Thursday, March 24, 2011

ম্যারি মি আফ্রিদি

টয়লেটের খোলা দরজা গলে হুড়মুড়িয়ে ঘরে ঢুকে পড়ে শুভ্রদার চিৎকার। শুনতে পাই, "কাশেম! অ্যাই কাশেম! অ্যাই কাশেমের বাচ্চা! আইকার কৌটাটা কই রাক্সস?"

ক্রিকইনফোর পাতা খুলে পুরনো রেকর্ড ঘাঁটছিলাম, শুভ্রদার আচমকা চেঁচামেচিতে মনোযোগ নষ্ট হয়। তবে এই চিৎকারে কোনো গণ্ডগোলের আভাস নেই। শুভ্রদা বেশ মুডে আছেন আজ, দুপুর থেকেই। গুনগুন গান গাইছেন, মাই নেইম ইজ শিলা, শিলা কি জাওয়ানি, আই অ্যাম টু সেক্সি ফর ইউ ... হু হু হু হু হু হু। কিছুক্ষণ চুপচাপ নিজের ডেস্কে কাজ করে উঠে গেছেন টয়লেটে, আর গিয়েই শুরু করেছেন চিৎকার।

কাশেম অনেকদিন কাজ করছে এই হাউসে, সময়ের সাথে ক্রমশ নির্বাকতর হয়ে যাচ্ছে সে। শুভ্রদার চিৎকারের জবাবে কোনো সাড়া না দিয়ে কিছুক্ষণ পর ভূতের মতো নিঃসাড়ে প্রকাণ্ড সাইজের প্লাস্টিকের এক আঠার কৌটা নিয়ে সে টয়লেটের দিকে এগিয়ে গেলো।

শুভ্রদা এবার খ্যাঁক করে ওঠেন, "কী রে তর জবান বন্ধ ক্যা? ডাকি উত্তর দ্যাস না ক্যা?"

কাশেম কোনো উত্তর দেয় না এবারও।

শুভ্রদা বলেন, "আইকা দিয়া ঠিকমতো এইটা লাগা। টেপ দিয়া লাগাইলে থাকে না। মজবুত কইরা লাগা।"

কাশেম লাগাতে থাকে। শুভ্রদা টয়লেটের কাজ না সেরেই বেরিয়ে আসেন।

আমি সহাস্যে বলি, "খুব মুডে আছেন বস! ঘটনা কী?"

শুভ্রদা এক পাক নেচে বলেন, "আর বইলো না। কালকে দিনটা দারুণ গেছে! কেমন চোদা খাইলো ওয়েস্ট ইন্ডিজ? কইছিলাম না? কইছিলাম না, যে এই ঢাকার মাটিতে তোদের আবার আসতে হবে? এসে চোদা খাইতে হবে? হে হে, এখন পর্যন্ত যা কিছু বলছি অক্ষরে অক্ষরে মিল্লা গেছে!"

আমি বলি, "খাওয়ান মিয়া! আমাগো দোয়াদরূদের জোরেই তো এমন অক্টোপাস পল হইছেন!"

শুভ্রদা নিজের ডেস্কের ওপর পা তুলে বসেন। "উফফ, আফ্রিদি কী খেললো গতকাইল! আর খালি গতকাইল ক্যা, পুরা টুর্নামেন্টেই ও টপ ফর্মে আছে! এরেই বলে ক্রিকেটার। শোনো তারেক, আমি লেইখা দিলাম, আফ্রিদি এমন এক রেকর্ডের দিকে আগাইতেছে যেইটা কোনো শালা চুতমারানি ক্রিকেটার ভাঙতে পারবো না! ব্যাটে শচীন আর বলে শহীদ ... তুখোড়!"

আমি ইয়াহু খুলি মেইল চেক করার জন্য। শুভ্রদা একটা সিগারেট ধরায়।

"আমাগো পোলাপাইনগুলি শালার গায়ে জোর নাই।" শুভ্রদা বলে যান। "এই যে আশরাফুল। কত্ত ট্যালেন্টেড একটা পোলা। কিন্তু শইলে জোর নাই। আসল সময়ে গিয়া মাজায় বল পায় না। কত দিন কইছি, আশরাফুল তুমি স্টেরয়েড খাও। শইলেও গোস্ত বাড়বো, তাগদও বাড়বো, সব শট খেইলা মজা পাবা। সে ভালো কথা শোনে না। এখন তার ফল কী হইলো? আছিলি জাতীয় দলের ক্যাপ্টেন, হইলি এ দলের ক্যাপ্টেন। শিং ভাইঙ্গা বাছুরের দলের সর্দার হইলি। ক্যান রে বাবা? শুভ্রদার কথাটা শুনলে ক্ষেতিটা কী ছিলো?"

আমি মিটিমিটি হেসে বলি, "আমরা তো চেষ্টার কম করলাম না বস। এখন ও যদি কথা না শোনে, কী করবেন?"

শুভ্রদার কালোপানা মুখটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। "আফ্রিদির গায়ে অনেক জোর! সেইবার সাউথ আফ্রিকা গিয়া একদম হাতেনাতে টের পাইছি।"

আমি মেইল চেক করতে করতে শুভ্রদার স্মৃতি উসকে দিই। "কী টের পাইছেন?"

শুভ্রদা লাজুক হেসে বলেন, "অনেক জোর পোলাটার গায়ে। ইন্টারভিউ করতে গেছিলাম, তখন টের পাইলাম।"

আড়চোখে শুভ্রদার দিকে তাকিয়ে দেখি, উদাস মুখে সিলিঙের দিকে তাকিয়ে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ছেন। বললাম, "তারপর?"

শুভ্রদা সন্দিহান চোখে আমার দিকে তাকিয়ে সিগারেটটা অ্যাশট্রেতে গুঁজে বলেন, "আজকে আফ্রিদির উপর আরেকটা স্টোরি করতে হইবো। ওর কিছু গেঞ্জি গায়ে ফটো পাইছি, কমনস ফোল্ডারে দেখো, সেই মোতাবেক একটা আর্টিকেল খাড়া করাও। আমি আইতাছি।"

দীর্ঘশ্বাস ফেলি, কাজের পর কাজ জমে যায়। সামনে আবার যেতে হবে জিম্বাবুয়ে। শুভ্রদা যাবে দুবাই, হারুণ লরগাতের কী একটা সাক্ষাৎকার নিতে। একেই বলে কিসমত।

শুভ্রদা টয়লেটের দরজা বন্ধ করে দেন আলগোছে। বের হতে সময় লাগবে মনে হচ্ছে।

কাশেম করিডোরে টুলের ওপর বসে ঝিমাচ্ছে। আইকা দিয়ে টয়লেটের দরজার ভেতরের দিকে শহীদ আফ্রিদির খালি গায়ে পোস্টারটা ভালো করে সেঁটে দিয়ে এসেছে সে।

কাজ করতে ভালো লাগে না। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই। অস্থির কারওয়ানবাজারের ওপর রোদ ঢেলে দিয়ে যায় ঢাকার সূর্য। চাপা গলার গোঙানি ভেসে আসে দরজার ওপাশ থেকে।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।