Sunday, January 09, 2011

বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান

১.

দালজিৎ সিং একটু থতমত খেয়ে যায় ভাণ্ডারি রামের ধমক খেয়ে।

"মোটর সাইকেলে স্টার্ট মার শালা বুড়বাক!" ভাণ্ডারি রাম দাঁত খিঁচিয়ে ধমকায়।

দালজিৎ আমতা আমতা করে তবুও। "কিন্তু বিশুর কেসটার কী হবে সাব?"

ভাণ্ডারি রাম পিচিক করে থুথু ফেলে মাটিতে। নেপাল বর্ডার থেকে বদলি হয়ে আসা প্রত্যেকটা চ্যাংড়াই এখানে এসে ত্যাড়ামি শুরু করে। ভাণ্ডারি রাম বহুবছর ধরে এদিকে আছে, দালজিতের মতো বহু বাঁকা লাঠিকে সোজা করে ছেড়েছে সে।

"এই নিয়ে দুইবার তুই আমার মুখে মুখে কথা বললি।" নিচু গলায় বলে ভাণ্ডারি। "আমি এইসব পছন্দ করি না। বুঝলি?"

দালজিৎ চোখ সরিয়ে নেয়। সে কনস্টেবল হয়েছে, খুব বেশিদিন হয়নি। হেড কনস্টেবলদের সাথে তর্ক যে করতে হয় না, এই শিক্ষা পেতে খুব একটা সময় লাগে না বাহিনীতে ঢোকার পর। কিন্তু ভাণ্ডারি তাকে যা করতে বলছে, সেটাও করতে বাধছে তার।

আশি সিসির মোটর সাইকেলটার স্টার্টারে কষে লাথি মারে দালজিৎ, খক খক করে দুয়েকবার কেশে বুড়ো কুকুরের মতো গর্জে ওঠে এনজিনটা। ভাণ্ডারি দালজিতের পেছনে এসে বসে। দালজিত ক্লাচ ছেড়ে দেয়, মৃদু ঝাঁকুনি দিয়ে সামনে বাড়ে মোটর সাইকেল।

বিশু গতকাল রাতে টাকা পৌঁছে দিয়েছিলো ফাঁড়িতে, বরাবরের মতোই। ভাণ্ডারি তখন অফ ডিউটিতে থাকে, দালজিৎও ছিলো তার সাথে। বিশু কথা কম বলে, ভাণ্ডারির সাথে নিচু গলায় দুয়েকটা কথা বলেই সে সাইকেল নিয়ে রওনা দিয়েছিলো গাঁয়ের পথে। রেখে যাওয়া পানের ডিব্বায় এক থোকা পঞ্চাশ রূপির নোট চুপচাপ গুণে ভাণ্ডারি দালজিৎকে ডেকে হিস্যা বুঝিয়ে দিয়েছিলো। পরিমাণ দেখে বুঝতে পেরেছে দালজিৎ, একজন লোক টপকাবে আগামীকাল ভোরে।

এদিকটায় গরু তেমন একটা যায় না। কী যেন একটা সমস্যার কারণে একবার ব্যাপক গোলাগুলি হয়েছিলো, সাব ইনস্পেক্টর গোপালানকে বড় সাহেবরা ডেকে পাঠায় তার পর। ওদিক থেকে বিডিআর পতাকা বৈঠকের ডাক দিয়ে খুব হাউকাউ করেছিলো। গোপালান বেজার হয়ে ফিরে আসার পর এক এক করে সব হেড কনস্টেবলকেই বদলি হয়ে যেতে হয়েছে এখান থেকে, আর গরুর চালানও বেমালুম বন্ধ হয়ে যায়। গরুতে পয়সা বেশি হলেও চালানিগুলো দিনকে দিন খচ্চর হয়ে যাচ্ছে, ঘাড়ও বাঁকা হচ্ছে আস্তে আস্তে। বিএসএফের ওপর লোহা ধরার সাহস দেখালে দস্তুর হচ্ছে দুয়েকটা বডি ফেলে দেয়া, তারপর তাদের লোক ফাঁড়িতে সন্দেশ আর খাসি ভেট নিয়ে এসে মাফ চাইলে তারপর আবার শুরু হয় কারবার। সেবারের গণ্ডগোলে কারবারিদের এক বড়সড় লোক মারা পড়েছিলো এক ছোকরা কনস্টেবলের হাতে, বেশ উঁচু জায়গায় তার টোকা গিয়ে পড়েছিলো, এপার ওপার দুধারেই।

