Tuesday, May 10, 2011

ডুবিয়ে তরী ঝাঁপিয়ে পড়ি

মরে গিয়ে বেঁচে গিয়েছিলো রবি।

শেষদিকে লোকজন বেজায় ত্যক্ত করতো। গুরুদেব গুরুদেব ডেকে পাগল করে ফেলতো। একটু স্বস্তি নাই, শান্তি নাই, আছে কেবল লোকজনের ঘ্যানঘ্যান, তাগাদা, আবদার, তৈলমর্দন, টাকে চুল গজানোর তেলের সার্টিফিকেট লিখে দেয়ার জন্যে অধ্যবসায়ী কবিরাজের ঘন ঘন দর্শন। জীবনটার ত্যানা পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে সুতো বের করে ছেড়েছিলো ব্যাটারা।

তাই শ্যামসমান মরণের শরণ নিয়েই রবি খুব বাঁচা বেঁচে গিয়েছিলো। এইবার দেখি তোরা কী করিস। শ্যালকের দল।

প্রেতযোনিপ্রাপ্তি প্রথম দিকটায় বেশ ফুরফুরেই লাগছিলো রবির। কোনো হুড়ো নেই, গিয়ানজাম নেই, যখন যেখানে খুশি যাও, যা খুশি দ্যাখো, যা খুশি শোনো। মর্ত্যলোকের দুয়ার একেবারে চিচিং ফাঁক করে খোলা। প্রেতলোকের কতিপয় দুঃশীল বাসিন্দার কথা বাদ দিলে মরণটা নেহায়েত খারাপ কিছু নয়। জীবনের মতোই।

ওখানেও কি বিটকেল কম ছিলো? কল্লোল যুগের ডেঁপোগুলি কী যে জ্বালাতন শুরু করেছিলো শেষটায়, কহতব্য নয়! কিন্তু একদিন একটা বেলগাছে আরাম করে শুয়ে নিচের ছায়াসুনিবিড় পৃথিবীটাকে দেখতে দেখতে হঠাৎ রবির মনে হলো, আচ্ছা, লোকজন আমাকে মনে রেখেছে তো?

বেজায় পীড়িত হলো রবি। কৌতূহল তো নয়, বিল্বকণ্টক একেবারে। রাতটা কোনোমতে ছটফট করে এপাশওপাশ ফিরে পার করে সকালেই ঢাকার দিকে উড়াল দিলো সে। কোলকাতায় গিয়ে লাভ নেই, ভোটের মরশুম এখন, বেজায় কেলো চলছে, মর্ত্যলোকের বিটকেলগুলো সব একাট্টা হয়ে হাল্লাচিল্লা করে বেড়াচ্ছে। তার ওপর আছে হিন্দি সিনেমার জগঝম্প।

ঢাকায় বেশ একটা সার্ধশতপনা চলছে। চারদিকে রবীন্দ্র রবীন্দ্র ভাব। পলিটিশিয়ানগুলো পর্যন্ত পারলে দুই লাইন রবি বলে। টঙ্গির কাছাকাছি আসতেই রবির ভুতুড়ে শরীরটা একটু কেমন কেমন করে উঠলো। শেষবার এমন হয়েছিলো নোবেলের মোহরখানা চুরি যাবার পর।

শেরেবাংলা নগরের একটা শ্যাওড়া গাছে ল্যাণ্ড করে রবি বুঝলো, বিষম জ্বর উঠেছে। মনে হয় ভূতের টাইফয়েড। কিন্তু আবার কী ঘটালো বাঙালগুলো?

বিস্তারিত জানার জন্যে শ্যাওড়া গাছ থেকে সুড়ুৎ করে নেমে টলতে টলতে কাছে এক বাড়ির টেলিভিশনে উঁকি দিলো রবি। তারপর যা দেখলো, সে কহতব্য নয়।

কিন্তু কইতে তো হবেই, তাই না? নইলে গল্প কেন?

রবি দেখতে পেলো, স্ক্রিন জুড়ে হাফমজুর রহমান নামে এক ডাক্তার পরম আহ্লাদে উঁচিয়ে ধরে আছে একখানা গানের সিডি। মোড়কে দুই বাংলার হৃদকম্প গানের বাদুড় ভিভা রহমানের হাস্যোজ্জ্বল ছবি। একটা ভুতুড়ে চশমা চোখে এঁটে রবি দেখতে পেলো, অ্যালবামের গায়ে লেখা কথাবার্তাগুলো বেশ পরিচিত ঠেকছে। আ মোলো, রবিরই লেখা গান নয় কি?

রবির ভুতুড়ে হার্টখানা এ দৃশ্য দেখে প্রবল গোঁ ধরে হরতাল করে বসলো। চিবিয়ে চিবিয়ে বললো, ক্ষমা যেথা ক্ষীণ দুর্বলতা, হে রুদ্র, নিষ্ঠুর যেন হতে পারি তথা।

আর এভাবেই আপন ভুতুড়ে হৃদযন্ত্রের নিষ্ঠুরতায় মৃত্যুর মাত্র সত্তর বছর পর প্রেতলোক পরিত্যাগ করতে হলো রবিকে। ভূত মরলে কী হয়, তা গল্পকারের জানা নেই।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।