Tuesday, February 08, 2011

নিজের ভাষা বলার আশা দেবো কি জলাঞ্জলি?

ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি একটা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হলেও তার নিজস্ব বাহিনী ছিলো। সেই বাহিনী কূটনীতি আর লড়াই করে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাবকে গদি থেকে নামিয়ে কোম্পানিকে ব্রিটেনের চেয়ে বড় একটি ভূখণ্ড শাসনের সুযোগ করে দিয়েছিলো। পলাশীর যুদ্ধে নিজেদের গোলন্দাজির বাহাদুরির বর্ণনা দিতে গিয়ে জনৈক ইংরেজ সামরিক অফিসার "ইলোকুয়েন্ট ক্যাননস" শব্দযুগলটি ব্যবহার করেছিলেন। এর বাংলা করলে দাঁড়ায়, বাকপটু কামান। আড়াইশো বছর আগে আমাদের ভূখণ্ড ইংরেজের কামানের ভাষার সামনে হারিয়েছিলো ফার্সিভাষী নবাবকে। আর তারপর একশো নব্বই বছর ধরে এই ভূখণ্ডটি ছিলো ভাষার কামানের মুখে। ভারতবর্ষ থেকে ইংরেজ বিদায় নেয়ার সময় অনেক কিছুর সাথে ইংরেজি ভাষাটাকেও আমাদের ওপর চাপিয়ে রেখে যায়। দুই শতক ধরে একটু একটু করে আমাদের শিক্ষা ও আইনের যাবতীয় উচ্চবর্গীয় বলয়ে ইংরেজি এত সুদৃঢ় স্থান করে নেয়, যে আজও আমাদের উচ্চশিক্ষা ও উচ্চ আদালতের দুয়ারে ইংরেজিতে অদক্ষ মাতৃভাষীরা সুবিধা করতে পারেন না।

তবে আমরা ইংরেজিমুখীনতাকে একটি স্বাভাবিক প্রবণতা হিসেবে মেনে নিয়েছি। ইংরেজি শুধু এককালের ঔপনিবেশিক শাসকের ভাষাই নয়, এটি বিশ্বের অন্যতম লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কায় পরিণত হয়েছে। পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন হতে না চাইলে ইংরেজি কিংবা ইংরেজির মতো আরেকটি প্রভু-ভাষা আত্মস্থ করা গরীব দেশগুলোর জন্যে জরুরি হয়ে পড়েছে। বড়লোকের বাজারে টুকরি হাতে তাই দীনহীন আমরা ইংরেজি বোল ফুটিয়ে দুটো করে কর্মে খাবার স্বপ্ন দেখি।

ভাষা যেমন যোগাযোগের মাধ্যম, তেমনি ভাষা একটি প্রাচীরও। ইংরেজের আমলে এই প্রাচীর টপকে গুটিকয়েক সুবিধাভিলাষী ইংরেজের সাথে সিমবায়োসিসে যোগ দিতে পেরেছিলেন। যারা পারেনি, তারা পিছিয়ে পড়েছে শিক্ষাক্ষেত্র আর আইনক্ষেত্রে। ইংরেজি ভাষার এই প্রাকারোপযোগিতার শক্তিটি বুঝতে পেরে আমাদের নতুন প্রভু পশ্চিম পাকিস্তানীরা এই পাঁচিলের দেয়ালে নতুন চুনকাম করতে চেয়েছিলেন, উর্দু দিয়ে। সদ্যস্বাধীন পাকিস্তানে উর্দু ছিলো নতুন ইংরেজি, যাতে কেবল গুটিকয়েকের দক্ষতা রয়েছে, এবং ইংরেজির সাথে গলাগলি করে যা রচনা করবে আরেকটি দুই-মহলা ভাষাপ্রাচীর। আমাদের দূরদর্শী ও প্রখর আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন পূর্বপুরুষেরা এই মতলবটি বুঝতে পেরেই প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলে আমাদের মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি এনে দিতে পেরেছিলেন।

অনলাইন লেখক সমাবেশ সচলায়তনে সহলেখক বিপ্রতীপ গত শতকের চল্লিশের দশকে জনৈক বি. আর. মোল্লা লিখিত একটি পোস্টকার্ডের বিবরণ তুলে ধরেছিলেন। তাতে লেখা ছিলো,

