Sunday, January 30, 2011

চটাশ করে থাবড়া

এই ব্রিসবেনেও তামিল গুণ্ডাদের অত্যাচার!

রমণ সুমহান দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন। এদের জ্বালায় সিঙ্গাপুর ছেড়ে ব্রিসবেন এসেছেন তিনি। কিন্তু নিয়তি এতটুকু স্বস্তি দিচ্ছে না। সিঙ্গাপুরে যেমন যখনতখন তামিল মাফিয়া শুঁটকির দোকানে এসে চাঁদাবাজি করতো, এখানেও কি তেমন করবে? শ্যামাগোপালান যদিও আশ্বাস দিয়েছে, ব্রিসবেনে এসব বিপদের সম্ভাবনা কম, তারপরও তার ভয় দূর হয় না। যদি সেই আগের মতোই কাজ শেষ হবার পর সন্ধ্যেবেলা এসে ঘিরে ধরে মুশকো কালো কালো গুণ্ডাগুলি? মানিব্যাগ থেকে সবকিছু কেড়ে নিয়ে গালে প্রকাণ্ড একটা চটকানা মেরে ফেলে রাখে রাস্তায়?

তার হাতখানা উঠে আসে বামগালে।

দেশ থেকে একটা খ্যাপ এসেছে। সিনেমা নিয়ে লিখতে হবে।

নিজের নামে মাঠে নামতে চাইছিলেন না তিনি। মেয়েটা ফোনে ঘড়ঘড় করে শুধু বললো, মিস্টার সুমহান, ট্রাই টু আন্ডাস্ট্যান্ড ব্রো। রোজ আমার নামে লেখা গেলে তো চলবে না। আর আম পেয়িং ইউ ইন ফাকিং ডলার্স ব্রো। ষাইট সত্তুর টাকা তো দিচ্ছি না। হোয়াটস দ্য ফাকিং প্রবলেম ইউজিং ইয়ো নেম?

তিনি মনে মনে চটলেও খদ্দেরের মুখের ওপর রূঢ় হন না। একটু হাসেন। বলেন, দ্যাখেন, অন্য কাউকে যদি পান। ফারহানা পপির নামে দিয়ে দেন তাহলে, সে তো আপনার অ্যাসিস্ট্যান্টই?

মেয়েটা সিনেমা ডিরেক্টর হিসেবে বালছাল হলেও টাকার ব্যাপারে যথেষ্ট প্রোফেশন্যাল। আবার ঘড়ঘড় করে শুধু বলে, ইউ আর গেটিং পেইড টু রাইট অ্যাজ আ স্কলার। ডোন্ট গিম্মি দ্যাট বুলশিট অ্যাগেইন। মেলবোর্নে আমার কাজিন আছে, সে আপনাকে টাকা পাঠিয়ে দেবে পরশু। অরাইট?

ফোন কেটে যায়। তিনি মনে মনে জ্বলতে থাকেন। চুতমারানি। পয়সার গরম দ্যাখাস?

রাগটা গিয়ে পড়ে ডালিয়ার উপর। তিনি গলা চড়িয়ে ডাকেন, এক কাপ চা-ই তো চাইছিলাম। জীবনে কি কিছুই পামু না?

ডালিয়া রান্নাঘর থেকে বিরস গলায় শুধু বলে, আইতাছি। খাড়াও।

ল্যাপটপ টেনে বসেন তিনি। সিনেমা নিয়ে লিখতে ভালোবাসেন না রমণ সুমহান। সিনেমা নিয়ে তাঁর কিছু তিক্ত স্মৃতি আছে।

ওমর ফারুকের ফেসবুক নোটে চোখ বোলান তিনি। পোলাটা লাইনে চলে আসছে এখন। অবশ্য বেশি চিৎকার করা বাম পোলাগুলি এমনই হয়, ক্যাম্পাসে তো কম দেখেন নাই এদের হাউকাউ। তাঁর সমসাময়িক বামরা বরং একটু দেরিতে লাইনে আসছে ওমর ফারুকের তুলনায়।

নিশ্চিন্দিপুরের ছোটোলোকগুলি যথারীতি ওমর ফারুকরে চিবি দিয়ে ধরছে। এরা তার পিছে লাগছিলো গ্যালোবার মাই নেম ইজ খান লইয়া। আবালগুলি ওত পাইতা থাকে, একটু ভুলচুক পাইলেই আইসা কাউকাউ করতে থাকে। জ্বালাতনই হইছে। এতকিছু চেক দিয়া খ্যাপের লেখা সাজানো সম্ভব?

