Sunday, March 20, 2011

লগ্ন তো সম্রাটের হাতে

পাঁচটি বিচারকাণ্ড পরবর্তী ঘটনা নিয়ে আমার এই পোস্ট। বিচারকাণ্ড নিয়ে আমার কোনো মতামত নেই, সেটি আইনজ্ঞদের বিবেচ্য বিষয়। ঘটনাগুলো সাম্প্রতিক অথবা নিকট অতীতের। তবে চেষ্টা করলে তাদের এক সুতোয় গাঁথা সম্ভব।
পাঁচটি বিচারকাণ্ডের মধ্যে পঞ্চমটি স্বতন্ত্র, বাকি চারটিকে একটি বিচিত্র সমতলে সাজানো সম্ভব। আমার পর্যবেক্ষণ কয়েকটি দেশে কয়েকটি দেশের নাগরিকের কয়েকটি বিচারকাণ্ড নিয়ে বিচার পরিচালনাকারী দেশের সমাজ ও সরকার এবং বিচারাধীন ব্যক্তি যে রাষ্ট্রের নাগরিক, সে রাষ্ট্রের সমাজ ও সরকারের প্রতিক্রিয়া নিয়ে। আমি চারটি ঘটনাকে চার কোয়াড্র্যান্টে রেখেছি। নিচের ছবিটা দেখলে ব্যাপারটা স্পষ্ট হবে।
প্রথম কোয়াড্র্যান্টের ব্যক্তিটি বাংলাদেশের গ্রামীণ ব্যাংকের নোবেলজয়ী ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক তাকে একটি চিঠি পাঠিয়ে জানায়, ব্যবস্থাপনা পরিচালকের পদে তাঁর পুনর্মনোনয়নের ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাঙ্কের অনুমোদন নেয়া হয়নি বলে তিনি এই পদে আর আসীন থাকতে পারবেন না। ইঊনূস এ আদেশের বিরোধিতা করে আদালতের শরণাপন্ন হন। আদালত বাংলাদেশ ব্যাঙ্কের আদেশকে বহাল রাখেন। ইউনূস আদালতের এই আদেশের বিরোধিতা করে বর্তমানে উচ্চ আদালতের শরণ নিয়েছেন। এ নিয়ে উচ্চ আদালতে শুনানি এখনও শুরু হয়নি। [১]
সূত্র [১] এ ইউনূসের অপসারণকে ঘিরে সরকার, ইউনূস, আদলত, গ্রামীণ ব্যাঙ্ক, সুশীল সমাজ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, আন্তর্জাতিক মহল ও মিডিয়ার নিজস্ব বক্তব্যের একটি গ্রাফিক টাইমলাইন রয়েছে। আমরা এই টাইমলাইনে চোখ রাখলে দেখতে পাবো, ঘটনার সঙ্গে সঙ্গেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউনূসের কণ্ঠে কথা বলছে। এ ঘটনাটির নিরসন আদালতে হওয়াই শ্রেয় ছিল, কিন্তু সেটি ক্রমশ ঢুকে পড়েছে রাজনীতি আর কূটনীতির আঙিনায়। বাংলাদেশের আদালতে বিচারাধীন বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার রাষ্ট্রদূত ও সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গকে পাঠিয়ে বলছে, ব্যাপারটি "সমঝোতা"র মাধ্যমে একটি "সম্মানজনক" পরিণতি পেলে বাংলাদেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সুসম্পর্ক অব্যাহত থাকবে।
এর পর যে ঘটনাটি আমার মনোযোগ আকর্ষণ করেছে, সেটি হচ্ছে রেমণ্ড ডেভিসের মুক্তি। সিআইএ-র কনট্র্যাক্টর রেমণ্ড ডেভিস এ বছরের জানুয়ারি মাসে লাহোরে দুজন সশস্ত্র পাকিস্তানী গোয়েন্দা কর্মীকে [যদিও পাকিস্তানী পুলিশ বলছে তারা দস্যু] পেছন থেকে গুলি করে হত্যা করে আত্মসমর্পণ করে। ডেভিস একটি রহস্যময় মার্কিন নাম্বার প্লেটযুক্ত টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজারকে এসকর্ট করছিল, এবং দুই