Thursday, October 13, 2011

প্রিয় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর


বিডিনিউজে আপনার একটি আর্টিকেল [১] পড়ে একাধারে ভালো লাগা আর বিতৃষ্ণা নিয়ে লিখতে বসলাম। আমি সম্ভবত আপনার আর্টিকেলে উদ্দিষ্ট তরুণ প্রজন্মের একজন। আপনি যদি তরুণতর প্রজন্মের জন্যে এই আর্টিকেলটি লিখে থাকেন, তাহলে সম্ভবত আমার প্রতিক্রিয়া লেখা মানায় না। কিন্তু কিছু জিনিস আপনাকে জানানো প্রয়োজন বোধ করছি।
আমার ভালো লাগা এ কারণে, যে একজন রাজনীতিক দেশের তরুণদের নিজের দলে ভেড়াতে আহ্বান করে কীবোর্ড ধরেছেন। আপনার উদ্দিষ্ট তরুণেরা অনলাইনে পাঠপ্রবণ, এটাও ধরে নিতে বেগ পেতে হয় না। পড়ার মতো সেরেব্রাল কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট মানুষদের রাজনীতির প্রতি আগ্রহী করে তোলার জন্যে আপনার এই উদ্যোগটি দেশে ক্রমবর্ধমান অনলাইন যোগাযোগ ও মত বিনিময়চর্চার গুরুত্বকেই প্রকট করেছে, তাই প্রারম্ভিক সাধুবাদ আপনার প্রাপ্য।
আপনার লেখা শুরু হয়েছে একটি উদ্বিগ্ন প্রশ্ন দিয়ে,
আমাদের সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে, সেটা হবে তো?
প্রিয় মির্জা সাহেব, এখানে "আমাদের" বলতে আপনি কাদের কথা বলছেন, স্পষ্ট হয়নি আমার কাছে। এ্ই "আমরা" যদি দলের মার্কা নির্বিশেষে রাজনীতিকদের বোঝায়, আমি আপনাকে আশ্বস্ত করছি, আপনাদের, রাজনীতিকদের সন্তানরা দুধেভাতেই থাকবেন। আমরা এখন পর্যন্ত এমন কোনো রাজনীতিককে রাজনীতির অঙ্গনে দেখিনি, যার সন্তান দুধেভাতে নেই। আপনাদের রাজনীতির খেলায় বরং আমরা, এই জনগণই দুধভাত হয়ে বসে থাকি একপাশে। আপনারা প্রকাশ্যে একদল আরেকদলের সাথে তর্কাতর্কি লাঠালাঠি করলেও বেলা শেষে আমরা দেখি, আপনাদের সন্তানেরা দলমতের সীমানা পেরিয়ে আত্মীয়তার মিষ্টি বন্ধনেও আবদ্ধ। তাই রাজনীতির পাশার দান উল্টে গেলেও বাংলাদেশের কোনো গরুর সাহস নেই, আপনাদের সন্তানদের পাতে দুধ না দিয়ে কোনো আমজনতার সন্তানের পাতে দুধ দেয়।
যদি পাবলিকের সন্তানের দুধভাত নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে থাকেন, আমার বিনীত প্রশ্ন, পাবলিকের সন্তান শেষ কবে দুধেভাতে ছিলো? আর্টিকেল পড়ে বুঝলাম, '৭২ থেকে '৭৫ সালে যুদ্ধবিদ্ধস্ত বাংলাদেশে শেখ মুজিবের শাসন নিয়ে আপনার অনেক ক্ষোভ, কাজেই আমি বুঝতে পারছি, ঐ সময় পাবলিকের সন্তান কখনোই দুধেভাতে থাকতে পারে না। তবে কি জিয়াউর রহমানের আমলে পাবলিকের সন্তান দুধেভাতে ছিলো? নাকি এরশাদের আমলে? নাকি বিএনপির প্রথম দফায়? আওয়ামী লীগের আমলে তো দুধেভাতের প্রশ্নই ওঠে না, তবে কি আপনাদের জোট সরকারের সময়? নাকি গত সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়? প্লিজ, মির্জা সাহেব, জনগণের সন্তান কবে দুধেভাতে ছিলো, একটু জানিয়ে যান, নিজেদের অভিজ্ঞতার সাথে মিলিয়ে দেখি।
