন না, ঐ কথাটি আপনার বলা উচিত হয়নি?
খালিদী, আপনার দায়িত্বশীলতার দৌড়ের একটা ছোটো নমুনা আমরা দেখলাম। ব্লগারদের দায়িত্বশীল হতে বলছেন আপনি, আমিও আপনার সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে বলতে চাই, আসুন দায়িত্বশীল হই। সাধারণ মানুষের কণ্ঠরোধের ভুল সার্কাসে ক্লাউন হয়ে না নাচি। প্লিজ।

সংযোজন: আগের পোস্ট --- মিডিয়াহাউসের মিডিয়াহাউশ। এখানে এই সিরিজের সবকটি পোস্ট একত্রে পাবেন।

তথ্যসূত্র:

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।