Friday, September 23, 2011

বহুজগত


১.
প্রফেসর দরবেশ মন দিয়ে বিস্কুট খাচ্ছিলেন, চায়ে চুবিয়ে। সব কনফারেন্স শেষেই তিনি সংলগ্ন ক্যাফেতে ঢুকে তাদের চা আর বিস্কুটের মান পরখ করেন, তারপর মনে মনে একটা রেটিং দেন। যেসব ক্যাফের চা ভালো, যাদের বিস্কুট চায়ে চুবানোর পর ঠুস করে গলে ভেঙে চায়ে ডুবে আত্মহত্যা করে না, সেসব ক্যাফের সাথে সংশ্লিষ্ট কনফারেন্স এবং আয়োজকদের প্রতি তিনি প্রসন্ন থাকেন। যেসব কনফারেন্সে গিয়ে সাথের ক্যাফেতে, বলাই বাহুল্য, সুবাসিত চা এবং বলিষ্ঠ বিস্কুট মেলে না, সেসব কনফারেন্সকে তিনি তুচ্ছজ্ঞান করেন। বিজ্ঞান কোনো না কোনোভাবে এগিয়ে চলবেই, কিন্তু দুবলা বিস্কুট সরবরাহকারী ক্যাফে মানবজাতিকে সবসময় পেছনদিকে টেনে নিয়ে যায়।
চায়ে চুবিয়ে বিস্কুট খাওয়ার কাজটাকে কিছুটা ঐকান্তিক মনে করেন প্রফেসর দরবেশ, অনেকটা প্রেমিকার সাথে ফিসফিস আলাপের মতোই। এ সময়ে কেউ কাছে এসে দাঁড়িয়ে থাকলে দুটো কাজেই ব্যাঘাত ঘটে।
"ডক্টর দরবেশ?" একটা পিলে কাঁপানো ভারি কণ্ঠস্বর মেঝের ছয়ফুট ওপর থেকে হেঁকে ওঠে।
প্রফেসর দরবেশ প্রচণ্ড বিরক্ত হন, কারণ সিক্ত বিস্কুটের একটা টুকরো তার হাত থেকে ফসকে পড়ে গেছে চায়ের কাপে। তিনি মাথা উঁচিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বিশালদেহী কৃষ্ণাঙ্গ লোকটির দিকে তাকালেন। একেবারে কুচকুচে কালো একটা মুখ থেকে হীরার মতো ঝকঝকে দুই সারি দাঁত বেরিয়ে আছে হারমোনিয়ামের চাবির মতো। লোকটার পরনে ধবধবে সাদা শার্ট, একটা চলনসই টাই, কোটটা হাতে ভাঁজ করে রাখা।
"হ্যাঁ।" খ্যাঁক করে উঠলেন প্রফেসর দরবেশ।
"আপনার সাক্ষাত পেয়ে প্রীত বোধ করছি প্রফেসর দরবেশ!" জাঁক করে বললো ব্যাটা। "আমার নাম ম্বাবাটু, ম্যাক্স ম্বাবাটু।"
"উম্বাবাটু? আচ্ছা ... তা কী করতে পারি আপনার জন্যে, জনাব উম্বাবাটু?" প্রফেসর দরবেশ টুসকি মেরে সুশ্রী ছিপছিপে ওয়েট্রেস মেয়েটিকে ডাকলেন। আরেক কাপ চা দরকার। বিস্কুটগলা চায়ের চেয়ে বদখদ আর কিছুই হতে পারে না।
ম্বাবাটু একটা চেয়ার টেনে বসে পড়লো, তবে খুবই সন্তর্পণে, যেন একটা বেড়াল এসে বসলো মখমলের গদিতে। "মৃতবিন্দু নিয়ে একটা ভাবনা আপনার সাথে শেয়ার করতে চাই স্যার।"
প্রফেসর দরবেশের মুখে একটা বিদ্রুপের হাসি ফুটে উঠে ঝুলে রইলো। মৃতবিন্দু নিয়ে তাঁর সাথে ভাবনা ভাগ করার মতো সাহস এখনও খুব বেশি পদার্থবিদের হয়নি। কিন্তু যেখানে ফেরেস্তা ঘেঁষে না, সেখানে বোকচন্দররা তেড়ে যায়।
"বেশ ... আমি এক কাপ চা দিতে বলেছি। সেটা শেষ করা পর্যন্ত সময় পাচ্ছেন আপনি।" খনখনে গলায় বললেন প্রফেসর দরবেশ।
"মানে পাঁচ মিনিট ছত্রিশ সেকেণ্ড, আঠারো সেকেণ্ড স্ট্যান্ডার্ড ডেভিয়েশন ধরে?" ম্বাবাটু সহজ গলায় বললো।
প্রফেসর দরবেশ এবার একটু মনোযোগ দিলেন ম্বাবাটুর দিকে। লোকটা সম্ভবত নিরক্ষীয় আফ্রিকার কোনো দেশ থেকে এসেছে, চেহারায় বুদ্ধির ছাপ আছে, এবং সে যে বাহরাম দরবেশের মতো একজন প্রথম সারির জ্যোতির্পদার্থবিদের ওপর লম্বা সময় ধরে নজর রাখছে, সে কথা জানাতে ম্বাবাটু পিছপা নয়। কী চায় ব্যাটা?
