Friday, October 28, 2011

সোমালিয়া অ্যান্ড কোং


ফররুখ ভাইকে প্রথমটায় চিনতেই পারিনি। কামরুলকে তাই নির্বিকার চিত্তে যা-তা বলে গালাগালি করেই যাচ্ছিলাম। কামরুল নিরীহ ভালোমানুষ, এক একটা গালি খায় আর প্রতিবাদ করে। শেষমেশ যখন পরিচারিকারমণের অভিযোগ অস্বীকার করে সে ডুকরে উঠলো, তখন দূরে এক জোড়া কোঁচকানো ভুরু দেখে ফররুখ ভাইকে চিনতে পারলাম।

কিন্তু, কিমাশ্চর্যম, ফররুখ ভাইয়ের এই হাল কেন?

বেশ রোগা হাড় জিড়জিড়ে একটা প্রোলেতারিয়েত চেহারা ছিলো ফররুখ ভাইয়ের, সেটা একেবারেই উধাও। গাল দুটো ফুলেফেঁপে হয়রান অবস্থা। ফররুখ ভাইয়ের প্রবাদপ্রতিম সুতির পাঞ্জাবি, যেটা বিপ্লব-সংগ্রামের সব ঝড়ঝাপটার ধকল সামলাতে সামলাতে চিমসে গন্ধ ছড়াতো, সেটাও দেখা যাচ্ছে না। উল্টোদিকের চায়ের টেবিলে বসে যা বুঝলাম, একটা টিশার্টের ওপর খদ্দরের চাদর গায়ে বসে আছেন তিনি। আগে চায়ের সাথে একটা কি দুটো ডালপুরি খেতেন, সামনে তাকিয়ে দেখি প্লেটের ওপর পরোটা আর শিক কাবাবের পাগমার্ক।

উঠে গিয়ে ফররুখ ভাইয়ের টেবিলে বসতে গিয়ে দেখি বেশ দামী একটা ফোন চিত হয়ে পড়ে আছে টেবিলের ওপরে। ওটার মালিকও ফররুখ ভাই বলেই মালুম হচ্ছে।

কামরুলটা গাধা, সরল মনেই হয়তো বলে বসে, "বস, বিজনেস শুরু করলেন নাকি?"

ফররুখ ভাইয়ের টেবো টেবো গাল দুটো রাগে গোলাপি হয়ে ওঠে। বিজনেসের মতো একটা পুঁজিবাদী অনাচারের আভিযোগ এভাবে চায়ের দোকানে মুখের ওপর খাড়া কেউ করে বসবে, এটা সহ্য করা কঠিন, জানি আমি। তাই কোলেইটারাল ড্যামেজ সামলানোর জন্য বলি, "বস মনে হয় মোটা হয়ে গেছেন।"

ফররুখ ভাই কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকেন আমার দিকে, তারপর চায়ের কাপটা তুলে একটা মাপা সংগ্রামী চুমুক দেন। তারপর খদ্দরের নিচ থেকে একটা ছোটো হাতআয়না বার করে নিজের মুখশ্রী দেখেন খানিকক্ষণ। তারপর ছোটো একটা বিপ্লবী দীর্ঘশ্বাস ফেলে সেটা আবার চালান করেন খদ্দরের নিচে। আমি বুঝি, টিশার্ট নয়, পকেটঅলা কিছু পরে আছেন তিনি।

"হ্যাঁ", বহু কষ্টে স্বীকার করে আবার চায়ের কাপে চুমুক দেন তিনি। "একটু।"

কামরুলটা ডিপ্লোমেসির কিছুই বোঝে না, সে বলে, "একটু না বস। আপনে তো ফু্‌ইল্যা শ্যাষ।"

ফররুখ ভাই আবারও রাগে রাঙা হন। ইনকিলাবি চোখে কামরুলকে সেকেণ্ড বিশেক ভস্ম করে বলেন, "একটু।"

কামরুল আবারও সংবিধান লঙ্ঘনের আগে আমি মুখ খুলি, "কী হইছে বস?"

