Friday, April 22, 2011

চতুর্থ স্তম্ভ

গেরিলা, হেহ! হাফমিদুল হাসে মিটিমিটি।

কাজটা মার্চ মাসে যতটা কঠিন ছিলো, এপ্রিলে এসে ততটাই সহজ হয়ে গেছে। কত সব ঘটনা ঘটে চলছে চারপাশে, মানুষের ছোট্ট স্মৃতি কতটুকু আর আগলে রাখতে পারে? যতই দিন যাচ্ছে, আসল কথা ভুলে যাচ্ছে লোকে। এখন প্রোপাগাণ্ডা মেশিনে স্টার্ট দিতে হবে, মনে মনে ভাবে হাফমিদুল হক। মেহেরযৌবন নিষিদ্ধ কেন কর্তৃপক্ষ জবাব চাই!

ম্যাডাম আজ দুপুরে ফোন দিয়েছিলেন। খানদানি ঘরের মেয়ে, দেশের বাইরে লেখাপড়া করেছে, আদবকায়দা খুউব ভালো জানে। ভাড়াটে লেখকেরও সম্মান আছে, সেটা অন্তত বোঝে। কখনো ভুলে যায় না যে হাফমিদুল একজন শিক্ষক। কথা শুরু করে স্যার দিয়ে, মাঝেমধ্যে শেষ করে স্যার দিয়ে। হাফমিদুল বোঝে, এই মহিলা বহুদূর যাবে। বহুদূর যাবার মাইলেজ তার শরীরের নীল রক্তে আছে।

"স্যার, আরো কিছু লেখা তৈরি করতে হবে।" একটু অনুযোগের সুরেই বলেন ম্যাডাম।

হাফমিদুল একটু ব্যস্ততার ভান করে। "কিন্তু আমার যে একটা সেমিনারের জন্য পেপার ফাইনাল করতে হবে মিসেস হোসেন? রেফারেন্সের কাজটা পুরা বাকি। হাতের কাজটা শেষ করে ...?"

"না স্যার।" ম্যাডাম নরম গলায় শক্ত কথাটা বলেন। "দুই-তিনদিনের মধ্যেই দিতে হবে পেপারে। আমি কথা বলেছি ওদের সাথে। ফারুক বললো জলদি পাঠাতে।"

হাফমিদুল আরেকটু সুতো ছাড়ে। "কিন্তু ম্যাডাম, সেমিনারে গিয়ে তো আমি খালি হাতে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবো না। পেপারটা তো শেষ করতে হবে, নাকি?"

ম্যাডাম টোপের ধার ধারেন না, সোজা বলেন, "শিওর, ইট হ্যাজ এভরি রাইট টু বি এক্সপেনসিভ! আই উইল চেইঞ্জ সাম ডিজিটস অন দ্য চেক, ওকে?"

হাফমিদুল হাল ছাড়ার ভান করেন, "মিসেস হোসেন, আপনি যে কেন এত ভরসা করেন আমার ওপর! আমাদের তো বয়স হয়ে গেছে, আপনি ইয়াং জেনারেশনের কাউকে দিয়ে ...।"

ম্যাডামের শরীরের নীল রক্ত কোলেস্টেরলের প্রবল বাধা উপেক্ষা করে দমকে দমকে ছুটে আসে হাতের পেশীতে, সংযোগটা কেটে দেয় একটা অধৈর্য আঙুল।

হাফমিদুল একটা দীর্ঘশ্বাসকে ছোটো করে ছাড়ে কেবল। এই লাইনে মাঝেমধ্যে একটু আধটু অপমান সহ্য করতে হয়। মুখের উপর ফোনই তো কেটে দিয়েছে, জুতো তো আর মারেনি! তবে এর পরের দিন একটু টাইট দিতে হবে, নাহলে জুতো মারার দিন শুরু হয়ে যাবে। রমণ সুমহানকে নাকি যাচ্ছেতাই ভাষায় ধমক দিয়েছিলেন ম্যাডাম। মহিলাকে বুঝতে হবে, হাফমিদুল একজন সম্মানিত ব্যক্তি, খানসামা নয়। টাকার বিনিময়ে কাজ হচ্ছে এখানে, সম্মানের বিনিময়ে নয়। সম্মানের বিনিময়ে কাজ হলে চেকের অঙ্কে অন্তত একটা শূন্য বেশি বসাতে হবে।