"কতদিন ধরে?" ওয়েট্রেস মেয়েটাকে ট্রে নিয়ে এগিয়ে আসতে দেখে নতুন করে চায়ের তৃষ্ণা অনুভব করলেন প্রফেসর দরবেশ।
"প্রায় বছর ঘুরতে চললো স্যার।" ম্বাবাটু আবার হারমোনিয়ামের চাবি মেলে ধরলো।
"বেশ ... কিন্তু এক কাপ চা পর্যন্তই সময় পাবেন। এরপর আমি হোটেলে ফিরে যাবো।" প্রফেসর দরবেশ মনে মনে কঠোর হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।
ম্বাবাটু হাত বাড়িয়ে দিলো, "আপনার আজকের প্রেজেন্টেশনটা দারুণ হয়েছে স্যার।"
প্রফেসর দরবেশ বেজার মুখে করমর্দন করলেন ম্বাবাটুর সাথে। "সময়টা কাজে লাগান জনাব ম্বাবাটু। মিষ্টি মিষ্টি কথা বাদ দিন। আমার সব প্রেজেন্টেশনই দারুণ হয়।"
ম্বাবাটু ওয়েট্রেস মেয়েটাকে নিচু গলায় এক কাপ কালো কফির অর্ডার দিয়ে ঝুঁকে বসলো। "মৃতবিন্দু নিয়ে ভাবনার কথা বলার আগে আমার পরিচয়টা দিচ্ছি স্যার। আমি একজন বিজ্ঞান লেখক।"
প্রফেসর দরবেশের মনটা এবার বিতৃষ্ণায় ছেয়ে গেলো। "কল্পকাহিনী লেখেন?"
ম্বাবাটুর মুখটা আরো এক পরত কালো হয়ে গেলো। "না স্যার, ভুল বুঝলেন। কল্পবিজ্ঞান লেখক নই আমি। বিজ্ঞান লেখকরা বিজ্ঞান আর গবেষণা নিয়ে লেখালেখি করে। আমার আগ্রহের বিষয় জ্যোতির্পদার্থবিদ্যা ... বুঝতেই পারছেন ... আমি সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো নিয়ে একটা বই লিখছি।"
প্রফেসর দরবেশ বললেন, "আমার সাক্ষাতকার নিতে চান?"
ম্বাবাটু বললো, "না স্যার। আপনি ব্যস্ত মানুষ, সাক্ষাতকার নিতে গিয়ে আপনাকে জ্বালানোর স্পর্ধা করি না। শুধু একটা আইডিয়ার কথা আপনাকে জানাতে এসেছি স্যার। শুধু যদি আপনি আমার পুরোটা ভাবনা মন দিয়ে শোনেন, তবেই আমি কৃতার্থ হবো।"
প্রফেসর দরবেশ চায়ের কাপে এক মারাত্মক চুমুক দিলেন। ম্বাবাটুর জন্যে এই ইশারাই কাফি হওয়ার কথা, এমন মর্মান্তিক চুমুকের পর চায়ের কাপ অর্ধেক খালি না অর্ধেক ভরা, তা নিয়ে আশাবাদী আর নৈরাশ্যবাদীর মধ্যে তুমুল তর্কের জায়গা প্রশস্ত হয়।
ম্বাবাটুর কফি চলে আসে, সে কফির কাপ হাতের মুঠোয় ধরে বলে, "মৃতবিন্দু থেকে এই যে মাইক্রোওয়েভ রেডিয়েশন হচ্ছে, এমন কি হতে পারে না স্যার, এটা একটা সিগন্যাল?"