ফররুখ ভাই কিছুক্ষণ চায়ের কাপের ওম নেন আনমনে। তারপর সেটাকে নামিয়ে রেখে বলেন, "আর বইলো না। অনশন করতে করতে ... এই অবস্থা।"

কামরুলটা স্তব্ধ হয়ে যায়। আমার চোখের সামনে মহাত্মা গান্ধীর টিংটিঙে চেহারাটা ভেসে ওঠে।

"অনশন করলে মোটা হয় নাকি মাইনষে?" কামরুল গোঁ-গোঁ করে বলে।

ফররুখ ভাই আবারও চোখে ইনকিলাবের আগুন জ্বেলে কামরুলকে পোড়ান। "তুমি কী বুঝবা? অনশন করছো জীবনে?"

কামরুল মাথা নাড়ে, কিন্তু মুখ বন্ধ করে না। "না খাইয়া থাকলে মাইনষে মোটা হয় ক্যামনে?"

ফররুখ ভাই চায়ের কাপ তুলে একটা বিরক্ত চুমুক দেন ফড়াৎ করে। "অনশনের সাথে না খেয়ে থাকার সম্পর্ক কী?"

এইবার আমরা দুজনেই মৌন মেরে যাই। কিছুক্ষণ ভাবি। অনশনের সাথে না খাওয়ার সম্পর্ক নিয়ে।

ফররুখ ভাই খদ্দরের নিচ থেকে হাত দু'খানা বার করে বলেন, "অনশনের প্রাচীন অর্থ ছিলো উপবাস। কিছু খাবে না, কিছু পান করবে না, চুপটি করে পড়ে থাকবে এক কোণায়। সারা পৃথিবী যখন খাচ্ছে, তখন তোমার প্রতিবাদ জ্বলে উঠছে এই স্বেচ্ছাক্ষুধায়। কিন্তু সময়ের সাথে এর অর্থ পাল্টে গেছে।"

কামরুল বলে, "এখন অনশন মানে কী?"

ফররুখ ভাই বলেন, "এখন অনশন মানে হচ্ছে, তুমি কর্তৃত্ববাদী পুঁজিতান্ত্রিক পেটোয়া বাহিনীকে চ্যালেঞ্জ করছো, আয় তুই বেরিয়ে আয় তোর দালালবাদিতার কেল্লা থেকে, বেরিয়ে এসে আমাকে মিনারেল ওয়াটার খাওয়া।"

কামরুল এবার আমার দিকে তাকায়। আমি বলি, "না খাইয়া থাকা লাগে না?"

ফররুখ ভাই বলেন, "তা থাকে। না খেয়ে থাকলে পুঁজিবাদের চামচারা এসে তোকে পানি খাওয়াবে কেন?"

কামরুল বলে, "তাইলে তো অনশনই হইল। উপাসই তো থাকলেন।"

ফররুখ ভাই বলেন, "হ্যাঁ, তা-ই তো।"

কামরুল এবার রেগে যায়। বলে, "তাইলে এইরাম ফুইল্যা গোলালু হইলেন ক্যাম্নে?"

ফররুখ ভাইও চটে যান। বলেন, "আরে অনশন কি দিনের পর দিন মাসের পর মাস করার জিনিস নাকি? সকাল বেলা যাবি, শহীদ মিনারে বসবি, দুপুরের পরই মন্ত্রী এসে তোকে মিনারেল ওয়াটার আর মালয়েশিয়ার বিস্কুট খাওয়াবে।"

কামরুল বলে, "মিনারের ওয়াটার আর মালয়েশিয়ার বিস্কুট খাইয়া কেউ এইরাম মোটা হয় নিকি? কইলেই হইলো?"

ফররুখ ভাই ক্ষেপে যান খুব। বলেন, "ছাগল কোথাকার, সকালে অনশন শুরুর আগে যে ফাটায় নাস্তা করতে হয়, সেইটা হিসাবে ধরবি তো! দুইটা মাস ধরে খালি গরুর গোস্তো দিয়ে পরোটা গরুর গোস্তো দিয়ে পরোটা গরুর গোস্তো দিয়ে পরোটা খেয়ে খেয়ে অনশন করতে গেছি!"

