Sunday, October 30, 2011

স্মুদ অপারেটর


১.
আমাদের জীবনটাই হিমশৈলের চূড়ায় কাটে। সব ঘটনা, দুর্ঘটনা, সিদ্ধান্ত, তর্কবিতর্ক সেই হিমশৈলের চূড়াতেই নিষ্পন্ন হয়। বাকিটা জলের কত গভীরে নেমে গেছে, তা নিয়ে আমাদের অনেকেরই মাথাব্যথা নেই।

কারণ আমাদের অনেকের মাথাই নেই। যাদের আছে, তাদের অনেকে সেটা খামোকা ব্যথা করাতে চায় না।

এ কারণেই যখন পত্রিকায় শিরোনাম দেখি, হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন প্রবীণ সত্যাগ্রহী, আহাউহু করি। তারপর পৃষ্ঠা উল্টে বিনোদন পাতায় গিয়ে নায়িকাদের বুক দেখার চেষ্টা করি। কিছু তার দেখি আভাস, কিছু পাই অনুমানে।

২.
কিন্তু চায়ের আড্ডায় উপস্থিত অনেকেই পেঙ্গুইনপন্থী। তারা হিমশৈলের চূড়ায় রোদ পোহায় যেমন, তেমনি জলের নিচেও জীবনের অন্ধিসন্ধির খোঁজ করে। তারপর চা আর ডালপুরিসহ সেসব খবর রাষ্ট্র করে।

তেমনি একজন চায়ের কাপ খালি করে বললেন, "এ সবই আসলে পুঁজিবাদের খাদেমগিরি নিয়ে ঢুঁশাঢুঁশি।"

আমরা যারা চা কম খাই, কথা কম বলি আর বিল বেশি দিই, তারা একটু নড়েচড়ে বসি। প্রবীণ সত্যাগ্রহী মৃত্যুর সাথে হাসপাতালে পাঞ্জা লড়ছেন, তার সাথে পুঁজিবাদের সম্পর্কটা শুরুতেই ঠাহর করতে পারি না।

জ্ঞানী পেঙ্গুইনটি তখন সব খোলাসা করে বলেন।

৩.
সব গিয়ানজামের মূলে রয়েছে আন্না হাজারে। চিমসে এই লোকটা অনশনকে আবার লাইমলাইটে তুলে এনেছে। পথসভা, লংমার্চ, টক শো, সব এক চড়ে ম্লান করে দিয়েছে ব্যাটা। সেইসাথে লুপ্তপ্রায় গান্ধীবাদ আবার ব্যাঙের ছাতার মতো পাথর সরিয়ে মাটি ফুঁড়ে বেরিয়েছে।

অনশনের ফর্মুলা সহজ নয় অবশ্য। কিছু ড্রেস কোড রয়েছে, কিছু কোড অব কনডাক্টও রয়েছে। টিশার্ট আর জিন্স পরে অনশন করতে গেলে কোনো লাভ নেই। পরতে হবে একটি খাদি চাদর। নিম্নাঙ্গে একটি কৌপীন ধারণ করতে পারলে আরও চোস্ত হয়। অনশনের জন্যে একটি মঞ্চ তৈরি করতে হবে, যেখানে সূর্যের আলো ফোটোগ্রাফারের ক্যামেরাকে বিব্রত না করে মুখের ওপর সঠিক ঔজ্জ্বল্য নিয়ে পড়ে। সূর্য ডুবে গেলে ফ্লাডলাইটের ব্যবস্থা করতে হবে। পানি খাওয়া চলবে, তবে গ্লুকোজ খাওয়া বারণ।

হাজারের নাম যারা আগে শোনেনি, হয়তো তারা তাকে জয়নাল হাজারে বলেই ভুল করতো, তারাও পত্রিকায় এই হাজারেপনার ফাঁপানো খবর শুনে নড়েচড়ে বসলো। অনশন। হুঁ, এটাই একবিংশ শতাব্দীর ব্রহ্মাস্ত্র। বাপমা থেকে শুরু করে সরকার, সবার টনক ধরে একেবারে টান মেরে ছাড়ে। যদিও দেশে লাখে লাখে লোক কয়েক বেলা না খেয়ে কাটিয়ে দেয়, কিন্তু ভদ্দরলোকের সন্তান খদ্দর গায়ে মাঠেময়দানে উপোস শুরু করলে তাতে শাসকের তহবনে ব্যাপক টান পড়ে।