প্রফেসর দরবেশ চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে চোখ বুঁজলেন। তার মনটা ক্যাফে থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ফিরে গেলো পনেরো বছর আগে, যেদিন ডেড স্পট নিয়ে তাঁর প্রথম পেপারটা সায়েন্স-এ ছাপা হয়েছিলো। একটা বাজে সময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি, ক্যারিয়ারটা কাদায় আটকা পড়েছিলো, ডেড স্পট তাঁকে এক হ্যাঁচকা টানে ফিরিয়ে নিয়ে আসে আলোচনায়।
অথচ কী নিতান্ত ফালতু এক প্রজেক্ট নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন তিনি। চিলির আতাকামা মরুভূমির এক চিপায় এক অতিকায় দূরবীণ প্রকল্পে যোগ দিয়ে চাঁদের একটা অবজারভেটরির সাথে যোগাযোগের জন্যে স্থাপিত মাইক্রোওয়েভ সংযোগের কোয়ালিটি পরীক্ষার মতো বিরক্তিকর কাজে দিন কাটছিলো তাঁর। সতেরো বছর আগে এক দিন রাতে হঠাৎ লুনার স্টেশন থেকে বার্তা আসে, স্টেশনের টেলিস্কোপে একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে। একটা কালো বিন্দু দেখা যাচ্ছে পৃথিবী বরাবর।
এবং কিমাশ্চর্যম, আতাকামার সেই স্টেশনের প্রকাণ্ড ভিএলটি-তেও চাঁদের বরাবর একটা কালো বিন্দু দেখা গেলো। প্রফেসর দরবেশের চোখে প্রথম ছবিটা এখনও ভেসে ওঠে মাঝে মাঝে, লুনার স্টেশন বরাবর একটা আশ্চর্য অন্ধকার বিন্দু।
হিসেব কষে দেখা গেলো, বিন্দুটার ব্যাসার্ধ ৫০ মিটারের মতো, এবং সেটি নিখুঁত বৃত্তাকার।
অনেক পুরনো একটা কথা সেদিন নতুন করে মনে পড়েছিলো প্রফেসর দরবেশের, ত্রুটিহীনতা একটা বার্তা। জরুরি, বড় বার্তা। প্রকৃতিতে ত্রুটিহীন বৃত্ত খুব বেশি নেই। মহাকাশে একটা গোল কালো বিন্দুর তাৎপর্য অন্যরকম।
লুনার স্টেশন থেকে আরো বার্তা এলো, গত ছয় মাস ধরে যে মৃদু নয়েজ পাওয়া যাচ্ছিলো মাইক্রোওয়েভ রিসিভারে, সেটা সম্ভবত এই কালো ছোপের কারণেই।
কেন কেউ আরো আগে এই কালো ছোপটাকে শনাক্ত করেনি, সেই প্রশ্নটা তৎক্ষণাৎ কারো মাথায় আসেনি। মহাকাশে মাত্র পঞ্চাশ মিটার ব্যাসার্ধের একটা কালো বিন্দু শনাক্ত যে হয়েছে, এটাই ভাগ্যের ব্যাপার।
সেই থেকে শুরু। এরপর প্রফেসর দরবেশ দুই বছরের নির্ঘুম অক্লান্ত গবেষণার পর প্রমাণ করলেন, ঐ কালো বিন্দুটি মহাজগতবিদ্যার গবেষণায় এক মারাত্মক সংযোজন। ডেড স্পট বা মৃতবিন্দুর ধারণাটিও তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন তার গবেষণাপত্রে। এ এমন এক ইয়ে, যা আলোকে বিকর্ষণ করে। কৃষ্ণবিবরের মহাকর্ষ থেকে যেমন আলো মুক্তি পায় না বলে তাকে কালো দেখায়, ডেড স্পট বা মৃতবিন্দু আলোকে কাছে ঘেঁষতে দেয় না বলে তা কালো দেখায়। পশ্চাদপটে উজ্জ্বল কোনো কিছু থাকলে ব্যাপারটা স্পষ্ট বোঝা যায়, একটা ছোটো কালো বিন্দু ফুটে ওঠে তখন।
