Saturday, October 15, 2011

আঠার পাঁচালি


মারুফি ভাইয়ের সাথে পরিচয় ধানমণ্ডি লেকের আড্ডায়। রাইফেলস এর মার্কেট কমপ্লেক্সের উল্টোদিকে সন্ধ্যার পর আমরা নানা কিসিমের লোক জড়ো হয়ে রাজাউজির মারি এবং তাদের স্ত্রীকন্যাদের নিয়ে আদিরসাত্মক গল্প ফাঁদি। একেক দিন একেক লোকের বন্ধুবান্ধব সেই আড্ডায় এসে জোটে, তাদের কেউ কেউ নিয়মিত আড্ডাধারীতে পরিণত হয়, কেউ হয়তো তর্কাতর্কি ঝগড়াবিবাদ করে সেই তল্লাট ছেড়ে বিবাগী হয়ে চলে যায়।

এমনই এক সন্ধ্যায় আড্ডামঞ্চে পায়ের ধূলো দিলেন মারুফি ভাই।

তাঁকে দেখলেই বোঝা যায় তিনি আর্টকালচার লাইনের লোক। মাথায় একটি জিন্নাহ টুপি, পরনে টিশার্ট, তার ওপরে ফোটোগ্রাফারদের জ্যাকেট, সেই জ্যাকেটের পকেটগুলো রহস্যময় রকমের ফোলাফাঁপা, এবং সবশেষে একটি ঢলঢলে জিন্সের প্যান্ট। তাঁর স্যাণ্ডেল দুটো যে দুইরকম সেটা বোঝার জন্যে প্রচুর মনোযোগ ব্যয় করতে হয়, কারণ যত্রতত্র পায়ের ধূলো গ্রহণ ও বর্জনের প্রক্রিয়ায় ওগুলো ঝাপসা হয়ে আছে।

মারুফি ভাই একটা প্লাস্টিকের চেয়ার টেনে বসে পকেট থেকে একটা পাইপ বার করেন, তারপর শীতল চোখে আমাদের পরখ করেন একবার। সন্ধ্যার অন্ধকারে পরিষ্কার বোঝা যায় না, কিন্তু আমরা এই ভেবে রোমাঞ্চিত হই যে তাঁর দৃষ্টি নির্ঘাত শার্লক হোমসের মতো তীক্ষ্ণ আর অন্তর্ভেদী। আমরা আরও টের পাই, তাঁর মধ্যে হোমস, ফাইনম্যান আর আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গুণাবলী সব একসঙ্গে ঘুটা মেরে দিয়েছেন ওপরোলা। ঐ একটি পাইপই যেন তাঁর সব গুণকে পিলসুজ হয়ে ধারণ করছে।

পাইপের পর জ্যাকেটের আরেক পকেট থেকে একটা পোঁটলা বার করেন মারুফি ভাই, তারপর সন্তর্পণে তামাক ভরেন পাইপে। সবশেষে একটি ভরসা ম্যাচ জ্বালিয়ে সেই তামাকে অগ্নিসংযোগ করেন। তারপর ফোঁসফোঁস করে পাইপে কয়েকটা টান দিয়ে একটা তৃপ্তির ধোঁয়াশা ছড়িয়ে দ্যান আশপাশটায়।

"আমি একটা ডকুমেন্টারি বানাইতেছি, বুঝলা তোমরা?" মারুফি ভাই বলেন।

আমরা খুশি হই আমাদের অনুমান মিলে যাওয়ায়। বলছিলাম না, উনি আর্টকালচার লাইনের লোক, এমন একটা ভঙ্গি করে সবাই সবার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসি।

"কী নিয়া বানাইতেছেন বস?" আমাদের একজন জানতে চায়।

মারুফি ভাই কটমটিয়ে প্রশ্নকর্তার দিকে তাকিয়ে পাইপে একটি দীর্ঘ নীরব চুমুক দেন। আমরা বুঝি, এই পাইপের অনেক গুণ, মাঝেমধ্যে সাইলেন্সার পাইপ হিসেবেও এটি ব্যবহৃত হয়।

আরো কয়েক লিটার ধোঁয়ার পর মারুফি ভাই মুখ খোলেন। বলেন, "আঠা!"