আপনি লিখেছেন,
আমি আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করি যে আজকের তরুণদের অনেকেই ক্রোধ আর হতাশার মাঝে খেই হারিয়ে ফেলছে। তারা যেন স্বপ্ন দেখতে ভুলে গেছে। দেশের ঘুরে দাঁড়ানোর সাথে নিজের উন্নয়নের এক অদ্ভুত দূরত্ব তৈরি করে তারা মনে করছে, দেশের উন্নয়নটা যেন অন্য কারো কর্তব্য, যার জন্য বরাদ্দ আছে বিশেষ একদল, তাদেরকে তাচ্ছিল্য করা যায়, দোষারোপ করা যায় কোনো পরীক্ষা ছাড়া, শুধু রাজনীতিবিদ বলে শনাক্ত করেই।
তাহলে আসুন, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের প্রেক্ষাপটে আপনার এই কথাটার মূল্য যাচাই করে দেখি। আপনি লিখেছেন,
মুক্তিযুদ্ধে আমরা অবশ্যই গিয়েছিলাম পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার জন্য, কিন্তু মনে ছিল তার চাইতেও বড় একটা আশা: স্বাধীনতার সুফলটা আমরা সবাই ভাগ করে পৌঁছে যাবো উন্নতির দুয়ারে। আমরা কী রকম আশাহত হয়েছিলাম সে বয়ান আমার কাছে শুনলে আপনাদের মনে হতে পারে পক্ষপাতদুষ্ট, আপনার পাশের যে মানুষটা ৭২ থেকে ৭৫ এর সময়টাতে জীবিত ছিলেন, অতিবাহিত করেছেন তার যৌবন, তাকে একবার হলেও জিজ্ঞেস করুন।
তার মানে, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালে, যখন আপনি তরুণ, তখন আপনিও "ক্রোধ আর হতাশার মাঝে খেই হারিয়ে ফেলেছিলেন", "স্বপ্ন দেখতে ভুলে গিয়েছিলেন", মনে করেছিলেন, "যার জন্য বরাদ্দ আছে বিশেষ একদল, তাদেরকে তাচ্ছিল্য করা যায়, দোষারোপ করা যায় কোনো পরীক্ষা ছাড়া, শুধু রাজনীতিবিদ বলে শনাক্ত করেই?"
আপনার কি মনে হয় না, যে ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫-এর দুঃসময়ের বদনামকে পুঁজি করে আপনার আর্টিকেল শুরু, সেই ৭২-৭৫ কখনও শেষ হয় না, প্রতিটি সরকারের সময়ই নতুন চেহারা নিয়ে ফিরে আসে তরুণদের কাছে? আপনি তরুণদের কেন মুরুব্বির কাছ থেকে ৭২-৭৫ এর কথা শুনতে বলেন মির্জা সাহেব? কেন তাদের ৯১-৯৬, ৯৬-২০০১, ২০০১-০৬, ২০০৭-০৮ দেখান না? সেগুলো তো তারা সরাসরি দেখেছে। নাকি বাংলাদেশের যাবতীয় দুঃখ আর দুর্দশা সেই ১৯৭২-৭৫ এই নিহিত? যদি তা-ই হয়ে থাকবে, তাহলে জিয়াউর রহমান, এরশাদ আর আপনারা মিলে কুড়ি বছর কেমন শাসন করলেন, যে ঐ চার বছরের ধাক্কা এখনও আপনার আর্টিকেলে প্রতিধ্বনিত হয়?