সময়ের সাথে প্রফেসর দরবেশ আরো প্রমাণ করেন, এই ডেড স্পট চাঁদকে প্রদক্ষিণ করছে, খুব মন্থর গতিতে। এবং শুধু আলো নয়, কোনো কিছুই এর কাছে ঘেঁষতে পারে না। এই ডেড স্পটকে লক্ষ্য করে পাঠানো প্রজেক্টাইলগুলো একে একে বেঁকে ছুটে গেছে দিগ্বিদিক, দৃশ্যমান আলোর মতো এক্স রে, মাইক্রোওয়েভ আর বেতার তরঙ্গও বেঁকে গেছে। এক আশ্চর্য অস্পৃশ্য প্রপঞ্চ হয়ে মন্থর গতিতে চাঁদকে ঘিরে পাক খাচ্ছে ঐ বিন্দুটি। একে বোঝার উপায় আপাতত একটিই, এর ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা অতি মৃদু মাইক্রোওয়েভ বিকিরণ। এবং এই গবেষণায় প্রফেসর দরবেশ আপাতত গোটা পৃথিবীতে অগ্রণী।
"কী বলতে চাইছেন?" মনের কলার ধরে আবার ক্যাফেতে ফিরিয়ে আনলেন প্রফেসর দরবেশ।
ম্বাবাটু কফিতে পরিমিত চুমুক দিয়ে বললো, "আমি বলতে চাইছি স্যার, এমন কি হতে পারে না, যে এই বিকিরণের মধ্যে আসলে প্রচুর তথ্য আছে?"
প্রফেসর দরবেশ আনমনে ছোটো একটা চুমুক দিলেন চায়ের কাপে। "কী ধরনের তথ্য?"
ম্বাবাটু হাসিমুখে বললো, "তার আগে বলুন স্যার, বহুজগত নিয়ে কিছু বললে আপনি চটবেন কি না?"
প্রফেসর দরবেশ ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে বললেন, "দেখুন ম্বাবাটু, আপনি বোধহয় জানেন, আমি এই বহুজগত তত্ত্বটাকে কল্পগল্পের চেয়ে বেশি কিছু মনে করি না। ছোটো বাচ্চাদের কমিকের জিনিসপত্রে আমার আগ্রহ এককালে ছিলো, যখন আমি নিজে ছোটো ছিলাম। এখন আর নাই।"
বহুজগত তত্ত্ব নিয়ে কসমোলজিস্টদের হাউকাউ শুনলে প্রফেসর দরবেশ বিরক্ত হন। অতি অতি অতি ক্ষীণ সম্ভাবনার ওপর ভরসা করে যারা বিজ্ঞানের গরু গাছে ওঠাতে চান, তাদের প্রতিও তিনি চরম বিরক্ত।
বহুজগত তাত্ত্বিকদের এক দল বলছেন, মহাজগতের কোথাও না কোথাও আমাদের পৃথিবী বা সৌরজগত বা ছায়াপথের হুবহু কপি রয়েছে, এবং সেই কপির সংখ্যাও অনির্দিষ্ট রকমের বড় হতে পারে। সেই কপি-পৃথিবীগুলো মূল পৃথিবীর সমসাময়িক না-ও হতে পারে, হয়তো সেখানে মোটে এককোষী প্রাণের উদ্ভব হয়েছে, কিংবা হয়তো সেখানে প্রাণের বিবর্তনের চরমতম অধ্যায় চলমান, নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু কোনো এক কপি-পৃথিবী আমাদের সমসাময়িকও হতে পারে।
প্রফেসর দরবেশ বাঁকা হেসে বললেন, "আপনি কি জানেন, কীরকম দূরত্ব পার হলে আপনি ঐ ছেঁদো বহুজগত তত্ত্বের প্রমাণ পাবেন?"