তিনি ওমর ফারুকের নোটে একটা মন্তব্য ঝাড়েন, ওমর, এই ব্লগের গুণ্ডাগুলি বুর্জোয়া ফ্যাসিবাদীদের কথাগুণ্ডা। এদের কথায় আপনি মন খারাপ কইরেন না। এরা চলে ফ্যাসিবাদীদের ইশারায়। ভুইলা যাইয়েন না, এরাই চান্দা তুইলা রাজাকার মারতে গেছিল। এরা একটা মাফিয়া সংগঠন। এদের রুখে না দাঁড়াইলে কবে চান্দা তুইলা আপনারে মারে কোনো ঠিক নাই। মনে রাইখেন, হামাসের সব টেকাপয়সা আসে প্রবাসী ফিলিস্তিনিগো পকেট থিকা।

কমেন্ট পোস্ট করে মনে মনে হাসেন তিনি। বেটারা এখন এই নিয়া গিয়ানজাম হাউকাউ শুরু করে দেবে। এই ফাঁকে দৈনিক কচুবনের জন্য তিনি একটা লেখা সাজিয়ে ফেলতে পারবেন। ফাকমিদ সাহেব আজকে একটা সাবধানী লেখা দিয়েছে, তবে সেটা তার তেমন মনে ধরে নাই। খ্যাপের লেখাগুলো অবশ্য এরকম ধরি-মাছ-না-ছুঁই-পানি মার্কাই হয়, কিন্তু আরেকটু চোখা হলে ভালো হয়।

রমণ সুমহান পয়েন্টগুলো মনে মনে টোকেন। ফোকাস সরিয়ে নিয়ে যেতে হবে মুসলমান বনাম বাঙালি ডিসকোর্সে। ১৯৭১ এ এই আত্মপরিচয়ের সংকটের কথাটা লিখতে হবে যতদূর সম্ভব। ৎসিগমুন্ট বোমানের তত্ত্ব থেকে কয়েক লাইন ঢোকাতে হবে, তখন বাঙালি পরিচয়টা ছিলো তরল পরিচয়, ভিতরে জমাট পরিচয় ছিলো মুসলমান। বলতে হবে, বাঙালি মূল আঘাত পায় তার মুসলমান পরিচয়টা হানাদারদের ... হ্যাঁ, পাকিস্তান শব্দটা এড়িয়ে যেতে হবে যতদূর সম্ভব ... হানাদারদের চোখে নগণ্য হয়ে পড়ায়। এই আঘাত জাতির শরীরে যত না পড়ে, তারচেয়ে বেশি পড়ে মনে। এই হতভম্ব মানসই ফুটে উঠেছে সিনামায়। জ্যাঁ বদ্রিয়া থেকে কী ঢুকানো যায়?

তিনি গলা চড়িয়ে ডাকেন, ডালিয়া? চা কি পামু এই বছর?

ডালিয়া সাড়া দেয় না। তিনি বিরক্ত হয়ে নোট করতে থাকেন, জ্যাঁ বদ্রিয়া ... আচ্ছা, ইয়াসমিন সাইকিয়া থেকে কিছু বললে কেমন হয়? আবাল পাবলিক কি বুঝে ফেলবে? বীরাঙ্গনাদের ব্যাপারটা সাবধানে বলতে হবে। নীলা চরিত্রটাকে ফাঁপিয়ে লেখা যায়। সিনামার নামটা মাইয়াটার নামে না রাইখা নৈর্ব্যক্তিক কিছু রাখলে সুবিধা হইত। ডিরেক্টর ছাগলীটা খ্যাপের কামটাও কঠিন করে রেখেছে।