আপনি আপনার নিজের রাজনৈতিক জীবনের দুঃখ-কষ্ট নিয়ে লিখেছেন, পড়ে মন কিছুটা আর্দ্র হয়েছে। তবে এর প্রতিদানও আপনি পেয়েছেন বৈকি, সেগুলো নিয়ে তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশ্যে কিছু লেখেননি। তাই রাজনীতি যে কেবল বন্ধুর পথে বাধা ঠেলে চলা আর প্রিয়জনের কাছ থেকে দূরে থাকাই নয়, মাঝেমধ্যে মন্ত্রিত্বের ওমও তাতে যুক্ত হয়, এ ব্যাপারটা আপনার আর্টিকেলে ফুটে ওঠেনি। তরুণ প্রজন্ম রাজনীতিতে (লীগ-বিম্পি-জামাত-জাপা-বাম নির্বিশেষে) যোগ দিক আর না দিক, আপনারাই ঘুরে ফিরে দেশ শাসন করবেন সামনে বেশ কিছু বছর। তাই শুধু আপনাদের কষ্ট নয়, প্রাপ্তির দিকগুলোও তাদের জানান প্লিজ।
সবচেয়ে ভালো লেগেছে আপনার একটি প্রশ্ন,
যে তথ্য, শ্রম, অর্থ ও কাণ্ডজ্ঞান সহযোগে আমরা একটা মোবাইল ফোন কিংবা কম্পিউটার বেছে নেই, সে প্রেরণা ও প্রজ্ঞা আমাদের রাষ্ট্রভাবনায় বরাদ্দ আছে কি না?
আমাদের কথা কিছুক্ষণের জন্যে ভুলে গিয়ে বলুন তো, এই প্রেরণা ও প্রজ্ঞা কি আপনাদের, রাজনীতিকদের রাষ্ট্রভাবনায় আছে? কেমন দেশ দিতে চান তরুণ প্রজন্মকে? বেশিদূর ভাবতে হবে না প্রিয় মির্জা সাহেব, যে ইন্টারনেটে আপনি আর্টিকেলটি প্রকাশ করেছেন, সেই ইন্টারনেটের প্রসঙ্গটাই ভাবুন, আপনাদের শাসনামলে আমাদের সুযোগ এসেছিলো প্রায় নিখরচায় তথ্যসড়কে নিজেদের যোগ করার। আপনারা সময়মতো দেশকে সেই সড়কে তুলতে ব্যর্থ হয়েছিলেন রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য পাচার হয়ে যাওয়ার অভিযোগে। আজ সেই আপনিই ইন্টারনেটে লিখছেন। রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য পাচারের দুশ্চিন্তা যে আপনাদের এখন নেই, জেনে ভালো লাগলেও, এ কথা জানিয়ে দিতে চাই, সময়মতো সেই সুযোগ না নেয়ার কারণে তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক কর্মসংস্থানের সঠিক ও সময়োচিত সুযোগ থেকে তরুণ প্রজন্মকে বঞ্চিত করার কিছু দায় আপনি এড়াতে পারেন না। তরুণ প্রজন্মের প্রেরণা ও প্রজ্ঞা গজফিতা ধরে মাপার আগে প্রিয় মির্জা সাহেব, আয়নার সামনে ফিতা নিয়ে দাঁড়ান প্লিজ। মেজার দাইসেলফ। তথ্যপ্রযুক্তি নিয়েই শুধু কথা বললাম, বাকি খাতগুলো আপনি নিজেই হয়তো অবসরে ভেবে ভেবে বার করতে পারবেন।
এবার আসি আমার বিতৃষ্ণার কথাটি জানাতে। আপনি লিখেছেন,
