Wednesday, November 02, 2011

বাংলাদেশে নিউক্লিয়ার শক্তি


প্রধানমন্ত্রীর অফিসে আজ বাংলাদেশের বিজ্ঞান, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রকের প্রতিমন্ত্রী ইয়াফেস ওসমান আর রুশ আণবিক শক্তি কর্পোরশন রোসাটমের মহাপরিচালক সের্গেই কিরিয়েঙ্কো চুক্তি স্বাক্ষর করলেন [১]। চুক্তি মোতাবেক, পাবনার রূপপুরে দু'টি নিউক্লিয়ার শক্তিকেন্দ্র স্থাপনে কারিগরি সহায়তা করবে রোসাটম। শক্তিকেন্দ্র দু'টির ইনস্টল্ড ক্যাপাসিটি হবে প্রতিটি এক গিগাওয়াট। প্রকল্পটির আকার বোঝানোর জন্যে বলছি, বাংলাদেশে সর্বমোট তিন থেকে চার গিগাওয়াটের মতো ক্যাপাসিটি বর্তমানে কার্যকর থাকে।

বাংলাদেশের শক্তি অবকাঠামো আশঙ্কাজনক রকমের গ্যাসনির্ভর। শুধু বিদ্যুতের জন্যেই নয়, আমাদের কলকারখানাও গ্যাসের ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। একদিন আমাদের গ্যাস ফুরোবেই, তখন এই গ্যাসভিত্তিক অবকাঠামোর জন্যে আমাদের পরনির্ভরশীল হয়ে পড়তে হবে, যদি না মাঝের সময়টুকুর মধ্যে আমরা আমাদের অবকাঠামোর চরিত্র পাল্টাতে না পারি। বাংলাদেশের জন্যে হাতে সুযোগ থাকে চারটি, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলা, নেপাল এবং/অথবা ভূটানে বৃহদাকার জলবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে বিনিয়োগ করে সেই বিদ্যুৎ আমদানি করা, ভারত এবং/অথবা মায়ানমার থেকে গ্যাস আমদানি করে এনে গ্যাসনির্ভর অবকাঠামোকে খোরাক যুগিয়ে চলা, নিউক্লিয়ার শক্তির দিকে ঝুঁকে পড়া। কয়লা নিয়ে আমাদের নীতিনির্ধারকরা জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে দ্রুত কাজ শুরু করতে পারছেন বলে প্রতীয়মান হয় না। নেপাল-ভূটানে জলবিদ্যুৎপ্রকল্প এবং ভারতের ভূমি ব্যবহার করে সেই প্রকল্প থেকে বিদ্যুৎ আমদানির জন্যে যে পরিমাণ আঞ্চলিক উদ্যোগ ও সক্রিয় কূটনীতির প্রয়োজন হয় তা এ অঞ্চলে এখনও বিদ্যমান নয়। ভারত-মায়ানমার থেকে গ্যাস আমদানির ক্ষেত্রেও আমাদের পারস্পরিক কূটনৈতিক সক্রিয়তাই বাধা হয়ে দাঁড়াবে। শক্তি সেক্টরের নীতিনির্ধারকরা যে অবশিষ্ট বিকল্পের দিকেই ঝুঁকে পড়বেন, তা বিচিত্র নয়, কারণ বাংলাদেশ শক্তির বিশাল ঘাটতি নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে চলছে। শিল্প ও কৃষি, বাংলাদেশের দুই খাতই শক্তি-ক্ষুধিত, আর সুচিন্তিত ট্যারিফ পলিসির অভাবে আমাদের নগরাঞ্চলও শক্তির বিশাল ভোক্তা। খুব শিগগীরই আমাদের অনেক শক্তি প্রয়োজন। নিউক্লিয়ার শক্তিকে তাই আমরা ক্রমশ নিজেদের জন্যে অপরিহার্য করে তুলেছি। এই পরিস্থিতি এড়ানো যেতো, যদি আমরা আমাদের সীমিত সম্পদের কথা ভেবে আজ থেকে কয়েক দশক আগেই অবকাঠামো নকশায় শক্তিদক্ষতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতাম, যদি আমাদের ট্যারিফ পলিসি শক্তিভোগে মিতব্যয়ী হওয়াকে উৎসাহিত করতো, এবং আমাদের শক্তি বিতরণ ব্যবস্থাকে কঠোরভাবে আর্থিক দক্ষতা অর্জনে উৎসাহিত করা হতো। আমরা এর কিছুই করতে পারিনি। ফলে নিউক্লিয়ার শক্তি আমাদের জন্য আর অপশন নয়, নেসেসিটি। মুখ কালো করে হলেও তাই এই প্রকল্পকে স্বাগত জানাতে হচ্ছে।