‘কিন্তু যা করি তাহা কিছুই ভালো লাগে না, কারন আমরা বাঙ্গালী খোদা তাল্লার কাছ হইতে যে কি আনিয়াছি তাহা বলতে পারি না, কারন মুসলমানের হাত হইতে গেল ইংরেজদের হাতে রাজত্ব শিখিতে হইলো ইংরেজি, আবার জোরে যে বাহু বলে আনিয়া স্বদেশ পাকিস্তান তাও আবার রাষ্ট্রভাষা উর্দু হবে। এখন দেখা যায় আমরা বাঙ্গালী চীর কাল শুধু রাষ্ট্রভাষাই শিখিয়া যাইতে হবে। কিসের সংসার উন্নতি কিসের চাকরি, শুধু আনিয়াছি আমার খোদা তাল্লার নিকট হইতে রাষ্ট্রভাষার কপাল। এই আমাদের কাজ কিন্তু খোদা তাল্লাই বিচার করিবে। তবে আমরা বীরের মতো পাঞ্জাবীর উপর আক্রমন করিতে প্রস্তুত হইতেছি। আপনারাও তৈয়ার হন, একবার তাহাদের সাথে লড়িব, জয় নাহয় পরাজয়।’

এই পোস্টকার্ডটি পড়ে সেই সময়ে ভাগ্যান্বেষী যুবকের মনপীড়ার চিত্রটি পরিষ্কার হয়, এবং আমরা ভাষাপ্রাচীরের কার্যদক্ষতা সম্পর্কেও আঁচ করতে পারি। নিজের দেশে বসে অন্যের ভাষা শিখে জীবনে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর কাজটির সাথে যে অপমান জড়িত, তা মোল্লা সাহেব স্পষ্ট করেন আমাদের সামনে।

এবার নিজের দু'টি অভিজ্ঞতার কথা বলি। ইয়োরোপে লেখাপড়া করতে এসে চেক রিপাবলিকের রাজধানী প্রাগে বেড়াতে যেয়ে মুখোমুখি হয়েছিলাম আরেকটি ভাষাপ্রাচীরের। প্রাগ পর্যটক-অধ্যুষিত শহর, কিন্তু প্রাগ শহরের দোকানদার খালাম্মারা চেক বাদে অন্য কোনো ভাষা বলতে উৎসাহী নন। ইংরেজি, জার্মান, ভাঙা ভাঙা ফরাসী আর স্প্যানিশ, চার চারটা ধনীলোকের ভাষার কামান চালিয়েও চেক দোকানদার খালাম্মার দুর্গে ফাটল ধরাতে পারলাম না। চেক রিপাবলিকের অর্থনীতি জার্মানির তুলনায় অনেক ছোটো, তাদের মাথাপিছু গড় আয় জার্মানদের অর্ধেক, কিন্তু আত্মসম্মানজ্ঞান কোনো অংশে কম নয়। দোকানদার খালাম্মা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন আমাকে, তুমি কিনতে এসেছো, ঠ্যাকা তোমার, পারলে আমার ভাষায় কথা বলো, নয়তো ফুটো।

