Wednesday, December 22, 2010

ছায়াগোলাপ

ফেসবুকে যারা ঢোকে, তাদের কি কাজকাম নাই?

প্রশ্নটা মাঝে মাঝে সশব্দে করে ফেলি, বউ অন্য ঘর থেকে তখন ইস্রাফিলের শিঙার মতো সুরে কী যেন বলে। পুরোটা বুঝতে পারি না, মনে হয় সায় দেয়।

ফেসবুকে লোকজনকে ফালতু কাজে ব্যস্ত রাখার জন্য চতুর লোকজন কত কারিকুরি বার করেছে, দেখে মাঝে মাঝে তাজ্জব হয়ে যাই। একটা কম্পিউটারের সামনে বসে কোনো নিরস চেহারার ছেলে, হয়তো সাতদিন ধরে গোসল করে না, দাঁত মাজে না এক মাস ধরে, বগলে অশ্বত্থের চারা হয়তো গজিয়ে গেছে, মড়াপচা গন্ধ গায়ে, সে-ই হয়তো বানিয়ে বসেছে ফুল উপহার দেয়ার অ্যাপ্লিকেশন। কী বুদ্ধি ব্যাটাদের। বসে বসে ক্লিক করো আর লোকজনকে ফুল উপহার দাও। আসল ফুল হলে একটা কথা ছিলো, এগুলো হচ্ছে ফুলের ভূত, হাতে আঁকা টাকার মতো। ফুল যদি কোনো ঈশ্বর বানিয়ে থাকে, সেই ব্যাটার চেয়ে হয়তো কম খাটেনি প্রোগ্রামার ছোকরা, কিন্তু ফুলের আত্মার দিকে চোখ না দিয়ে বলদাটা শুধু রূপটাই দেখেছে।

আর যাদের কোনো কাজ নেই খাওয়াদাওয়ার পর, তারা বসে বসে ফেসবুকে ঢুকে এই অ্যাপ্লিকেশনে মাউস দিয়ে গুঁতাগুঁতি করে একে ওকে ফুল পাঠায়। প্রোগ্রামার বিদেশী, তাই ফুলগুলিও ফিরিঙ্গি। বাঙালিরা সেই ম্লেচ্ছ নামের লিস্ট থেকে চেনা ফুলের ইংরেজি নাম খোঁজে, তাই হয়তো আমার নোটিফিকেশনে শুধু গোলাপের আগমনী সংবাদ।

বউ অন্য ঘরে বসে মনোযোগ দিয়ে কী একটা হিন্দি অনুষ্ঠান দেখছে। একটা ঘড়ঘড়ে পুরুষ কণ্ঠ বলছে, ইস বাচ্চে কি পিতা ম্যায় হুঁ! যন্ত্রপাতির অসীম করুণায় তার দাবী ছড়িয়ে পড়ছে সাত আসমানে, ম্যায় হুঁ ম্যায় হুঁ ম্যায় হুঁ! পরিস্থিতি খুবই জমজমাট, বাচ্চার বাপের পরিচয় নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া চলছে, বউ এখন টিভি ফেলে ঘরে ঢুকবে না, এমন মনকলার খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে নোটিফিকেশনে ক্লিক করে গোলাপবিলাসিনীর প্রোফাইলটা খুললাম।

মেয়েটা গত এক মাস ধরে গোলাপ পাঠিয়ে যাচ্ছে। অবিরত। ওর কি আর কোনো কাজ নাই? কিংবা আর কেউ নাই গোলাপ পাঠানোর? আমাকে কেন? আর দিবিই যদি তো এই ভূতগোলাপ কেন? একদিন ভালোমতো সেজেগুজে একটা তোড়া নিয়ে আয় বাসায়, ডালভাত খেয়ে যা, বউয়ের সাথে বসে বেওয়ারিশ হিন্দি সিরিয়ালের বাপের আহাজারি শুনে যা।

নোটিফিকেশনের পাতাটা পুরোটা খোলার পর হঠাৎ করেই আরেকটা ব্যাপার চোখে পড়ে আমার। আগে খেয়াল করিনি।

কে এক পুরুষও আমাকে গোলাপ পাঠাচ্ছে এক মাস ধরে।

মেজাজটা খারাপই হয় এবার। প্রথম গোলাপের তারিখটা দেখি। গত মাসের বারো তারিখ। আজ সাত তারিখ। বারো তারিখ থেকে ঐ মেয়েটাও গোলাপ পাঠানো শুরু করেছে। ব্যাটাছেলেটা মেয়েটার মতো অনর্গল না পাঠালেও মাঝে মধ্যে একটা দু'টো পাঠিয়েছে দেখা যাচ্ছে। কে রে তুই শালা, বিবাহিত লোককে গোলাপ পাঠাস? ঘরে বাপভাই নাই?