এমন বড় স্কেলের প্রকল্প নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের অনেক কৌতূহল থাকবে, এবং সরকারের উচিত সংসদের ভেতরে আর বাহিরে এই প্রকল্প সম্পর্কে বিশদ আলোচনা করা। আমরা পরিবর্তে দেখতে পাচ্ছি, সরকার প্রায় মৌনব্রত অবলম্বন করেছে। প্রকল্পের ব্যয় সম্পর্কে কিছুই জানানো হয়নি, ব্যয় প্রাক্কলন আদৌ হয়েছে কি না, জানার উপায় নেই। রাশিয়া থেকে এর আগেও আমরা পুরনো বিমান অনেক চড়া দামে কিনেছি বলে অভিযোগ উঠেছে নানা মহলে, নিউক্লিয়ার শক্তিকেন্দ্রের ক্ষেত্রেও এ ধরনের কিছু ঘটতে যাচ্ছে কি না, বোঝার উপায় নেই।

জাপানে সাম্প্রতিক ফুকোশিমা শক্তিকেন্দ্রে বিস্ফোরণ এবং তারপর তেজস্ক্রিয় বস্তু আশেপাশে ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা সারা পৃথিবীতেই নিউক্লিয়ার শক্তির ভবিষ্যৎকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। জার্মানিতে ক্রমশ তার সব নিউক্লিয়ার শক্তিকেন্দ্র বন্ধ করে দেয়ার জন্যে প্রবল জনমত ও রাজনৈতিক ইচ্ছা তৈরি হয়েছে, ইয়োরোপের আরো কয়েকটি দেশ তাদের নিউক্লিয়ার শক্তিকেন্দ্রের সংখ্যা আর না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাই পুরনো বিমানের মতো ফেইজ আউট করা পুরনো শক্তিকেন্দ্র আমাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হবে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার উপায় আপাতত নেই, এবং সরকারেরই কর্তব্য এই প্রকল্প সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে ক্রমাগত অবহিত করা। এই ধরনের বড় প্রকল্পে নানা ধরনের আর্থিক নয়ছয় হওয়া সম্ভব, কিন্তু দরিদ্র রাষ্ট্রের পয়সা গচ্চা যাওয়ার চেয়ে বড় আশঙ্কা হচ্ছে একটি বুড়াধুড়া নিউক্লিয়ার শক্তিকেন্দ্রকে দেশে ঠাঁই দেয়া। পুরনো বিমান ক্রয়ে দুই চারটা ধান্ধাবাজ মন্ত্রী আর দশ বারোটা বাটপার এয়ার কমোডরের পকেটে পয়সা ঢুকলে সেটা এককালীন ক্ষতি, কিন্তু একটা পুরনো নিউক্লিয়ার শক্তিকেন্দ্র একটা দেশকে মোটামুটি কয়েক দশক থেকে কয়েকশো বছরের জন্যে কারবালা বানিয়ে ছাড়তে পারে। তাই সরকারের প্রতি আমার অনুরোধ, এই প্রকল্পটি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জন্যে তথ্য সরবরাহ করার। এরসাথে জড়িত বাংলাদেশের বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীরা যেন পত্রিকা, টেলিভিশন ও রেডিওতে [সম্ভব হলে ব্লগেও] মানুষের জিজ্ঞাসার মুখোমুখি হন এবং তাদের সঠিক তথ্য যোগান। বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শক্তিপ্রকল্প নিয়ে চোরের মতো চুপিচুপি কাজ করার তো কোনো প্রয়োজন নেই, যখন বাংলাদেশের মানুষই সেই প্রকল্পের জন্যে অর্থ যোগাবে। জোট সরকারের আমলে টঙ্গীতে হারবিন পাওয়ারের ৮০ মেগাওয়াটের ধ্বজভঙ্গ পাওয়ার স্টেশনটির কথা আমরা ভুলে যাইনি, যেটি আধঘন্টা চলার পর বিকল হয়ে পড়েছিলো।