এর ঠিক উল্টো চিত্র দেখেছি নিজের দেশে। জার্মান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রর পক্ষ থেকে একবার শেরাটনে এক শিক্ষামেলায় জার্মান শিক্ষা বিনিময় পরিষেবার [ডয়েচার আকাডেমিশার আউসটাউশডিন্সট] স্টলে কামলা খাটতে গিয়েছিলাম। সেখানে দিল্লি থেকে আগত জনৈকা জার্মান যুবতী এবং ভারতীয় যুবককে সাহায্য করতে হবে। এ দু'জনের সাথে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে জার্মানই ব্যবহার করছিলাম। শিক্ষামেলা কর্তৃপক্ষ [এরা হোলসেল ধান্দাবাজ] আমাদের সাথে সাদা চামড়ার লোক দেখে গলে গিয়ে এক তরুণ এবং এক তরুণীকে পাঠালেন সাহায্য করার জন্যে। আমার খাটনি তাতে একটু লাঘব হওয়ায় ভালোই লাগছিলো। একটু পর সেই ভারতীয় যুবক আমাকে এসে হাসিমুখে হিন্দিতে বললেন, বাহ, তোমাদের এখানে তো সবাই চমৎকার হিন্দি বলে! আমি তার হাসির আড়ালে দাঁত বার করা তাচ্ছিল্যটুকু দেখে অপমানিত হয়েছিলাম। এবং সত্যিই তাই, সেই তরুণ আর তরুণী ইংরেজিতে কাঁচা হলেও গড়গড়িয়ে হিন্দি বলে যাচ্ছিল সেই ভারতীয় ভদ্রলোকের সাথে। আমি দু'জনকে একটু তফাতে ডেকে নিয়ে বিনয়ের সাথে অনুরোধ করলাম, আপনারা একটু কষ্ট করে হলেও ইংরেজিতে কথা বলুন। তারা আমার অনুরোধ রাখলেন তো না-ই, ঝাঁঝিয়ে উঠলেন। আমি মানুষের সাথে সহজে দুর্ব্যবহার না করলেও প্রয়োজনের সময় পিছপা হই না, আমি তাদের প্রায় ঘাড়ধাক্কা দিয়ে স্টল থেকে বার করে দিয়েছিলাম। কাজটার জন্যে আমি গর্বিত নই, কিছুটা লজ্জিতই। তবে সেই ভারতীয় ভদ্রলোক পরবর্তী আটচল্লিশ ঘন্টায় আমার বা আমার সহপাঠীদের সাথে একটিও হিন্দি শব্দ ব্যবহারের আগ্রহ পাননি।

প্রাগের চেক দোকানদার খালাম্মার সাথে ঢাকা শেরাটনের সেই তরুণতরুণীর মানসপটের পার্থক্য থাকবেই। আমরা বিদেশীবৎসল জাতি, ভিনজাতির কাউকে হাতের কাছে পেলে তাকে নারায়ণজ্ঞানে আপন করে নিতে ক্ষেপে উঠি, চেকরা কমবেশি বিদেশীবিদ্বেষী।

ভাষা নিয়ে আত্মসম্মানজ্ঞানের যে নমুনা বি.আর. মোল্লা কিংবা প্রাগের দোকানদার খালাম্মার মাঝে দেখি, তার কণামাত্র দেখতে পাই না নিজেদের দেশে নিজেদের মাঝে বসে। কিন্তু এমনটা ঘটলো কীভাবে, কোন ফাঁকে?

বাংলাদেশে হিন্দির এই জনপ্রিয়তা বিনোদনের সপ্তদশ অশ্বারোহীর মতোই আমাদের আত্মসম্মানের লক্ষণাবতী প্রাসাদটি দখল করে বসেছে। আশির দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে হিন্দি সিনেমাগুলো ভিডিও ক্যাসেটের ব্যবসার কল্যাণে আমাদের গৃহিণীদের মনোরঞ্জনের একটি প্রবল উপকরণে পরিণত হয়। ভারতীয় রাজনীতিক ও কলামিস্ট শশী থারুর তাঁর এক বক্তৃতায় বলিউডকে সফট পাওয়ার বলেছিলেন। কামান বা বন্দুক ধরে নয়, কতগুলো টিভি চ্যানেল আর সিনেমা স্টুডিও দিয়ে ভারত বিশ্বজয়ে নেমেছে। পলাশীর আম্রকাননের ইলোকুয়েন্ট ক্যাননগুলো এখন আমাদের ঘরে ঘরে প্রবেশ করেছে, আমাদের টেলিভিশনের অর্ধেকেরও বেশি জায়গা দখল করে নিয়েছে হিন্দিভাষী চ্যানেলগুলো। আর ভাষা কোনো বিচ্ছিন্ন প্রপঞ্চ নয়, ভাষার ওপর ভর করেই আমাদের অন্দরমহলে ঢুকে পড়েছে এক অলীক হিন্দিভাষী জগতের চিন্তা আর মনোবিকলন। হিন্দি সিনেমা ও সিরিয়ালে যা প্রদর্শিত হয়, তা বাস্তবতা থেকে বহু দূরে, কিন্তু এই ফ্যান্টাসির জগত আমাদের মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তের জীবনাচরণকে গ্রাস করে নিয়েছে বহুলাংশে। এমন এক সময় ছিলো, যখন ভারতের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে আমাদের বিটিভির অনুষ্ঠানের টেরেস্ট্রিয়াল সম্প্রচার দেখার জন্যে সেখানকার মানুষ উৎসুক হয়ে থাকতেন। আজ এর ঠিক উল্টোচিত্র আমরা দেখি। আমাদের নিজেদের দেশেই বিটিভি ক্রমশ মান হারিয়ে দর্শকের টিভির পাতে অপাঙক্তেয় হয়ে পড়ছে, আমাদের দেশের কোনো টিভি চ্যানেল সীমান্তের ওপারে প্রদর্শিত হয় না, কিন্তু আমরা নিজেদের টেলিভিশন চ্যানেলকে একপাশে ঠেলে সরিয়ে গলাধকরণ করে যাচ্ছি হিন্দিচ্যানেলবাহিত বিনোদন-লাড্ডু। আমাদের কর্মক্লান্ত জীবনের পর অবসরটুকু এখন বিপুলাংশে গচ্ছিত হিন্দির চরণকমলে। আমরা তা-ই শুনি, যা হিন্দি চ্যানেলগুলো শোনায়, তা-ই দেখি যা হিন্দি চ্যানেলগুলো দেখায়, আর তা-ই ভাবতে শিখি যা হিন্দি চ্যানেলগুলো আমাদের ভাবতে উসকায়।