দালজিৎ নেপাল সীমান্তে কাজ করতে গিয়ে দেখেছে, সবচেয়ে আরাম ড্রাগসে। যারা ড্রাগসের ব্যবসা করে, একেবারে
সুবেদার মেজরের সাথে বোঝাপড়া করে রাখে, টাকাপয়সা মাসে মাসে হাতে চলে আসে একেবারে ওপর থেকে, যদি সুবেদার মেজর খচ্চর লোক না হয়। অস্ত্রের চালান নিয়ে ঘাপলা থাকে, বড়সড় কিছু পার হলে সেখানে তার মতো নবীন কনস্টেবলের বেশি লোভ না করাই মঙ্গল, টুকিটাকি খুচরা জিনিস পার হলে মোটাসোটা দাঁও মারা যায়, তবে সেখানে ঝুঁকিও যে থাকে না, তা নয়। দালজিতের এক দেশোয়ালি ভাইকে দেশী বোমা চার্জ করে বসেছিলো এক গোঁয়ার, বেচারা একটা চোখ হারিয়েছে, সাথে চাকরিও। সাথের লোকজন বডি ফেলে দিলেও ততক্ষণে ক্ষতি যা হবার, তা তো হয়েই গেছে।

এদিকের বর্ডারে আরেকটা জিনিস বেশ চলে বলে শুনেছে দালজিৎ, ফেনসি। পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে গঞ্জে একটা কারখানা আছে, সেখান থেকে মিনিতে করে মাল এনে গ্রামে দিয়ে যায় ব্যাপারিরা। ওপারের লোকজন নানাভাবে সেগুলো নিয়ে টপকায়। বাচ্চা থেকে শুরু করে বুড়ো, সবাই আছে এই ফেনসির লাইনে। ফেনসিতে পয়সা মাথাপিছু খুব বেশি না হলেও সব মিলিয়ে খারাপ আসে না।

ভাণ্ডারি রাম মাঝে মাঝে জুয়ার আড্ডায় একটু বেসামাল হয়ে গেলে হিসাব করতে থাকে, পাটনা শহরে বাড়ি করতে গেলে তাকে আর কয় বছর খাটনি দিতে হবে এই বর্ডারে। সুবেদার মেজর হয়ে বুড়ো হবার শখ নেই ভাণ্ডারি রামের, সে এর মধ্যে কিছু জমি কিনেছে তার গাঁয়ে, সে কিষাণ বসিয়ে ক্ষেতি করবে আর মাঝে মধ্যে পাটনায় গিয়ে মাস্তি করে আসবে। দালজিৎ মিটিমিটি হাসে ভাণ্ডারির কথা শুনে। তার মনে অবশ্য ক্ষেতির শখ নেই। কিছু টাকা বানাতে পারলে সে চণ্ডীগড়ে তার বড় ভাইয়ের গ্যারেজের ব্যবসায় টাকা খাটাবে। আর বিয়েশাদিও তো করতে হবে, নাকি?

মোটর সাইকেলটা একটা ছোটো গর্তে পড়ে, ঝাঁকি খেয়ে দালজিতের মুখের মৃদু হাসিটাকে চিন্তাটার সাথেই মুছে দেয়, আর ভাণ্ডারি এনজিনের গুনগুনকে ছাপিয়ে একটা গালি দেয় মাতৃভাষায়, সেটার অর্থ গাধার অণ্ডকোষ। দালজিৎ পাত্তা দেয় না ভাণ্ডারিকে।