পাকিস্তানী গোয়েন্দাকে হত্যার পর সেই গাড়িটি একজন মোটরসাইকেল আরোহীকে চাপা দিয়ে পালিয়ে যায়। এ ঘটনার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ডেভিসকে একজন কূটনীতিক দাবি করে তার জন্য ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী কূটনৈতিক দায়মুক্তি দাবি করে। পাকিস্তান এ দাবি অস্বীকার করে ডেভিসের বিচার চালিয়ে যায়। বিচার চলাকালীন একজন নিহতের বিধবা আত্মহত্যা করেন। [২] গত ১৬ মার্চ দুই নিহতের নিকটাত্মীয়রা আদালতে হাজির হয়ে জানায়, তাদের ২০ কোটি পাকিস্তানি রূপি ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়েছে। শরিয়া আইন অনুযায়ী রক্তের ঋণ শোধ করে দিলে হত্যাকারীকে ক্ষমা করতে পারে নিহতের আত্মীয়স্বজন। পাকিস্তানি রাজনৈতিক দলগুলো এ ধরনের ক্ষতিপূরণ না নেয়ার জন্যে নিহতের আত্মীয়দের ওপর চাপ প্রয়োগ করে আসছিলো। ক্ষতিপূরণের ব্যাপারে এক নিহতের আইনজীবী আসাদ মনজুর বাট জানায়, ক্ষতিপূরণের ব্যাপারে তিনি জানেন না, কারণ তাকে তার মক্কেলদের কাছ থেকে চার ঘন্টার জন্য দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছিলো। এ সময় এ ধরনের কোনো চুক্তি হয়ে থাকলে তা তার অজান্তে ঘটেছে। ডেভিসের মুক্তির ঘটনার পর থেকে নিহতের আত্মীয়স্বজনরা নিখোঁজ রয়েছে। রেমণ্ড ডেভিসকে বিনা অভিযোগে হস্তান্তর করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের ওপর প্রবল কূটনৈতিক চাপ দিচ্ছিলো, এবং এ ইস্যুকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের সম্পর্ক তিক্ত হয়ে উঠেছিলো। [৩]
পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা ডেভিসকে উত্তরাঞ্চলে ড্রোন হামলার সাথে সংশ্লিষ্ট বলে সন্দেহ করে।
তৃতীয় যে ঘটনাটির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই, তা হচ্ছে ব্যাঙ্ক অব আমেরিকার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কেনেথ লুইসের বিরুদ্ধে নিউ ইয়র্কের ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির প্রতারণার মামলা [৪]। শেয়ার হোল্ডারদের কাছে প্রকৃত পরিস্থিতি গোপন করে ব্যাঙ্ক অব আমেরিকা অর্থনৈতিক মন্দার সময় মেরিল লিঞ্চকে অধিগ্রহণ করে। অধিগ্রহণের আগে মেরিল লিঞ্চ নিজেদের কর্তা ও কর্মীদের ৩৬০ কোটি মার্কিন ডলার বোনাস বিতরণ করে। অন্যদিকে ব্যাঙ্ক অব আমেরিকা সরকারের কাছ থেকে ৪৫০০ কোটি মার্কিন ডলার প্রণোদনা গ্রহণ করে মেরিল লিঞ্চসহ অন্যান্য কোম্পানিকে চাঙা করার জন্য [৫]। এ কথা জানাজানি হবার পর স্টক এক্সচেঞ্জ কমিশনের সাথে অপরাধ স্বীকার না করার শর্তে ৩৩ মিলিয়ন ডলার জরিমানা দেয়ার সমঝোতায় আসে ব্যাঙ্ক অব আমেরিকা, যা বিচারক জেড রাকফ অবৈধ ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, ব্যাঙ্ক অব আমেরিকার তথ্য গোপনের কুফল ভোগ করছে এর শেয়ারহোল্ডাররা। জরিমানার দায়ও তাদের ওপরই গিয়ে পড়বে, যা ভুক্তভোগীকে সাজা দেয়ার নামান্তর। [৬] কেনেথ লুইস কংগ্রেস কমিটির সামনে শপথ নিয়ে বলেন, রিপাবলিকান সাংসদেরা তাকে মেরিল লিঞ্চ অধিগ্রহণের জন্য চাপ দেন।