ল্যাপটপের ওপর চিন্তামগ্ন আঙুলের ফাঁকে সিগারেটটাকে পুড়তে দেয় হাফমিদুল। গতবার তাড়াহুড়োয়ে একটা ভুল হয়ে গেছে। পুরোনো আরেকটা লেখার ল্যাজামুড়ো ছেঁটে খ্যাপের লেখাটা নামিয়েছিলেন তিনি, এবার সেটা করা যাবে না। তবে ভুলটা নিশ্চিন্দিপুরের অভদ্রগুলো ছাড়া আর কারো চোখে পড়েনি। শালারা কোত্থেকে খুঁজে খুঁজে ঠিকই বের করে ফেলেছে আসল লেখাটা! হাফমিদুলের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে, টাকের কাছটা রঙিন হয়ে ওঠে একটু।

শোবার ঘরে টিভিতে হিন্দি সিরিয়াল দেখছে শেফালি, সেখানে একটা চরিত্র ডুকরে ওঠে, পেয়ার কি মতলব তুম কেয়া সমঝোগে? তীব্র বেহালা বেজে ওঠে সংলাপের পর, আর অনুরণিত হতে থাকে কথার শেষ অংশটা, তুম কেয়া সমঝোগে, তুম কেয়া সমঝোগে, তুম কেয়া সমঝোগে ...?

আসলেই তো। হাফমিদুল সিগারেটের গোড়ায় হালকা চুম্বন করে। পাবলিক প্রেমের মানে কী বুঝবে? পাবলিক শুধু বোঝে রক্তারক্তি। যেন ১৯৭১ সালে কেউ প্রেম করে নাই, হেহ!

গলা চড়িয়ে ডাকে হাফমিদুল, "শেফালি, ভলিউমটা কমাইবা একটু? লেখালেখি করতেছি।"

শেফালি বিরস কণ্ঠে বলে, "দরজা লাগাইয়া লেখালেখি করো। ভলিউম কমান যাইতো না।"

হাফমিদুল বিরক্ত হয়। বউটা যদি একটু সহযোগিতা করতো কোনো কাজে!

"তাইলে মশারি টাঙ্গাইয়া দিমু? শুইয়া শুইয়া দ্যাখো?" হাঁক ছেড়ে বলে হাফমিদুল।

"সিরিয়াল শ্যাষ হৌক, তারপরে টাঙ্গাইবা। মশারির ভিতরে শুইয়া টিভি দ্যাখন যায়?" শেফালি খনখনে কণ্ঠে ধমকে ওঠে।

হাফমিদুল সিগারেটের গোড়ায় একটা অস্থির চুমুক লাগায়। সে ঠিক জানে, লেখাটায় যখন সে ডুবে যাবে, চোথা খুলে কোটেশন লিখবে, ভালো ভালো কথা দিয়ে পিচ্ছিল পিচ্ছিল জায়গাগুলো বালুচাপা দেবে, তখনই শেফালি আবার হেঁকে উঠবে, "মশারিটা টাঙ্গাইয়া দিয়া যাও!" ধাড়ি মেয়েছেলে, একটা মশারি টাঙাতে পারে না!

কিন্তু বসে থাকলে কাজ এগোবে না। সকালে আবার ক্লাস আছে একটা। হাফমিদুল ফেসবুকে ঢোকে একবার। আমার বন্ধু রাশেদ আর গেরিলা নিয়ে আবাল পাবলিক খুব লাফালাফি করছে। এই লাফঝাঁপকে মেহেরযৌবনের পক্ষে কাজে লাগাতে হবে।

