Monday, December 13, 2010

উটপশু আর উটপাখি

পোস্টটা শুরু করি প্রথম আলোর একটি আর্টিকেল উদ্ধৃত করে।

ভারতের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত

রাহীদ এজাজ | তারিখ: ১০-১২-২০১০

রাষ্ট্রীয় ঋণের আওতায় ভারতের এক্সিম ব্যাংক থেকে পাওয়া ১০০ কোটি ডলারের পণ্য ও সেবা ভারতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কিনতে হবে। এর মধ্যে ৮৫ শতাংশ পণ্য সরাসরি ভারতের কাছ থেকে কিনতে হবে, আর অবশিষ্ট ১৫ শতাংশ কিনতে হবে ভারতীয় ঠিকাদারের পরামর্শে। এ ছাড়া ঋণ চুক্তির আওতায় যেসব প্রকল্পে অর্থায়ন হবে, তাতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন লাগবে।

...

জানা গেছে, গত ৮ নভেম্বর নাদিম পাঞ্জেতানের নেতৃত্বে আসা এক্সিম ব্যাংকের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে ইআরডিতে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের বৈঠক হয়। বৈঠকে ৮৫ শতাংশ পণ্য ভারত থেকে কেনার বিষয়টি উত্থাপন করা হয়। এ ব্যাপারে অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি ব্যাখ্যা চাইলে এক্সিম ব্যাংকের কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশের কাছে ৮৫ শতাংশ পণ্য বিক্রি করা হবে, তা হবে ভারতে উৎপাদিত। দরপত্রে যেসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অংশ নেবে, সেগুলো ভারতে নিবন্ধিত, প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বত্বাধিকারীরাও হবেন ভারতীয় নাগরিক এবং ৫১ শতাংশ মালিকানা হবে ভারতীয়। অন্যদিকে, ভারতের বাইরে থেকে যে ১৫ শতাংশ পণ্য বাংলাদেশ কিনবে, সেটি ঠিক করে দেবে ভারতীয় ঠিকাদারেরাই। সে ক্ষেত্রে তৃতীয় দেশ থেকে কেনা হতে পারে, আবার ভারত আমদানি করেও তা বাংলাদেশে সরবরাহ করতে পারে।

ঋণ চুক্তি অনুযায়ী ১০০ কোটি ডলারের জন্য বছরে ১ দশমিক ৭৫ শতাংশ হারে সুদ দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিবছর শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ হারে ‘কমিটমেন্ট ফি’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ বিষয়ে রেল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়, বগি ও ইঞ্জিন কিনতে ১৮ থেকে ২৪ মাস লেগে যায়। সে ক্ষেত্রে, পণ্য কেনার আগেই ওই ফি গুনতে হবে বাংলাদেশকে। এ ব্যাপারে এক্সিম ব্যাংকের কর্মকর্তা পরামর্শ দেন, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রকল্প নির্বাচিত করে তা যেন ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের মাধ্যমে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এরপর তা যেন এক বছরের মধ্যেই পাওয়া যায়, তার ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে বাংলাদেশকে ওই কমিটমেন্ট ফি গুনতে হবে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ সময় বলা হয়, ১৮ থেকে ২৪ মাস সময় লাগা ছাড়াও ভারতীয় ঠিকাদারেরা যদি কালক্ষেপণ করেন, বাংলাদেশের কী করার আছে। এমন প্রশ্নের উত্তরে নাদিম বলেন, ঠিকাদারদের বুঝিয়ে এক বছরের মধ্যে তা পাওয়ার চেষ্টাটা বাংলাদেশকেই করতে হবে।

সড়ক ও জনপথ বিভাগের পক্ষ থেকে বৈঠকে জানতে চাওয়া হয়, আখাউড়ায় সেতু নির্মাণে যে সেবা দেওয়া হবে, তার মধ্যে নির্মাণসামগ্রী অন্তর্ভুক্ত কি না। এক্সিম ব্যাংকের কর্মকর্তা জানান, ‘প্রজেক্ট এক্সপোর্ট’ নামের ওই সেবা প্রকল্পের মধ্যে রড, বালু, সিমেন্টসহ সব ধরনের নির্মাণসামগ্রী অন্তর্ভুক্ত। ভারতীয় নির্মাণসামগ্রীর নিম্নমান এবং এসব পণ্য দিয়ে নির্মিত হলে সেতু মানসম্পন্ন হবে না—বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ কথা বলা হলে ভারতীয় ব্যাংকের কর্মকর্তা জানান, চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশকে ভারতীয় নির্মাণসামগ্রীই কিনতে হবে। কারণ, এক্সিম ব্যাংকের শর্ত অনুযায়ী কোনো প্রকল্পের পরামর্শসেবার আওতায় সবকিছু ভারতীয় উৎসের হতে হবে।