ম্বাবাটু মৃদু হেসে বললো, "জানি স্যার। গত মাসেই এ নিয়ে লেখা আমার একটা নিবন্ধ ছাপা হয়েছে পত্রিকায়। সংখ্যাটা বেশ ... বড়, আমি জানি।"
প্রফেসর দরবেশ বললেন, "আমাদের দৃশ্যমান জগতে উপপারমাণবিক কণাগুলোকে কতভাবে সাজানো সম্ভব, জানেন?" পকেট থেকে একটা কলম বার করে টিস্যু পেপারে বড় করে একটা ২ লিখলেন তিনি, তারপর তার ঘাতের জায়গায় লিখলেন ১০১১৮ । "দেখুন।"
ম্বাবাটু হাসিমুখেই বললো, "এর সাথে গুণ করতে হবে আমাদের দৃশ্যমান জগতের ব্যাস। ১০২৬ মিটার স্যার, জানি আমি।"
প্রফেসর দরবেশ বললেন, "ঐ গুণফলের সমান দূরত্ব পার হলে হুবহু আরেকটা পৃথিবী পাওয়া যেতে পারে, যেখানে আমি আর আপনি ক্যাফেতে বসে চা আর কফি খাচ্ছি, তাই তো?"
ম্বাবাটু মুখে হাসি ঝুলিয়ে রেখেই বললো, "মমমম না স্যার। ঐ পৃথিবীতে হয়তো আমি এখনও ক্যামেরুনের কোনো জঙ্গলে বাঁদর শিকারে ব্যস্ত, আর আপনি হয়তো কোনো ট্রেন স্টেশনে পান-বিড়ি বিক্রি করছেন।"
প্রফেসর দরবেশ ঠাণ্ডা চোখে ম্বাবাটুর দিকে তাকিয়ে বললেন, "পান-বিড়ি?"
ম্বাবাটু হাসিমুখে মাথা দুলিয়ে বললো, "কিংবা কলা।"
প্রফেসর দরবেশ বললেন, "আমার একটা কপিকে অন্য দুনিয়ায় পান-বিড়ি বেচাতে হলে যে বিরাট দূরত্ব পার হতে হবে, সেই দূরত্ব পার হবার সময় আপনার বা আমার কারোই নেই। এ কারণেই, এই তত্ত্বে আমার কোনো আগ্রহ নেই। এসব জিনিস বিজ্ঞান লেখকদের বিজ্ঞান বিজ্ঞান খেলার জন্যে, আমার অন্য কাজ আছে।"
ম্বাবাটু আহত হলো না একটুও, অন্তত আহত হলেও তার চেহারায় সেই ছাপ পড়লো না। "কিন্তু স্যার, চিন্তা করে দেখুন, হয়তো স্থানকালের চাদরটা আমরা যেমন ভাবছি, সেরকম চাদর নয়। হয়তো দলা পাকানো, মোচড়ানো, হয়তো আমাদের চেনা তিন মাত্রায় অতিক্রম করতে গেলে একটা বিন্দু থেকে আরেকটা বিন্দুর দূরত্ব ওরকমই বড় হবে। কিন্তু যদি অন্য কোনো মাত্রায় এরা খুব কাছাকাছি চলে আসে ...।"
প্রফেসর দরবেশ আবার চায়ের কাপে বজ্রকঠোর চুমুক দিলেন। "ওয়ার্মহোল? আমি দুঃখিত, ওটাও কল্পবিজ্ঞান। কমিকের খোরাক। আর কিছু বলবেন?"
ম্বাবাটু হাসিমুখেই বললো, "আপনি যে মৃতবিন্দু নিয়ে কাজ করছেন স্যার, ওটা কি একটা একমুখী ওয়ার্মহোলের এক প্রান্ত হতে পারে না?"
প্রফেসর দরবেশ চায়ের কাপটা ধীর হাতে নামিয়ে রাখলেন। "তাই? পারে?"