বিএনপি কোন অতীতমুখী দল নয়, তাদের মনোজগৎ অতীতে অবরুদ্ধ নয়। অতীতের অর্জন আর ট্রাজেডি নিয়ে মানুষের সহানুভূতি আর অনুকম্পা আশা করে না বিএনপি। বিএনপি শুরু থেকেই একটি ভবিষ্যতমুখী দল। পৃথিবীতে এমন কোনও জাতি নেই যার অতীত রক্ত-রঞ্জিত নয় কিংবা পাপবর্জিত । তারা তাদের অতীত বেদনাকে ভুলে থেকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে চায়, প্রতি নিয়ত অতীত ক্ষতকে সজীব করার রাজনীতি করে না। নাৎজি উত্থান-পর্ব (যেটা সম্পূর্ণ গণতান্ত্রিক ছিলো!) নিয়ে জার্মানরা রাজনীতি করে না, অস্ট্রেলীয় আদিবাসীরা তাদের উপর সংঘটিত অবিচার নিয়ে প্রতিনিয়ত আলোচনা করে নিজেদের মধ্যে বিভেদ ও হীনম্মন্যতা সৃষ্টি করে না। আমাদের রাষ্ট্রের ইতিহাস অন্যান্য আর দশটি রাষ্ট্রের মতোই ভুলে ভরা। আমাদের প্রজন্মের বহু লোক ভুলের এই ফিরিস্তি নিয়ে আলোচনা করাকে তাদের জীবিকা হিসেবে গ্রহণ করেছে। দয়া করে আপনারা এই ভুলের পুনরাবৃত্তি করবেন না। আমরা এগিয়ে যেতে চাই, এগিয়ে যেতে চাই আমাদের অন্ধকার অতীতকে ভুলে গিয়ে নয়, ভুলে থেকে।
কেন এ ধরনের কথা বলেন মির্জা সাহেব? আপনার আর্টিকেল আপনি শুরুই করলেন ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ এ আপনার হতাশার কথা দিয়ে, আবার বলছেন বিএনপি অতীতমুখী দল নয়? টেলিভিশনে সম্প্রচার করা হয় আপনাদের (লীগ ও বিএনপি) সাংসদীয় কার্যক্রম, তার সিংহভাগ জুড়ে থাকে অতীতচারণা। আপনারা শেখ মুজিবকে তুলাধুনা করেন, লীগ জিয়াউর রহমানকে তুলাধুনা করে। অতীতের অর্জন নিয়ে সহানুভূতির কথা যখন উঠলোই, একটু কষ্ট করে কি বলবেন, আপনাদের অর্জনগুলো কী কী? ট্র্যাজেডির কথা তরুণ প্রজন্ম জানে, তারা সেইসব ট্র্যাজেডির ভিকটিম ও ভুক্তভোগী।
আপনাকে কে বলেছে, নাৎসি উত্থানপর্ব নিয়ে জার্মানরা রাজনীতি করে না? টুপির নিচ থেকে কথা বার না করে একটু খোঁজ নিন না, গুগল করলেই তো পাবেন অনেক কিছু! জার্মানিতে নাৎসি রাজনীতি নিষিদ্ধ বহুবছর ধরে। জার্মান রাজনীতিতে নাৎসি দলকে কেউ পুনর্বাসন করেনি, যেমনটা জিয়াউর রহমান করেছিলেন জামাতে ইসলামকে। জার্মানি শুধু নাৎসি পার্টিকেই নিষিদ্ধ করেনি, তারা আজও নাৎসি ধারার রাজনীতিক দলগুলোকে নিষিদ্ধ করে [২]।
অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের কথা বলছেন মির্জা সাহেব? প্লিজ, আপনার পরম স্বজনেরাই তো থাকেন ওখানে, একটু খোঁজখবর করতে ক্ষতি কী ছিলো? অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী কেভিন রাড তাদের সংসদে প্রস্তাব এনে অতীত নির্যাতন ও নিপীড়নের জন্যে ক্ষমা চেয়েছেন আদিবাসী গোষ্ঠীর কাছে [৩]। কিছু আদিবাসী এই ব্যাপারে সন্তুষ্ট হলেও ক্ষতিপূরণ চেয়েছেন তাদের একাংশ। আপনি আমার দেয়া খবরটা পড়লে আরো জানবেন, একজন