এর প্রতিফলন দেখতে চাইলে খুব বেশিদূর বোধহয় যেতে হবে না। আমাদের জনভারাগ্রস্ত ঢাকা শহরে শিশুদের বিনোদনের সুযোগ খুব অপ্রশস্ত, তাদের মাঠগুলো আমরা দখল করে রিয়েল এস্টেটের ব্যবসায় ফুঁকে দিয়েছি। স্কুল-কোচিংসেন্টার-প্রাইভেটটিউটরের ফাঁকে আমাদের বাচ্চাদের বিনোদনের জন্যে একমাত্র জানালা হয়ে দাঁড়িয়েছে টেলিভিশন। সেখানে শিশুতোষ কার্টুন চ্যানেলগুলো এখন ভারত থেকে হিন্দিতে ডাবড হয়ে আসে। আমি চার বছর বয়সী শিশুদের শুনেছি নিজেদের মধ্যে হিন্দিতে কথা বলতে। এ নিয়ে তাদের অভিভাবকরাও বিন্দুমাত্র বিচলিত নন, বরং তারা প্রায়শই গর্বোচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন, তাদের কন্যাটি হিন্দি গানের তালে এই বাচ্চা বয়সেই কেমন চমৎকার নাচতে শিখে গেছে, এই ভেবে। আমাদের বিয়ের অনুষ্ঠানগুলোয় কিছু নিজস্বতা ছিলো, সেগুলো সবই বিসর্জিত হয়েছে হিন্দির আকাশগঙ্গায়, গায়ে হলুদকে আমরা এখন মেহেন্দি ডাকা শুরু করেছি, এবং সেই অনুষ্ঠানে অক্ষরে অক্ষরে অনুকরণ করছি কোনো হিন্দি সিরিয়ালে দেখা বিয়ের অনুষ্ঠানের দৃশ্য। সেইসব অনুষ্ঠানে আমাদের কিশোরীরা যৌনাবেদনময়ীর সাজে নেচে যাচ্ছে, এবং তা উপভোগও করছে সমাগতরা। হিন্দি সিনেমা আর সিরিয়ালে দেখা সজ্জা আর পোশাক আমাদের ফ্যাশনজগতকে কব্জা করেছে, আর আমাদের নিজেদের নির্মিত সিরিয়াল আর সিনেমাগুলোও অনুকরণের দুর্বল প্রচেষ্টার ফলে পরিণত হচ্ছে এক একটি ব্যর্থ অনুকৃতিতে। শুধু তা-ই নয়, কিছুদিন আগে আমাদের কেষ্টুবিষ্টুদের অনেকে ক্ষেপে উঠেছিলেন, আমাদের প্রেক্ষাগৃহে বলিউডি চলচ্চিত্র আমদানি করে এনে দেখানোর জন্যে। কারণ হিসেবে বলা হয়েছিলো, আমাদের দর্শক নাকি সিনেমা হলবিমুখ হয়ে পড়েছেন, "প্রতিযোগিতা" বাড়িয়ে আমাদের চলচ্চিত্রকে আরো বুলন্দ-বলিষ্ঠ করার জন্যেই নাকি এখন হিন্দি চলচ্চিত্র দেখানো অনিবার্য হয়ে পড়েছে। হিন্দির ক্রমবর্ধমান বিস্তারের ব্যাপারেও আমরা উদাসীন, মোবাইল টেলিফোনে প্রেমাস্পদাকে গদগদ হিন্দিতে আমরাই ভালোবাসা জানাচ্ছি। অথচ খোদ ভারতেই একজন আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন তামিল বা তেলুগুভাষী হিন্দিতে কথা বলেন না, মাতৃভাষার বাইরে সারা ভারতের সাথে যোগাযোগ করেন ইংরেজিতে, বলিউডি জীবনাচরণকে আত্মস্থ করা তো দূরের কথা। আর আমরা মাতৃভাষার স্বীকৃতির জন্যে রক্তপাত করেও আত্মসম্মানবোধের নিদর্শন রাখতে ব্যর্থ হচ্ছি ক্রমশ।