মান নিয়ন্ত্রণ নিয়েও নানা প্রশ্ন: বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউটের (বিএসটিআই) সামর্থ্য বাড়াতে ঋণ চুক্তির আওতায় বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি কেনার কথা রয়েছে। ভারত যেখানে জার্মানি, সুইজারল্যান্ডসহ পাশ্চাত্যের বিভিন্ন দেশ থেকে ওই সব যন্ত্র্রপাতি সংগ্রহ করে, সেখানে বাংলাদেশ কেন ভারত থেকে তা সংগ্রহ করবে—বৈঠকে জানতে চান বিএসটিআইয়ের প্রধান। এক্সিম ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক চুক্তির কথা উল্লেখ করলে ক্ষোভ প্রকাশ করে বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক বলেন, ভারতীয় যন্ত্র্রপাতি দিয়ে কখনো বিএসটিআই আধুনিকায়ন সম্ভব নয়। কাজেই এসব যন্ত্রপাতি নেওয়ার দরকার নেই।

নিয়মিত জানাতে হবে: ভারতের দেওয়া ঋণে বাংলাদেশের আর্থসামাজিক পরিবর্তন কতটা হলো, তা নিয়মিতভাবে জানাতে হবে এক্সিম ব্যাংককে। এ নিয়ে ইআরডির সচিব প্রশ্ন তুলে বলেন, এ বিষয়টির উল্লেখ ছিল না চুক্তিতে। কিন্তু নিজের অবস্থানে অনড় থাকেন নাদিম।
...


[সূত্র]
পরবর্তী সংবাদটিও একই ধাঁচের, কালের কণ্ঠে প্রকাশিত, ১১ ডিসেম্বর তারিখে।

ভারতের সঙ্গে যৌথ বিদ্যুৎকেন্দ্র খুলনায়: ক্ষমতা ২৬৪০ মেগাওয়াট, খসড়া চুক্তিপত্রে পিডিবির স্বার্থ উপেক্ষিত

ফারুক মেহেদী

বিদ্যুৎ সংকট কাটাতে খুলনায় বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ বিনিয়োগে প্রতিটি ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, (পিডিবি) এবং ভারতের পক্ষে ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার কম্পানি (এনটিপিসি) এ বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে। মোট ২৬৪০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এ বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পে বাংলাদেশ ও ভারতের সমান অংশীদারিত্ব থাকবে। এরই মধ্যে প্রকল্পের যৌথ বিনিয়োগ চুক্তিপত্রের (জেভিএ) খসড়া তৈরি করা হয়েছে। খসড়া চুক্তিপত্র অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ভারতীয় সংস্থা এনটিপিসির একচ্ছত্র কর্তৃত্ব থাকবে। ওই সংস্থা অনুমোদন না দিলে প্রস্তাবিত প্রকল্পের কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। খসড়াটি গত ২ ডিসেম্বর বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে পাঠানো হয়েছে মতামতের জন্য।

...

পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক ও বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞ বি ডি রহমতুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রকল্পটি ভারতীয় স্বার্থ বিবেচনায় রেখেই করা হচ্ছে। ভারতের বাজে কয়লা, তাদের বেকার লোকজনের কর্মসংস্থান, অদক্ষ জনবলকে বিশেষজ্ঞ হিসেবে এখানে কাজে লাগানো হবে। আমাদের দেশের বিশেষজ্ঞরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করলেও এখানে আসছেন ভারতীয়রা।’ তিনি বলেন, ‘পিডিবিতে অন্তত ৬০ জন বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। এখানে খসড়া যা করা হয়েছে, তার খুব একটা পরিবর্তন হবে বলে মনে হয় না।’

...