আমরা হতবিহ্বল হয়ে যাই। আঠার ওপর যে ডকুমেন্টারি তৈরি হতে পারে, এমনটা আমরা কস্মিনকালেও ভাবিনি। মারুফি ভাই যে আম আর্টকালচারী নন, সেটা বুঝে শ্রদ্ধায় জড়োসড়ো হয়ে পড়ি আমরা। ইনি ক্ষণজন্মা। ইনি বহুদূর যাবেন। নিশ্চয়ই ফেসবুকে ইনার ফ্যান পেজ আছে।

আগের সেই প্রশ্নামোদী আড্ডিক আবার প্যাঁ করে ওঠে, "আঠা? মানে, ঐ যে গাম?"

মারুফি ভাই এবার হাসেন মৃদু। রহস্যময় হাসি। এভাবেই হোমস, ফাইনম্যান আর ইলিয়াস হাসতেন নিশ্চয়ই।

"গাম? হাঁ, গাম বলা যায় বটে। গাম-এ-জিন্দেগিও বলতে পারো। ঐ যে একটা শের আছে না, হামে তো গাম নহি থা গাম-এ-আশিকি কে পেহলে? আঠা এক গামই বটে।"

আমরা কিছুই বুঝি না, কিন্তু এটা বুঝি, মারুফি ভাই সেই বিরল প্রতিভাদের একজন, যাদের কথা বোঝা যায় না।

প্রশ্নওয়ালা রবিন হুডের মতো তূণ থেকে প্রশ্ন বার করে ছুঁড়তেই থাকে, "গাম নিয়া ডকুমেন্টারি কীরকম বস?"

মারুফি ভাই এবার আরেকটা প্লাস্টিকের চেয়ার টেনে নেন একপাশ থেকে। তারপর সেটার ওপর একটা পা তুলে একটু আয়েশ করে বসেন। তারপর বলেন, "চা চু দেয় না তোমাদের এদিকে?"

আমাদের কয়েকজন একসঙ্গে লাফিয়ে উঠে অদূরে চারচাকার কেঠো চলমান চায়ের স্টলের দিকে ধেয়ে চাচা চা চু লাগান বলে হাউকাউ করে উঠি। মারুফি ভাই ইত্যবসরে তাঁর পাইপটি ফুঁকতে থাকেন।

চা আসার পর তাতে একটি মৃদু, সুসংস্কৃত, পরীক্ষামূলক নিঃশব্দ চুমুক দেন মারুফি ভাই। দাড়ির ফাঁকে তার হৃষ্ট মুখ দেখে বুঝি, চা তাঁর পছন্দ হয়েছে। এবং এরপরই মহাসিন্ধুর ওপার থেকে ভেসে আসে এক প্রলয়ঙ্করী চুমুকের আওয়াজ, তাতে তিন অক্টেভের শব্দই মিলে মিশে আছে।

"ভালো চা।" চায়ের কাপের ওম নিতে নিতে বলেন মারুফি ভাই। একজন আকলমন্দ আরেক কাপ চা দিতে বলে চাওয়ালা চাচামিয়াকে।

প্রশ্নকর্তা উসখুস করছিলো, তাই মারুফি ভাই খানিক করুণা করেই মুখ খোলেন। "আঠা নিয়ে ডকুমেন্টারি বহুরকম হতে পারে ভাইটু। কিন্তু আমি বানাচ্ছি আমার মতো করে।"

প্রশ্নওয়ালা সোৎসাহে বলে, "স্ক্রিপ্ট ছাড়া? মানে স্পন্টেনিয়াস শুটিং? ক্যামেরা ছাইড়া রাইখা সামনে যা পান সব শুট করবেন?"

মারুফি ভাই মুখটা কুঁচকে ফেলেন। "স্ক্রিপ্ট ছাড়া ডকুমেন্টারি! স্ক্রিপ্ট ছাড়া ডকুমেন্টারি? স্ক্রিপ্ট ছাড়া মারুফি পায়খানাতেও যায় না মিয়া!"

আমরা প্রচণ্ড ধমক দিই এতক্ষণ যে প্রশ্ন করছিল তাকে, "ঐ হালায় চুপ মার! বুঝে না সুঝে না খালি কথা কয়! চুপ বে!"

একজন কাঁচুমাচু হয়ে বলে, "সরি বস, ওর কথায় কিছু মনে কইরেন না, ও একটা ইয়া। যাজ্ঞা, কীরকম বানাইতেছেন বস?"