এরপর শুরু হয়ে গেলো অনশন হাইপ। উঠতে বসতে এ অনশন করে, সে অনশন করে। শহীদ মিনারে আগে নেশাখোরেরা ভিড় করতো, অনশনীদের দাপটে তারা আস্তানা গুটিয়ে দমকল অফিসের দিকে চলে গেলো। প্রত্যেক মিডিয়া হাউসে একজন অনশনম্যান ফিট করা হলো, আর কোনো নিউজ না পেলে সে শহীদ মিনার থেকে একটা চক্কর মেরে আসে, সেখানে সবসময়ই কেউ না কেউ অনশনে লিপ্ত।

পত্রপত্রিকা আর টকশোতে এ নিয়ে ধুন্ধুমার লেগে গেলো। রোজই সরকারকে কেউ না কেউ ধুয়ে সাদা করে ফেলে।

পরিস্থিতি যখন ক্রমশ খারাপ হচ্ছে, ভুখা এবং সিলেকটিভ নাঙ্গা লোকে ছেয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন চত্বর, তখন সরকারের উপরমহল ঠিক করলো, এইসব প্রতিবাদী অনশনীদের একটা টাইট দিতে হবে।

তারা তখন যোগাযোগ করলো প্রবীণ সত্যাগ্রহী, বাংলার গান্ধী আবুলদার সঙ্গে। এই লাইনে তিনি স্মুদ অপারেটর নামেই পরিচিত। তাঁর তপস্বীসুলভ জীবনাচরণের জন্যে লোকে তাকে ডাকে তাপস পাল, আদালত তাঁকে ডাকে হরিদাস পাল। সেই যে সেন রাজারা পাল বংশের নাম ডোবালো, তারপর তাঁর মতো করে কেউ আর পাল বংশের নামে পাল তুলতে পারেনি।

৪.
হিমশৈলের এইটুকু রাষ্ট্র হওয়ার পর আবার চা বলতে হয়। কিছু পুরিও। সাথে শসা।

৫.
আবুল গান্ধীর সাথে সরকারের ওপরমহলের কী চুক্তি হয়, তা পরিষ্কার জানা যায় না। জানতে হলে কয়েক বছর পর উইকিলিক্স ঘেঁটে দেখতে হবে। কিন্তু তিনি দেরি করেন না একটুও, মাঠে নেমে পড়েন।

আবুলদা জানেন, কোনো সিস্টেম পণ্ড করতে হলে সেই সিস্টেমের একটা অংশ হতে হয় আগে। তাই তিনি অ্যাসাইনমেন্ট হাতে পেয়েই প্রথমে সোবহানবাগ থেকে দুই ফুল তেহারি আনিয়ে খেলেন, তারপর হাফহাতা গেঞ্জির ওপরে একটা খদ্দরের চাদর আর ধুতি পরে চলে এলেন শহীদ মিনারে। কিছুক্ষণ পর সেখানে হাজির এক পত্রিকার সাংবাদিক।

আবুলদা ছলোছলো চোখে ব্যানার দেখে নিয়ে সাংবাদিকের কাছে ঘোষণা দিলেন, ছায়াগাছি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের আন্দোলনের সঙ্গে তিনি সংহতি প্রকাশ করে অনশনে যোগ দিলেন। সরকার তাদের দাবি না মানা পর্যন্ত তিনি বাদামটাও খাবেন না।

উপস্থিত অনশনীরা প্রবল হাততালি দিলো। তাদের মনে আশা, একদিন গোটা বাংলাদেশই এভাবে ভুখ হরতাল করতে শহীদ মিনারে চলে আসবে।

এক অনশনীর হাতে একটা ছাতা খুলে ধরিয়ে দিয়ে আবুলদা বললেন, "একটু ধরো তো বাবা। একটু ছায়ায় বসি। বয়স হয়েছে তো, রোদ সহ্য হয় না।"

অনশনী ছাত্র কষ্টেসৃষ্টে প্রবীণ কমরেডের মাথায় ছাতা ধরে।

কিছুক্ষণ নিরিবিলি ঝিমিয়ে আবুলদা বলেন, "ত্যাগ। তিতিক্ষা। এসব ছাড়া কোনো মহৎ কর্ম সাধন হয় না। গান্ধীজিকে দেখো। আহা। জীবনে বিলাস কী, আয়েশ কী, জানতেই পারলেন না। তিতা শাক দিয়ে রুটি খেয়ে আর হাফনেংটো থেকে কাটিয়ে দিলেন জীবনযৌবন। আর ছাগলের দুধ দুইয়ে দুইয়ে চারটি খেতেন, মুড়ি ভিজিয়ে। বাজানেরা কেউ ছাগলের দুধ দুইয়েছো কখনো?"

