Wednesday, December 21, 2011

মিডিয়াহাউসের মিডিয়াহাউশ


বেশ কিছুদিন ধরেই কখনো জোরেসোরে, কখনো ফিসফিস করে একটা কথা বেশ চলছে, ব্লগ নিয়ন্ত্রণে আইন করা জরুরি। প্রস্তাবটি কৌতূহলোদ্দীপক, এবং প্রস্তাবকদের নামগুলোকে এক সারিতে রেখে দেখলে, আমোদপ্রদও বটে।
প্রস্তাবটি যাদের মুখ থেকে জোরেসোরে বেরোচ্ছে, তারা মূলত কোনো না কোনো প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার অথবা বেতনভূক কর্মী। তারা সভা-সেমিনারে ব্লগ নিয়ন্ত্রণের জন্য আইন প্রণয়নের আহ্বান জানাচ্ছেন রাজনীতিকদের উদ্দেশে। তাদের সাথে থেকে কিছুটা নিচু গলায় সমর্থন জানাচ্ছেন কতিপয় বুদ্ধিজীবী নামযশোপ্রার্থী, যারা নিজেদের ব্লগ-বিশেষজ্ঞ বা সামাজিক যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ পরিচয় দিয়ে আত্মপ্রসাদ পান। আর নীরব সমর্থনের কাজটি করে যাচ্ছে এই ইস্যুতে নাম জড়াতে অনাগ্রহী কয়েকটি মিডিয়াদানব। আর আবদারগুলো ভেসে উঠছে ব্লগারদের নামে। একটি মিডিয়ারচিত চিত্রনাট্যে নাম ভূমিকায় কিছু ব্লগার অভিনয় করে যাচ্ছেন, যাদের কথাবার্তা শুনলে মনে হয় তারা দুনিয়ার তাবৎ বাংলা ব্লগারের মুখপাত্র।
ব্লগিং এমনই এক মাধ্যম, যেখানে আসলে মুখপাত্রের প্রয়োজন নেই। ব্লগারদের দাবিদাওয়াগুলো তাদের লেখাতেই ফুটে ওঠে সাধারণত। ব্লগাররা নানা ইস্যুতে নানা দাবি আর আবদার তুলে ধরলেও বাংলা ব্লগে "ব্লগ নিয়ন্ত্রণে আইন"-এর দাবি নিয়ে আমব্লগাররা সোচ্চার, এমন দৃশ্য দুর্লভ। গুটিকয়েক ব্লগার, যারা এই কিছু প্রতিষ্ঠানের স্নেহধন্য বা কৃপাধন্য বা মজুরিধন্য, তারাই মালিকের বেসুরো গলার সাথে সারিন্দা বাজাচ্ছেন। মালিক নিজের মিডিয়ায় এদের পরিচিত করিয়ে দিচ্ছেন বিভিন্ন বাংলা ব্লগের মুখপাত্র হিসেবে। যেন যে কয়েক হাজার লোক ব্লগিং করেন, তাদের চাপেই এরা এই দাবি তুলে ধরছেন, এমন একটা ভাব।
কিন্তু ব্লগ-ফেসবুক-টুইটার তথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ে মিডিয়াহাউসগুলো কেন তাদের পোষ্য ব্লগারদের মাঠে নামিয়ে নিয়ন্ত্রণমূলক আইনের জন্যে সারিন্দাবাদনে লিপ্ত?