খ্যাপের লেখায় যুক্তি লাগে না যদিও, কিন্তু একটা যুক্তি সাজাতে পারলে মন্দ কী? হাফমিদুল মনের চোথায় খসখস করে নোট তোলে। আমার বন্ধু রাশেদ আর গেরিলা দেখতে হলে জনতার ঢল দেখেই বোঝা যায়, বাংলাদেশের সুনির্মিত চলচ্চিত্র দর্শকের কোনো অভাব নেই। এই লাইনে শুরু করা যায়। তারপর একটা মিথ্যা কথা বলতে হবে, অভাব ছিলো না মেহেরযৌবনের দর্শকেরও। পেপার যারা পড়ে, তারা কোনো কিছু চেক করে না, কাজেই ছাপা হওয়ার পর এইটাই সত্য হয়ে যাবে। এরপর একটা ধাক্কা, একটা কান্নাচাপা অভিযোগ করতে হবে, কেন আমরা এমন? বাঙালির নরকে কি আসলেই প্রহরী নিয়োগ দিতে হয় না?

এই লাইনটা খুব খাবে, মনে মনে হাসে হাফমিদুল। ইউনূস সাহেবের ঘটনার পর ফুলে আছে সবাই, কাজেই ইউনূস সাহেবকেও টানা যায় এর মধ্যে। লিখতে হবে, আমরা এত স্বশ্রীকাতর কেন? যে দেশে গুণীর কদর নেই, সে দেশে কীভাবে গুণী জন্মাবে? আমরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলাম, ইউনূসকে অপমান করলাম, আর মেহেরযৌবনকে করলাম নিষিদ্ধ!

সিগারেটের পুটকিটা চুষতে চুষতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে হাফমিদুলের মুখ। নাহ, নিকোটিনে জাদু আছে! এইভাবেই এগিয়ে নিতে হবে। তারপর বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন থেকে ... নাহ, বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন নিয়ে গতবার একটা সমস্যা হয়েছিলো। এবার আহমদ ছফা থেকে কিছু বলতে হবে। ছফার নামে একটা মাদকতা আছে। পাঠকদের মধ্যে যারা একটু ত্যাড়া, তারাও ছফার নাম পড়লে চুপ করে যাবে। এরপর বলতে হবে, মেহেরযৌবন সম্ভবত চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে ভুল-বোঝা নিদর্শন। মেহেরযৌবনের সাথে আমাদের এক শ্রেণীর ইতর মানুষ যে আচরণ করেছে, তাকে বীরাঙ্গনাদের সাথে বাঙালির যুদ্ধ-পরবর্তী আচরণের কি কোনো পার্থক্য আছে? এক তরুণী নারীর লাঞ্ছনার ইতিহাসকে সেলুলয়েডে বন্দী করতে প্রবাসের ভোগ-বিলাস ছেড়ে ছুটে এসেছেন দেশের মাটিতে, দোর থেকে দোরে ফিরেছেন বীরাঙ্গনাদের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করতে, নিজের ব্যবসা আর শিক্ষকতার দুঃসহ চাপ সয়ে সয়ে তিলে তিলে তিলোত্তমা করে নির্মাণ করেছেন এই দশকের সবচেয়ে নন্দিত সিনেমাটি, আর আমরা কী করেছি? মেহেরযৌবনকে নিষিদ্ধ করেছি, ঠিক যেভাবে পাকিস্তানীদের হাতে ... ওহ না, পাকিস্তানী বলা যাবে না, হামিদ মিরের প্রজেক্টের কথা খেয়াল রাখতে হবে ... হানাদারদের হাতে ধর্ষিতা বীরাঙ্গনাদের আমরা নিষিদ্ধ করেছিলাম আমাদের সমাজে!