এক অনশনী বহু কষ্টে বলে, "ছাগলের দুধ হয় নাকি?"

আবুলদা স্নেহভরে হাসেন। "শহুরে ছেলে তোমরা বাবা। কতকিছু জানো না। ছাগলের দুধ না হলে ছাগলের বাচ্চাগুলি কীসের জন্য লাফায়?"

আরেক অনশনী সন্দেহভরে বলে, "ছাগলের বাচ্চা হয় নাকি?"

আবুলদা আবার হাসেন, সস্নেহে, বোঝেন, কাজ কঠিন হবে না এখানে। নিতান্ত আবেগী হুজুগে সব পোলাপান, আলমারির সবচেয়ে টাইট গেঞ্জি আর জিন্স পরে চলে এসেছে অনশন করতে, সবার মুখে সানস্ক্রিন, হাতে মোবাইল, সেখানে ফেসবুক খোলা। তিনি বলেন, "হয়। ছাগল তো প্লাটিপাস না যে ডিম দেবে। ছাগলের বাচ্চাও হয়, দুধও হয়।"

আরেক অনশনী বলে, "না আঙ্কেল, ছাগলের দুধ দোয়াই নাই কখনো্।"

আবুলদা বলেন, "বড় কঠিন কাজ রে বাবা, বড় কঠিন কাজ। প্রথমে ছাগলটাকে বেঁধে নিতে হয়, তারপর অতি সন্তর্পণে, আঙুলে হাফছটাক সরিষার তেল মাখিয়ে তারপর ছাগলের ওলানে হাত দিতে হয়। সে বড় কঠিন কাজ। শিল্পের পর্যায়ে পড়ে। গান্ধীজি ছাগলের দুধ দোয়ানো শিল্পের আচার্য ছিলেন।"

এক অনশনী বলে, "আঙ্কেল কি কখনও ছাগলের দুধ দোয়াইছেন?"

আবুলদা উদাস হাসেন। সে হাসির নানার্থ হয়। তারপর বলেন, "গান্ধীজি নিজের হাতে ছাগলের পরিচর্যা করতেন। কাঁঠাল পাতা ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাওয়াতেন। যে সিজনে ছাগলের তনুমনে বাসন্তী হাওয়া লাগে, সে সিজনে মদ্দা ছাগল যোগাড় করে দিতে হয় ছাগলকে। ছাগলপালন বড় কঠিন কাজ রে বাবারা।"

অনশনী যুবকেরা চুপ করে যায়। একজন ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়, "আমাদের সংগ্রামে পদে পদে মৃত্যুর হাতছানি। উই শ্যাল নট ফ্ল্যাগ নর ফ্লেইল।"

গলা খাঁকরে আবুলদা বলেন, "কিন্তু ছাগলের মাংস মোটামুটি স্বর্গীয় একটা বস্তু। যদি ছাগলটাকে বাল্যকালেই খাসি করে নিতে পারো, ভালো। খাসি না করলে ছাগলের মাংসে একটা বোঁটকা গন্ধ হয়। সেই বদবু দূর করতে আবার গোলাপজল দিতে হয়, জাফরান দিতে হয়, মৌরি দিতে হয়, আদা দিতে হয়, দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে দোয়া করতে হয়।"

কে যেন কেশে ওঠে।

আবুলদা আড়চোখে বাকি অনশনীদের হাবভাব কয়েক পলক দেখে নিয়ে বলেন, "কচি ছাগলের মাংস বুটের ডাল দিয়ে রান্না করি কোরবানির সময়। ভালোই হয়। পরোটা দিয়ে খেতে সেইরকম লাগে।"