মারুফি ভাই এবার দ্বিতীয় কাপটি তুলে অভিমানী চুমুক ‌দ্যান একটি, যেন ইস্রাফিলের শিঙা বেজে ওঠে ভিভা রহমানের গলায়। তারপর অপমানের জ্বালা সয়ে নিয়ে ধিকিধিকি পাইপটিকে আবার চাঙা করেন। "বেসিকালি আমার ডকুমেন্টারিটা আঠার ছয় হাজার বছরের ইতিহাসকে কাভার কইরা। বুঝলা না?"

আঠার ইতিহাসের বয়স জেনে আমরা স্তম্ভিত হয়ে যাই। মারুফি ভাই যে একজন কঠিন পথের পথিক, সেটাও দিলঙ্গম করি, বুঝতে পারি, একদিন এই আড্ডার স্মৃতি আমরা অফিসে, দাওয়াতে রোমন্থন করবো। মারুফি ভাই আমাদের মাইকেল মুর।

মারুফি ভাই বলেন, "ডকুমেন্টারি বানাইতে গেলে বিস্তর খরচা। লোকেশনে যাওয়া-আসা, শুটিং, কাগজপত্র, দৌড়াদৌড়ি, দোভাষীর খরচ, রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, তারপর ধরো দেশের বাইরে গেলে তো কিনাকাটাও করতে হয় কিছু না কিছু, তাই না? সব মিলাইয়া খুব ইয়া আর কি। এইজন্য আমি একটা বিকল্প ধারা ঠিক কইরা ফালাইছি। অনেক কথা যাই যে বলে, কোনো টাকা না ঢালি ... এই হইতেছে আপাতত আমার মটো।"

আরেকজন আকলমন্দ আরো এক কাপ চায়ের অর্ডার দেয় চাচামিয়ার দরবারে।

মারুফি ভাই পাইপে টান দিয়ে বলেন, "আঠার আলামত প্রথম পাওয়া গেছে প্রায় ছয় হাজার বছর আগে। প্রত্নতাত্ত্বিকরা এক সাইটে খুব খোদাখুদি করতেছে, তো সেইখানে উইঠা আসছে ভাঙ্গা পাতিল, সেইটা আবার আঠা দিয়া জোড়া লাগানো। সেই আঠা আবার গাছের কষের আঠা। তারপর ধরো গিয়া, ব্যবিলনে মাটি খুইদা এক মন্দির পাইছে, সেই মন্দিরে মূর্তির চোখ হাতির দাঁতের, সেই চোখ গর্তের মধ্যে আঠা দিয়া ফিট করা। আলকাতরার আঠা, ছয় হাজার বছর পরেও যেমন ছিলো তেমনই।"

ধমক খাওয়া প্রশ্নকর্তা ফস করে বলে, "বস এইটা ক্যামনে দেখাইবেন? ব্যবিলন যাইবেন?"

মারুফি ভাই গম্ভীর মুখে বলেন, "ব্যবিলন কি আর আস্তা আছে? বুশ আর ওবামা মিল্লা ভাইঙ্গা চল্টা উঠায় দিছে না? সাভারে শুটিং হবে এইসব। গর্তের মধ্যে ভাঙ্গা পাতিল, আর কুমারপাড়ায় মূর্তির চোখ।"

আমরা শিহরিত হই মারুফি ভাইয়ের সূক্ষ্ম কৌশলের কথা জেনে। কোথায় স্বর্গ কোথায় নরক কে বলে তা বহুদূর, সাভারেরই মাঝে স্বর্গনরক ... মারুফি ভাই আবার কথা বলছেন দেখে ভাবনা থামিয়ে দিই।

"এরপর এক হাজার বছর ধইরা লোকজন নানা জায়গায় আঠা নিয়া অনেক ইয়া করছে, বুঝলা? এই যে ফারাও তুত আনখ আমেন, তার কবর তো বৃটিশেরা ঠিকই খুইদা খাইদা বাইর কইরা লইয়া গেছে, তো সেই কবরে যেইসব কাঠের বাক্সমাক্স ছিলো, সেইসব বাক্সেও আঠার আলামত মিলছে।"