শ্বেতাঙ্গ অস্ট্রেলীয়র সাথে একজন আদিবাসী অস্ট্রেলীয়র প্রত্যাশিত আয়ুর পার্থক্য ১৭ বছর। তাদের মধ্যে শিশুমৃত্যু, মাদকাসক্তি, বেকারত্বের হারও অনেক বেশি। অস্ট্রেলিয়ার মোট জনসংখ্যার ২% এই গোষ্ঠী এখনও বিপুল বৈষম্যের স্বীকার, যা রাড সরকারও স্বীকার করে নিয়েছেন। আর আপনি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঘরে বসে বলে দিচ্ছেন, তারা নিজেদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে না! নিজের প্রতি বৈষম্যের প্রতিবাদ করার মানে বিভেদ সৃষ্টি করা? হীনম্মন্যতা সৃষ্টি করা? আপনি কি এই ধারণা নিয়েই মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন, স্বাধীনতা চেয়েছিলেন? তাহলে যখন ক্ষমতায় থাকেন না, তখন প্রতিপক্ষের পারফরম্যান্স নিয়ে কথা বলে কেন "বিভেদ" আর "হীনম্মন্যতা" সৃষ্টি করেন মির্জা সাহেব?
কিন্তু এই কথাগুলো কেন ওঠালেন মির্জা সাহেব? আপনাদের শরীক জামায়াতে ইসলামীর চামড়া বাঁচানোর জন্যেই তো? আপনি তরুণ প্রজন্মের কাছে জার্মানি আর অস্ট্রেলিয়ার অসত্য উদাহরণ টেনে কি এটাই বোঝাতে চাইলেন, যে ১৯৭১ সালে আপনাদের শরীকদের ভূমিকার সমালোচনা আর শাস্তির দাবি থেকে তরুণ প্রজন্মকে সরে আসতে হবে? কেন মির্জা সাহেব? আপনারা কেন তরুণ প্রজন্মের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই বদমাশগুলোর বিচার দাবি করেন না? আপনি না শিক্ষকতা করতেন? আপনি না মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন? আপনি কি আপনার জীবন থেকে আর যুদ্ধ থেকে এ-ই শিক্ষা নিলেন, যে যে বিশ্বাসঘাতকের দল আপনার মতোই লক্ষ লক্ষ স্বাধীনতাকামী মানুষকে হত্যার কাজে সহায়তা করেছে, তাদের গায়ে গা ঘষে আপনাকে ক্ষমতায় যেতে হবে? আপনার কি বেলা শেষে আয়নায় নিজেকে দেখে এতটুকু গ্লানি অনুভব হয় না? রাজনীতি, যেদিকে তরুণ প্রজন্মকে টানার জন্যে আর্টিকেলটি লিখলেন, কি আপনাকে স্বজনবৈরিতার ঐ সীমায় নিয়ে গেলো?
কেন মির্জা সাহেব, কেন দেশটাকে চালানোর জন্যে আমরা আহ্বায়কের ভূমিকায় আপনার সুদর্শন সৌম্য চেহারা দেখবো, আর আপনার দুর্বল আর্টিকেলের অসত্য উদাহরণের ফাঁদে পড়ে আমাদের পিতা-পিতামহের হত্যাকারীদের ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসাবো? আপনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দালালদের বুক আগলে বাঁচাবেন, আর হাতছানি দিয়ে তরুণদের ডাকবেন সেই কাজে? আপনি অন্ধকার অতীতকে ভুলে যেতে বলে সেই অন্ধকার অতীতের পারপিট্রেটরদের হাতে ধরে গদিতে বসাবেন কেন?