ছত্রধারী অনশনী ছাতা হাতবদল করে।

আবুলদা বলে চলেন, পাকিস্তানে যখন গবেষণার কাজে গিয়েছিলেন, তখন পেশোয়ারের এক পাঠান বন্ধু কীভাবে ছাগল কেটে ছাল ছাড়িয়ে লাঠিতে বেঁধে আগুনের আঁচে দিনমান কাবাব করে হাতে গড়া গমের ধোঁয়া ওঠা রুটি সহকারে পরিবেশন করেছিলেন। কীভাবে নারকেল পেড়ে দু'টুকরো করে তার ভেতরে ছাগলের চাক চাক মাংস মশলাসহ ভরে আটার লেই দিয়ে নারকেল জোড়া লাগিয়ে কাঠকয়লার আগুনে ফেলে দিলে নারকেল গলে তেল বেরিয়ে সেই তেলে ছাগলের মাংস রান্না হয়, কী করে আগুন থেকে সেই পোড়া নারকেল তুলে এনে একটা ঠুক্কি দিলে নারকেলের খোলের ভেতর থেকে অপূর্ব সুবাসিত ভুনা মাংস বেরিয়ে আসে। মটরশুঁটি, গাজর, বাসমতী চাল, মুগ-মুসুর-বুটের ডাল আর ছাগলের মাংস দিয়ে কীভাবে হুলুস্থুলু খিচুড়ি তৈরি করা যায়। প্রচুর জিরা আর পেঁয়াজ দিয়ে কীভাবে উজবেক কায়দায় ছাগলভুনা রান্না করে যবের রুটি দিয়ে হামলে খেতে হয়। যৌবনকালে বান্দরবানে এক পাহাড়ি উৎসবে যোগ দিয়ে হেড কারবারির বাড়িতে কীভাবে কেবল আদা, লবণ, কাঁচামরিচ দিয়ে ডলে আস্ত ছাগল বারবিকিউ করেছিলেন, সে স্মৃতিও খানিক রোমন্থন করেন।

গ্রিকরা কীভাবে ছাগল আর আলু দুইটার স্বাদই একরকম করে তোলে, সে বর্ণনা অর্ধেক দিতে না দিতেই দূরে সাইরেন শোনা যায় প্যাঁ পোঁ। মন্ত্রী চলে এসেছেন। সঙ্গে পাইকবরকন্দাজ।

আবুলদা বলেন, "আরে, তোমাদের সংগ্রাম তো সফল হলো বাজানেরা। মন্ত্রীসাহেব উপস্থিত।"

অনশনীরা কিছু বলে না, কেউ কেউ জিভের জল সুড়ুৎ করে গিলে ফেলে।

ভারিক্কি মন্ত্রী এসে দাঁড়ান, পেছনে সিকিউরিটি মিডিয়া উৎসুক জনতা সবাই হাজির। মন্ত্রীর এপিএস একটা ঝকঝকে বোতলে পানি এগিয়ে দেন, আর একটা আমড়া।

মন্ত্রী সবচে সামনে যে অনশনী, তাকে পাকড়ে ধরে কোলাকুলি করে বলেন, "তোমাদের সংগ্রাম সফল হয়েছে বাজানেরা। আমি এসে গেছি। নাও, পানিটুকু খেয়ে নাও। হাইড্রোজেন আছে, অক্সিজেন আছে। শরীরে কাজে লাগবে।"

এপিএস বলে, "আমড়াতে ভিটামিনও আছে।"

অনশনী যুবক দ্বিধাভরে আবুলদার দিকে তাকায়। আবুলদা মাথা দুলিয়ে ইশারা করেন, খেয়ে নাও।

এরপর বাকিরাও একে একে পানি খায়। আমড়া একটাই আনা হয়েছিলো, তাই তারা আর আমড়া পায় না ভাগে।

সাংবাদিকেরা ফটাফট ছবি খিঁচে নেয়। টিভি সাংবাদিকেরা আবুলদার নাকের সামনে বুম ধরে। আবুলদা অনশনক্লান্ত গলায় বলেন, "আমাদের দাবি মানতে হবে।"

অনশনী যুবকেরা এরপর ফেসবুকে বিজয় ঘোষণা করে স্ট্যাটাস দিয়ে আবুলদাকে ঘিরে ধরে, "চলেন আঙ্কেল, স্টারে যাই।"

আবুলদা উদাস গলায় বলেন, "কাচ্চি?"