এরপর আনতে হবে কর্তৃপক্ষীয় ফ্যাসিবাদের ইনটারনালাইজেশনের কথা। কর্তৃপক্ষ, অর্থাৎ আম্লীগ সরকার মুক্তিযুদ্ধরে কুক্ষিগত করেই ক্ষান্ত হয় নাই, এই আধিপত্যের অনুভূতিকে পাবলিকের মধ্যে রোপণ করার চেষ্টা করছে। মিশেলিন মেসন যারে বলছিলেন ইনটারনালাইজড অপ্রেশন। আচ্ছা, মিশেলিন মেসনই কি বলেছিলেন? নাকি অন্য কেউ? আচ্ছা, গুগল মেরে চেক করা যাবে ... এই অন্তরায়িত দমনপীড়নের ফলে পাবলিক মুক্তিযুদ্ধকে এই কর্তৃপক্ষের চোখ দিয়ে দেখার অভ্যাস থেকে বের হতে পারছে না। মুক্তিযুদ্ধকে দেখতে হবে আর্গাস প্যানোপটেসের মতো বহু চোখ দিয়ে, পুঞ্জাক্ষিতে বিশ্লেষণ করতে হবে এই ঘটনাকে। কেবল জাতীয়তাবাদী চাপিয়ে-দেয়া-সেকুলার চোখে মুক্তিযুদ্ধকে দেখার প্রবণতা হানিকর, এই প্রবণতা আমাদের একটি বিপজ্জনক ফ্যাসিবাদি গোষ্ঠীতে পরিণত করতে পারে, যার প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই নিশ্চিন্দিপুরে। সেইখানে প্রবাসী গুণ্ডারা, যারা চান্দা তুলে রাজাকার মারে, তারা আজ মুক্তিযুদ্ধ গেল গেল রবে চিৎকার করছে। আমরা দেখতে পাই, ফ্যাসিবাদ কীভাবে আমাদের তথাকথিত শিক্ষিত সুবিধাবাদী মহলকে আচ্ছন্ন করছে। এই যে কর্তৃপক্ষ এই সিনামাকে নিষিদ্ধ করল ... হ্যাঁ, এভাবেই চালিয়ে দিতে হবে ব্যাপারটাকে, কারণ নিষিদ্ধকরণ মানে নিপীড়ন, যদিও জিনিসটা আপোষে ডিস্ট্রিবিউটর আর ডিরেক্টরের মন্ত্রী বাপের মধ্যের ব্যাপার, কিন্তু কর্তৃপক্ষকে টেনে আনলে এক ঢিলে দুই পাখি ... এতেই বোঝা যায়, এই জাতীয়তাবাদী একচক্ষুষ্মানতা আমাদের সৃজনশীল চক্ষুটিকে কী নির্মমভাবে নিষ্ক্রিয় করার ভয়ঙ্কর নাৎসিপনার দিকে ঠেলছে। এই ফ্যাসিপনা শুধু জাতীয়তাবাদীই নয়, এই ফ্যাসিপনা নারীর কণ্ঠস্বরকে রোধ করার এক গুপ্ত বিকৃত পুরুষতান্ত্রিক মনোবাঞ্ছার উপরিতল। নারী যখন নারীর গাথা নির্মাণ করে, নারীর অভিজ্ঞতাকে পর্দায় তুলে আনতে চায়, তখন এই প্রবল দখলবাদী মধ্যবিত্ত ইগোর ষষ্ঠি বাগিয়ে তেড়ে আসে। পাকি সেনার প্রতি কিশোরীর নিরীহ বয়সোচিত প্রেমকে তাই প্রথমে আঘাত করা হয় জাতীয়তাবাদের খঞ্জর দিয়ে, তারপর সেই প্রেমের ছিন্নদেহকে টুকরো টুকরো করা হয় দখলদার পুরুষের নখর দিয়ে ... আমরা দেখতে পাই, সুসান ব্রাউনমিলার ... না থাক, সুসান ব্রাউনমিলার নিয়ে নিশ্চিন্দিপুরের বেয়াদবগুলি কী যেন একটা সমস্যা খুঁজে পাইছে ... ।

ডালিয়া! সরোষে ডাকেন তিনি। এক কাপ চা দিলে লিখতে সুবিধা হইত!