প্রিয় মির্জা সাহেব, বিএনপি কি একলা চলতে অসক্ষম? একাত্তরের হন্তারকদের চামড়া না বাঁচালে কি বিএনপি চলতে পারবে না? আপনি ইনক্লুসিভিটির কথা বলছেন, বহু মতকে ধারণের কথা বলছেন, কিন্তু সব মত কি ইনক্লুড করা যায়? যে মত এই দেশের তিন মিলিয়ন মানুষ হত্যাকে সহায়তা করেছে, সেই মতও ইনক্লুড করবেন আপনি? আপনি কি আপনার পুত্রের হত্যাকারীকে, কন্যার ধর্ষণকারীকে পাশে নিয়ে মঞ্চে দাঁড়াতে পারবেন? যদি পারেন, যদি এতোই ইনক্লুসিভ হন আপনি, আপনার হাতে কি আমাদের বাংলাদেশ নিরাপদ?
আপনি প্রশ্ন রেখেছেন,
কিন্তু একবার নিজেকে সততার সাথে প্রশ্ন করুন তো দৈনন্দিন জীবনে কতবার আপনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কিংবা জাতীয়তাবাদের কথা সাগ্রহে চিন্তা করেন? চার ঘণ্টা ব্যয় করে অফিস যাওয়া আসার সময়, দশ ঘন্টার লোডশেডিঙে নেতিয়ে পড়ার সময়ে কিংবা চোখের সামনে কাউকে পিটিয়ে মারার দৃশ্য দেখার সময় কি আপনি অতীতের অর্জন নিয়ে উদ্বেলিত হন না বর্তমানের যন্ত্রণায় কুঁকড়ে ওঠেন?
এই প্রশ্ন আপনাকেও করতে চাই মির্জা সাহেব। আপনি যখন ক্ষমতায় ছিলেন, যখন মন্ত্রী ছিলেন, অফিস যেতে আপনার কত সময় লাগতো? আপনার বাড়িতে কয় ঘন্টা লোডশেডিং হতো? আপনাদের শাসনামলে কয়জন মানুষের মৃত্যুর কথা জেনে আপনি যন্ত্রণায় কুঁকড়ে উঠেছিলেন? আমরা তো চিরভুক্তভোগী, আপনারা যে দলই ক্ষমতায় আসেন না কেন, ট্র্যাফিক জ্যামে আমরাই পড়ি, লোডশেডিঙে আমরাই ভুগি, আমরাই রাস্তাঘাটে রাহাজানির শিকার হই, তারপর যখন সময় আসে, তখন আপনাদের একজনকে টেনে নামিয়ে আরেকজনকে তুলি। আপনার কি মনে হয়, আপনারা নিজেদের মেরিটে ক্ষমতায় যান? আপনার ক্ষমতায় যান প্রতিপক্ষের আরো খারাপ শাসনের উছিলায়। আপনাদের হাতে একটা অজুহাত সবসময় তৈরি, সেটা হচ্ছে, প্রতিপক্ষ খারাপ। আপনারা নিজেরা কতো ভালো? আওয়ামী লীগ আর বিএনপির বর্তমান নেতারা কোন যোগ্যতায় একে অন্যের নিন্দা করে?
বিএনপির দরজা সবার জন্যে খুলে ধরছেন মির্জা সাহেব, কেন আগে ঘর থেকে একাত্তরের হায়েনাগুলোকে খেদাচ্ছেন না? আপনার সৌম্য চেহারাকে সামনে রেখে যে পেছনে তাদের দাঁতগুলোই ক্রমশ ধারালো হচ্ছে? নূহের নৌকার মতো কি সাপ আর খরগোশ, দুইই পাশাপাশি থাকতে পারবে সে ঘরে? সে ঘরে কে বেশি নিরাপদ, সাপ না খরগোশ?
আপনারা, রাজনীতিকরা, দল-নির্বিশেষে, নিজেদের প্রোপাগান্ডাময় পৃথিবী ছেড়ে একটু জেগে উঠুন। বাংলাদেশের অনেক কষ্ট, গভীর রাতে কান পেতে তার কান্নার শব্দ শুনুন। আপনারা না জাগলেও সকাল হবে, আপনাদের ছাড়াই।


সূত্র:

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।