ক্লিক করে প্রোফাইলটা খুলে এবার নামটা চোখে পড়ে আমার। ওহ। মারুফ কাজী। হাল্লার পো, তুই আবার আমাকে গোলাপ পাঠাস ক্যান রে?

মারুফ কাজী আমার বড় ভাইয়ের বন্ধু। প্রাণোচ্ছ্বল লোক। একটু মেয়েলি ভাব আছে, ওড়না টোড়না পরে কুর্তার সাথে, কিন্তু সেটা সম্ভবত সঙ্গদোষে। দিনরাত মেয়েদের সাথেই তার ওঠবোস। মেয়েরাও তাকে ঘিরে থাকে, দেখেছি। সম্ভবত, কবিতার গুণে।

কবিতা জিনিসটা আমি হজম করতে পারিনি কখনো, যেটাই গিলতে চেয়েছি. মার্গপথে বেরিয়ে গেছে। মারুফ কাজী কবিতা শুধু গেলেইনি, চিবিয়ে রসমজ্জা হজম করে বাদুড়ের মতো যত্রতত্র কবিতা ওগড়াতে ওগড়াতে একেবারে দক্ষযজ্ঞ কাণ্ড বাঁধিয়ে রেখেছে। শাহবাগে গিয়ে আবৃত্তির সিডি কিনতে গেলে তার খোমাটা কাভারে দেখতে হবেই। ছেলেদের কবিতা, মেয়েদের কবিতা, সব কিছুতেই সে আছে ঈশ্বর আর ব্যাকটিরিয়ার মতো। কবিতা আমি বুঝি না, কিন্তু এ কথা বুঝি, বেশ টেনে টেনে কবিতা আবৃত্তি করতে পারলে, সিডি বার করে ফেলা যায়, মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায় ওড়না পরে মাইক কাঁপিয়ে তোলা যায়।

আর মেয়েদের পটানো তো অবশ্যই যায়।

গোলাপের ভূত মারুফ কাজীর পাশাপাশি এই হাস্যোজ্জ্বল রূপবতী তরুণীটির কাঁধে কিরামান কাতেবিনের পেছনের বেঞ্চে বসে আছে দেখে একটা আঁশটে সন্দেহ হলো প্রথমেই।

মেয়েটি দেখতে বেশ। প্রোফাইলের ছবিটি দেখে বোঝা যায়, সে দীর্ঘাঙ্গিনী, নির্মেদ। তার হাসিটিও তার আত্মাকেই ধারণ করেছে। কান পেতে শুনলাম, হিন্দি সিরিয়ালে বাচ্চার মালিকানা নিয়ে নারীপুরুষের কলহ চলমান। বউ যখন দূরে, তখন এই গোলাপের রহস্যে একটু টোকা দিয়ে দেখা যায়।

অনলাইন বন্ধুদের তালিকায় মেয়েটির নাম জ্বলজ্বল করছিলো তখন, সামিরা মেহের, ক্লিক করে লিখলাম, "গোলাপের নিচে চাপা পড়ে তো মারা যাচ্ছি!"

প্রত্যুত্তর এলো, "হিহি।"

চোঙামুখো মানুষকে আমি ভালোবাসি না, আর দেখেছি, যারা মন খুলে হাসতে জানে না, তারা এই অক্ষরের আলাপেও হাসির অক্ষর লিখতে পারে না। হাসতে জানা মানুষ নিরাপদ মনে হয়, হাসতে জানা নারী নিরাপদতর, এবার নির্ভার মনে লিখি, "ঘটনা কী? কে গো তুমি?"