বিনোদন শুধু সময় পার করার উপায় নয়, বিনোদন আমাদের মনোজগতকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। আমরা প্রবাদের উটের মতো হিন্দি ভাষার উটকে আমাদের তাঁবুতে ঢুকতে দিয়েছি, সে এখন একটু একটু করে ভেতরে ঢুকে খোদ আমাদেরই ঠেলে সরিয়ে দিচ্ছে দ্বিতীয় সারিতে। আজ আর্মি স্টেডিয়ামে তাই আমরা কোটি কোটি টাকা নজরানা দিয়ে শাহরুখ খানের অর্থহীন হাত পা ছোঁড়াছুঁড়ি দেখতে যাচ্ছি, তার সাথে একবার কথা বলার জন্যে উন্মাদিনীর মতো হাত পা ছুঁড়ছে আমাদের তরুণীরা, এ দৃশ্য টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত হয়েছে। বিশ্বকাপ ক্রিকেটের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও আমাদের আয়োজকরা ভারত থেকে ষাটজন নট-নটী ধরে নিয়ে আসছেন। নিজেদের বিনোদিত করার ক্ষমতা, সুযোগ আর অধিকারও কি তাহলে আমরা হারিয়ে ফেললাম?

সাময়িক বিনোদনের কাছে নিজেদের সমর্পণ করে আমরা আত্মসম্মানজ্ঞানে এই সার্বিক ধ্বস নামিয়েছি কীসের বিনিময়ে? উত্তর পাই খবরের কাগজে, যখন দেখি, ভারতের এক্সিম ব্যাঙ্কের নাদিম পাঞ্জেতান এসে আমাদের ওপর একগাদা হুকুম চাপিয়ে দিয়ে যান, ঋণের টাকা কীভাবে ব্যয় করবো না করবো, তার জবাবদিহি ব্যাঙ্কের কাছে জমা দেবার আদেশ করেন। আমাদের ঋণ করা টাকায় নির্মিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে কারা কাজ করবে, বিদ্যুৎকেন্দ্র কীভাবে চলবে, তা নিয়ে হুকুম ঝেড়ে দিয়ে যায় ভারতের রাষ্ট্রীয় কোম্পানি এনটিপিসি। আমাদের মনে কি এই প্রশ্নটা জাগে না, আমরা কেন এ ধরনের অমার্জিত আচরণ মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছি?

উত্তরটা কিন্তু সুস্পষ্ট, আমরা জাতিগতভাবে পলকা আত্মসম্মানজ্ঞানের পরিচয় দিয়ে আসছি বছরের পর বছর ধরে। গত পনেরো বছরে আমরা অবাধে হিন্দিভাষী বিনোদনকে আমাদের নিজেদের জীবনযাত্রায় এত গভীরভাবে প্রবিষ্ট করিয়েছি, যে হিন্দিমুখীনতাও এখন একটি স্বাভাবিক ও স্বীকৃত প্রপঞ্চ। আমাদের চাকরির সিভিতে এখন ভাষিক দক্ষতার কলামে "হিন্দি" লেখাটা বর্ধিষ্ণু প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। অথচ উত্তর ভারতের কোনো শহরে গিয়ে বাংলা বললে আমরা কার্যোদ্ধার করতে পারবো না, কিন্তু একজন ভারতীয়ের কোনো সমস্যাই হয় না বাংলাদেশে এসে কাজ করতে, তার সাথে হিন্দি বলতে কমবেশি সবাই মুখিয়ে থাকে। আত্মসম্মানের দৌড়ে তাই আমরা আলোচনার টেবিলের ম্যারাথনে শুরুতেই পিছিয়ে থাকি। আর তার ষোলো আনা সুযোগ গ্রহণ করেন ভারতীয় ব্যবসায়ী ও আমলারা।