"এইটাও কি সাভারে হবে বস?" জানতে চায় একজন।

মারুফি ভাই একটু ভাবেন পাইপে টান দিতে দিতে। তারপর বলেন, "না। এইটা একটু অন্যভাবে দেখাইতে হবে। মিশরী এমবেসির দরজাটা শুট করা হবে কয়েক সেকেণ্ড। তারপর আশুলিয়া থেকে প্লেন টেকঅফ করার দৃশ্য। এরপর পুরান ঢাকার মাদ্রাসা আর নিউমার্কেটে বোরখার দোকানের ক্লোজআপ শুটিং। তারপর একটা মমি দেখামু।"

"মমি পাইবেন কই?" কে যেন বলে।

মারুফি ভাই বলেন, "এক কম্পাউণ্ডারের সাথে আলাপ করা আছে। সে খুব ভালো ব্যাণ্ডেজ বানতে পারে। আমার বন্ধু বশীরের বাবার জামার দোকান আছে বসুন্ধরায়, ঐখান থিকা একটা ‌ম্যানিকিন হাওলাত করা হবে, ঐটারেই ব্যাণ্ডেজ প্যাচাইয়া মমি বানাইয়া ফালামু।"

মিনমিন করে একজন বলে, "ইয়া, কী জানি বলে, পিরামিড আর নীল নদ দেখাইবেন না?"

মারুফি ভাই ভীষণ খাপ্পা হয়ে বলেন, "পিরামিড আর নীল নদের সাথে মিশরের কী সম্পর্ক?"

আমরা স্তব্ধ হয়ে উত্তর খুঁজি। তাই তো?

মারুফি ভাই বলেন, "পিরামিড কি খালি মিশরেই আছে? সুদানে আছে, ইথিওপিয়ায় আছে, মেক্সিকোতে আছে! নীল নদ কি খালি মিশরেই আছে? উগাণ্ডা থিকা শুরু কইরা সুদান ফুদান হইয়া তারপরে না সে মিশরে আসছে। তোমরা মিয়া খালি স্টিরিওটাইপিং করো। এইভাবে শিল্প হয় না!"

মিনমিন কণ্ঠ আরো মিনমিনে হয়ে বলে, "পুরান ঢাকার মাদ্রাসা আর নিউমার্কেটের দোকানের ফুটেজ দিয়া কী হবে?"

মারুফি ভাই বলেন, "আরবী জামাকাপড় পরা লোকজন দেখাইতে হবে না? খালি পুরুষ দেখাইলে হবে? জেণ্ডার বায়াস এড়াইয়া এখন কাজ করতে হয়। সেইজন্য বোরখার দোকানে বোরখা পরা নারীও দেখাইতে হবে। খেজুরের আড়তে খেজুরের বস্তার ক্লোজআপও নিমু ভাবতেছি। যাজ্ঞা, মমিতে গিয়া ব্যাপারটার ক্লাইম্যাক্স। আর সেইসাথে কিছু আরবী মিউজিক। আজানের আওয়াজও রাখতে হবে।"

আমরা আর কিছু বলি না। শুধু অবাক হয়ে শুনি, কেবল শুনি।

মারুফি ভাই চায়ের কাপ নামিয়ে রাখেন। বলেন, "এরপর ধরো দেড় দুই হাজার বছর আগে রোমান আর গ্রীক লোকজন তাদের কাঠের কাজে আঠা ব্যবহার করছে প্রচুর। এরা আবার আঠা বানাইতো জন্তু জানোয়ারের হাড্ডিগুড্ডি দিয়া। কসাইয়ের দোকান থিকা শিং, হাড্ডি, খুর এইসব নিয়া বড় বড় পাতিলে ফুটাইয়া জেলাটিন বাইর কইরা সেইটা দিয়া আঠার কাম করতো। কেউ কেউ আবার মাছের কাটাকুটা দিয়াও আঠা বানাইতো।"

একজন বলে, "হ বস, এইটা শুট করা সহজ। নিউমার্কেটে গরুর গোস্তের দোকান আর সেনপাড়ায় কাঠের ফার্নিচারের দোকান দিয়াই ম্যানেজ করা যাবে।"

মারুফি ভাই বলেন, "না নিউমার্কেটের গরুর গোস্তের দোকানে ঠিক ফ্লেভারটা ফুটে না। টাউন হলের একটা গোস্তের দোকান আমি রেকি কইরা আসছি, ঐখানে ঐ প্রাচীন রোমান ভাবটা মোটামুটি আসে, যা দেখলাম। আর কাঠের কাজের শুটিংও সাভারে হবে। একটু নেচার রাখতে হয় মাঝেমাঝে, তোমরা তো বুঝো না এগিলি।"

কে যেন বলে, "এইটার লগে কী মিউজিক দিবেন?"