উত্তর আসে, "আমি সামিরা।"

সেই থেকে শুরু হয়। ফুলের স্রোত থামে না। আমার বউটাও কোনো হিন্দি সিরিয়াল মিস করে না, লোডশেডিং হলে ভোরে উঠে পুনর্প্রচারে আবার দ্যাখে, কোন শাশুড়ি কোন পুত্রবধুর একশো কোটি রূপির কাগজের গুদামে গুণ্ডা লাগিয়ে আগুন ধরিয়েছে, কার কোলের শিশুর পিতা কাকে কোলে নিয়ে বসে আছে। সামিরার সাথেও তাই আলাপ আস্তে আস্তে সরু খাল ধরে কীর্তনখোলায় এসে পড়ে।

সামিরা হাসতে জানে বলেই বোধহয় বেশিক্ষণ গোপন রাখে না কথাটা, দ্বিতীয়বার চেপে ধরতেই একটা হাসিমুখ পাঠায়। সম্মতিরই লক্ষণ বলে চিনে নিই স্মাইলিটাকে। হ্যাঁ, মারুফ কাজীর প্রেমে সে আচ্ছন্ন।

মারুফ কাজীর ফেসবৌকেয় দেয়ালে আধ ঘন্টা পর পর নতুন নতুন প্রেম গদোগদো কবিতার চরণ, আর সামিরার দেয়ালে এক ঘন্টা পর পর নতমুখ কোনো তরুণীর তৈলচিত্র দেখে ধারণাটা এতই পোক্ত হয়েছিলো যে ইতিবাচক উত্তর না এলেও সেটা পাল্টাতো না, কিন্তু সামিরা ত্রস্তা হরিণীর মতো আড়াল খোঁজে না, সে শাবকের সরলতা নিয়ে প্রশ্নের দাঁতে নিজের গলা পেতে দেয়। হ্যাঁ, মারুফ কাজীকে ভালোবাসে সে।

ভালো লাগে মেয়েটির সাহসী স্বীকারোক্তিটুকু, আবার খারাপও লাগে, কারণ মারুফ কাজী বিবাহিত, বহুদিন ধরেই। ব্যাটার বিয়ের হলুদে বন্ধুর ছোটো ভাই হিসেবে কিছু শ্রমও দিয়েছিলাম। হতভাগার কোনো শালি নেই, মামাতো চাচাতো শালিও না। এরকম কালাহারি মরুভূমিতে পদ্ম হয়ে প্রস্ফুটিতা তার স্ত্রী, আর গোটা বংশ ভর্তি ছেলেছোকরা। গায়ে হলুদটাই লস হয়েছিলো পুরো।

রাগটা ঝাড়তে ইচ্ছা হয় সামিরার ওপরই, কিন্তু খারাপ লাগাটা কাটে না, কারণ সামিরা নিজেও বিবাহিতা।

কান পেতে শুনি, বউ মজে আছে হিন্দি সিরিয়ালে, কীবোর্ডে আমার আঙুল ফিসফিসিয়ে টাইপ করে, "কেমন হয়ে গেলো না ব্যাপারটা?"

সামিরা একটু চুপ করে থেকে লেখে, "কী করবো? ভালো লাগে তো!"

বিবাহিত বুকটায় একটু ব্যথা লাগে। সামিরার দুঃখে নয়, নিজের দুঃখেও নয়, মারুফ কাজীর গায়ে হলুদে তার নেই-শালিদের অনুপস্থিতির জন্যেও নয়, ঐ ভালোলাগার কথা শুনেই। ভালোবাসতে ভালো লাগে যাদের, তাদের কেবলই দেখি আহত হতে। ঘূর্ণিঝড়ে তাদেরই চাল উড়ে যায়, বাজ পড়ে তাদেরই গরু মরে, ভূমিকম্পে তাদের ঘাড়েই হুড়মুড় করে এসে পড়ে ছয়তালা দালান। সামিরার ছবির হাসিটার জন্যে দুঃখ পাই, দুঃখ পাই তার আলাপের টুকরো টুকরো মূক হাসিমুখগুলোর জন্যে।

টিভিতে হিন্দি সিরিয়াল কখনও শেষ হবার নয়, আর আমার বউও যতদিন দেহে রবে প্রাণ, ততদিন লড়ে যাবে, তাই সামিরার গোলাপগুলো জমতে থাকে আমার নোটিফিকেশনের পৃষ্ঠায়। তার খোঁজ নিই, খোঁজ নিই তার হাসিমুখের।

সামিরার গোলাপগুলো মলিন হয় না, কিন্তু একদিন দেখি তার দেয়ালে আর সেই নতমুখ তরুণীদের ছবিগুলো নেই। তার বদলে টুকরো টুকরো কথা লেখা, সেগুলোও টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়ার। একটু আশঙ্কা হয়, মারুফ কাজীর দেয়ালে গিয়ে দেখি, কিন্তু সেখানে কবিতার আমাশয় সগর্জনে বহমান।

সামিরার গোলাপ ঠিকই পাই, জানতে চাই, "কী হলো?"