ফুকুশিমা শক্তিকেন্দ্রের কথা মাথায় রেখেই শক্তিকেন্দ্রের নকশা ঠিক করা হবে বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন কিরিয়েঙ্কো। ফুকুশিমা শক্তিকেন্দ্রের সমস্যাটা কিন্তু ছিলো সেই বয়সেই। ফুকুশিমাতে যে দুর্ঘটনা ঘটেছিলো, সেটির প্রকৃতি পারমাণবিক নয়, বরং তাপীয়। নিউক্লিয়ার শক্তিকেন্দ্রগুলো সবই বাস্তবে একেকটা প্রকাণ্ড বয়লার, সেখানে পানি গরম করে বাষ্প তৈরি করা হয়, আর সেই বাষ্প এক বা একাধিক বাষ্পীয় টারবাইনকে ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। পানি থেকে বাষ্প তৈরির তাপ আসে ইউরেনিয়ামের ফিশন থেকে। ইউরেনিয়ামের ক্ষুদে বড় একটা জিরকোনিয়াম রডের মধ্যে থাকে, সেই রডের ভেতরে নিয়ন্ত্রিত চেইন রিয়্যাকশন হয়, ফলে রডটা গরম হয়ে ওঠে। এই রডগুলো পানিতে ডোবানো থাকে, সেই পানি রড থেকে তাপ শুষে নিয়ে বাষ্পে পরিণত হয়। ফুকুশিমাতে ভূমিকম্পের ফলে কেন্দ্রে বিদ্যুৎ সরবরাহ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলো। পাম্পগুলো বিকল হয়ে যাওয়ার ফলে ফিশনপ্রক্রিয়া থামিয়ে দেয়া সম্ভব হলেও, বিদ্যুৎকেন্দ্রটিকে পানির সাহায্যে ঠাণ্ডা করার আর উপায় আর ছিলো না। জিরকোনিয়াম রডগুলো যখন অতিরিক্ত গরম হয়ে যায়, তখন তা পানি আর বাষ্প থেকে হাইড্রোজেন আলাদা করে ফেলে। হাইড্রোজেন আর বাতাসের মিশ্রণ একটা খুব সক্রিয় বিষ্ফোরক, ফলে যা হবার, তা-ই হয়েছিলো সেই কেন্দ্রে, অতিরিক্ত হাইড্রোজেন প্রবল চাপে রিয়্যাক্টর ছেড়ে বেরিয়ে গোটা রিয়্যাক্টর বিল্ডিংশুদ্ধ বিষ্ফোরিত হয়। ঐ বিষ্ফোরণে রিয়্যাক্টরে জমা থাকা কিছু তেজস্ক্রিয় বর্জ্য, মূলত তেজস্ক্রিয় সিজিয়া আর আয়োডিন, বিশাল এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। জাপানের কিছু কিছু গ্রাম তেজস্ক্রিয় সিজিয়াম বর্ষণের কারণে আগামী পঁয়তিরিশ বছর পর্যন্ত আর মানুষ বাসের উপযোগী নয়।

আমাদের নিউক্লিয়ার শক্তিকেন্দ্র স্থাপিত হতে যাচ্ছে পাবনার রূপপুরে। এর দক্ষিণে কিছুদূরে পদ্মা, পূর্বে কিছুদূরে যমুনা। নিউক্লিয়ার মেল্টডাউনের প্রয়োজন নেই, ফুকুশিমার মত কোনো ধরনের তাপীয় দুর্ঘটনাও যদি সেখানে ঘটে, গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার একটা বড় অংশ খুব অল্প সময়ের মধ্যে সেই তেজস্ক্রিয় বর্জ্যের শিকার হবে।

কিন্তু এগুলো সবই জুজুর ভয়, সারা পৃথিবীতে শয়ে শয়ে নিউক্লিয়ার শক্তিকেন্দ্র চলছে, বাংলাদেশেই বা কেন ঠিকমত চলতে পারবে না?

