Wednesday, December 14, 2011

অ্যাটেনবুড়ো


যখন ছোটো ছিলাম, তখন আগন্তুক বড়দের গৎবাঁধা প্রশ্নের মুখে পড়তাম, বড় হয়ে কী হবে? বড় হয়ে যাওয়ার পর কেউ জিজ্ঞেস করে না, বুড়ো হয়ে কী হবে?

বুড়োদের ওপর আমাদের কোনো ভরসা বোধহয় নেই। মানুষ বুড়ো হয়ে একটা কিছু হবে, এই আশাবাদে হয়তো মানুষ কখনো পৌঁছানোর মতো শক্তিশালী হতে পারেনি। সেই আদিকাল থেকে, যখন আমরা শিকার করতাম আর এটাসেটা কুড়িয়ে খেতাম, দিন শেষ করতাম আগুনের পাশে গোল হয়ে ঘিরে বসে, তখন থেকেই হয়তো বুড়োরা কোনো কিছু না হওয়ারই প্রতীক। মানুষ শিশু থেকে যুবক হবে, সন্তানের জন্ম দেবে, তারপর বুড়ো হয়ে যাবে। বার্ধক্য মানুষের স্বেচ্ছা গন্তব্য নয়, অলঙ্ঘ্য পরিণতি কেবল। কেউ বুড়ো হতে চায় না বলেই হয়তো আর ভাবে না, বুড়ো হয়ে কী হবে সে।

আমি অনেক বছর বেঁচে থাকতে চাই, বুড়ো হতে চাই, আর যেনতেন বুড়ো নয়, একজন অ্যাটেনবুড়ো হতে চাই।

শরীর সুস্থ না থাকলে, বা মন খারাপ থাকলে নেট ঘেঁটে বিবিসির ডকুমেন্টারিগুলো খুঁজে বের করে দেখি। সেখানে ডেভিড অ্যাটেনবুড়ো জীবনের প্রতি কী প্রবল কৌতূহল আর ভালোবাসা নিয়ে আমাদের এই একলা গ্রহের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়াচ্ছে। পত্রিকায় খবর পড়ি, কোনো এক নরপশু হাসান সাঈদ সুমন তার স্ত্রীকে অন্ধ করে দিয়েছে সন্দেহের বশে, ব্লগে আর ফেসবুকে পড়ি, আরো সহস্র অমানুষ তার সমর্থনে কীবোর্ড খুলে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, তখন শুনি, একজন অ্যাটেনবুড়ো হেডফোন ফিসফিস করে বলছে, দেখো, আলোর জন্যে একটা গাছের কী অতুল তৃষ্ণা, সে কেমন করে আলোর দিকে বেড়ে উঠছে। স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখি, কোথায় এক বৃষ্টিঘন জঙ্গলে আকাশ লেহনের সংকল্প নিয়ে বেড়ে উঠছে এক একটি বৃক্ষ। পরিমল জয়ধর তার কিশোরী ছাত্রীকে ধর্ষণ করে, আমাদের সমাজের মানসধর্ষকেরা হাত খুলে লিখে চলে, ঐ কিশোরীরই চরিত্র খারাপ, তার বেশভূষা ধর্ষণের আমন্ত্রণ জানায়। হেডফোনে অ্যাটেনবুড়ো বলে, দ্যাখো, নিউজিল্যাণ্ডের কোন দুর্গম পর্বতে একটা কাকাপো টলতে টলতে এগিয়ে যাচ্ছে পাহাড়ের চূড়ার দিকে, যেখানে সে একটা গর্ত খুঁড়ে তাতে মুখ লাগিয়ে ডাকবে তার সঙ্গিনীকে, সেই ডাক বিবর্ধিত হয়ে ছড়িয়ে পড়বে তার একান্ত উপত্যকায়, মাদী কাকাপো, যদি বিলুপ্ত হয়ে না থাকে, তার ডাক শুনে এগিয়ে যাবে সেই পাহাড়শিখরের দিকে, আর চেষ্টা করবে তাদের এই বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতিটিকে রক্ষার জন্যে। সড়ক দুর্ঘটনা হয়, আমাদের দরিদ্র চলচ্চিত্র জগতের পাঁচজন মানুষ এক লহমায় হারিয়ে যায়, আমাদের নির্লজ্জ দুর্নীতিবাজ মন্ত্রী গিয়ে আহত বাকিদের বলে, দোষ কিন্তু আপনাদের চালকেরই ছিলো। স্ক্রিনে দেখি, পলিনেশিয়ার দূর দ্বীপে মানুষ দেখে অনভ্যস্ত একটা পাখি কী অসীম আস্থা নিয়ে বসে আছে অ্যাটেনবুড়োর হাতে, আর বুড়োটা সেই পাখির মাথায় হাত বুলিয়ে ফিসফিস করে বলছে সেই পাখিদের গল্প, কী করে তারা অদ্ভুত কোনো শব্দ শুনলেই আকাশ ফুঁড়ে দুড়দাড় করে হাজির হয় সেই দূর দ্বীপের ঘন জঙ্গলের মাঝে এক ঘাসের চত্বরে। গল্পের মাঝেই পাখিটা নিঃশঙ্ক চিত্তে অ্যাটেনবুড়োর হাত বেয়ে তার কাঁধে উঠে পড়ে সন্তানের মতো, তারপর বাতাসে ডানা ভাসিয়ে চলে যায় তার যেখানে যাওয়ার। আমাদের একজন লেখক বইমেলা শেষে বাড়ি ফেরার পথে নিজের বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে আক্রান্ত হন ঘাতকের হাতে, আরেকজন লেখক তাঁর মৃত্যুর চার বছর পর প্রবাস থেকে ডুকরে ওঠেন সেই হামলার সাফাই গাইতে, ব্লগে-ফেসবুকে দেখি আরো অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন অমানুষের দল বলছে, মারছে ঠিকই আছে, মাইর খাওয়ার মতই কাম কর্ছে। স্ক্রিনে দেখি, হাঙ্গেরির এক বুনো নদীতে নৌকায় চুপ করে একটি দৃশ্যের অপেক্ষায় বসে আছে অ্যাটেনবুড়ো, একদিনের জন্যে সেই নদীর বুক থেকে জেগে উঠে আকাশের অধিকার দাবি করছে নিযুত মে ফ্লাই, মৃত্যুর আগে একমাত্র সঙ্গমের উদ্দেশ্যে। একটা বুনো ক্যাকটাসের গোল ডাল গড়াতে গড়াতে গিয়ে ঠেকছে মরুভূমিতে চরে বেড়ানো অ্যাটেনবুড়োর হাতে, অ্যাটেনবুড়োর পাশে বসে একটা সিলের ছানা বরফের গোল শ্বাসগর্তে অপেক্ষা করছে তার মায়ের জন্যে, দক্ষিণ মহাসাগরের পানি চিরে সূর্যের দিকে চাইছে একটা ঝিল্লিমুখো তিমি, আর তার লেজের ঝাপটায় ভিজে যাচ্ছে আমাদের অ্যাটেনবুড়ো, একটা সাগরসীমের গাছ টুপ করে তার একটি বীজ ভাসিয়ে দিচ্ছে নদীর বুকে, অ্যাটেনবুড়ো ফিসফিস করে বলে চলছে টেকো শকুনের অসাধারণ ঘ্রাণশক্তির কথা, গভীর বিষাদ নিয়ে বলছে প্রকৃতির বুক থেকে হারিয়ে যাওয়া হলদে-কালো ডোরা ব্যাঙের বিলুপ্তির কাহিনী, পিতার ভালোবাসায় গাছের ডাল থেকে কোলে তুলে নিচ্ছে একটা গম্ভীর ক্যামেলিয়নকে। ওদিকে পত্রিকায় দেখি মন্ত্রীরা চুরি করে, হিংস্র মানুষ পিটিয়ে মেরে ফেলে নিরীহ মানুষকে, পুলিশ ছাত্রের পা ভেঙে দেয়, মা খুন করে সন্তানকে, শিশু ধর্ষিত হয় বৃদ্ধের হাতে, বনের পাশে তামাক আর ইঁট পোড়ানোর ভাঁটা চলে জমজমাট, একটা ঘরছাড়া বাঘ অবাক চোখে দেখে তাকে নিধনে এগিয়ে আসা হিংস্রতর মানুষকে। অ্যাটেনবুড়ো যখন চারশো মিলিয়ন বছরের পুরনো পাথরখণ্ড বুকে চেপে ধরে সেই পাথরের বুকে রেখে যাওয়া প্রাণীর শরীরের আভাস দেখিয়ে ফিসফিস করে বলতে থাকে, দেখো প্রাণ কত সুন্দর, প্রকৃতি কী গভীর মমতায় তার স্মৃতি ধরে রেখেছে, তখন আমাদের প্রধান দৈনিকে দেখি বুদ্ধিবেশ্যারা মাত্র চল্লিশ বছরের পুরনো যুদ্ধের ইতিহাস নষ্ট করে বিকল্প ইতিহাস লেখে।