বাংলাভাষী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তারা নানা দুর্বলতার পরও মানুষকে এক অভূতপূর্ব ক্ষমতা দিয়েছে। এই ক্ষমতা মত প্রকাশের ক্ষমতা। এর অপপ্রয়োগের ছড়াছড়ি যেমন আছে, তেমনই আছে এর সঠিক প্রয়োগও। সংবাদপত্র আর ইলেকট্রনিক মাধ্যম এতদিন মানুষের এই মতের বাজারটি নিয়ন্ত্রণ করতো, এবং তাদের সম্পাদনার কাঁচির সাইজে মানুষের মতজলবায়ু মানুষের সামনে তুলে ধরতো। এই মতজলবায়ুতে মতের বর্ণালী করুণভাবে সংকীর্ণ, যেখানে সাধারণ মানুষ যে কোনো ইস্যুকেই নানাদিক থেকে দেখতে ও ব্যবচ্ছেদ করতে আগ্রহী। ব্লগ বা ফেসবুক বা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মানুষ তার নিজের মতটি তুলে ধরতে আর সেটি নিয়ে তর্ক করতে পারে এখন। এটি শুধু তার সক্ষমতাই নয়, অধিকারও বটে।
ভৌত গঠনবৈভিন্ন্যের কারণেই সংবাদপত্র আর ইলেকট্রনিক মিডিয়া মানুষের বহু মত ধারণে অসমর্থ। এই অসামর্থ্যের সাথে যোগ হয় তাদের রাজনৈতিক অভিলাষতাড়িত নিয়ন্ত্রণাকাঙ্খা, ব্যবসায়ী মনোভঙ্গিতাড়িত কাঁচিকৌশল আর কর্মীদের মেধার দীনতা। ফলে যে কোনো ইস্যুতে মানুষ সংবাদপত্র আর ইলেকট্রনিক মিডিয়া থেকে কাঁচা সংবাদ সংগ্রহ করলেও, পাশাপাশি নিজের মতটিও তুলে ধরে। সেই মতটি ক্ষমতাবানের জন্যে মাঝেমধ্যেই অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে।
কিন্তু সাধারণ মানুষ ক্ষমতাবানের মন যুগিয়ে মত প্রকাশ করে না। সে তা-ই বলে, যা সে বলতে চায়। তার এই বলতে চাওয়ার পটপত্তন হিসেবে ব্লগ নিঃসন্দেহে একটি শক্তিশালী মাধ্যম। তার বক্তব্যে ত্রুটি থাকলে তার লেখার নিচে তর্কের মাঠে অন্যেরা সেই ত্রুটি ধরিয়ে দেয়, তর্ক হয়, কলহ হয়, কিন্তু লড়াইটি হয় যুক্তির, তথ্যসূত্রসহ।
উপরন্তু ব্লগ এখন মিডিয়ার ত্রুটিনির্দেশের কাজেও পক্ক হয়ে উঠেছে। মিডিয়ার রাজনৈতিক আর ব্যবসায়িক ক্ষমতা শুধু প্রকাশে নয়, অপ্রকাশেও। মিডিয়া যখন ভুল কথা বলে, ব্লগে তার প্রতিবাদে আমরা সত্য উঠে আসতে দেখি। মিডিয়া যখন ঠিক কথা চেপে যায়, সেটিও ব্লগে উঠে আসে। তাই ক্ষমতাবানের সাথে মতপ্রকাশ ও মতগোপনের বাজারে মিডিয়াহাউসের দরকষাকষির সুযোগ সীমিত আকারে হলেও কিছুটা বাধাগ্রস্ত হয়। সময়ের সাথে ব্লগ আরো শক্তিশালী হবে, তখন এই দরকষাকষির সুযোগ আরো বাধাগ্রস্ত হবে। তাই সময় থাকতেই মিডিয়াহাউসগুলো "ব্লগ নিয়ন্ত্রণে আইন" প্রণয়নে চাপ দিয়ে মাঠে নেমে পড়েছে।
আমরা কৌতূহল নিয়ে দেখি, প্রচলিত মিডিয়া (সংবাদপত্র ও ইলেকট্রনিক মাধ্যম) নতুন মিডিয়ার (ব্লগ-ফেসবুক-টুইটার) পৃথক সত্ত্বাটিকে স্বীকার করে, কিন্তু পৃথক চরিত্রকে নয়। তারা নতুন মিডিয়াকে দেখতে চায় প্রচলিত মিডিয়ার নিয়ন্ত্রণে, অথবা নখদন্তহীন হিসেবে। ব্লগ নিয়ন্ত্রণে তারা আইন চায়, তাহলে সংবাদ নিয়ন্ত্রণে আইন চায় না কেন? আমি প্রশ্ন করতে পারি, ব্লগকে কেন সংবাদপত্রের মতো হতে হবে?