একটি জাতির দরকষাকষির শক্তি তার সংস্কৃতিতেও নিহিত। আমরা এই শক্তির শেকড়ে বিষ ঢালার সুযোগ করে দিচ্ছি ক্রমাগত। আটচল্লিশ সালে জিন্নাহ টপ-ডাউন প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের সব প্রদেশের ওপর রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দু চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। বাঙালি বটম-আপ প্রক্রিয়ায় উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে ছেড়েছিলো। উর্দুর আগ্রাসন আমাদের কাছে পরিষ্কার, কারণ উর্দুর স্বার্থে এদেশে রক্তপাত হয়েছে, রাষ্ট্র মানুষের ওপর গুলি চালিয়েছে। হিন্দির আগ্রাসন নীরব ও কোমল। ঘরে ঘরে কামানের বদলে টেলিভিশনগুলো গুলি ছুঁড়ছে, আমরা সোৎসাহে সেই গুলি সেবন করে যাচ্ছি আফিমের গুলির মতো। যে প্রতিরোধ আমরা আজ থেকে ঊনষাট বছর আগে গড়ে তুলতে পেরেছিলাম উর্দুর বিপরীতে, তার কণামাত্রও আমরা হিন্দির বিপরীতে গড়ে তুলতে পারিনি। কাজেই যদি এমন অনুমিতি করি, যে হিন্দি ক্রমশ নতুন ইংরেজিতে পরিণত হতে যাচ্ছে আমাদের দেশে, তাহলে কি খুব ভুল করা হবে? হিন্দি তখন হবে ভাষার নতুন প্রাচীর। সুবিধাভিলাষীদের তখন সুযোগ ও সম্ভাবনার বাগানে ঢুকতে হবে হিন্দির পাঁচিল টপকে। এটা যে আমাদের জন্যে অপমানজনক, তা আমাদের হিন্দিসংস্কৃতির ভোক্তা আর নীতিনির্ধারকদের আচরণ দেখে বোঝা যায় না। প্রধানমন্ত্রীর নাতনিকে তাই আমরা দেখতে পাই জনৈক বলিউডি নায়কের অনুষ্ঠানে এসে ঢলে পড়ে গদগদ হয়ে হিন্দি বলতে। আমাদের বেসরকারি টেলিভিশনে এই মুহূর্তে একটি বিজ্ঞাপন প্রচারিত হচ্ছে, যেখানে একজন বলিউডি অভিনেতা বিকৃত বাংলায় আমাদের নসিহত করে যাচ্ছেন। অর্থাৎ, আমরা নিজেরাই নিজেদের সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছি দ্বিতীয় সারিতে, প্রথম সারিটি ছেড়ে দিচ্ছি হিন্দির জন্যে। ধীর গতিতে, কিন্তু নিশ্চিত ভাবে। এ কাজে আমাদের অর্ধেক নির্লজ্জ, বাকি অর্ধেক নিশ্চুপ।

গায়ের চামড়া ব্রন্টোসরাসের মতো হলে, পরিণতিও ব্রন্টোসরাসের মতোই হবে, আকার যতোই বড় হোক না কেন। যতদূর জানি, জীবটি হারিয়ে গেছে পৃথিবীর বুক থেকে।

ভারতের এই ইলোকুয়েন্ট মিডিয়াক্যাননের সামনে আমরা কোনো প্রতিরোধ বা প্রতিযোগিতার চেষ্টা করিনি বলে পনেরো বছরের মাথায় দেখতে পাচ্ছি, আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে উদ্যোক্তারা ক্রমশ মুৎসুদ্দিতে পরিণত হচ্ছেন, আর আমাদের সামগ্রিক অবিমৃষ্যকারিতার দায় বহন করে পায়ে পায়ে পিছু হটছে আমাদের ভাষা, আমাদের গান, আমাদের জীবনাচরণ, আমাদের পাওয়ার প্ল্যান্টে বাংলাদেশী যুবকের কাজ পাওয়ার সম্ভাবনা, আমাদের সড়ক নির্মাণ প্রকল্পে বাংলাদেশী ঠিকাদারের টেন্ডার পাওয়ার আশা, আমাদের অর্থনীতি। কী বাকি থাকে আর?