উত্তর আসে মলিন মুখের স্মাইলিতে।

বিস্তারিত জানতে চাই, সামিরা চুপ করে থাকে। তারপর বলে, "ও একটা প্রবঞ্চক।"

প্রবঞ্চক কথাটা বড় কঠিন, মানেও মনে পড়তো না, কিন্তু সামিরার খালি দেয়াল, মারুফ কাজীর অক্ষুণ্ণ কবিতার স্রোত, আর ঐ বিষণ্ণ মুখের এক টুকরো স্মাইলির ফ্রেমে শব্দার্থ পরিষ্কার হয়ে ওঠে। বলি, "কেন?"

সামিরা উত্তর দেয়, "আমাকে আর ভালোবাসে না। এখন অন্য আরেকজনকে গোলাপ দেয়, অন্য আরেকজনের জন্যে কবিতা লেখে।"

শিশুর মতো অভিমান মনে হয়, কিন্তু অভিমানী সকলেই তো শিশু, ঐটুকু উত্তরাধিকার তো সে শৈশব থেকে বহন করে চলতেই পারে। জানতে চাই, "কে?"

জানতে পারি, সুমনা মোস্তফা নাম সেই প্রবাসিনীর, মারুফ কাজীর নতুন কবিতার স্টক অর্গলমুক্ত বর্ষার জলের মতো সেইদিকে ধাবিত। মারুফ কাজীর দেয়ালে সেই মেয়েটির হাসিমুখ দেখতে পাই, দেখতে পাই আরেকটি সামিরাকে, দেখতে পাই আরেকটি পরিতৃপ্ত হরিণশাবককে।

সামিরা কাঁদে, একটি কোলন, একটি একাকী কোট মার্ক, একটি প্রথম বন্ধনী এঁকে, কিন্তু আমি তার কান্নার শব্দ যেন শুনি বউয়ের হিন্দি সিরিয়ালে হোটেল ব্যবসায় দুইশো কোটি রূপি লস খাওয়া শাশুড়ির কান্নাকে ছাপিয়ে।

সামিরা কাঁদে, কারণ তার নিজের সংসারটুকু চুরমার হয়ে গেছে সেই ভালোবাসতে ভালো লাগার রোগে। সামিরার পুরুষটি জানে, সামিরা সশরীরের ভালোবাসে মারুফ কাজী নামের একটি লোককে। তারা আর একজন আরেকজনের সাথে কথা বলে না, পারতপক্ষে মুখোমুখি হয় না, সামিরা সেই লোকটির জন্যে রান্না করে না, কারণ সেই লোকটি সামিরার রান্না মুখে দেয় না, তারা দু'জন দুই ঘরে রাতে অন্ধকার ঘরে শুয়ে ভিন্ন মানুষের কথা ভাবে। সামিরা ভাবে মারুফ কাজীর কথা, সামিরার পুরুষ কার কথা ভাবে, সামিরা জানে না।

জানতে চাই, মারুফ কাজীও তো বিবাহিত। যদিও তার শালি নেই, নচ্ছাড়টা জাতির কোনো কাজেই এলো না। সামিরা এ কথা জেনে কেন ... ?

সামিরার উত্তরটা আসার আগেই বুঝে যাই। এর কোনো উত্তর তো হয় না। ভালো লাগার পেছনে তো এত হিসাব থাকে না।

সামিরার গোলাপগুলি মলিন হয় না, শুধু একটু একটু করে সামিরাকে মলিন হতে দেখি। হিন্দি সিরিয়াল চলতে থাকে, বউ রাজত্ব করে টিভির আওয়াজ যতদূর যায় ততদূরের সমস্ত বর্গফুট নিয়ে, কিন্তু সামিরাকে অনলাইনে দেখি না।

পহেলা ফাল্গুনে বসন্ত উৎসবে বউকে নিয়ে বেড়াতে গিয়ে একা হয়ে যাই, বউ তার গোটা দুয়েক বান্ধবী খুঁজে পেয়ে আমাকে দাঁড়িয়ে থাকার হুকুম দিয়ে কোথায় যেন হারিয়ে যায়। তার স্মরণশক্তির দৌর্বল্যের ওপর ভরসা করে একটু ডানে বামে যাই। আর চারুকলায় একটি নিভৃত কোণে দেখা হয়ে যায় মারুফ কাজীর সঙ্গে। যথারীতি তার সঙ্গে তার নিজ স্ত্রী নয় এমন একটি রমণী। দীর্ঘাঙ্গিনী, সুকেশা, মুখটি মলিন। এ-ই হয়তো নতুন শিকার, সেই সুমনা মোস্তফা।

সম্ভাষণ জানাতেই মারুফ কাজী একটু চমকে ওঠে, বলে, কীরে বাবু, কেমন আছিস? তোর বউ কই?