আইন ক্ষমতাবানকে রাষ্ট্রের ছায়ায় দাঁড়িয়ে নিজের স্বার্থানুগ ক্ষমতাচর্চার সুযোগ করে দেয় বহু ক্ষেত্রে। আমাদের দেশে আইন প্রয়োগ ও আইন তর্কের মঞ্চে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার ভীতিপ্রদভাবে সীমিত। তাই সাধারণ মানুষের মতপ্রকাশের একটি মাধ্যমকে বিকশিত হয়ে ওঠার পর আমরা দেখতে পাচ্ছি, একযোগে রাজনৈতিক শক্তি ও মিডিয়াশক্তি সেটিকে লাগাম পরাতে অস্থির হয়ে উঠেছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি, সাধারণ মানুষের মতনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে এরা এক অক্ষে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। আমরা বুঝতে পারছি, রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভও তার বাকি তিনটি স্তম্ভের মতো সাধারণ মানুষের স্বার্থ থেকে দূরে দাঁড়িয়ে নিজস্ব স্বার্থসিদ্ধিতে আগ্রহী। ক্ষমতাসীন রাজনীতিক তার রাজনৈতিক স্বার্থ নিয়ে মিডিয়াহাউসের সাথে দর কষাকষি করতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের নাগরিকের সঙ্গে নয়। কার সঙ্গে আপোষ বা চুক্তি করবেন আপনি, যখন প্রতিটি কণ্ঠই আলাদা মানুষের? তাদের কোনো একক নেতা নেই, মুখপাত্র নেই, যাকে পিটিয়ে বা বশে এনে বাকি মুখগুলো বন্ধ করা যাবে। যখন বহু কণ্ঠ উচ্চকিত, তখন ক্ষমতাবান আর ক্ষমতাবানের সাথে দরকষাকষিতে আগ্রহী মুৎসুদ্দি মিডিয়া এই বহু কণ্ঠের মুখে নিজের কথা গুঁজে দিতে চায়।
ব্লগের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক শক্তি আর মিডিয়াশক্তির নড়াচড়া মূলত সাধারণ মানুষের স্বার্থের বিপক্ষে সমরেখ অবস্থানে আসার নামান্তর। ব্লগ নিয়ন্ত্রণে আইন প্রণীত হলে মতপ্রকাশের বাজারটিও তার দখলেই যায়, যার আইনের হাতের সাথে করমর্দন করার কিংবা সেই হাতের সাথে পাঞ্জা লড়ার আর্থিক সঙ্গতি আছে। সাধারণ মানুষের দুর্বলতাও ওখানেই, তার মত আছে, কিন্তু সেই মতকে সমুন্নত রাখতে রাষ্ট্রের সাথে লড়ার হিম্মত নেই। এ কথা রাজনীতিকরা জানে, জানে মিডিয়াহাউসও। তাই সাধারণ মানুষের সাথে লড়তে গিয়ে তারা শুরুতেই আঘাতটা করতে চায় সেই দুর্বল গোড়ালির ওপর। মানুষ রাজনীতিকদের বিরুদ্ধাচরণ করতে পারে ও চায়, মিডিয়াহাউসেরও তোয়াক্কা করে না, কিন্তু রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সে অসহায়। তাই রাজনীতিক ও মিডিয়াহাউসের অভিন্ন স্বার্থকে রাষ্ট্রের স্বার্থ হিসেবে হাজির করতে পারলে তাদের স্বার্থ রক্ষার কাজটি রাষ্ট্রের কাঁধে চাপিয়ে দেয়া যায়। ব্লগ নিয়ন্ত্রণে আইন তাই মূলত সাধারণ মানুষকে রাষ্ট্রের প্রবল চেহারাটির মুখোমুখি দাঁড় করানোর চেষ্টা।
[এই লেখাটিতে আরো কিছু অংশ যোগ হবে, তথ্যসূত্রসহ। আপাতত আলোচনা চলুক।]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।