Thursday, April 07, 2011

ওয়াহে গুরুজি কা খালসা

গত কয়েক মাস ধরেই ডকুমেন্টারি দেখছি কাজের ফাঁকে বের করা সময়টুকুতে। নানা বিচিত্র সব বিষয়ের ওপর বিচিত্রতর তথ্যচিত্র তৈরি হয়ে আসছে বছরের পর বছর ধরে, দুষ্টমতি লোকেরা কপিরাইটের তোয়াক্কা না করে সেগুলো ইন্টারনেটের নানা অন্দরেকন্দরে আপলোড করে রেখেছে। এই পোস্টটিও তেমনি কয়েকটি ডকুমেন্টারির প্রতিক্রিয়া।

ইন্দিরা গান্ধী আর মার্গারেট থ্যাচার সম্পর্কে আমার বাবা কিছুটা বিদ্বেষমিশ্রিত শ্রদ্ধা পোষণ করতেন। ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যু সংবাদ যেদিন টিভিতে প্রচারিত হয়, সেদিন তাঁর হতচকিত চেহারাটা আমার স্মরণে আছে, যদিও আমি তখন শিশু ছিলাম। ইন্দিরা গান্ধী, এরশাদ, থ্যাচার ... এই নামগুলো টিভির অন্যান্য চরিত্রের মতোই ছিলো, আমার বোধে তখনও তারা বাস্তব আকার পায়নি। ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর পর কয়েকদিন খুব তোলপাড় চললো আশেপাশে, প্রবল ইন্দিরাবিদ্বেষী প্রতিবেশীরা হাসিমুখে তার শিখ দেহরক্ষীর প্রশংসা করতে লাগলেন, এবং নানা গুরুত্বপূর্ণ খেলাধূলার ভিড়ে ইন্দিরা গান্ধীর নামটা কিছুদিনের মধ্যে আমার চেতনায় আবার ফিকে হয়ে গেলো। এর সাত বছর পর রাজীব গান্ধীর মৃত্যুসংবাদ যখন টিভিতে প্রচারিত হলো, তখন আবার ইন্দিরা ফিরে এলেন আলোচনায়। ইন্দিরাবিদ্বেষী প্রতিবেশীরা এবার লিবারেশন টাইগার্সের প্রশংসায় আত্মহারা হলেন, যাক, পোলাটারেও ছাড়ে নাই।

কেন ইন্দিরা গান্ধীর ওপর আশপাশের লোকে ক্ষ্যাপা, সেটা বুঝতে আমার আরো সময় লেগেছে। কিন্তু ইন্দিরা হত্যার পটভূমি নিয়ে কেন যেন আমি কখনোই উৎসাহ নিয়ে পড়াশোনা করিনি। ভারতের আভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে সচেতন হওয়ার বয়সটায় আরো আগ্রহকাড়া বিষয় ছিলো, সেগুলোর পেছনে সময় দিয়েছি। এ কারণেই গত এক সপ্তাহ ধরে অবসরটা ব্যয় করলাম ইন্টারনেটে শিখ পরিস্থিতি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করে।

ভারতে খাদ্যশস্য নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কিছু রাজনৈতিক চাল ছিলো। ইন্দিরা গান্ধী ব্যাপারটা পছন্দ করতেন না। ষাটের দশকের শেষ থেকেই পাঞ্জাবে তাই সবুজ বিপ্লব শুরু হয়। সিন্ধু নদীর পাঁচটি শাখাই পাঞ্জাবের ওপর দিয়ে প্রবাহিত, আর এই শাখাগুলো উৎপত্তিস্থল যে কাশ্মীরে, সে কাশ্মীরও বহুলাংশে ভারতের দখলে, তাই পাঞ্জাবের চাষাবাদে বিঘ্ন ঘটানোর মতো ফ্যাক্টরও খুব বেশি ছিলো না। সার আর সেচের কল্যাণে আর নরমান বোরলগের তত্ত্বাবধানে ষাটের দশকের শেষে ভারতের সবুজ বিপ্লব ভারতকে খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয়। আশির দশকের শুরুতেই ভারত এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করে, আর ভারতের শস্যভাণ্ডার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে পাঞ্জাব।