আজ বেহুদাই বিশুর কেসে যাচ্ছে তারা। ভাণ্ডারি গত দুই সপ্তাহ ধরে বলে আসছে, তার ধারণা বিশু তাকে ঠকাচ্ছে। একজনের টাকা দিয়ে বিশু দু'তিনজনকে পার করাচ্ছে। ওসব চলবে না।

দালজিতের অবশ্য কখনোই মনে হয়নি, বিশুর এত হিম্মৎ আছে। ভাণ্ডারি এদিকের বিওপিতে আছে বেশ কয়েক বছর ধরে, চালিয়াৎ কারবারি তার হাতেই মরেছে কয়েকটা, তার মাঝে বিশুর গাঁয়ের লোকও আছে। বেশি চালিয়াতি করতে গেলে যে সমস্যা হবে, সেটা বিশু বোঝে। লোকটার সিড়িঙ্গে ছোটোখাটো ভীরু চেহারাটা দেখে মনে হয় না, ভাণ্ডারিকে ঠকিয়ে কোনো কিছু সে করে যাচ্ছে। কিন্তু ভাণ্ডারি দালজিতের এসব যুক্তিকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছে।

"বাঙ্গুদের চিনিস না তুই। এরা সব সাপের মতো। কিলবিল করে চলবে মাটি ঘেঁষে, আর একটু ছাড় দিবি তো পোঁদের সমান উঁচু হয়ে কামড়ে দেবে।" চিড়েতনের বিবি আছড়ে ফেলে বলেছে ভাণ্ডারি। ইউসুফ খান আর সুবল রাও ছিলো সেদিনের জুয়ায়, তারাও হুঁ হুঁ করে উঠেছে তার কথায়। "হক কথা।"

হয়তো সত্যিই তাই। তবে দালজিৎ এখন পর্যন্ত সেরকম কাউকে পায়নি। দূর থেকে হাঁক দিলে জড়োসড়ো হয়ে যায় লোকগুলো, কারবারির হাত চেপে ধরে, বার বার মানা করা সত্ত্বেও সীমানার কাছে গিয়ে ঝেড়ে দৌড় দেয়। কচি বয়সের মেয়েরাও আসে ফেনসি নিতে, ভীরু বাছুরের মতো চোখ করে তাকিয়ে থাকে, দালজিতের বুকের ভেতরটা শিনশিন করে ওঠে।

এখনও পর্যন্ত কোনো বডি ফেলেনি সে।

ভাণ্ডারি সংক্ষিপ্ত আদেশ দেয়, "খেজুর গাছটার কাছে থামা।"

একটা নুয়ে পড়া খেজুর গাছ যেন খুব মন দিয়ে দেখছে কাঁচা রাস্তাটাকে, দালজিত তার নিচে মোটর সাইকেল থামায়। মোটর চালানোর সময় তার হাতিয়ারটা একটা স্ট্র্যাপ দিয়ে পিঠের সাথে বাঁধা থাকে, সেটা না খুলেই মোটর সাইকেলের চাবি মোচড় মেরে নেমে দাঁড়ায় সে।

"এখন?"

ভাণ্ডারি লম্বায় দালজিতের চেয়ে ঝাড়া আধহাত ছোটো হলেও তার চোখ দু'টি গনগনে আগুনের মতো। সে চাপা গলায় গর্জে ওঠে, "হাতিয়ার খোল। খুলে হাতে নে।"

দালজিৎ লজ্জিত মুখে অস্ত্রটা হাতে নিয়ে ভাণ্ডারির পেছন পেছন চলতে থাকে। টহলেই তো এসেছে সে, হোক না সেটা টাকা খেয়ে টহল না দেবার সময়। সে একজন রক্ষী, তার হাতে অস্ত্র সবসময় তৈরি থাকবে ডিউটির সময়।

ভাণ্ডারি আবারও চাপা গলায় গালি দিয়ে বলে, "বিশু বেহেনচোদটা যদি কোনো বেঈমানি করে, তাহলে আজকে একটা বডি ফেলে দেবো। শালা বিজিনেস করবি কর, তাই বলে নাইনসাফি?"