কামরুল গোল গোল চোখে আমার দিকে তাকায়। আমি মিনমিনিয়ে বলি, "গরুর গোস্তো পরোটা দিয়া সকালে নাস্তা কইরা এইরাম মোটা হয় নাকি কেউ?"

ফররুখ ভাই চায়ের কাপ তুলে একটা স্তালিনশীতল কঠোর চুমুক দেন, সাইবেরিয়াতে কোনো হ্রদের পানির লেভেল যেন এক ইঞ্চি কমে যায় ওতে। তারপর বলেন, "আর অনশনের পরে যে বিরিয়ানি খাইতে হয়, সেইটার হিসাব কে রাখবে? তোদের বাপ?"

কামরুল আবারও স্তব্ধ হয়ে যায়। আমি দুর্বল গলায় বলি, "বিরিয়ানি? বিরিয়ানি ক্যান?"

ফররুখ ভাই বলে, "চুক্তিতে বিরিয়ানির কথা আছে তাই বিরিয়ানি!"

কামরুল বলে, "কীসের চুক্তি?"

ফররুখ ভাই বলে, "সোমালিয়া অ্যান্ড কোঙের সাথে চুক্তি।"

আমি বলি, "সোমালিয়া অ্যান্ড কোং কী?"

ফররুখ ভাই অধৈর্য হয়ে হাত নাড়েন। বলেন, "অনশন একটা সামগ্রিক প্রতিবাদ। তুই আজকে একা গিয়ে শহীদ মিনারের সামনে না খেয়ে পড়ে থাকলে তোকে কেউ বাল দিয়েও পুঁছবে না। অনশনের একটা আয়োজন লাগে। এটা একটা ইভেন্ট। এইটার লজিস্টিক সাপোর্ট লাগে না? অনশনের আগে মিডিয়াকে ম্যানেজ করতে হয়, খবরের কাগজ রেডিও টিভিকে ফিট করতে হয়, তারা অনশনের খবর আগে রাষ্ট্র করে। অনশনের দিন সকালে শহীদ মিনারে যাবি, খালি হাতে যাবি? পুষ্পস্তবক লাগবে না? ব্যানার লাগবে না? ফেস্টুন লাগবে না? অনশনের সময় আবার মিডিয়ার লোকদের ডেকে এনে কাভারেজ নিতে হবে না? তারপর এই যে মন্ত্রী আসবে তোকে মিনারেল ওয়াটার খাওয়াতে, সেইটার একটা কোঅর্ডিনেশনের ব্যবস্থা করতে হবে না? ফোটোগ্রাফার দিয়ে ভালো ছবি তোলাতে হবে না? ফেসবুকে গ্রুপ খুলে সেটা চালাতে হবে না? মন্ত্রী কি তার বাপের বাড়ি থেকে মিনারেল ওয়াটার আর বিস্কুট নিয়ে আসবে তোর জন্যে, সেটা এগিয়ে দিতে হবে না? তারপর সারাটা দিন না খাওয়া তুই, অনশন শেষ হওয়ার পর বিরিয়ানি খাবি না তো কি চোদায়া মুড়ি খাবি?"

কামরুল বলে, "সোমালিয়া অ্যান্ড কোং কী?"

ফররুখ ভাই হুঙ্কার দিয়ে বলেন, "আরে এতক্ষণ কী কই? এইসব ম্যানেজ করে তারা, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি! এখন অনশনের ফুল সিজন চলতেছে, সামনে শীতকাল, আরো অনশন হবে। যে যত অনশন করে, সব ম্যানেজ করে সোমালিয়া অ্যান্ড কোং!"

একেবারে তাক লেগে যায়। বলি, "এইখানেও পুঁজিবাদ?"

ফররুখ ভাই বড় বিরক্ত হন। একটা সিগারেট ধরিয়ে বলেন, "সাদা কালো দিয়ে সব কিছু বিচার করলে চলে না। মাঝের ধূসর জায়গাগুলি নিয়ে ভাবতে হবে।"

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।