১৯৪৭ এ রক্তক্ষয়ী বিভাজনে পাঞ্জাব আর বাংলা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিলো, রাষ্ট্রবিভাজনের কারণে পৃথিবীর আর কোনো অঞ্চল বোধহয় এতোটা রক্তপাতের ভেতর দিয়ে যায়নি। বাংলার চেয়েও বহুগুণে বীভৎস ছিলো পাঞ্জাববাসীর এক্সোডাস। মুসলমান, হিন্দু আর শিখ, এই তিন ধর্মের মানুষই পাঞ্জাবে মোটামুটি সমসত্ত্ব মিশ্রণে বাস করতো; নেহরু আর জিন্নাহর দর কষাকষি নিয়ে অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে ১৯৪৭ সালের শুরুতেই পাঞ্জাবে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে। নেহরু ছিলেন অবিভক্ত ভারতের পক্ষে, আর জিন্নাহ চাইছিলেন মুসলমানের দেশ পাকিস্তান, লর্ড ওয়েভেলের পর যখন রাজার তুতো ভাই লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভাইসরয় হয়ে এলেন, তিনি জানালেন, ১৯৪৮ এর জুনের মধ্যেই ভারত থেকে হাত ধুয়ে চলে যাবে ইংরেজ। ভারত আর পাকিস্তানের বিভাজন প্রশ্ন যখন চূড়ান্ত, তখন আলোচনার টেবিলে উঠে এলো পাঞ্জাব আর বাংলা। কী হবে এই দুই প্রদেশের? ব্রিটেন থেকে এলেন এক গম্ভীর আইনজীবী, তার নাম সিরিল র‍্যাডক্লিফ। মাউন্টব্যাটেনের ভাইসরয় তালুকের এক বাংলোতে উঠে সোজা ম্যাপের ওপর পেনসিল টানতে শুরু করলেন তিনি।

মাউন্টব্যাটেন এরপর দুটো খারাপ কাজ করেন। তিনি নেহরু আর জিন্নাহকে চমকে দিয়ে ঘোষণা করেন, ১৯৪৮ নয়, ১৯৪৭ এর অগাস্টেই ব্রিটিশ ভারতকে দুই ভাগ করে তাদের হিস্যাদারদের হাতে তুলে দিয়ে চলে যাবে ইংরেজ। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, তা না হলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দায় তাকে নিতে হবে। দ্বিতীয় যে খারাপ কাজটা তিনি করেন, দেশ দু'টির সীমান্ত দেশবিভাগের পর প্রকাশ করা হবে বলে জানান। অর্থাৎ, দেশ ভাগ হবে, কিন্তু কোন অংশ কোথায় পড়বে, তা জানা যাবে দুই দেশের পতাকা ওড়ানোর পর।

বাংলার ক্ষেত্রে যা মোটামুটি আন্দাজযোগ্য ছিলো, পাঞ্জাবের ক্ষেত্রে তা ছিলো না। প্রতি গ্রামেই হিন্দু, শিখ, মুসলিম রয়েছে, এক গ্রামে কম হলে পাশের গ্রামে বেশি। ফলে মার্চ ১৯৪৭ নাগাদ পুরো পাঞ্জাবেই অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়লো। আবহমান কাল ধরে পাশাপাশি ঘরে বেড়ে ওঠা প্রতিবেশীরা একে অন্যকে দেখিয়েই ছুরিতে শান আর বন্দুকে তেল দেয়া শুরু করলো। মুসলিম, হিন্দু, শিখ, সবাই তখন সম্ভাব্য ভিনদেশী।