সবাই সম্মতি দেয়।

৬.
আবার চা বলতে হয়।

৭.
এভাবেই চলতে থাকে স্মুদ অপারেশন। তেলগ্যাস আন্দোলন, পদ্মাসেতু আন্দোলন, মেট্রো রেল আন্দোলন, অকুপাই ভুরুঙ্গামারি, ধর্ষক শিক্ষকের ফাঁসি, খুনী দুলাভাইয়ের জামিন কেন কর্তৃপক্ষ জবাব চাই, সীমান্তে ফেলানির লাশ, শহরতলিতে ডাস্টবিনে মৃত শিশু, সব আন্দোলনেই অনশনীদের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেন আবুলদা। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা তার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই অকুস্থলে হাজির হয়ে সংগ্রাম সফল করিয়ে দ্যান।

শহীদ মিনারের নেশাখোর সংগঠনের নির্বাহী সভাপতি তাঁর বাড়িতে মিষ্টি আর বুটের হালুয়া নিয়ে দেখা করে আসে। তিনি তার সাথে কিছুক্ষণ আলাপসালাপ করেন। নওগাঁর জেলা প্রশাসকের সাথে তিনি গাঁজার চাষ নিয়ে আলাপ করবেন বলে কথা দেন।

পুরান ঢাকার বিরিয়ানি ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদকও একদিন একটা মাঝারি হাঁড়ি পাঠিয়ে দেন লাল শালু দিয়ে জড়িয়ে। আবুলদা উদাস মনে একটা চীনামাটির বাসনে বিরিয়ানি নিয়ে বারান্দায় বসে খেতে খেতে মহাত্মা গান্ধীর কথা ভাবেন। আহারে লোকটা, একটা টক শো করতে পারলো না আরাম করে।

৮.
আমরা এবার উসখুস করি। এত এত চা, এত এত পুরি, এত এত বিল। ঘটনা শেষ হয় না কেন?

৯.
পেঙ্গুইনদা অবশেষে একটা ঢেঁকুর তোলেন। তারপর একটা সিগারেট ধরান।

পুঁজিবাদী খাদেমগিরি নিয়ে লড়াই। একেবারে গোড়ায় ফিরে যান তিনি।

বাংলাদেশে লোকজন সৃজনশীল না। চিনির পাহাড়ে পিঁপড়ার মতো আচরণ করে তারা, একজনের পিছে বাকি সবাই লাইন ধরে। আবুলদার মার্কেটে ভাগ বসাতে নেমে পড়লো এক তরুণ সত্যাগ্রহী। খদ্দরের চাদর, নিম্নাঙ্গে কৌপীন, কৌপীনের নিচে লুক্কায়িত ইউনাইটেড কালারস অব বেনেটনের অন্তর্বাস, ফ্লাস্কে ছাগলের দুধ আর বগলে গান্ধীর জীবনী নিয়ে একদিন সেও হাজির শহীদ মিনারে।

আবুলদা তখন নিখিল বাংলাদেশ বাসযাত্রী মোর্চার অনশনে বসে ছাগলের মাংসে কাঁচামরিচ আর আদার ভূমিকার তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব আলোচনায় মশগুল ছিলেন। অদূরে অনশনে ব্যস্ত নিরাপদ ফুটপাত চাই আন্দোলনের কর্মীরা। চোখের কোণ দিয়ে তিনি আরেক খদ্দরধারীকে দেখে বক্তৃতা ভুলে গেলেন।

নবাগত সত্যাগ্রহী একেবারে টিভি সাংবাদিক ধরে এনেছে সাথে, ক্যামেরার সামনে সে সাশ্রুনয়নে ঘোষণা করলো, "নিরাপদ ফুটপাথ চাই আন্দোলনের সাথে আমি সংহতি প্রকাশ করছি। আমাদের দাবি যতক্ষণ মেনে না নেয়া হচ্ছে, আমরা দানাপানি ছোঁবো না। শুধু গান্ধীজির স্মরণে এই ফ্লাস্কে কিছু ছাগদুগ্ধ নিয়ে এসেছি, মাঝেমধ্যে দুই চুমুক খাবো। গান্ধীজির স্মরণে, নিজের জন্যে নয়। আমি উপবাসী যোদ্ধা, আমি অনশনের সাধক, ক্ষুধাতৃষ্ণা সকলই মায়া, সকলই গরল ভেল। কা তব কান্তা কস্তে পুত্র, মরণরে তুহুঁ মম শ্যাম সমান, আই জাস্ট কল্ড টু সে আই লাভ ইউ।"

