Wednesday, March 02, 2011

এবার মরে সাহেব হবো

ক্রিকেট সাহেবদের খেলা। ওনারা টপাটপ এদেশ ওদেশ জয় করেছেন, তারপর নীল-তামাক-চা-আখ চাষ করিয়েছেন, পান থেকে চুন খসলে চাবকে পেছনের চামড়া লাল করেছেন, কিংবা তুলেই নিয়েছেন, আর ধাওয়ার মুখে চলে যাবার সময় পেছনে ফেলে রেখে গেছেন ক্যাট-ব্যাট-ওয়াটার-ডগ-ফিশ, ফুলপ্যান্ট আর হাফশার্ট, সকল অপরাধের দায়মুক্তিদাতা অমোঘ "সরি", রেললাইন, পোস্টেজ স্ট্যাম্প আর ক্রিকেট।

সবই আমাদের কাজে লাগে। "সরি"টা বেশি কাজে লাগে।

এখন ডার্কিরাও ক্রিকেট খেলে। শুধু তা-ই নয়, সাহেবদের চেয়ে খুব একটা খারাপ খেলে না। সাহেবরা সেই সত্তরের দশক থেকেই কালা আদমীর হাতে ক্রিকেটের মাঠে গোয়ামারা খেয়ে চলছে। সাহেবদের মাঝটুর্নামেন্ট থেকে পেঁদিয়ে খেদিয়ে দিয়ে কালা এবং অন্যান্য ধলারা শোরগোল করতে থাকে বাকিটা সময়।

কিন্তু প্রতি খেলা শেষে যখন খেলোয়াড়দের মিডিয়ার মুখোমুখি হতে হয়, তখনই যেন সেই দুই-আড়াইশো বছর আগের সাহেবদের ভূত এসে দাঁড়ায় চাবুক হাতে। হারুকাপ্তান হও কি চালুকাপ্তান, মিডিয়া তখন ক্যাট-ব্যাট-ওয়াটার-ডগ-ফিশ নিয়েই তোমাকে চেপে ধরবে। ম্যান অব দ্য ম্যাচ হলে তো কোনো কথাই নেই। মিডিয়াই একবিংশ শতাব্দীর সাহেব।

সেদিন আমাদের শফিউল চার উইকেট নিলো আয়ারল্যাণ্ডের বিরুদ্ধে। ছেলেটা বল হাতে মোটামুটি, ব্যাট হাতে আরেকটু খারাপ, কিন্তু ইংরেজি মুখে একেবারেই কাঁচা। তার ওপর এতো বড় দর্শকসমাজের মুখে পড়ে একেবারে গলবস্ত্র অবস্থা। বল হাতে যে ছেলেটা চোয়াল শক্ত করে ভুরু কুঁচকে নিজের চেয়ে ছয় ইঞ্চি উঁচু ব্যাটসম্যানকে তোপের মুখে রেখেছিলো, তাকেই দেখি দরদর করে ঘামতে ঘামতে, ঢোঁক গিলতে গিলতে কাঁপা কাঁপা গলায় ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে কথা বলতে।

ইনজামাম উল হকও ইংরেজিতে কাঁচা। তাকে রমিজ রাজা বাঁচিয়ে দেয় বরাবর। টস জিতে ইংরেজি প্রশ্নের মুখোমুখি হয় তাই তোতলাতে তোতলাতে শেষ পর্যন্ত ইনজামাম বলে, হাম পেহলে ব্যাট কারেঙ্গে।

আজ লসিথ মালিঙ্গাকেও দেখলাম, দ্বিবেহীতে গড়গড়িয়ে কথা বলে গেলো উপস্থাপকের সাথে। সে আলাপের সারমর্মটুকু তিনি অনুবাদ করে দিলেন পরে, দর্শকদের জন্যে।

যখন কিশোর ছিলাম, আমাদের ক্রিকেটারদের ইংরেজিপারঙ্গমতা নিয়ে হাসাহাসি আমিও করেছি। কিন্তু সময়ের সাথে শিখেছি, খেলার মাঠে ইংরেজি না জানাটা কোনো অপরাধ হতে পারে না। আমরা ওখানে ইংরেজির পরীক্ষা দিতে যাইনি। আমরা দেখাতে গিয়েছি, কতটা ভালো ক্রিকেট পারি আমরা।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে শুক্রবারের খেলায় শফিউলকে ম্যান অব দ্য ম্যাচ দেখতে চাই। শুনতে চাই শফিউল পরিষ্কার বাংলায়, মিরপুরের দর্শক আর গোটা পৃথিবীর দর্শকের সামনে তিরিশ কোটি লোকের ভাষায় বলছে তার যা বলার। যারা সেগুলো বোঝে না, তাদের অনুবাদ করে দেয়ার মতো অন্তত একটি লোক আশা করি সে ম্যাচে মাইক হাতে উপস্থিত থাকবে। ইনজামাম আর মালিঙ্গা বলতে পারলে আমরাও পারবো।

বিসিবির সদয় মনোযোগ আকর্ষণ করছি।


সংযোজন: ইউটিউবে খুঁজছিলাম শফিউলের অপ্রস্তুত মুহূর্তের দৃশ্যটি। দেখলাম, অনেকে সেদিনকার ম্যাচ হাইলাইটস আর পুরস্কার বিতরণীর দৃশ্য আপ করেছেন ইউটিউবে, সেগুলোর সবকটাতেই ঐ দৃশ্যটা সম্পাদনার কাঁচি চালিয়ে বাদ দেয়া হয়েছে। বিড়ম্বনাটা দেখা যাচ্ছে কেবল বোলারদের নয়, সমর্থকদেরও।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।