শিখরা মুসলিম বা হিন্দুর তুলনায় কিছুটা ভিন্ন, ধর্মমতেই তারা প্রত্যেকে যোদ্ধা, এক একজন "সন্ত-সিপাহি", স্পার্টা বা সুইৎজারল্যাণ্ডের মতো প্রত্যেকেই সশস্ত্র। কৃপাণ বহন করা তাদের ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা। দেশবিভাগের সময় পাঞ্জাবে শিখরা পশ্চিম প্রান্তে আক্রান্ত হয়েও যেমন লড়াই করেছে, তেমনি পূর্ব প্রান্তে আক্রমণও করেছে। ইতিহাসের এক দুঃখজনক অধ্যায় পাঞ্জাবের এক্সোডাস। ১৯৭১ এ বাংলার এক্সোডাসকে সংখ্যার দিক দিয়ে অতিক্রম করতে না পারলেও, সহিংসতার দিক দিয়ে এই এক্সোডাস অন্যতম। এক মিলিয়ন মানুষ শুধু দেশ পার হতে গিয়ে মৃত্যুবরণ করেছিলো। কেউ ক্ষুৎপিপাসায়, কেউ রোগশোকে, কেউ আক্রান্ত হয়ে। উদ্বাস্তুদের দেশছাড়া হওয়ার পথের কূপগুলিতে বিষ মিশিয়ে রেখেছিলো হিন্দু-মুসলমান-শিখেরা, উদ্বাস্তুদের মিছিলে হামলা করেছে তাদেরই এককালের প্রতিবেশীরা, ভিনদেশগামী ট্রেনের ওপর আক্রমণ করে হত্যা করেছে মানুষকে।

দেশভাগের বিরাট ক্ষয়ক্ষতি সয়ে ভারতীয় পাঞ্জাবে কেন্দ্রীভূত শিখরা এরপর প্রতিবেশী হিসেবে পায় হিন্দুদের। পাঞ্জাবে কৃষক সমাজের প্রায় সমস্তটাই ছিলো শিখ, হিন্দুরা কৃষি বাদে বাকি পেশাতে মনোযোগী ছিলো। সবুজ বিপ্লবের মূল চালিকাশক্তি ছিলো শিখ কৃষক। কৃষিতে অর্থনৈতিক সাফল্য শিখ সমাজকে এরপর কিছু জটিল সামাজিক রাজনৈতিক প্রশ্নের সম্মুখীন করে।

শিখ ধর্মের পাঁচ নিদর্শন হচ্ছে কেশ, কাঙ্গা (চিরুনি), কাচেরা (শর্টস), কারা (লোহার বালা) আর কিরপান (কৃপাণ)। তার ওপর শিখ ধর্মে ধূমপান বা মদ্যপান নিষিদ্ধ। এদিকে কৃষিকাজে লম্বা দাড়ি আর পাগড়ি খুব একটা এর্গোনমিক নয়। শিখ কৃষকরা সবুজ বিপ্লবের সময় আস্তে আস্তে দাড়ি আর চুল কাটা শুরু করে।সচ্ছল শিখ তরুণ কৃষক যখন চুল ছোটো করে, দাড়ি কেটে বা ছেঁটে বিড়ি বা মদ খাওয়া শুরু করে, তখন শিখ প্রবীণরা অসন্তুষ্ট হয়ে ওঠেন। শিখদের কাছে চুলদাড়ি কেবল প্রতীকই নয়, বাহনও। তাই শিখ ধর্মগুরুদের চোখে চুলদাড়ি কেটেছেঁটে যে ছোকরা শিখ বিড়ি খাচ্ছে, তাকে আর শিখ বিবেচনার কোনো কারণ থাকে না। সবুজ বিপ্লবের সময় পাঞ্জাবে তামাক কোম্পানিগুলোও বিরাট ব্যবসা শুরু করে। পানি পিও পাম্প দা তে বিড়ি পিও লাম্প দা (পাম্পের পানি আর ল্যাম্পের বিড়ি খা) শিরোনামে রেড ল্যাম্প ব্র্যাণ্ডের সিগারেটের বিজ্ঞাপনে পাঞ্জাব ছেয়ে যায়, যেখানে কৌশলে কৃষিতে সাচ্ছল্যের সাথে ধূমপানকে এক করে দেখানো হয়।

