Friday, January 14, 2011

কচুরিপানা

কয়েকদিন আগে খবরে পড়লাম [১], কাপ্তাই হ্রদে কচুরিপানার মারাত্মক উৎপাতে মোট চারটি সমস্যা দেখা দিয়েছে।
  • কর্ণফুলি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন ব্যাহত। জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে টারবাইনে পানি প্রবেশের পথে একটা ধাতব স্ক্রিন থাকে, যেটা পানিতে ভাসমান যে কোনো বর্জ্যকে আটকে দেয়। কচুরিপানা সম্ভবত এই স্ক্রিনটিকে পুরোপুরি আচ্ছন্ন করে রেখেছে। জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, পচে যাওয়া কচুরিপানার কারণে বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির কুলিং সিস্টেমও বিপন্ন। দ্রষ্টব্য যে কুলিং সিস্টেম কাজ না করলে বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালানো সম্ভব নয়।
  • দ্বিতীয় সমস্যাটি নৌপরিবহনে। কচুরিপানার কারণে কর্ণফুলি কাগজকলে বাঁশ চালান দেয়া যাচ্ছে না। কাগজকলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন, এর মধ্যেই বাঁশের মূল্য দ্বিগুণ হয়ে গেছে। বাঁশের চালান এতটাই বিপন্ন যে ২৮ হাজার মেট্রিক টন কাগজ কম উৎপাদন হবে।
  • তৃতীয় সমস্যাটি সংমিশ্রিত। কচুরিপানা বেশ দক্ষতার সাথে জলাশয়ের উপরিভাগ ঢেকে ফেলে, ফলে সূর্যের আলো আর মাইক্রোফ্লোরার বিকাশ ঘটাতে পারে না, ফলে জলাশয়ের খাদ্যচক্র বিপন্ন হয়। কাপ্তাই হ্রদে কোটি কোটি টাকার মাছের পোনা পুষ্টির অভাবে বাড়তে পারছে না। যা-ও বা পারছে, সেসব মাছ ধরে মৎস্যজীবীরা বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন কর্পোরেশনের ল্যাণ্ডিং স্টেশন পর্যন্ত আসতে পারছে না পরিবহনজনিত জটিলতার কারণে।
  • চতুর্থ সমস্যাটিও নৌপরিবহনে। কয়েক বর্গকিলোমিটার জুড়ে কচুরিপানা ছেয়ে আছে বলে কাপ্তাই হ্রদে চলাচলে অসুবিধা হচ্ছে এলাকাবাসীর। সময় আর অর্থের অপচয়ের ব্যাপারটা সহজবোধ্য
সমস্যা নিরসনের লক্ষে কর্তৃপক্ষ একটি যান্ত্রিক সমাধান চাইছেন। বিএফডিসি'র ব্যবস্থাপক কমাণ্ডার জাহিরুল আলম জানিয়েছেন, এ সমস্যার "স্থায়ী সমাধানের জন্য" বিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষের কাছে হার্ভেস্টার মেশিন কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পাঠানো প্রস্তাবটি সরকারের বিবেচনায় রয়েছে বলে তিনি জানান। আর মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী আব্দুল লতিফ বিশ্বাস জানিয়েছেন, সকল মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে শিগগিরই হার্ভেস্টার মেশিন কেনার পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
কচুরিপানার এই দৌরাত্ম্য নতুন কিছু নয়, কিংবা স্থানীয় কিছুও নয়। সারা পৃথিবী জুড়ে কচুরিপানা জলীয় বাস্তুসংস্থান, কৃষি ও নৌপরিবহনের জন্যে মোটামুটি আতঙ্কোদ্দীপক নাম। মোটামুটি দুই সপ্তাহে পরিমাণে দ্বিগুণ হতে পারে সাধারণ কচুরিপানা [Eichhornia crassipes]। কোন হতভাগা একে দক্ষিণ আমেরিকা থেকে বাংলার পুকুরে এনে ছেড়েছিলো, তাকে ধরে চেয়ারে বেঁধে জোরজার করে ইভা রহমানের গান শোনানো উচিত তিন বেলা।