আবুলদা গা ঝাড়া দিয়ে উঠে এগিয়ে গেলেন পাশের অনশনমঞ্চের দিকে।

নবাগত সত্যাগ্রহী বয়সে নবীন, তাই সে সময় নষ্টে রাজি নয়। মোবাইলে ঘড়ি দেখে সে মন্দ্রস্বরে শুরু করে, "আহা, গান্ধীজি। জীবনপাত করলেন ছাগলের দুধ দোয়াতে গিয়ে।"

আবুলদা খদ্দরের চাদরটা উত্তমরূপে উত্তমাঙ্গে জড়িয়ে নেন।

নবাগত সত্যাগ্রহী নিমীলিত নয়নে বলে চলেন, "আহা ছাগল। শুধু কি দুধই দেয় ও? ডিম দেয়, মাংস দেয়, শাকসব্জিও দেয়। বড় উপকারী জীব। তবে ছাগলের ডিম আর ছাগলের শাকসব্জি যেমনই হোক না কেন, ছাগলের মাংস মানবজাতির জন্যে ঈশ্বরের উপহার। সেই ব্যবিলন আমল থেকে লোকে ছাগল মেরে ছাল ছাড়িয়ে খাচ্ছে। কাবাব খাচ্ছে, রোস্ট খাচ্ছে, রেজালা খাচ্ছে, ভুনা খাচ্ছে, বুটের ডাল দিয়ে খাচ্ছে, আলু দিয়ে খাচ্ছে, পরোটা দিয়ে রুটি দিয়ে পোলাও দিয়ে খাচ্ছে। মুগের ডাল আর কুচি কুচি করে ফাড়া মুলা দিয়ে ছাগলের ঝাল-ঝোল খেয়ে দেখেছেন কেউ?"

আবুলদা ভালো করে ঠাহর করে দেখেন, নবাগত এই সত্যাগ্রহীকে চেনা চেনা লাগছে। ছায়াগাছি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ছত্রধারী অনশনী যুবকটিই নয় কি? এ যে তাঁর লেকচারটিকেই মিউটেশন মেরে বাজারে চালিয়ে দিচ্ছে! গুরুমারা বিদ্যা বুঝি একেই বলে?

এক ঘরমে দো পীর কি টিকতে পারে কখনও? কিংবা এক বনে দুই বাঘ? এক শহীদ মিনারে দুই সত্যাগ্রহী? নিশ্চয়ই সরকারের ভেতরে কোনো সরকার একে নিয়োগ করেছে।

আবুলদা যৌবনে কুস্তির আখড়ায় মুগুর ভেঁজেছেন অনেক, গেণ্ডারি দাঁত দিয়ে এখনও ছুলে খান, সভাসেমিনারে লারমিন শাকির পাশের চেয়ারে বসেন, তাই তিনি তিলেকমাত্র দ্বিধা না করে ঝাঁপিয়ে পড়লেন এই অনুপ্রবেশকারীর ওপর। গান্ধীচর্চায় ক্যু করার শাস্তি যে কবরের আযাবের চেয়েও ভয়ানক, সেটা ব্যাটাকে বুঝিয়ে দিতে হবে। পেঁদিয়ে ছাল ছালিয়ে নিতে হবে একেবারে।

১০.
আমরা বুঝি, গল্প শেষ। চায়ের দোকানের ছোকরাকে ডেকে বিল দিতে বলি।

একজন পেঙ্গুইনদাকে জিজ্ঞেস করে, "ঐ নতুন পীরের কী হৈল?"

পেঙ্গুইনদা বলেন, "ওর বেশি একটা জখম হয়নি। দুয়েকটা স্টিচ পড়েছে। কিন্তু আবুলদার অবস্থা ভালো নয়। গান্ধীর জীবনী আর ছাগলের দুধের ফ্লাস্ক দিয়ে একেবারে হাত খুলে পিটিয়েছে চ্যাংড়া হতভাগা। অহিংস কুংফু একেবারে।"

কে যেন বলে, "নাম কী নতুনটার?"

পেঙ্গুইনদা বলেন, "সৈয়দ নাত্থু।"

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।