মারুফি ভাই বিরক্ত হয়ে বলেন, "এইটার সাথে মিউজিক দিমু ক্যান? আরে না বুইঝা খালি কথা বলে রে!"

আমরা আবার ধমক লাগাই। বলি, "এই চুপ বে!"

মারুফি ভাই বলেন, "আঠা নানা জিনিস থিকা বানানো হইতো। ডিমের সাদা অংশ, গরুবাছুরের রক্ত, হাড্ডি, চামড়া, দুধ, তারপর ধরো গিয়া শাকসব্জি, কী নাই? একবার খালি ফুল ফ্যামিলির জন্য বাজার করলেই সারা বছরের আঠা বানাইয়া ফেলা যায়। এই যে আমরা নৌকায় আলকাতরা লাগাই, এইটা প্রথম বাইর করছিলো কিন্তু রোমানরাই।"

আমরা ভয়ে ভয়ে চুপ করে থাকি।

মারুফি ভাই বলেন, "এগুলি সহজ সিন। নৌকাতে আলকাতরা লাগানোর সিন সাভারেই পাওয়া যাবে। আর তারেক অণুর কাছ থেকে রোমের কিছু ছবি হাওলাত করা হবে। সিদ্দিকা কবীরের একটা বই রাখা হবে ফ্রেমের এক পাশে, অন্য পাশে এক এক করে বাকি সব জিনিস একটা বাটিতে করে এক একটা শট নেয়া হবে। "

কে যেন অস্ফূটে বলে, "লারমিন শাকি!"

আমরা সবাই সমর্থন করি ব্যাপারটাকে। "‌হ্যাঁ হ্যাঁ লারমিন শাকি!"

মারুফি ভাই লাজুক হাসেন। "আচ্ছা দেখি, কথা বলে দেখবো শাকির সাথে। ও খুব বিজি, বুঝলা না? তারপরও আমি রিকোয়েস্ট করলে না করবে না হয়তো। দেখি। যাজ্ঞা। কী বলতেছিলাম যেন?"

তবুও কে যেন নাছোড়বান্দা বলে, "লারমিন শাকি!"

মারুফি ভাই বলেন, "আরে চুপ বে! এর পরে প্রায় এক হাজার বছর আঠা নিয়া তেমন আর কোনো সাড়াশব্দ পাওয়া যায় নাই দুনিয়াতে। এরপর আবার কাঠমিস্ত্রিদের কাজকামে আঠার আলামত পাওয়া যায়। কিন্তু!"

আমরা নড়েচড়ে বসি।

"খালি সাদা চামড়ার লোকের আঠার কথা বললেই হবে? এডওয়ার্ড সাইদের কথা কিন্তু ফালায় দেওয়ার মতো না। ঠিক্কিনা?" মারুফি ভাই চেয়ারের ওপর দুই পা তুলে জুত করে বসেন।

আমরা জানি না এডওয়ার্ড সাইদ কী বলেছিলো, কীভাবে ফেলি তার কথা? তাই সবাই বলি, ঠিক ঠিক!

"যেমন ধরো, এই যে চেঙ্গিস খান, সে কীভাবে এত রাজ্য জয় করলো? টেকনোলজি। চেঙ্গিস খানের সাঙ্গোপাঙ্গোরা নানা অদ্ভুত অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করতো। যেমন তাদের ধনুক ছিলো লেবুকাঠের সাথে গরুর শিং জোড়া দিয়া বানানো। ঐ কাজে ব্যবহার করা হইতো এক রহস্যময় আঠা, যেই আঠার মশল্লা সময়ের অতল গর্ভে হারায় গেছে। গন। ফিনিশ।" মারুফি ভাই হাতের খালি কাপটা নাড়েন। একজন আকলমন্দ আবার চাওয়ালা চাচাকে হুড়ো দেয়।