ম্বাবাটু ঝুঁকে পড়ে বললো, "কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউণ্ড তো কোনো কমিকের খোরাক নয় স্যার। আমরা সেই বিগ ব্যাঙের আমলের বিকিরণ শনাক্ত করতে পেরেছি। এমনকি হতে পারে না স্যার, যে এই ডেড স্পট আসলে একটা একমুখী সুড়ঙ্গের মাথা? এর অন্য প্রান্ত হয়তো খোলা, যেদিক দিয়ে আলো ঢুকতে পারে। যদি সুড়ঙ্গটার দৈর্ঘ্য আমাদের পরিচিত তিন মাত্রার হিসেবে অনেক, অনেক বেশি হয়, তাহলে সেই পথ পাড়ি দিতে গিয়ে সেই আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বাড়তে বাড়তে সেটা এক সময় মাইক্রোওয়েভে পরিণত হতে পারে, যে মাইক্রোওয়েভ বিকিরণ নিয়ে আপনি আজকে পেপার পড়লেন স্যার। আপনারই নকশা করা মাইক্রোওয়েভ টেলিস্কোপ চাঁদকে ঘিরে চক্কর কাটতে যাচ্ছে বছর খানেকের মধ্যে, তাই না?"
প্রফেসর দরবেশ চায়ের কাপে ছোটো চুমুক দিয়ে বললেন, "ম্বাবাটু, আপনার উৎসাহ আছে, আমি টের পাচ্ছি। কিন্তু বিজ্ঞান একেবারেই ছেলেখেলা নয়। হুট করে একটা ফিকশনের ওপর ভর করে আমরা, বিজ্ঞানীরা, এগোতে পারি না।"
ম্বাবাটু কফিতে চুমুক দিলো হাসিমুখে। "আমার আইডিয়াটা এমনই স্যার। আপনি তো জানেন, মহাজগতে একটা তথ্য প্রাচীর আছে। পাশের গ্যালাক্সিতে যদি আজ আমরা একটা বার্তা পাঠাতে যাই, সেটা ওখানে পৌঁছুতে পৌঁছুতে পঁচিশ লক্ষ বছর পেরিয়ে যাবে। সেই বার্তার কোনো উত্তর যদি পাঠানো হয়, সেটা পৌঁছবে আজ থেকে পঞ্চাশ লক্ষ বছর পরের কোনো প্রজন্মের হাতে। কিন্তু স্যার, কোনো না কোনো চোরাগলি কি এই মহাজগতে থাকতে পারে না, যেখানে অন্তত আরো অনেক অল্প সময়ের মধ্যে তথ্য বিনিময় হতে পারে? আপনার এই মৃতবিন্দু হয়তো সেরকমই যোগাযোগের একটা মাধ্যম?"
প্রফেসর দরবেশ বললেন, "তা ঐ সুড়ঙ্গের খোলা মাথাটা কেমন হবে বলে আপনি মনে করেন?"
ম্বাবাটু বললো, "তা ঠিক জানি না স্যার। হয়তো খুব স্বাভাবিক এক টুকরো জায়গা। হয়তো আমাদের এই ক্যাফেটাই ওরকম কোনো সুড়ঙ্গের খোলা মাথা। আমাদের এখান থেকে আলো সেই সুড়ঙ্গ বেয়ে অন্য কোনো পৃথিবীর মৃতবিন্দু দিয়ে মাইক্রোওয়েভ হয়ে বেরোচ্ছে। হয়তো সেই মাইক্রোওয়েভ সিগন্যালকে দৃশ্যমান আলোতে রূপান্তরের কোনো ফিল্টার কাজে লাগিয়ে আমরা কী করছি, সেটা দেখছে কেউ।"
প্রফেসর দরবেশ বললেন, "তার মানে, পৃথিবীতে প্রাইভেসি বলে কিছু নেই?"
ম্বাবাটু হাসিমুখে বললো, "কারো কারো জন্যে হয়তো নেই স্যার। আসি, আমার কফি খাওয়া শেষ। আপনার চা-ও মনে হয় শেষের দিকে। শুভেচ্ছা জানাই স্যার, আমার আইডিয়াটা একেবারে যদি ডাস্টবিনে না ফেলেন, সেটাই হবে আমার বড় পাওয়া। বিদায়।"
প্রফেসর দরবেশ শুষ্ক কণ্ঠে বললেন, "বিদায়।"
২.