মেহেরযৌবনকে আবার চালুর প্রস্তাবটা কখনো করা যাবে না। ম্যাডাম বাংলাদেশে মেহেরযৌবন চালানোর ব্যাপারে তেমন একটা আগ্রহী না। পাবলিসিটি যতটুকু পাওয়া দরকার, পাওয়া গেছে। বিবিসিও কাভারেজ দিয়েছে কয়েকদিন আগে। এখন সিনেমাটা প্যারিসে ওপেন করার ব্যাপারে কথাবার্তা চলছে ... কলকাতা, দুবাই আর লণ্ডনেও পাঠানো হবে। টাকা নিয়ে তো কোনো চিন্তা নাই, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে সাঁই সাঁই করে চলবে মেহেরযৌবন। জয়া বচ্চন আছে, ভিক্টর ব্যানার্জি আছে, তারা কি কেশ উৎপাটনের জন্য আছে এই সিনেমায়? তাদের নামের ভারেই ইনডিয়া আর বাকি দুনিয়ায় কাটবে যা কাটার, বাংলাদেশে না চললেও কোনো ক্ষতি নাই।

লেখার বাকিটায় থাকবে শুধু অনুযোগ। আমরা খল, আমরা নৃশংস, আমরা অপরিণামদর্শী। মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে গলা টিপে হত্যা করতে চায় আমাদের তথাকথিত শিক্ষিতরাই। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার স্তরে স্তরে ঘুণ না ধরলে একটা জাতিকে কখনো সিনেমা নিষিদ্ধ করার ক্ষতচিহ্ন নিয়ে ঘুরতে হয় না ...!

চিন্তার সুতোটা কেটে যায় শেফালির খনখনে গলার উচ্চগ্রাম হুকুমে, "মশারিটা টাঙ্গাইয়া দিয়া যাও!"

ছাইদানিতে সিগারেটটা পিষে গুঁজতে গুঁজতে উঠে দাঁড়িয়ে লুঙ্গি ঠিক করে হাফমিদুল। শেফালি পূর্বাভাসযোগ্যা, এটাই যা সান্ত্বনা। বাকিটা কিসমত।

স্পঞ্জের স্যাণ্ডেল পায়ে গলিয়ে শোবার ঘরে ঢোকে হাফমিদুল। শেফালি বিছানায় শুয়ে পড়েছে পাশবালিশ জড়িয়ে ধরে। শ্বশুরবাড়ি থেকে পাঠানো মেহগনি কাঠের মস্ত পালঙ্ক। শ্বশুরের পয়সা আছে প্রচুর, রুচি ততটা নাই, মোগল আমলের নকশার ফার্নিচার পাঠিয়েছে ব্যাটা। খাটের চার কোণায় চারটা প্রকাণ্ড মশারির স্ট্যাণ্ড লাগানো ছিলো, মিস্ত্রি ডাকিয়ে খুলিয়েছে হাফমিদুল। ঐ স্ট্যাণ্ডওয়ালা পালঙ্কে শুলে মনে হতো সুপারিবাগানে শুয়ে আছে সে।

তিনটা স্ট্যাণ্ড খাটের নিচে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে, একটা শুধু কাজে লাগাতে হয়। খাটের তিন কোণে দেয়ালে প্লাস্টিকের হুক লাগানো আছে, সেখানে মশারি ফিতার ফাঁসটা চমৎকার ভাবে আটকানো যায়। চতুর্থ স্ট্যাণ্ডটা প্রতি রাতে খাটের নিচ থেকে বের করে ফিট করে তারপর মশারি টাঙাতে হয়, ঘরের ঐদিকটায় মশারি টাঙানোর মতো জুৎসই কোনো কিছু নেই।

মশারির তিন কোণা লাগিয়ে গুঁজতে গুঁজতে হাফমিদুল শুনতে পায়, শেফালি ঘুমিয়ে পড়েছে।

স্ট্যাণ্ডটা কি লাগাবে হাফমিদুল? নাকি তিন কোণা টাঙালেই চলবে? টানটান করে না টাঙালে মশা আবার মশারির গায়ে বসেই রক্ত খাবে না তো? শেফালি জেগে গেলে আবার তাকে ঠেলেঠুলে স্ট্যাণ্ড ফিট করতে পাঠাবে।

বিরক্ত মুখে খাটের নিচ থেকে স্ট্যাণ্ডটা বের করে খাটের শরীরে ফিট করা ধাতব খাপে ঢোকাতে থাকে হাফমিদুল। বাকি তিনটা স্ট্যাণ্ড জাহান্নামে যাক, এই চার নাম্বার স্ট্যাণ্ডটা তাকে সমুন্নত রাখতেই হবে।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।