দালজিৎ মাথা নাড়ে আনমনে। বিশু একজনের হিসাব করে দু'তিনজন পার করবে, এমনটা তার মনে হচ্ছে না এখনও। শীর্ণ একটা লোক, শার্টের হাতা ঢলঢল করে, সাইকেল চালাতে গিয়ে দু'তিনবার করে আছাড় খায়, আর বিশু করবে বেঈমানি?

ভাণ্ডারি ঢালু একটা জায়গায় পৌঁছে শুয়ে পড়ে, তারপর পাউচ খুলে বাইনোকুলার বের করে চোখে লাগায়। দালজিৎ কয়েক গজ হামাগুড়ি দিয়ে পৌঁছায় তার কাছে। মাথায় উঁচু বলে তাকে সবসময় একটু আগে ক্রল শুরু করতে হয়।

ভাণ্ডারি ধৈর্য ধরে বসে থাকে। তার ভাণ্ডারে গালি আর ধৈর্যের কোনো অভাব নেই। এই কাজে পয়সা কামাই করতে গেলে দু'টো জিনিসই লাগে।

আর লাগে গুলি।

ভাণ্ডারি রাম চাপা গলায় বলে ওঠে, "হাতিয়ার তৈরি রাখ!"

দালজিৎ একটু চমকে উঠে তাকায় ভাণ্ডারির দিকে। বিডিআরের প্যাট্রল বের হয়েছে নাকি ওপাশে?

ভাণ্ডারি বাইনোকুলারটা দালজিতের হাতে দিয়ে ইনসাস রাইফেলটা হাতে নেয়। ব্যাটেলিয়নের অন্যতম সেরা মার্কসম্যান ভাণ্ডারি রাম, নিশানা না ফসকানোর ব্যাপারে দুর্নাম আছে তার।

দালজিত বাইনোকুলার চোখে লাগিয়ে চমকে ওঠে। জোর পায়ে সীমানার দিকে হাঁটছে দু'জন মানুষ। একজন বয়স্ক পুরুষ, আরেকজন কিশোরী।

ভাণ্ডারি ঝকঝকে সাদা দাঁত বের করে গোঁফের নিচে। "বলেছিলাম না? বিশু শুয়ারটা ঠকাচ্ছে আমাদের।"

দালজিৎ বিমর্ষ মুখে বলে, "এরা টপকাবে কীভাবে?"

ভাণ্ডারি গোঁফে মোচড় দেয়। "বিশুর লোক একটা মই রেখে আসে বেড়ার গায়ে। মই বেয়ে টপকাবে, আর কী?"

দালজিৎ আবার বাইনোকুলার লাগায় চোখে। বয়স্ক লোকটার পরনে হাফশার্ট আর ফুলপ্যান্ট, মেয়েটার পরনে সালোয়ার কামিজ। সন্ত্রস্ত পায়ে প্রায় ছুটছে তারা। বেড়ার গায়ে এক জায়গায় লাল একটা কাপড় গিঁট মেরে রাখা, ওদিকেই এগোচ্ছে তারা।

ভাণ্ডারি চাপা গলায় হাসে। "বিশু আমাদের একজনের টাকা দিয়েছে। একজনই টপকাবে।"

দালজিৎ চমকে ওঠে। "আরেকজন?"

ভাণ্ডারির হাসিটা মুখেই থাকে, কিন্তু এবার তার পরিধি চোখ থেকে নেমে নিষ্ঠুর চোয়াল স্পর্শ করে শুধু। "আরেকজনকে ফেলে দিবি তুই।"

দালজিতের মুখটা বিবর্ণ হয়ে যায়। "আমি?"

ভাণ্ডারি শক্ত মুখে বলে, "হ্যাঁ, তুই।"

দালজিৎ তার রাইফেলের ধাতুর শীতল স্পর্শ অনুভব করে হাতে। আজ তাকে বডি ফেলতে হবে?