এই বলপ্রয়োগ আমাদের কলার ধরে করা হচ্ছে না, করা হচ্ছে থুতনি নেড়ে দিয়ে, মাথায় হাত বুলিয়ে। একে তুলনা করা যেতে পারে ইয়ারকোভস্কি এফেক্টের সাথে। সূর্যের আলোর প্রভাবে সৌরজগতে প্রদক্ষিণরত গ্রহাণুগুলো যেমন ত্বরণ অনুভব করে, একটু একটু করে কক্ষপথ থেকে সরে গিয়ে কোনো গ্রহের বুকে আছড়ে পড়ে, আমরাও তেমনি বলিউডি সূর্যের রোদ পোহাতে পোহাতে নিজেদের কক্ষপথ থেকে সরছি একটু একটু করে, কিন্তু পতনটা অনুভব করতে ব্যর্থ হচ্ছি। যখন চূড়ান্ত পতন হবে, তখন আর করার কিছু থাকবে না।

হিন্দি ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার পর মারাঠি রাজনীতিক শঙ্কররাও দেও ভারতের লোকসভায় দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, "নেহরু শুধু সংস্কৃতির কথা বলেন, কিন্তু ব্যাখ্যা করেন না, সংস্কৃতি বলতে তিনি কী বোঝাচ্ছেন। আজ বুঝলাম, সংস্কৃতি মানে হলো বহুর ওপর স্বল্পের আধিপত্য।"

ছয় দশকেরও বেশি সময় পর এই জাত্যাভিমানী রাজনীতিকের কথাটির মূল্য হ্রাস পায়নি এতটুকু।

কিছু আত্মসম্মানজ্ঞান হোক আমাদের, এই কামনা করি। শেখ মুজিবুর রহমান একটি বাক্য ব্যয় করে বাংলাদেশের মাটি থেকে ভারতীয় সৈন্যদের বিদায় জানিয়েছিলেন। তাকে জাতির পিতা হিসেবে সম্মান যদি করি আমরা, তার দৃষ্টান্তটুকু অনুসরণের সাহস যেন আমাদের হয়। বাংলাদেশের বহুর ওপর এই বলিউডি স্বল্পের আধিপত্য দূর হোক। আমরা নিজেদের দেশে নিজেদের বিনোদনের জগতটুকু যেন অন্যের নিয়ন্ত্রণে ছেড়ে না দিই। সব দুয়ার তারই খোলা রাখা মানায়, যে নিঃস্ব। আমরা নিঃস্ব নই, তাই দুয়ার উদাম করে খুলে সবকিছু লোপাট হতে দেবো না। নীতিনির্ধারকদের প্রতি তাই আহ্বান, আমাদের দেশে হিন্দিভাষী চ্যানেলের সংখ্যাটি শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করে নামিয়ে আনতে। দর্শকের বিনোদনের ক্ষুধা মেটানোর কর্তব্যটি আমাদের অনুষ্ঠাননির্মাতাদের পালন করার সুযোগ দিতে হবে। আর সেই বিনোদনের ভাষা হতে হবে বাংলা, সেই বিনোদনে বিধৃত ফ্যাক্ট ও ফ্যান্টাসি হতে হবে বাংলাদেশের বাস্তবতাঘনিষ্ঠ। যদি তা করতে ব্যর্থ হই, তাহলে আমাদের সম্ভাবনাময় তরুণদের সৃজনশীলতা বিকাশের পথ সরাসরি রুদ্ধ হবে। পলাশীর মাঠের কামানগুলো আজও আমাদের দুই কানে ইংরেজি ভাষায় গর্জে চলেছে, সরাতে পারিনি জীবন থেকে, তাই একবার আমাদের তরুণদের সৃষ্টি ও বিকাশের পথটি রুখে দিলে বলিউডি কামানগুলো যে আমাদের জাতিকে হিন্দির অশনিবাণে ঝাঁঝরা করার কাজটি সর্বোচ্চ দক্ষতার সাথে করবে না, সে ব্যাপারে আশাবাদী হওয়া যায় না।


লেখাটি দৈনিক কালের কণ্ঠের সাময়িকী রাজকূটে ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১১ তারিখে ছাপা হয়।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।