Monday, October 03, 2011

গজব পড়বে, গজব


জেলখানায় আয়না পেতে বিস্তর লড়তে হয়েছে দেলু রাজাকারকে। আব্বুজির তাহফীমুল কুরআনের কপি পেতে তেমন সমস্যা হয়নি, সমস্যা হয়নি বড় হুজুরের মানব সৃষ্টির হকিকতের কপি পেতেও, কিন্তু একটা আয়না যোগাড় করতে গিয়ে কালঘাম ছুটে যাওয়ার দশা। সীমারের দল দেয়নি শেষপর্যন্ত। নিজের মাসুম শাকল দেলুকে পত্রিকায় দেখতে হয়, মাসে এক দুইবার।

খবরের কাগজটা অবশ্য আসে। মাঝেমধ্যে একটু দেরি হলেও আসে নিয়মিত। শুরুতে সংগ্রাম দেয়া শুরু করেছিলো, চোখ রাঙিয়ে দৈনিক আলু দিতে বলেছেন তিনি। বলেছিলেন, আমারে কাষ্ঠুভুদাই পাইছেন? সংগ্রামের দিন বহু আগেই ফুরিয়েছে, এখন ভরসা আলু। ওখানেই যা একটু আশার আলো দেখতে পান তিনি মাঝেসাঝে। বড় বড় মানবতাবাদী বুদ্ধিজীবীরা ওখানে হরবখত চিকন চিকন আর্টিকেল ঝাড়েন। একটু মন দিয়ে পড়লে, একটু কান পেতে শুনলে একটা দূরাগত হুক্কাহুয়া শুনতে পাওয়া যায় সেসব লেখায়।

আজ সেলে ফিরে গুম হয়ে পড়েছিলেন তিনি। কথাটা ওভাবে দুম করে বলে ফেলাটা ঠিক হয়নি। বাজারে তার নামে অনেক বাতেনী কাবিলিয়তের গল্প চালু আছে। হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় এক জেনারেল ফট করে মরে যাওয়ার পর তার নাম বেশ ফেটেছিলো। কবে সেই জেনারেল তার সাথে বেয়াদবি করে, তার কানে হাত দিয়ে গুনাহগার হয়েছিলো, আর তারই শাস্তি হিসেবে একেবারে আসমান থেকে জমিনে তাকে নামিয়ে দিয়েছিলেন পরওয়ারদিগার, সেই গল্প খুব রটেছিলো। কিন্তু ... এবার যদি গজবটা সময়মতো না পড়ে?

কয়েকদিন আগে বেশ একটা জোর ভূমিকম্প হয়েছিলো অবশ্য। কিন্তু কাজের কাজ হয়নি। মালাউনের দেশের ভূমিকম্পের ওপর বিশ্বাস নাই। মধুপুর না কই যেন একটা ফল্ট না কী জানি আছে, ঐখানে একটা ভূমিকম্প দিতে আল্লাহপাকের এত গড়িমসি কেন? তসবি নিয়ে কয়েকটা নাম জপেন তিনি। খালেক মালেক হাই হকের পর তার মনোযোগ কেটে যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত কে এখন?

একটা সলিড ভূমিকম্প দরকার। ঢাকা শহরের অর্ধেক ধ্বসে পড়ে যেতে হবে। যারা নেকদিল, যাদের হৃদয়ে কোনো মোহর মারা নেই, কিংবা শুধু তার দলের মোহর মারা আছে, তারা বেঁচে যাবে। আর যুদ্ধাপরাধের বিচার বিচার করে যেসব বুজদিল লাফাচ্ছে, তাদের বাড়িঘর সব গুড়া গুড়া হয়ে যাবে। চারদিকে তার নাম রৌশন হবে তারপর। গজবের ফোরকাস্ট কে করেছিলো? হুঁহুঁ বাবা, ইয়োরস ট্রুলি। সেই আল্লামা দেলু। এরপর তিনি দেখে নেবেন, এই টেরাইবোনাল তাকে কয়দিন জেলখানায় আটকে রাখে।

কিংবা একটা সাইক্লোনও হতে পারে। সত্তর সালের মতো। একেবারে পিরোজপুর থেকে শুরু করে ঢাকা শহর পর্যন্ত এক প্রকাণ্ড সুনামি না কী যেন বলে, ঐটা দিয়ে সব কাফের মোশরেককে একেবারে ধুয়ে সাফ করে দিতে পারেন আল্লাহ পাক। এমন তো না যে এসব আগে হয় নাই?

সদোম আর গোমর্হার মতো ঢাকা শহরটা উল্টিয়ে দিলেও মন্দ হয় না। বিমর্ষ মনে পেছনে হাত বুলাতে বুলাতে দেলু রাজাকার ভাবনাটা পাল্টে ফেলেন। সদোম নিয়ে আর ভাবতে চান না তিনি। শালার উটপাখি!