কাপ্তাই হ্রদে যে সমস্যাটা এখনও শুরু হয়নি, বা শুরু হলেও নজরে আসেনি কারো, সেটা হচ্ছে মশা। কচুরিপানা মশার আদর্শ বিস্তারভূমি [স্পনিং গ্রাউণ্ড]। কেবল মশা নয়, আরো নানারকম জীবাণুবাহক পোকামাকড়ের উপযুক্ত আবাস হচ্ছে কচুরিপানার ভাসমান আর্মাডা। আর এ ব্যাপারটি মোটামুটি পরীক্ষিত যে যান্ত্রিকভাবে কচুরিপানা নিয়ন্ত্রণ একটি অত্যন্ত দুরূহ ও ব্যয়সাধ্য পদ্ধতি। এ কারণেই মোটামুটি চল্লিশ বছর ধরে কচুরিপানাকে জৈবপ্রযুক্তির মাধ্যমে মোকাবেলার চেষ্টা চলছে।
আরেকটি সমস্যা খুব সূক্ষ্ম, কিন্তু আমলে আনার মতোই। সেটি হচ্ছে, খোলা জলাশয়ের উপরিতল থেকে যে পরিমাণ পানি বাষ্পীভূত হয়, তার প্রায় দ্বিগুণ বাষ্পীভূত হয় কচুরিপানার শ্বসনের কারণে [ইভাপোট্রান্সপিরেশন]। ভিক্টোরিয়া হ্রদে কচুরিপানার কারণে নীল নদের প্রবাহ প্রায় এক দশমাংশ কমে গিয়েছিলো। কাজেই কাপ্তাই জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে এই কচুরিপানার কারণে খানিকটা হলেও হেড লস বাড়বে।
১৯৮৯ সালে ভিক্টোরিয়া হ্রদে কচুরিপানার একটি লাওয়ারিশ গোছা শনাক্ত করার সাত বছরের মাথায় এটি হ্রদের উগাণ্ডীয় অংশের ৮০% গ্রাস করে ফেলে। কচুরিপানার বিস্তারে বাধা দেয়ার মতো কিছুই ছিলো না ভিক্টোরিয়া হ্রদে। ফলাফল কমবেশি কাপ্তাইয়ের মতোই, তার সাথে যোগ করা যেতে পারে পচে গিয়ে পানীয় জলসংস্থান নষ্ট করা আর শিস্টোসোমিয়াসিস রোগ ছড়ানো কৃমির হোস্ট এক ধরনের শামুকের বংশবিস্তার। জেমস ওগোয়াং নামে এক ভদ্রলোক কচুরিপানার বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেন [২]।
ওগোয়াঙের আক্রমণ ছিলো জৈবপ্রযুক্তি। খুব জটিল কিছু নয়, ভিক্টোরিয়া হ্রদে কচুরিপানার কোনো স্থানীয় শত্রু ছিলো না বলে তিনি এমন একটি শত্রু প্রজাতি খুঁজে আনেন কচুরিপানার মাতৃভূমি সুদূর দক্ষিণ আমেরিকা থেকে। প্রজাতিটি এক ধরনের গুবরে পোকা। ওগোয়াং খুব সতর্কতার সাথে পরীক্ষা করেন, এই পোকা কি কেবল কচুরিপানার ওপরই হামলা করে, নাকি ডানেবামে অন্য কোনো কিছুতেও দাঁত বসায়। একেবারেই কচুরিপানার জানি দুশমন প্রমাণিত হবার পর তিনি এই গুবরে পোকাকে ভিক্টোরিয়া হ্রদে চরে খাবার জন্যে ছেড়ে দেন। ফলাফল সন্তোষজনক, ২০০১ সালের মধ্যে ভিক্টোরিয়া হ্রদে কচুরিপানার উৎপাত কমে আসে।
একই ধরনের সমস্যা ফ্লোরিডাতেও হয়েছিলো। সেখানে ১৮৮৪ সালে প্রথম কচুরিপানা আসে। তারপর কী হইল জানে শ্যামলাল। ১৯৭২ সালে ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সেখানে Neochetina eichhorniae প্রজাতির গুবরে পোকা ছাড়া হয়। এগুলোর জীবনকাল ছিলো ৯০-১২০ দিন। দু'বছর পর সেখানে আরো স্বল্প জীবনকালের Neochetina bruchi ছাড়া হয়। পরবর্তীতে মাত্র ৩০ দিনের জীবনচক্রের ম্যারাডোনামার্কা সংস্করণ, আর্জেন্টিনার দুর্ধর্ষ পানাখেকো Sameodes albiguttalis উন্মুক্ত করা হয় কচুরিপানা নিয়ন্ত্রণের জন্যে। এই প্রজাতিটি এখন আরো কয়েকটি দেশে ব্যবহার করা হচ্ছে। এদের সাফল্য যে খুব আহামরি, এমনটি নয়, কারণ কচুরিপানার বীজ প্রচুর পরিমাণে উৎপন্ন হয়, আর তিরিশ বছর পর্যন্ত টিকে থাকে। পানিতে যথেষ্ট পুষ্টি থাকলে [যেমনটা কমবেশি আমাদের জলাশয়ে রয়েছে] কচুরিপানার বিস্তার ঠেকানো খুব মুশকিল।