ভাণ্ডারি বাইনোকুলার চোখে লাগায়। "নে, মার একটাকে।"

বয়স্ক লোকটা ব্যস্ত হাতে বেড়ার গোড়ায় পড়ে থাকা মইটা নিয়ে বেড়ার গায়ে ঠেকায়, শক্ত হাতে ধাক্কা দিয়ে সেটার গোড়া মাটিতে বসায়, তারপর মেয়েটাকে ইশারা করে। মেয়েটা ডানে বামে তাকাচ্ছে শুধু, লোকটার ইশারা দেখে সে মাথা নাড়ে। লোকটা অধৈর্য হয়ে হাত নাড়ে, কী যেন বলে, মেয়েটা আবার এদিক ওদিক মাথা নাড়ে। লোকটা আর কথা বাড়ায় না, মই বেয়ে উঠতে থাকে।

ভাণ্ডারি বলে, "মার শালাকে।"

দালজিৎ অস্ফূট গলায় বলে, "ওস্তাদ, দুই রূপি মারি।"

ভাণ্ডারি বিরক্ত হয়ে বাইনোকুলার নামায় চোখ থেকে। "কীসের দুই রূপি মারবি? এই শালা কেশরীর বাচ্চা, তুই পয়সার বখরা পাস না? কাজে নেমে দুই রূপি মারামারি কী রে?"

দালজিৎ হাতড়ে হাতড়ে পকেট থেকে পাতলা মানিব্যাগ বের করে একটা দুই রূপির মুদ্রা বের করে। "গাছ উঠলে আমি ফেলছি বডি। অশোকস্তম্ভ উঠলে তুমি ফেলো।"

ভাণ্ডারি চোখে আগুন নিয়ে বলে, "শালা ডরপোক! এদিকে মাল টপকে যাচ্ছে, আর তুই রাণ্ডির ভাতার দুই রূপি মারছিস! আচ্ছা ... গাছ উঠলে আমি ফেলবো। মার দেখি।"

দালজিৎ বুড়ো আঙুলের টোকায় মুদ্রাটা বাতাসে ছুঁড়ে এক বুক আশা নিয়ে তাকিয়ে থাকে সেটার দিকে।

বয়স্ক লোকটা ওদিকে মই বেয়ে কাঁটাতারের দুই মানুষ উঁচু বেড়া টপকে লাফিয়ে পড়ে অন্য পাশে। তারপর গুড়ি মেরে বসে মেয়েকে ডাকে, "আয় ফেলানি, জলদি আয়! দেরি করতিছিস কেন, আয়!"

মেয়েটা টলমল করে উঠতে থাকে মই বেয়ে, তার সন্ত্রস্ত চোখ পেছনের বিরান ভূমিতে।

লোকটা মেয়েকে তাড়া দেয়, "তাড়াতাড়ি আয়! পিছনে কী দেখতিছিস? তোর শ্বশুর আসতিছে নাকি?"

মেয়েটা তাড়াতাড়ি পা চালাতে যায়, তার সালোয়ার আটকে যায় কাঁটাতারের বেড়ায়। সে অস্থির হয়ে পা টানে, কিন্তু পা ওঠে না।

"বাপজান! বাপজান, আমি আইটকে গেছি বাপজান!" ডুকরে ওঠে সে। "আমারে ছুটাও!"

বয়স্ক লোকটা উৎকণ্ঠিত দৃষ্টিতে তাকায় ফেলে আসা দেশের মাটির দিকে। "জোরে টান মার, সালোয়ার ফাইড়ে গেলে ফাড়ুক! জলদি আয় রে মা!"

সালোয়ার ছেঁড়ে না, অনড় আটকে থাকে কাঁটাতারের বেড়ায়। বরং আটকে যায় ফেলানির কামিজের একটা অংশও।

"বাপজান, আমি আইটকে গেছি, আমারে ছুটাও!" ফেলানি আতঙ্কে ফুঁপিয়ে ওঠে।

দালজিতের বুকের ভেতরটা ঠাণ্ডা করে মাটিতে আছড়ে পড়ে অশোকস্তম্ভ। তিনটি সিংহ তিন দিকে তাকিয়ে যেন মুখ ব্যাদান করে ব্যঙ্গ করে দালজিৎকে।

ভাণ্ডারি ফুড়ুক ফুড়ুক হাসে। চোখে বাইনোকুলার লাগিয়ে বলে, "রোজগার হালাল কর কেশরী। এইবার এই ছোকরিকে মারো। ওর সাথের মরদটা টপকে গেছে, ওটাকে ছেড়ে দে।"

দালজিৎ চমকে উঠে তাকায় ভাণ্ডারির দিকে। "সাব, আওরৎকে মারবো?"