ওদিকে পাঞ্জাবের আদি রাজধানী শিমলা ছেড়ে পাঞ্জাবের রাজকার্য চলে আসে চণ্ডীগড়, যে শহর আবার হরিয়ানার সাথে রাজধানী হিসেবে ভাগাভাগি করতে হয়। পাঞ্জাবের শিখপ্রধান পার্টি অকালি দল কংগ্রেসের রাজনীতির সাথে টেক্কা দেয়ার জন্যে নতুন সচ্ছল শিখসমাজের সামনে শিখদের অপ্রাপ্তিগুলো প্রচার করা শুরু করে। এককালে যে শিখ সাম্রাজ্য সিন্ধু থেকে শুরু করে দিল্লীর উপকণ্ঠ পর্যন্ত দোর্দণ্ডপ্রতাপে শাসন করেছে, আজ সে নিজের প্রদেশ পাঞ্জাবের একটি টুকরোর ওপর নিজভূমে পরবাসীর মতো বাস করবে কেন, যেখানে সারা ভারতকে সে খাদ্য যোগাচ্ছে? অকালি দল পাঞ্জাবকে নতুন করে সীমায়িত করার দাবি তোলে, যে সীমায় শিখদের সংখ্যাগুরুত্ব বজায় থাকবে। অকালি দলের তৎপরতা সত্তরের দশকের শেষদিকে ইন্দিরা গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসকে নতুন চাল চালতে বাধ্য করে। শিখদের কাছে অকালি দলের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকায় ইন্দিরা গান্ধীর পুত্র সঞ্জয় গান্ধী কাছে টেনে নেন এক যুবক শিখ ধর্মগুরুকে। তার নাম জার্নাইল সিং ব্রার, কিন্তু লোকের কাছে সে পরিচিত জার্নাইল সিং ভিন্দ্রানওয়ালে নামে। উদ্দেশ্য, শিখদের মাঝে ডিভাইড অ্যাণ্ড রুল।

ভিন্দ্রানওয়ালে নিজেও ধর্মকাতর পরিবারের ছেলে, পড়াশোনা করেছে দমদমি তাক্সালে (তাক্সালকে শিখ কওমী মাদ্রাসা বলা যেতে পারে), মাত্র তিরিশ বছর বয়সেই তাক্সালের প্রধান হিসেবে মনোনীত হয়েছে, যত্রতত্র অনলবর্ষী ওয়াজ করে বেড়ায়। পথভ্রষ্ট শিখ সমাজ যখন চুল ছোটো করছে, দাড়ি ছেঁটে ফেলছে, বিড়ি পান করছে, তখন পাঞ্জাবের গ্রামে গ্রামে ওয়াজ করছে এক তরুণ গুরু, যাকে সবাই সন্ত জ্ঞান করছে। শিখ ধর্মে জীবের কল্যাণে সহিংস হওয়া বাধ্যতামূলক, তাই শিখদের এই অধপতন ঠেকাতে সহিংস মূর্তিতেই বিরাজ করছিলো ভিন্দ্রানওয়ালে। তার চেহারাটিও মনে সম্ভ্রম বা ভয় জাগিয়ে তোলে, সটান লম্বা আবক্ষ দাড়িওয়ালা তলোয়ার হাতে এক যুবক, রক্তচক্ষু মেলে যে মন্দ্রস্বরে সবাইকে লাইনে আসতে বলে। গান্ধী পরিবারের কূট চাল ফল দেয়া শুরু করে, গ্রাম আর শহরের ধর্মভীরু শিখেরা অকালি দল নয়, ভিন্দ্রানওয়ালের দিকে ঝুঁকতে শুরু করে।