আর অ্যানথ্রাক্স না কী যেন একটার খবর ছড়িয়েছিলো বছর খানেক আগে। অসময়ে অ্যানথ্রাক্স, বার্ড ফ্লু হয়ে লাভ কী? আর এয়াহুদি নাছারাদের চামচা কিছু লোক আছে, এরা গবেষণা টবেষণা করে এইসব রোগের ওষুধ বের করে ফেলে। দেলু রাজাকার আরো জোরেসোরে তসবি ঘুরাতে থাকেন। খালেক মালেক হাই হক ... তারপর স্মরণশক্তি আর সহযোগিতা করে না। শুয়োর থেকে নাকি একটা ভাইরাস ছড়াচ্ছিলো, ঐটাতে লাখখানেক লোক মরলেও মন্দ হতো না। গজব দরকার একটা, সেইরাম একটা গজব। এককালে যক্ষ্মা, কালাজ্বর, ম্যালেরিয়া, কলেরা, গুটিবসন্ত ... কত ভালো ভালো জিনিস ছিলো। কই গেলো সেই স্বর্ণালী দিন? নাছারাদের পাল্লায় পড়ে সব গেল। গুজরা হুয়া জমানা, আতা নাহি দুবারা ...।

বন্যা কিংবা খরার সিজনও চলে গেছে। অথচ এখনই সেগুলির জরুরি দরকার ছিলো। আমনের ক্ষেতে পঙ্গপালের হামলা হলেও চলতো। পদ্মা নদীতে লোনাপানি ঢুকলেও মন্দ হতো না। ইনডিয়া বসে বসে কী বালটা ফেলে? কয়েকটা নদী আটকায় দিলেই তো একটা টাটকা গজব হাতে চলে আসতো। মনমোহন লোকটার কোনো পুরুষকার নাই, হুদাই মুখে দাড়ি আর শিরে পাগ।

পাকিস্তান থেকেও কোনো সুখবর নাই। চুদির ভায়েরা একাত্তর সালে যেভাবে তাদের একলা ফেলে পালিয়েছিলো, আজও সেইরকম। হুদাই এদের এতো খিদমত খাটলেন তিনি। খালেক মালেক হাই হক।

বিষাক্ত মনে দৈনিক আলু হাতে তুলে নিলেন তিনি। একগাদা ফালতু খবর। তার একটা ছবি প্রথম পাতায় দিয়েছে, সেইটাতে তাকে দেখাচ্ছে গরুচোরের মতো। মেহেদি রাঙানো দাড়িটা ফটোতে মোটেও ভালো আসে নাই, মনে হচ্ছে কেউ তার দাড়িতে পানের পিক ফেলেছে সমানে। তিনি অবশ্য সাংবাদিকদের জন্য একটু ভালো পোজ দিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, কিন্তু এক এসআই হারামজাদা তাকে "চলেন হুজুর" বলে দুষ্ট জায়গায় হেলমেট দিয়ে ঠেলা দিয়ে মহিষ তাড়ানোর মতো করে তাড়িয়ে নিয়ে গেছে আদালতের সামনে।

একটা গজব দরকার। দাঁতে দাঁত পেষেন দেলু রাজাকার। রেডিমেড গজব দরকার একটা। তার মতো লোকের জন্য কি আবাবিল পাখি আসবে? কিছু পাথরটাথর ঐ কমজাতদের মাথায় কি ফেলা দরকার ছিলো না?

খবরের কাগজে মালাউন নায়িকাগুলোর চেহারাছবি আর ক্রীড়া পাতায় শহীদ আফ্রিদির লোমশ বক্ষদেশ খানিকটা দেখে পাতা উল্টে বিজ্ঞান পাতায় গেলেন তিনি। সেইটার এক কোণায় আবার জাকের নালায়েকের লেকচার সিডির বিজ্ঞাপন। এই ইনডিয়ান বদমাশটাকে তিনি দুই চোখে দেখতে পারেন না। কিছু বুদ্ধিজীবী আন্দোলন করায় শেখের সরকার নাকি এরে দেশে ঢুকতে দেয় নাই। অসংখ্য খারাপ কাজের ভিড়ে এই একটা ভালো কাজ অন্তত তারা দেখাতে পারবে। দেশী ওয়াজ ইন্ডাস্ট্রি এইভাবে ইনডিয়ার হাতে তুলে দেয়া যায় না। ইনশাল্লাহ তিনি একদিন লুণ্ঠিত কদর ফিরে পাবেন, দুই আঙুল উঁচিয়ে ভিকারুন্নিসা নুনের কচি ছাত্রীদের মতো ভি দেখিয়ে জোরকদমে জেলের বাইরে বেরিয়ে আসবেন, তারপর আবার দেশজুড়ে ওয়াজ করবেন। তারেক মনোয়ার এই কয়দিন একটু বিজনেস করলে করুক। ছেলেটা লোক খারাপ না। খালেক মালেক হাই হক ...।

খবরের কাগজ উল্টাতে উল্টাতে দেলু রাজাকারের হৃদযন্ত্র একটু জোরে ছুটতে শুরু করে। বিজ্ঞানই মনে হচ্ছে গজবটা জুটিয়ে দেবে। এয়াহুদি নাছারাদের একটা স্যাটেলাইট খসে পড়ছে আসমান থেকে, সেইটা দুনিয়ার যে কোনো জায়গায় যে কারো মাথায় পড়তে পারে। বিজ্ঞানীরা সবাইকে হুঁশিয়ার থাকতে বলেছেন, বাড়ির বাইরে বেরোলে ছাতা ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন।

কাগজ নামিয়ে তসবি ঘোরাতে লাগলেন দেলু। খালেক মালেক হাই হক। আল্লাহ যখন দেন তখন ছপ্পর ফুঁড়ে দেন। দে রে খোদা, একেবারে বত্রিশ নাম্বারের উপর নামিয়ে দে স্যাটেলাইটখানা। কিংবা ছয় নাম্বারে। কিংবা টেরাইবোনাল বিল্ডিঙে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে। তোর অসীম দয়া। গত কয়েক বছর বড় বিলা হয়ে আছিস ওরে, এইবার বুলস আই মেরে বাঁচিয়ে দে, ইয়া পরওয়ারদিগার, হাতির সাইজের জোড়া উট জবাই দিবো য়্যায় মালিক তেরে বন্দে হাম।

অথবা, চিড়িয়াখানার ঐ দুষ্ট মাদী উটপাখিটার জান কবচ করে নে খোদা। পিলিজ।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।