ভাণ্ডারি বাইনোকুলার চোখ থেকে ধীরে নামিয়ে ঠাণ্ডা দৃষ্টিতে তাকায় দালজিতের দিকে। দালজিতের জিভ শুকিয়ে যায় সেই দৃষ্টি দেখে।

"মুখে মুখে কথা বলিস না লৌণ্ডা।" ভাণ্ডারি রাম হিসহিস করে ওঠে। "বিশু যেন এরপর কোনোদিন আমাকে আর ন্যায্য হিস্যার চেয়ে কম দিতে সাহস না করে। ছুকরি আটকে গেছে বেড়ায়। ফেলে দে।"

দালজিৎ ভাণ্ডারি রামের চোখে তার পাটনার বাড়ি আর মুজফফরপুরের ক্ষেত যেন দেখতে পায়। সে হাতের ঘাম মুছে নেয় প্যান্টের পাছায়, তারপর সাইটে চোখ লাগায়।

কাঁটাতারের বেড়ায় আহত প্রজাপতির মতো ছটফট করে ফেলানি, তার কাপড় আটকে গেছে, আঁচড় লেগে চামড়া ছড়ে রক্ত পড়ছে দরদর করে।

সিঙ্গল শটে সেট করে ট্রিগারে চাপ দেয় দালজিৎ, তার চোখ বন্ধ।

প্রথম গুলিটা ফেলানির কোমরের একটু ওপরে গিয়ে লাগে। ৫.৫৬ ক্যালিবারের গুলির ধাক্কায় সে মই থেকে সরে বেড়ার ওপরে পড়ে। দ্বিতীয় গুলিটা তার ফুসফুস ছিদ্র করে বেরিয়ে যায়।

মইটা আছড়ে পড়ে মাটিতে, ফেলানির শরীরটা খিঁচুনি দিয়ে ওঠে। তার বাবা বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে দেখে সে দৃশ্য। বিশাল আকাশকে ডান থেকে বামে, উত্তর থেকে দক্ষিণে চিরে চলে গেছে এক বিরাট কাঁটাতারের বেড়া, তাতে এক অতিকায় পতঙ্গের মতো বিদ্ধ হয়ে আছে ফেলানি, তার কাপড়ের সম্মুখভাগ গাঢ় করে উঠে আসছে রক্ত।

ফেলানি একবার কাশে, অস্ফূটে কী যেন বলে ঘড়ঘড় করে। তারপর তার মাথাটা ঢলে পড়ে ঘাড়ের ওপর।

ফেলানির বাবা আতঙ্কে চিৎকার করে ছুট দেয় নিজের দেশের দিকে।


২.

নাজারেথ থেকে উড়ে আসে কাকের দল, কাঁটাতারের বেড়ার খুঁটিতে এসে বসে। একটা সাহসী কাক এগিয়ে ফেলানির খোলা চোখে ঠুকরে দেয়।

পরদিন সূর্য ঠিক সময়মতোই ওঠে, সীমানার এপারে ওপারে মানুষ জেগে ওঠে। কেউ খবরের কাগজে ফেলানির কথা পড়ে, কেউ ফেসবুকের দেয়ালে। কেউ গল্প লেখে, কেউ লেখে স্ট্যাটাস। তারপর আবার সব শুনশান হয়ে যায়। সীমানার ওপর দিয়ে টপকে আসে শুধু বিনোদনের ঢেউ।

চলুন, দেখে নিই আজকের ছবির তালিকা, দৈনিক প্রথম আলোর ভেতরের পাতা থেকে। ফেলানির খবর সেখানে এসেছে, প্রথম পাতায়।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।