চার বছর আগে চা খেতে গিয়ে ম্বাবাটুর সাথে সাক্ষাতের কথা আবার মনে পড়ে গেলো প্রফেসর দরবেশের। সত্যি বলতে কী, লোকটার আইডিয়া তিনি ঝেড়ে ফেলেছিলেন, কিন্তু মাইক্রোওয়েভ টেলিস্কোপের প্রথম দফার সিগন্যাল হাতে পেয়ে ম্বামাটুর কথাই তার প্রথমে মনে পড়েছিলো। মৃতবিন্দু থেকে বেরিয়ে আসা মাইক্রোওয়েভ বিকিরণের তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বৈচিত্র্যই এর কারণ।
এর পর দুই বছর প্রায় ষাটজন বিজ্ঞানীর এক দল নিয়ে পশুর মতো পরিশ্রম করে গেছেন প্রফেসর দরবেশ। সম্ভাব্য সব রকম বিশ্লেষণ প্রয়োগ করে শেষ পর্যন্ত একটি ফিল্টার অ্যালগরিদম ফল দিয়েছে, মাইক্রোওয়েভ টেলিস্কোপের আউটপুটে দেখা গেছে একটি ছবি। তাতে কালো মহাকাশে একটি নীল গ্রহের একাংশ দেখা গেছে।
ম্বাবাটুর সাথে যোগাযোগ করা উচিত হবে কি না, তা নিয়ে সামান্য ভাবনা উদয় হয়েছিলো প্রফেসর দরবেশের মনে, কিন্তু সে ভাবনা ঝেড়ে ফেলেছেন তিনি। বিজ্ঞান লেখকদের সাথে পরে কথা বললেও চলবে।
এর পর প্রচুর নষ্ট আউটপুটের পাশাপাশি একে একে আরো বেশ ক'টি অর্থবহ ছবি পাওয়া গেছে। নীল গ্রহটি যে পৃথিবীর ছবি, তাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ ছিলো না, তাই সেটি বাস্তব পৃথিবীরই প্রতিবিম্ব কি না, তা স্থির করতে প্রচুর সময় ব্যয় করতে হয়েছে। বাস্তব পৃথিবীর ছবি সেটি নয়, কারণ সেই পৃথিবীতে উত্তর আর দক্ষিণ মেরুর বরফ আচ্ছাদন আরো বিস্তৃত, এবং সেই পৃথিবীর চাঁদটিতে উল্কাপাতের গহ্বরের সংখ্যা অনেক অনেক বেশি। ম্বাবাটুর অনুমান ভুল নয়, এটি অন্য কোনো কপি-পৃথিবীর ছবি, যে পৃথিবী বহু দূরে, যে পৃথিবীর বার্তা ভেসে আসছে মহাজগতের এক চোরাগলি বেয়ে। প্রফেসর দরবেশ সেই বার্তার উদ্ধারকর্তা।
চায়ের কাপ হাতে সামনে বিশাল মনিটরের দিকে তাকিয়ে আছেন প্রফেসর দরবেশ। নতুন শক্তিশালী মাইক্রোওয়েভ টেলিস্কোপ পাঠানো হয়েছে মৃতবিন্দু থেকে বেরিয়ে আসা বিকিরণ বিশ্লেষণের জন্যে, আজ তার প্রথম দফা ছবি আসবে, আগের চেয়ে অনেক বেশি রেজোলিউশনে।
"ডক্টর দরবেশ, ফাইল প্রসেসিং শেষ। স্ক্রিনে পাঠাবো?" হেডফোনে ভেসে এলো এক সহকর্মীর গলা।
"হ্যাঁ, প্লিজ।" বুক ঢিপঢিপ অনুভূতিটা চায়ের কাপে চুবিয়ে মারার সিদ্ধান্ত নিলেন প্রফেসর দরবেশ।
স্ক্রিনে ভেসে উঠলো একটা ছবি। কপি-পৃথিবীর একাংশ দেখা যাচ্ছে স্ক্রিনে, কপি-চাঁদ দৃশ্যমান নয়, আর একটা ছোটো আলোর বিন্দু গোল লাল মার্কার দিয়ে দাগানো।
"জুম করো।" মাইকে বললেন প্রফেসর দরবেশ।
তিন দফা জুম করার পর ছোটো আলোর বিন্দুটি একটি আলোর গোলকে পরিণত হলো।
"করতে থাকো।"