"চেঙ্গিস খান কই পাইবেন?" একজন রূদ্ধশ্বাসে জানতে চায়।

মারুফি ভাই হাসেন। "আমার বন্ধু সোহিনীর ছোটো চাচারে তো তোমরা দেখো নাই। দেখলে মনে হবে এইমাত্র মঙ্গোলিয়া থিকা আইসা নামছে এয়ারপোর্টে। ওনারে একটা চক্রাবক্রা আলখাল্লা পরাইলেই একদম রেডিমেড চেঙ্গিস খান। গরুর শিং আর কাঠের ধনুকও যোগাড় করা যাবে, ব্যাপার না। খালি মঙ্গোলিয়ার যুদ্ধের সিনটা দেখানো ট্রিকি। দেখি এইটা মঙ্গোলিয়ার দূতাবাসের সাথে কথা বলে, তারা কোনো ফুটেজ টুটেজ দিতে পারে কি না। না পারলে একদিন একটু কষ্ট কইরা কোনো হরতালের সিন শুট করতে হবে আর কি, ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া। ঐটারে একটু আউট অব ফোকাস কইরা তুললেই যুদ্ধের সিন হয়ে যাবে। পুরান ঢাকার ঘোড়ার গাড়ির ঘোড়ার ডাক রেকর্ড করে ছেড়ে দিলেই খেল খতম।"

চা আসে।

মারুফি ভাই চায়ের কাপে নতুন করে চুমুক দিয়ে বলেন, "অ্যান্টোনিও স্ট্র্যাডিভ্যারিয়াসের নাম শুঞ্ছো? না, শুনবা ক্যামনে। বেহালা বানাইতো এই লোক। সেইখানেও আঠার কেরামতি। এক রহস্যময় আঠা দিয়া সে কাঠ ল্যামিনেট করতো। সেই আঠার মশল্লাও কালের গর্ভে বিলীন। রহস্য।"

"এই লোকরে ক্যামনে দেখাইবেন?" একজন বলে।

মারুফি ভাই বলেন, "আমার বন্ধু বশীরের ছোটো বোন বেহালা বাজায়। ঐ বেহালার একটা ক্লোজ আপ গ্লাইডিং শট নিলেই হবে। অ্যান্টোনিওরে না দেখাইলেও চলে। নিতান্ত যদি দেখাইতেই হয় তো অ্যান্টোনিও বান্দেরাসের কোনো সিনামা থিকা ফুটেজ কাটা যাবে।"

আমরা চমৎকৃত হই।

মারুফ ভাই বলেন, "এরপর তো শিল্প বিপ্লব। তখন একের পর এক নতুন আঠা আবিষ্কার হইছে। একটা কইরা যুদ্ধ লাগে আর নতুন নতুন আঠা আবিষ্কার হয়, আর নতুন নতুন ফ্যাক্টরি খোলে। এমনেই চলতে আছে তারপর থিকা। টঙ্গীর আকাশে চিমনির ধোঁয়া দিয়া দেখামু এই অংশটা। আর পাটকলের ভিতরের মেশিনপাতি।"

একজন বলে, "তারপর শেষ?"

মারুফি ভাই বলেন, "না আরো আছে। সুপারগ্লু দেখাইতে হবে না? এইটা আবিষ্কারের কাহিনীটা দেখাইতে হবে। ইস্টম্যান কেমিক্যাল কোম্পানি পলিমার নিয়া গবেষণা করতেছিলো, একদিন তারা দেখে, মাইক্রোস্কোপের নিচে তাদের দুইটা স্লাইড জোড়া লাইগা গেছে। সে জোড়া এমনই জোড়া, টাইনাও খোলন যায় না। এইটা দেখানো এমন শক্ত কিছু না। বদরুন্নেসার বায়োলজি ল্যাবেই শুট করা যাবে।"

কে যেন এক হতভাগা বলে, "বদরুন্নেসায় ক্যান?"

মারুফি ভাই বলেন, "জানাশোনা চিন পরিচয় আছে সেইজন্য। খালি আলতু ফালতু কোশ্চেন কর ক্যান?"

আরেকজন বলেন, "তারপর শেষ?"

মারুফি ভাই বলেন, "না। এরপর দেখামু প্রাণীজগতে আঠা। যেমন ধরো তক্ষক ক্যামনে দেয়ালের সাথে চিপকায় লাইগা থাকে, এইটা দেখামু। শ্রীমঙ্গলে আমার এক বন্ধু থাকে, তার বাসার পিছের দেয়াল ভর্তি তক্ষক।"

কে যেন বলে, "তারপর শেষ?"