ডালিয়া কিছু বলে না। রান্নাঘর থেকে ছ্যাঁক ছ্যাঁক শব্দ আসে। ধুর!

আর কী লেখা যায়? ব্লগরে একটু গালি দিতে হবে। এই পোঁদপাকাগুলি এসেই কাজকাম কঠিন করে তুলেছে। আগে ব্লগ নামের এই বালছাল ছিলো না, যা হতো সব পত্রিকায় পত্রিকায় লড়াই, আর সেখানে একজনের শালা আরেকজনের দুলাভাই। খুব বেশি গণ্ডগোল হইতো না, একটু তিতা কথা চালাচালির পর বাকিটা সম্পাদকীয় পাতার লোকজন ম্যানেজ করে ফেলতো। ওমর ফারুক তো রোবায়েতের লেখার অর্ধেক কাইটা ফালায় দিলো, রোবায়েত কিছু করতে পারছে? কাউরে কিছু বলতে পারছে? পারে নাই। কারণ তারেও তো সেই দৈনিক কচুবনেই লিখে লিখে নাম করতে হবে। কিন্তু ব্লগের ইতরগুলির সেই পরোয়া নাই, যখন খুশি যারে খুশি টাইনা ন্যাংটা করতেছে, কোনো লঘুগুরু জ্ঞান নাই, কতগুলি বেয়াদব এক জায়গায় হইছে। আচ্ছা, তোরা কবিতা সাহিত্য কর, গল্পটল্প লেখ, এইসব লইয়া টানাটানি কেন?

রমণ সুমহান নোট করতে থাকেন, তাই আমরা দেখি, বল্গাহীন ব্লগও দখল হয়ে গেছে ফ্যাসিবাদী অতিজাতীয়তাবাদী পুরুষতান্ত্রিক নব্যপাকিদের দখলে, যারা নিরীহ সিনেমাশিল্পীদের ওপর চড়াও হয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে সম্ভাবনাকে। এই নিষিদ্ধকৃত সিনেমা তাই একাত্তরের বধ্যভূমিরই সহোদর। আজ এক নির্মাতার কণ্ঠ রুদ্ধ করে দিয়ে এই বিকৃত ফ্যাসিপনা আমরা সয়ে নিচ্ছি, কাল আমাদের কণ্ঠস্বর চেপে ধরতে এলে কী করবো?

মার্টিন নিমোয়েলার দিয়ে শেষ করবেন নাকি? নাহ ... সব শালা ঐ কথা বলে বলে পঁচিয়ে দিয়েছে, ভলতেয়ারের বালছাল কথাটার মতো। নতুন কিছু লাগবে। নাহ, পড়াশোনা শুরু করা দরকার আবার। খ্যাপ মারার কাজ ক্রমশ কঠিন হচ্ছে, নতুন কিছু কোটেশন দরকার।

ডালিয়া! হাঁক ছাড়েন তিনি। দিবা নাকি এক কাপ চা?

ডালিয়া বলে, হুঁ, আসি।

রমণ সুমহান ফেসবুক খুলে ওমর ফারুকের নোটে উঁকি দেন আবার। ময়দানটা আরেকটু গরম করে রাখা ভালো। নিশ্চিন্দিপুরের ইতরগুলিকে আরো দুটো গালি দেবেন নাকি? ব্রিসবেনে আবার শালাদের কেউ নাই তো? পথেঘাটে ধরে যদি থাপ্পড় মারে ওয়াহিদুর রহিম খঞ্জনের মতো? বাম গালে পুরনো একটা ব্যথা ঊনিশশো একাত্তরের মতো নিজের অস্তিত্ব স্মরণ করিয়ে দেয় তাঁকে।


[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।