নতুন টেলিস্কোপটি মারাত্মক শক্তিশালী, দফায় দফায় জুম করার পরও ছবির কোয়ালিটির তেমন কোনো হেরফের হয়নি দেখে টের পেলেন প্রফেসর দরবেশ।
আলোর গোলকটি এক সময় গোটা স্ক্রিন দখল করে ফেললো।
নিশ্চিতভাবেই সেটি একটি মহাকাশ স্টেশন গোছের কিছু। গোলকটির একটি অংশ স্বচ্ছ কোনো বস্তুর আবরণে তৈরি, তার ভেতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে, গোলকটির ভেতরে আলো জ্বলছে। সেই আলোয় চোখে পড়ছে প্ল্যাটফর্মের মতো একটি কাঠামো, কিছু গোল দরজা, একটি প্রশস্ত কাউন্টার। নিঃসন্দেহে একটা মহাকাশ স্টেশনের ছবি।
হলঘরের ভেতর উত্তেজিত ফিসফাস শুরু হলো। কে একজন হাততালি দিয়ে উঠলো।
প্রফেসর দরবেশ চোখ বুঁজলেন। নোবেল নিশ্চিত, কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু কয়বার দেয়া হবে সেটাই এখন প্রশ্ন। অন্তত দুইবার দেয়া উচিত, তিনবার দিলে বুঝতে হবে নোবেল কমিটির লোকজনের ভদ্রতাজ্ঞান আছে। আর ম্বাবাটুর সাথে সাক্ষাতের ব্যাপারটা নিয়ে পরে চিন্তা করা যাবে। লোকটা কোনো মিডিয়াভিত্তিক নিম্নবর্গীয়পনা শুরু না করলেই হয়।
হেডফোনে হড়বড় করে কে যেন বললো, "ডক্টর দরবেশ, একটা মানুষ দেখা যাচ্ছে!"
"জুম করো!" হুঙ্কার দিলেন প্রফেসর দরবেশ।
আলোকিত গোলকটির জানালা গোছের প্রান্তে একটি লোক দাঁড়িয়ে আছে, এবার বোঝা যাচ্ছে পরিস্কার। উজ্জ্বল আলো এসে পড়েছে তার মুখে।
আরো কয়েকবার জুম করার পর লোকটার অবয়ব আরো স্পষ্ট হয়ে উঠলো। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে, হাতে একটা পাত্রের মতো কিছু ধরা।
"জুম, জুম, জুম!" গর্জে উঠলেন প্রফেসর দরবেশ।
আরো কয়েকবার জুম করার পর গোটা হলঘরের ফিসফাস থেমে গেলো।
এবার স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে মানুষটাকে, হাঁটু পর্যন্ত। লোকটা বয়স্ক, মুখে পুরু গোঁফ, মাথায় টাক, চোখে চশমা। তার হাতে ধরা একটা টুকরিজাতীয় পাত্র।
প্রফেসর দরবেশ বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে রইলেন সেই চেহারার দিকে। চেহারাটা তাঁর পরিচিত, তিনি প্রায়ই এই চেহারাটা কোথাও দেখেন, কিন্তু কোথায় দেখেন, তা কিছুতেই তাঁর মনে পড়ছে না।
আরেক দফা জুম করার পর প্রফেসর দরবেশ চিনতে পারলেন চেহারাটাকে। রোজ সকালে আয়নায় চেহারাটা দেখেন তিনি।
পর্দার ঐ লোকটা কপি-পৃথিবীর কপি-দরবেশ। কিন্তু ওর হাতে কী?
প্রফেসর দরবেশ অস্ফূট গলায় বললেন, "হাতে কী?"
আরো এক দফা জুম করার পর কানের কাছে হেডফোনে কটকট করে উঠলো একটা গলা।
"কলা, স্যার। পাকা কলা।"

এ গল্পটি রহস্যপত্রিকার জুন, ২০১২ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।