মহা বিরক্ত লাগে। আমার বউ দিয়ে তুই কী করবি ব্যাটা লম্পটেশ? তোর নিজের বউ কই? সঙ্গে এটা কাকে নিয়ে ঘুরঘুর করছিস?

কিন্তু মুখে বলি, "এই তো।"

দীর্ঘাঙ্গিনী এবার হাসে একটু কষ্টে, বলে, "চিনতে পারেন?"

হাসিটাকে চিনি ভালো করেই, হাসির মালকিনকে চিনতে পেরে এবার চমকে উঠি। এ কী হাল সামিরার?

কৃশ হাসিটি আবার পায়ে পায়ে পিছিয়ে হারিয়ে যায় কোনো অন্ধকারে, প্রশ্নের জবাবে সামিরা শুধু বলে, "এই তো, ঝামেলা যাচ্ছে আর কি।"

দেখতে পাই, মারুফ কাজীর হাত সে শক্ত করে চেপে ধরে আছে, তার নখগুলো সাদা হয়ে আছে।

যুগলটি বেশিক্ষণ থাকে না সেখানে, মারুফ কাজী ত্রস্তপায়ে চলে যায় কোথায় যেন। আর আমার বউও কোত্থেকে আবার চলে আসে, "য়্যাই, তোমাকে না বললাম দাঁড়িয়ে থাকতে?"

বউগুলো শুধু দাঁড়া করিয়ে রাখতে চায়।

পরের দিনটা ব্যস্ত গিয়েছিলো, অফিস থেকে ফিরেছিলাম একটু দেরিতে, চায়ের কাপ হাতে ফেসবুক খুলে পেলাম দুঃসংবাদটা। মেসেজে মেসেজে ভরে গেছে ইনবক্স।

আত্মহত্যা করেছে সামিরা। পুরনো গল্প। ফ্যানের সাথে ওড়না, সেই ওড়নার সাথে একটি অভিমানী শিশু। খবরের কাগজেও এসেছে সে দুঃসংবাদ।

বড় দুঃখ পাই। বউ আমার বাষ্পমাখা চোখ দেখে ছুটে আসে। তাকে কী করে বোঝাই, সামিরার সাথে পরিচয় কেমন, কীভাবে? আরেকটি নারীর সাথে প্রেমের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে কোনো বেগ পেতে হয় না, কিন্তু আমার সাথে একটি হাসিমুখ আর গোলাপস্রোতের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করা বড় জটিল। সামিরা আমার বন্ধু
নয়, প্রেমাস্পদাও নয়। প্রতিদিন যে চড়ুই সকালে ডেকে ঘুম ভাঙায়, একদিন সে হঠাৎ আর না এলে যে বেদনা অনুভব করি আমরা, সেই চড়ুইয়ের মতোই সামিরা বেদনা জাগিয়ে তুলেছে কেবল।

মারুফ কাজীর দেয়াল খোঁজ করতে গিয়ে দেখি, সে আর নেই ফেসবুকে। নাম ধরে খুঁজেও তাকে পাই না, যেন সে কখনো ছিলোই না। যথার্থ লম্পটের মতো সে নিরুদ্দেশ।

তারপর কয়েকদিন অনেক বেকার কথা ঘুরপাক খায় নিষ্কর্মা বাঙালির ফেসবুকের দেয়ালে। সামিরার দেয়ালের নানা অর্ঘ্য দিয়ে আসে তার বন্ধুরা, তাকে খবরের কাগজ পড়ে চিনেছে এমন আবেগখোর অপদার্থের দল। তারপর আবার আস্তে আস্তে উত্তাপ পড়ে আসে, সামিরার দেয়ালে আর নতুন লতাগুল্ম গজায় না।

আজ ফেসবুকে নিজের দেয়াল সাফ করতে গিয়ে এক এক করে নিষ্ঠুরের মতো সাফ করলাম সামিরার পাঠানো সব ক'টি গোলাপ। কেবল একটি রেখে দিলাম। থাকুক।


সকল চরিত্র ও ঘটনা কাল্পনিক। বাস্তবের সাথে মিল কাকতালমাত্র।


এ গল্পটি রহস্যপত্রিকার অগাস্ট, ২০১২ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে।

1 comment:

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।