সমস্যা শুরু হয় ১৯৭৮ সালে এসে, যখন শিখ ধর্মের একটি শাখা, নিরঙ্কারীদের বিরুদ্ধে মিছিলে হামলায় তেরো জন শিখ মারা যায়। হরিয়ানা প্রদেশে নিরঙ্কারী নেতা গুরবচন সিংকে বেকসুর খালাস দেয়া হলে পাঞ্জাবের ক্ষমতাসীন অকালি দলের মুখ্যমন্ত্রী এর বিরুদ্ধে আপিল থেকে বিরত থাকেন। নিরঙ্কারীদের নেতাদের পুলিশি নিরাপত্তায় আইনী সুরক্ষা দেয়া হলে এ নিয়ে শিখ সমাজে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। জার্নাইল সিং ভিন্দ্রানওয়ালে তখনই অকালি দলের বিপরীতে শিখদের ভরসার জায়গা হিসেবে রাজনৈতিকভাবে চিহ্নিত হয়।

গুরবচন সিং এর রহস্যজনক হত্যাকাণ্ডের পর ভিন্দ্রানওয়ালে প্রকাশ্যেই তা উদযাপন করে। এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে তার সংশ্লিষ্টতা নিয়ে পুলিশের মনে সন্দেহ বাড়ে।

এরপর লালা জগত নারায়ণ নামে এক সংবাদপত্র মালিক গুপ্তহত্যার শিকার হয়। জগত নারায়ণ হিন্দু স্কুলে পাঞ্জাবি ভাষায় শিক্ষার বিরুদ্ধে সরব ছিলো। হিন্দু কমিউনিটিকে হিন্দিতে শিক্ষালাভের অধিকার আদায়ে জগত নারায়ণের কাগজ সক্রিয় থাকায় ভিন্দ্রানওয়ালে জগত নারায়ণকে প্রকাশ্যে হুমকি দিয়ে আসছিলো অনেকদিন ধরেই। এই হত্যাকাণ্ডের পর ভিন্দ্রানওয়ালেকে গ্রেফতার করা হয়। এ নিয়ে ক্রমাগত সহিংসতা চলতে থাকলে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জ্ঞানী জৈল সিং লোকসভায় বলেন, ভিন্দ্রানওয়ালের বিরুদ্ধে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বেকসুর খালাস পেয়ে ভিন্দ্রানওয়ালে বেরিয়ে আসে।

কিন্তু এখানে একটা ছোটো গণ্ডগোল করে রাখে পুলিশ। মার্ক টালির মতে, পুলিশ ভিন্দ্রানওয়ালেকে গ্রেফতারের সময় তার সারা জীবনে দেয়া যাবতীয় ওয়াজের স্ক্রিপ্ট, যেগুলো তার সেক্রেটারি স্টেনোগ্রাফ করে রাখতো, পুড়িয়ে ফেলে। ভিন্দ্রানওয়ালের কাছে তার ওয়াজ ছিলো তার সন্তানের মতো। জেল থেকে বেরিয়ে ভিন্দ্রানওয়ালে সরাসরি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কথা বলা শুরু করে। সব বক্তৃতায় ভিন্দ্রানওয়ালে বলতো, কী আশা করো এই দেশের কাছ থেকে, যারা তোমার সন্তানকে হত্যা করে?

ফলাফল দাঁড়ায় এমন, অকালি দল অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেয় কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে, আর ভিন্দ্রানওয়ালে হয়ে ওঠে সেই আন্দোলনের সহিংস সহযোগী। গোটা পাঞ্জাবে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ক্রমশ অবনতির দিকে চলে যেতে থাকে। গান্ধী সরকারের নিযুক্ত গুপ্তচরেরাও শিখদের মধ্যে ডিভাইড অ্যাণ্ড রুলের চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে। ভিন্দ্রানওয়ালে এ সময় হয়ে ওঠে অবিসংবাদিত গুরু, যারা কাছে সব ধরনের সমস্যার সমাধান চেয়ে জড়ো হতে থাকে শিখরা।