২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে কৃষি বিভাগের গবেষণা শাখা থেকে আরেকটি কচুরিপানাখোর পতঙ্গ ছাড়া হয় [৩], এ-ও ম্যারাডোনার জাতভাই, আর্জেন্টিনীয় Megamelus scutellaris, একেবারে খাস কচুরিপানার দুশমন, অন্য কিছু দাঁতে কুটেও দেখে না।
কেনিয়াতে কিছু ছত্রাক-প্যাথোজেন পাওয়া গেছে, যা দিয়ে কচুরিপানাকে গলা টিপে মারা সম্ভব, কিন্তু এ ধরনের পরজীবী কতটুকু প্রজাতিনিষ্ঠ, সেটি খুব সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ না করলে অন্যান্য জলজ উদ্ভিদের জন্যেও নতুন হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আমাদের দেশে হারভেস্টার কিনে কিনে কচুরিপানা নিয়ন্ত্রণ করতে দিলে কর্মসংস্থান হবে নিশ্চয়ই, কিন্তু গোটা প্রকল্পটাও ব্যয়বহুল হয়ে পড়বে, যদি কচুরিপানাকে প্রাকৃতিক কোনো খাদকের শিকারে পরিণত করা না যায়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, এক একর জলাশয়ে কচুরিপানার ওজন ২০০ টন পর্যন্ত হতে পারে [৪]। আমাদের কৃষিবিজ্ঞানী, উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও পতঙ্গবিজ্ঞানীরা এ ব্যাপারটিকে গুরুত্বের সাথে যদি নেন, তাহলে কিছু কার্যকর গবেষণা যেমন হবে, ব্যয় সংকোচনও সম্ভব হবে।
কচুরিপানাকে গণশত্রু ভাবার কারণ যেমন আছে, তেমনি এর সম্ভাবনাকেও যাচাই করে দেখা জরুরি। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অতনু কুমার দাশ যেমন কেমিক্যাল পাল্পিঙের মাধ্যমে কচুরিপানা থেকে কাগজের মণ্ড তৈরি করার প্রক্রিয়া আবিষ্কারের দাবি করছেন [৫]। কর্ণফুলি পেপার মিলে এই হতভাগাদের মিজান-পিষে-ফ্যালো করে যদি কাগজ তৈরি করা যায়, মন্দ কী?
কচুরিপানা থেকে আরো অনেক তন্তু-সামগ্রী প্রস্তুত করা সম্ভব, যেমন সম্ভব একে পচিয়ে বায়োগ্যাস তৈরি করা কিংবা পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা। তবে কচুরিপানা থেকে প্রস্তুতকৃত পশুখাদ্যে বিষক্রিয়া দেখা দেয়ার সম্ভাবনাও বেশি, যেহেতু কচুরিপানা পানি থেকে প্রচুর ভারি মৌল [বেশিরভাগই জীবদেহের জন্যে বিষাক্ত] শোষণ করতে পারে [৬]।
কচুরিপানার এই শেষ গুণটির কারণেই কিন্তু একে আরেকটি অতি চমৎকার কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীববিদ্যা বিভাগে ড. মোজাম্মেল হকের নির্দেশনায় এক গবেষকদল চামড়াশিল্পে ব্যবহৃত ক্রোমিয়াম-যৌগকে নিষ্ক্রিয় করতে পারে এমন তিনটি ব্যাকটিরিয়া শনাক্ত করেছেন [৭]। কচুরিপানার মূলের অংশটুকু প্রচুর অণুজীবের আদর্শ সূতিকাগার, কাজেই আমাদের ট্যানারির বর্জ্য শোধনের কাজে এই অণুজীবগুলোর বাহক হিসেবে দূষণসহ কচুরিপানা ব্যবহার করা যেতে পারে। একই সাথে প্রবল দূষিত বুড়িগঙ্গা, যেখানে আর কোনো ফ্লোরা বা ফনাই টিকতে পারছে না, সেখানে কচুরিপানা ছেড়ে পলিউট্যান্টগুলোকে ফিল্টার করার একটি প্রকল্প আরো গবেষণার দাবি করে বলে মনে করি।
আমি তো মিস্ত্রি মানুষ, সত্যিকারের বিজ্ঞানীরা এই ধরনের আইডিয়াগুলোকে গুরুত্বের সাথে দেখলে আমরা এক ঢিলে কয়েক পাখি মারতে পারবো না কেন?


No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।