আমরা তো একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করতে চাওয়া জাতি হতে চেয়েছিলাম। এমন কেন হলাম, যখন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় টপকানো মানুষেরাই একেকটা প্রচণ্ড অমানুষ হয়ে ওঠে? যাদের শিক্ষিত হওয়ার কথা, তারাই দেখি সবচেয়ে বর্বরের মতো কথা বলে। অ্যাটেনবুড়োকে দেখি জঙ্গলে পাহাড়ে হামাগুড়ি দিয়ে একটা ছোট্ট ফুলের কাছে নতজানু হয়ে বসে বলতে, কী করে সেই ফুল নিজে টিকে আছে, আর টিকিয়ে রেখেছে আরেকটি পতঙ্গকে।

অ্যাটেনবুড়োকে মনে হয় উন্মাদে ভরা পৃথিবীতে শেষ সুস্থ লোক, শ্রোতার অভাব পরোয়া না করে বকে চলা এক উদভ্রান্ত আত্মমগ্ন গল্পদাদু, যে বছরের পর বছর ধরে বলে চলছে পৃথিবীর গল্প, প্রকৃতির গল্প, প্রাণের গল্প আর ভালোবাসার গল্প। মনে হয়, আমাদের তথাকথিত শিক্ষিত সব বর্বরের বিনিময়ে প্রকৃতির কাছে একজন অ্যাটেনবুড়ো চেয়ে নিই আমাদের জন্য।

বুড়ো হয়ে একজন অ্যাটেনবুড়ো হতে চাই। হতে না পারলেও চাওয়াটা ধরে রাখতে চাই। আমি এক স্বার্থপর বিশ্বনিন্দুক। পৃথিবীর খুব কম মানুষকেই আমি ভালোবাসি। তার মধ্যে অ্যাটেনবুড়ো একজন। এই লোকটা সারা পৃথিবীর মানুষের জন্যে সম্পদ।



1 comment:

  1. অসাধারণ ... ফেসবুকে শেয়ার করলাম এই পোস্ট

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।