এমনই এক পরিস্থিতিতে ভিন্দ্রানওয়ালে আস্তানা গাড়ে শিখদের প্রধান ধর্মকেন্দ্র স্বর্ণমন্দিরে। স্বর্ণমন্দিরের অকাল তখত, যেখানে শিখদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ গ্রন্থ সাহিবকে দিবাভাগে আনা হয়, সেখানে ধর্মগুরু জ্ঞানী কিরপাল সিঙের আপত্তি উপেক্ষা করেই অস্ত্রশস্ত্র সমেত দুর্গ গড়ে তোলে ভিন্দ্রানওয়ালে। শুধু আধুনিক স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রই নয়, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিখ তরুণরা ভিন্দ্রানওয়ালের সাথে যোগ দেয়। তাদের লক্ষ্য তখন শিখ রাষ্ট্র খালিস্তান, শুদ্ধদেশ।

রাজীব গান্ধী ভিন্দ্রানওয়ালেকে অকাল তখত থেকে বেরিয়ে আসার ঝাড়ি দিলে ভিন্দ্রানওয়ালে উত্তর পাঠিয়েছিলো, পারলে এসে আমাকে বের করো।

পরিস্থিতি তখন অনেকখানি পাল্টে গিয়েছিলো, কারণ ভিন্দ্রানওয়ালের সাথে যোগ দিয়েছিলেন মেজর জেনারেল সাবেগ সিং। দীর্ঘ সৈনিক জীবনে বীরত্বের স্বীকৃতি হিসেবে নানা সম্মানে ভূষিত হলেও এই শিখ অফিসারকে অবসরের একদিন আগে দুর্নীতির অভিযোগ চাকরিচ্যুত করা হয়। শিখরা দাবি করে, সাবেগ সিং ভারতের সেনাপ্রধান টি. এন. রায়নার এক আর্থিক নয়ছয় ধরে তাকে সেই অর্থ ফিরিয়ে দিতে বলায় রায়নার নেতৃত্বে সামরিক হাইকমাণ্ড সাবেগ সিংকে হয়রানি করে। চাকরিচ্যুতির পর রাজনীতিতে নামেন সাবেগ সিং, কেন্দ্রীয় সরকার তখন তার পিছনে লাগে।

সাবেগ সিঙের তত্ত্বাবধানেই ভিন্দ্রানওয়ালের অনুসারীরা সামরিক প্রশিক্ষণ পায় বলে ধরে নেয়া হয়। তাই বহু সশস্ত্র শিখ যখন প্রধান শিখ উপাসনালয়কে কেন্দ্র করে সহিংস রাজনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে, ইন্দিরা গান্ধী এই পরিস্থিতির সামরিক সমাধানের আদেশ দেন। অপারেশন ব্লুস্টার নামে এই অভিযান পরিচিত।

ভারতীয় সেনাবাহিনী থেকে স্বায়ত্বশাসনকামী বিপ্লব দমনে অভিজ্ঞ একজন শিখ অফিসারকেই এই দায়িত্ব দেয়া হয়। নাগাল্যাণ্ড আর মিজোরামে বিদ্রোহীদের পিটিয়ে ঠাণ্ডা করা মেজর জেনারেল কুলদীপ সিং ব্রারকে তার ছুটি বাতিল করে ১৯৮৪ সালের জুনের শুরুতে ডেকে নেয়া হয় চণ্ডীগড়ে। তিনিও ভিন্দ্রানওয়ালের মতোই জাতিতে ব্রার, জন্মও ভিন্দ্রানওয়ালের মতোই ফরিদকোটে। কুলদীপ সিং ভিন্দ্রানওয়ালের অ্যান্টিথিসিস, তার দাড়ি নেই, চুল ছাঁটা, বিড়ি-মদ সবই চলে, বিয়েও করেছেন এক অ্যাংলো মহিলাকে। কুলদীপ সিং ব্রার মীরাটে ৯ ডিভিশনের কমাণ্ডার ছিলেন, তার অধীনের তিন ব্রিগেডের দুটিই ছিলো শিখ সৈনিকদের নিয়ে গঠিত। ৫ জুন তিনি তার সৈনিকদের নিয়ে স্বর্ণমন্দির ঘেরাও করেন। তখন গুরু অর্জন সিঙের বার্ষিকী উপলক্ষ্যে প্রচুর তীর্থযাত্রী মন্দিরের ভেতরে ছিলো। ভিন্দ্রানওয়ালের অনুসারীরা সশস্ত্র প্রতিরোধের মাধ্যমে আত্মসমর্পণের আদেশের উত্তর দেয়। ব্রারের সৈনিকরা প্রথম দফায় নিহত হয়, ব্রার জবাবে ট্যাঙ্ক ঢুকিয়ে দেন স্বর্ণমন্দিরে।