এই প্রশ্নের উত্তরেই সরকারকে সরব দেখতে চাই। তারা যেন আমাদের আশ্বস্ত করেন, একেবারে স্টেইট অব দ্য আর্ট নিউক্লিয়ার শক্তিকেন্দ্র আমরা পাচ্ছি, অন্যদেশে ফেইজ আউট করা কোনো বাতিল মাল নয়। নিউক্লিয়ার শক্তিকেন্দ্র নিয়ে আক্ষরিক অর্থেই কোনো চুদুরবুদুর ছৈল্ত ন। আমরা প্রতিমুহূর্তে এ সম্পর্কে আশ্বস্ত থাকতে চাই, সে অধিকার আমাদের রয়েছে।

নিউক্লিয়ার শক্তিকেন্দ্র সারা পৃথিবীতেই বেইজ লোড মোকাবেলার জন্যে ব্যবহার করা হয়, তাই এই শক্তিকেন্দ্র কমিশন করার আগে আমাদের দুর্বল গ্রিড সিস্টেমকেও সবল করতে হবে। বাংলাদেশের পূর্বভাগে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সংখ্যা, আকার ও পরিমাণ বেশি, পশ্চিমভাগ সেই তুলনায় বিদ্যুৎদরিদ্র, তাই একটি ট্র্যান্সমিশন লাইন এই দুই ভাগকে সংযোগ করেছে, যেটিকে ইস্ট-ওয়েস্ট ইন্টারকানেক্টর বলা হয়। সবেধন নীলমণি ইস্ট-ওয়েস্ট ইন্টারকানেকটরের সমান্তরালে ইমার্জেন্সি বিকল্প সহ আরো কয়েকটি বিপুল ক্যাপাসিটির ট্র্যান্সমিশন লাইন স্থাপনের কাজ যদি এই শক্তিকেন্দ্রের সাথে সমাপতিত না হয়, নিউক্লিয়ার শক্তির ফসল আমাদের ঘরে উঠতে আরো সময় লাগবে। এ ব্যাপারেও সরকারের কী পরিকল্পনা, তা আমরা বিশদ জানতে চাই।

এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের মতো প্রকল্পগুলো নিয়ে আমাদের দেশের বিশেষজ্ঞদের কোনো কণ্ঠস্বর শুনতে পাই না, সংসদেও এ নিয়ে বিশদ কোনো আলোচনা আমরা শুনতে পাই না। সংসদে আমাদের সাংসদরা যতবার "মাননীয় স্পিকার, আমি আপনার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানাতে চাই" বলে মুখে ফেনা তুলে সময় নষ্ট করেন, সেই অবকাশে এই সকল প্রকল্প নিয়েই মনোজ্ঞ আলোচনা হওয়া সম্ভব। বিদেশী প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি সই হওয়ার আগে তাই সেই চুক্তি সংসদে আলোচিত হতে হবে, জনসাধারণের কাছে সেই চুক্তির অনুলিপি উন্মোচিত করতে হবে। গণতন্ত্র শুধু ভোটে সীমাবদ্ধ রাখার জিনিস নয়, বরং প্রতিনিয়ত ভোটারদের সামনে সরকারের কাজ সম্পর্কে তথ্য যোগানো ও আলোচনার সুযোগ দানই গণতন্ত্রের প্রশস্ত অংশ। আমরা সরকারের আচরণে তাই প্রকৃত গণতন্ত্রের ছাপ দেখতে চাই।

সূত্র

[১] <a href="http://www.thedailystar.net/newDesign/latest_news.php?nid=33385">Dhaka, Moscow ink nuke power deal - দ্য ডেইলি স্টার</a>

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।