চতুর্থ ঘটনাটি সাম্প্রতিক। ১৮ মার্চ, ২০১১ তারিখে যুক্তরাজ্যের উলউইচ ক্রাউন কোর্ট বাংলাদেশি-বৃটিশ রাজীব করিমকে সন্ত্রাসের চেষ্টার অভিযোগে ৩০ বছরের কারাদণ্ড ও দণ্ডভোগ শেষে বহিষ্কারের আদেশ দেয়। রাজীব করিম অভিযোগ স্বীকার করে জানিয়েছে, বাংলাদেশের সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে চায় এমন উগ্রপন্থী দলের সাথে সে সংশ্লিষ্ট ছিলো।
চারটি ঘটনা থেকে আমরা দেখতে পাই, প্রতিটি বিচারই সংঘটিত হয়েছে সংশ্লিষ্ট দেশের আইনের আওতায়। একটি বিচার নিয়োগবিধি সংক্রান্ত, একটি হত্যা সংক্রান্ত, একটি আর্থিক প্রতারণা সংক্রান্ত, অপরটি সন্ত্রাসের চেষ্টা সংক্রান্ত। চারটি বিচারের মধ্যে দু'টির ক্ষেত্রে আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দেখি, কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে একটি দেশের আইন ও বিচারব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠি দেখাতে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যাঙ্কের সিইওকে আদালত ও সংসদীয় কমিটির মুখোমুখি হতে হয়, আর পৃথিবীর অন্য প্রান্তে দুর্বল বাংলাদেশে একজন ইউনূসের নিয়োগবিধি কিংবা দুর্বল পাকিস্তানে দুজন মানুষকে হত্যা নিয়ে আদালতে সম্পাদ্য বিচারকে উপেক্ষা করে "সমঝোতা"র প্রস্তাব দেয় সেই একই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আজ ইউনূসের নিয়োগবিধি নিয়ে মামলাকে উপেক্ষা করছে যুক্তরাষ্ট্র, কাল কি তবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায়কেও তুড়ি দিয়ে উড়িয়ে "সমঝোতা"য় যাওয়ার জন্য চাপ দেবে? লক্ষণ তো সেরকমই বলে।
রাজীব করিমের ব্যাপারে সব পক্ষ একমত, এমনকি রাজীব করিম নিজেও। উগ্রপন্থী জিহাদী না হয়ে আজ সিআইএর কনট্র্যাক্টর কিংবা ক্লিনটন পরিবারের শান্তিতে নোবেল লরিয়েট বন্ধু হলে হয়তো পরের দিনই দেশে ফেরার বিমান ধরতে পারতো সে, জন্ম বাংলাদেশেই হোক কি যুক্তরাষ্ট্রে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে আরো অনেক কিছু বলা যেতো, কিন্তু মাথা নিচু হয়ে যায়, যখন খুনের মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামীকে আমাদের রাষ্ট্রপতি ক্ষমা করে দেন [৮]। এর আগে দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি ও সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর ছেলে শাহাদাব আকবরের দণ্ডও তিনি মওকুফ করে দিয়েছিলেন [৯]।
সম্রাটের ইচ্ছায় রাত দিন হয়ে যায়। আমাদের পঞ্জিকা কী বলে, তাতে কিচ্ছু আসে যায় না।


No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।