এরপর যা ঘটে তা হৃদয় বিদারক। প্রচুর নিরীহ তীর্থযাত্রী, শিখ বিদ্রোহী ও ভারতীয় সেনার মৃত্যুর পর ভিন্দ্রানওয়ালেকে বুলেটবিদ্ধ ও মৃত অবস্থায় সরানো হয় স্বর্ণমন্দির থেকে। অকাল তখতকে পাওয়া যায় অর্ধ বিধ্বস্ত চেহারায়। এ নিয়ে জেনারেল ব্রার আর তীর্থযাত্রীদের বয়ান দু'রকমের। জেনারেল ব্রারের মতে, তিনি স্বর্ণমন্দিরকে কিছু উপদ্রবের হাত থেকে রক্ষা করে কলঙ্কমুক্ত করেছেন, আর শিখরা তাকে একজন স্বজাতহন্তা হিসেবে দেখে। খুশওয়ন্ত সিং তার পদ্মভূষণ ফিরিয়ে দেন এই অভিযানের প্রতিবাদে।

সাবেগ সিং আর কুলদীপ সিং ব্রার, দু'জনেই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যুদ্ধ করেছেন। সাবেগ সিং ছিলেন ডেল্টা সেক্টরের প্রধান, আগরতলায় তার সহযোগিতা নিয়েই খালেদ মোশাররফ ও রফিকুল ইসলাম যুদ্ধ করেছেন। কুলদীপ সিং ব্রার মুক্তিবাহিনীকে সাথে নিয়ে জামালপুর-ঢাকা করিডোর দখল করেন ১ মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রির হয়ে। ৫ জুন এর অপারেশনের আগে এই দুই শিখ যোদ্ধা পরস্পরের মুখোমুখিও হয়েছিলেন, যখন ব্রার সাদা পোশাকে মন্দিরের ভেতরে রেকি করতে ঢুকেছিলেন।

শিখ ধর্মকেন্দ্রিক খালিস্তান আন্দোলনকে পাকিস্তান সহযোগিতা করেছিলো, হয়তো স্বীকৃতিও দিতো, কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী নির্মমভাবে সেই উঠতি আন্দোলনকে দমন করেন। তার মূল্যও তাকে দিতে হয় নির্মমতার কারেন্সিতেই। দেহরক্ষী বিয়ন্ত সিং অপারশেন ব্লুস্টারের পর অকাল তখতের পরিণতি আর লাশের গন্ধে উন্মত্ত হয়ে উঠেছিলো, সে বছরই অক্টোবরের শেষদিকে এক সকালে ইন্দিরার স্নিগ্ধ হাসির জবাবে স্যালুটের পর বিয়ন্ত সিং নিজের রিভলভার বের করে পাঁচবার গুলি করেন ইন্দিরা গান্ধীকে। সহকর্মী সতওয়ন্ত সিং ইন্দিরার ওপর সাব মেশিনগানের ম্যাগাজিন খালি করেন। অন্যান্য দেহরক্ষীরা বিয়ন্ত সিংকে তৎক্ষণাৎ হত্যা করে, আর সতওয়ন্ত সিং আহত হয়। পরে বিচার শেষে সতওয়ন্তের ফাঁসি কার্যকর করা হয় কয়েক বছর পর।