মারুফি ভাই বলেন, "আরে না রে ভাই। দেশীয় আঠা নিয়ে কিছু বলতে হবে না? গাবের আঠা, ভাতের আঠা।"

একজন বলে, "পিরিতি কাঁঠালের আঠা?"

মারুফি ভাই বলেন, "হ্যাঁ, ভালুকায় কাঁঠাল বাগানে কিছু শুটিং হবে, আর বলধা গার্ডেনে কিছু।"

কে যেন বলে, "তারপর শেষ?"

মারুফি ভাই বলেন, "হুঁ। ডকুমেন্টারি শেষ হবে বসন্ত বিলাস সিনামার ঐ গানটা দিয়া, ও শাম যখন তখন খেলো না খেলা অমন ধরিলে আজ তোমায় ছাড়বো না।"

একজন বলে, "ডকুমেন্টারি প্রডিউস করতেছে কারা বস?"

মারুফি ভাই কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে পাইপ টানেন, তারপর বলেন, "আপাতত আমার বন্ধু বশীরের বাপ। অবশ্য উনি জানে না যে উনি প্রডিউস করতেছেন। বশীর ওনার দোকানের ক্যাশ থেকে টাকাটা ম্যানেজ করতেছে আর কি।"

কে যেন বলে, "বস, সরকারি অনুদানের চেষ্টা করে দেখবেন না একবার? এইরকম একটা মূল্যবান জিনিস, সরকারের তো উচিত হেল্প করা!"

মারুফি ভাই ফোঁসফোঁস করে বলেন, "সেই চেষ্টা করি নাই ভাবছো?"

আমরা নড়েচড়ে বসি, বুঝি গল্প শেষ হয়নি।

কে যেন বলে, "কী হইছিল বস?"

মারুফি ভাই ধরা গলায় বলেন, "মানিকদা তো ধরো গিয়া পথের পাঁচালির জন্য পশ্চিমবঙ্গের সড়ক ও জনপথ বিভাগের কাছ থিকা ফাণ্ড পাইছিলেন, মুখ্যমন্ত্রীরে ধইরা। আমি ভাবলাম, আমিও যাই। মন্ত্রী তো সিনামা লাইনেরই লোক। মন্ত্রীর এপিএস আবার আমার বন্ধু বশীরের চিনাজানা।"

একজন বলে, "কোন মন্ত্রী? যোগাযোগমন্ত্রী? ঐ বাবুল?"

মারুফি ভাই বলেন, "হ, ঐ বাবুল হোসেনের কাছেই গেছিলাম। তিন মাস ঘুরাঘুরি কইরা শেষে একদিন অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাইলাম। গেলাম। সব খুইলা কইলাম। লোকটা খালি শোনে আর হাসে। যা-ই কই, সে খালি ক্যালক্যালাইয়া হাসে। তেল দিলাম, কইলাম আপনার তো এই ব্যাপারে অনেক রেপুটেশন, কয় সব ষড়যন্ত্র, ঐসব কানে নিয়েন না। কথা শেষ করার পর সে কয়, হুমমম, ওকে, দেখি, গুড বাই। তারপর সে বেল বাজাইয়া সেক্রেটারিরে ডাক দিলো, সেক্রেটারি আইসা তার চেয়ারটা ঠেইলা ঠেইলা টয়লেটে নিয়া গিয়া দরজাটা লাগাইয়া আমারে কইল, খাড়ায় খাড়ায় কী দেখেন ভাইডি, যান গিয়া, কথা শ্যাষ।"

আমরা শিহরিত হই। বলি, "এই লোক হাগতে মুততেও কি চেয়ার ছাইড়া উঠে না নাকি?"

মারুফি ভাই পাইপে টান দিয়ে বলেন, "না। গদির সাথে সে এমন টাইট হইয়া বসছে, নিজেও উঠে না, কেউ তারে টাইনাও তোলে না।"

কে যেন বলে, "তাইলে বস, ডকুমেন্টারিটা বলধা গার্ডেনে শেষ না কইরা, ওনার গদি আর ওনার পিছনের কিছু ফুটেজ দিয়া শেষ করেন।"

মারুফি ভাই কিছুক্ষণ ভাবেন, তারপরে হাসেন। বলেন, "হ!"

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।