কথিত আছে, মহাত্মা গান্ধীর হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দিল্লিতে মুসলমান নিধনযজ্ঞের একটা প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছিলো অহিংস মহাত্মার সহিংস অনুসারীরা, নেহরু এক প্রচণ্ড ধমক দিয়ে হত্যাকারীর পরিচয় জানিয়ে বলেছিলেন, হি ওয়াজ আ ড্যাম হিন্দু! ইন্দিরার হত্যাকারীরা নিজেদের পরিচয় প্রকটই রেখেছে। ইন্দিরার হত্যার পর দিল্লি জুড়ে সংঘটিত হয় ১৯৪৭ এর পর সবচেয়ে বড় সংগঠিত শিখ হত্যাকাণ্ড। কয়েক হাজার নিরীহ নিরস্ত্র শিখকে হত্যা করে দিল্লিবাসীরা। তাদের সহযোগিতা করে পুলিশ। এসব হত্যার মামলা নথিবদ্ধ করেনি পুলিশ, আজও এ নিয়ে সোচ্চার বহু শিখ। কিছুদিন আগে এ নিয়ে প্রশ্নোত্তরকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে চিদাম্বরমকে জুতো ছুড়ে মেরেছিলেন এক শিখ সাংবাদিক। দিল্লীতে শিখ হত্যাকাণ্ডে নিহতদের বিধবাদের জন্য এক বিশাল অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সও রয়েছে।

ভিন্দ্রানওয়ালের মৃত্যুর পর খালিস্তান আন্দোলন থামেনি। এর পরও সারা পাঞ্জাব জুড়ে হিন্দু ও নরমপন্থী শিখদের হত্যা করেছে চরমপন্থী শিখরা। আরেক শিখ পুলিশ অফিসার, কাওঁয়ার পাল সিং গিল, পাঞ্জাবের তৎকালীন পুলিশের ডিজি এই আন্দোলনকে কঠোর হাতে প্রশমিত করেন। ১৯৯৩ নাগাদ খালিস্তান আন্দোলনের শরীর থেকে দাঁত নখ খসে পড়ে।

রাজনীতির ছকে নানা শত্রুমিত্র তৈরি হয় সময়ের সাথে। যে পাকিস্তানের পাঞ্জাবী মুসলমানের হাত থেকে নিজের কন্যার সম্ভ্রম রক্ষা করতে শিখ পিতা কৃপাণ দিয়ে তার মুণ্ডচ্ছেদ করেছেন ১৯৪৭ সালে, ১৯৮৪তে সেই শিখ পিতার সন্তানরাই আবার অস্ত্র এনেছে সেই পাঞ্জাবীর কাছ থেকে, হিন্দুর বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য। যে ইন্দিরার নামে হর্ষধ্বনি করেছি আমরা ১৯৭১এ, সেই ইন্দিরার মৃত্যুতেই দাঁত বের করে ১৯৮৪তে হাসতে দেখেছি আমাদের মানুষকে। যে পাঞ্জাবী মুসলমান নিজের ভিটা হারিয়ে শিখ-হিন্দুর হাতে আক্রান্ত হয়ে দেশ ছেড়েছে, সেই পাঞ্জাবী মুসলমান দশ গুণ মুসলমান হত্যা করে ৪৭ এর দাঙ্গার শোধ তুলেছে বাঙালির ওপর। রাজনীতির ছক পাল্টায়, পাল্টায় না শুধু মানুষের অশ্রু আর রক্ত। দিল্লির বিধবা-ভবনে যে শিখ বিধবা তার চার পুত্রের জীবন্ত দগ্ধ হবার দৃশ্যের বর্ণনা করেন, তার অশ্রু আর আর্তনাদের সাথে মিলে যায় সতীশ গুজরালের দেখা অমৃতসরের মুসলমান স্কুলের গণধর্ষিতা মেয়েদের অশ্রু আর কান্না, লাহোরে প্রাণ নিয়ে বাড়ি ছাড়া হিন্দুর বুকফাটা আর্তনাদ, দুই ভাগ করে টেনে ছিঁড়ে ফেলা শিশুর মৃতদেহের সামনে উন্মাদিনী বাঙালি মায়ের হাহাকার।

সবই ঈশ্বরের নামে।

ডকুমেন্টারি ১: ১৯৮৪: আ শিখ স্টোরি

ডকুমেন্টারি ২: পার্টিশন: দ্য ডে ইন্ডিয়া বার্ণ্ড

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।