খসড়ায় আরো বলা হয়, বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরুর পরবর্তী ৩০ বছরে কোনো করপোরেট কর দেবে না এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র। এমনকি প্লান্ট, যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ, অবকাঠামো নির্মাণসামগ্রী, জ্বালানি আমদানিতেও কোনো রকমের শুল্ক, ভ্যাট, সারচার্জ, আমদানি পারমিট ফিসহ কোনো ধরনের মাসুলও দেওয়া হবে না ওই সময় পর্যন্ত। স্থানীয় বাজার থেকেও বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রয়োজনে কোনো কেনাকাটা করলে তাও শুল্ক-কর-ভ্যাটমুক্ত থাকবে। এমনকি বিদেশি উৎস থেকে এ প্রকল্পের জন্য ঋণ নেওয়া হলে ঋণদাতা আয়কর ও ঋণের সুদের ওপর আয়কর থেকে মুক্ত থাকবে। প্রকল্পে নিয়োজিত বিদেশি সংস্থা তার শেয়ারের পুঁজির মুনাফা স্থানান্তর করলেও তা করমুক্ত থাকবে। প্রকল্পের প্রয়োজনে স্থানীয় বা বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেওয়া অথবা অর্থ সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার, বিনিয়োগ বোর্ড কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা জারি করতে পারবে না।

খসড়া চুক্তিপত্র অনুযায়ী বাংলাদেশ সরকার প্রকল্পটিকে সাধারণ বীমা করপোরেশনে ইনস্যুরেন্স বা পুনঃইনস্যুরেন্স করাতে বাধ্য করতে পারবে না এবং প্রকল্প কর্তৃপক্ষ চাইলে আন্তর্জাতিক কোনো বীমা কম্পানিতে ইনস্যুরেন্স করাতে পারবে। এমনকি প্রকল্পটি যখন বাংলাদেশের স্থানীয় আইনে চুক্তিবদ্ধ হবে তখন প্রযোজ্য স্ট্যাম্প শুল্কও আদায় করা যাবে না। এ প্রকল্পে যেসব বিদেশি বিশেষজ্ঞ চাকরি করবেন, তাঁদের আয় প্রথম তিন বছর করমুক্ত রাখতে হবে এবং তাঁদের আয়ের ৫০ শতাংশ নিজ দেশে পাঠানোর সুযোগ থাকতে হবে। প্রকল্পে নিয়োজিত বিদেশিদের ওয়ার্ক পারমিটে কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকতে পারবে না।

খসড়া চুক্তিপত্রের ‘সংরক্ষিত ইস্যু’ অংশে বলা হয়েছে, চুক্তিপত্রে যা-ই থাকুক না কেন, এনটিপিসির অনুমোদন ছাড়া প্রকল্পের উন্নয়ন, বিনিয়োগ বা এর শেয়ার, ব্যবসা স্থানান্তর, সম্পদ বিক্রি, অন্য কোনো যৌথ বিনিয়োগ চুক্তি বা নতুন সংস্থায় বিনিয়োগ ইত্যাদি কিছুই করা যাবে না। বোর্ড সভায় ব্যবসায়িক পরিকল্পনা অনুমোদন করা হলেও নতুন পরিকল্পনা প্রণয়ন, ব্যবসা সম্প্রসারণ, অবকাঠামো নির্মাণ, এর ব্যয়, নকশা, বাণিজ্যিক পরিকল্পনা, বার্ষিক বাজেট ইত্যাদি ক্ষেত্রে এনটিপিসির অনুমোদন লাগবে। এ ছাড়া বিল পরিশোধ জিম্মা নির্দেশনার (গ্যারান্টি গাইডলাইন) কোনো পরিবর্তন, প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক, পরিচালন ও বার্ষিক বাজেট অনুমোদন, মুনাফার বিপরীতে ডিভিডেন্ড ঘোষণা দেওয়া, বিগত সময়ের খরচের ২০ শতাংশের বেশি খরচ প্রাক্কলন করা, জমি অধিগ্রহণ, ভবন পণ্য বা সেবাসংক্রান্ত কাজে দালালকে কোনো বিল পরিশোধ করা যাবে না এনটিপিসির অনুমোদন ছাড়া।

খসড়ায় আরো বলা হয়, প্রকল্পের মার্জার বা আত্তীকরণ, পুনর্নির্মাণ, সম্পদ স্থানান্তর, প্রকল্পের জন্য অনাবশ্যক কোনো বোঝা তৈরি, প্রকল্প পরিকল্পনায় নেই এমন পরিকল্পনা করা, কোনো পার্টিকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া, জিম্মা থাকা, পেইড-আপ ক্যাপিটালের কোনো রকম পরিবর্তন, বার্ষিক পরিকল্পনার বাইরে নতুন ঋণ নেওয়া, শেয়ার বিভক্তিকরণ, বাড়ানো, কেনা বা বাতিল করা, রাইট ও বোনাস শেয়ার ইস্যু করা, সংস্থার সমঝোতা স্মারক পরিবর্তন, প্রকল্পের জন্য অডিটর নিয়োগ বা বাতিল করা, নতুন কোনো হিসাব নীতিমালা চালু করা, ব্যাংকিং দেউলিয়াত্ব বা অক্ষমতাসহ অন্য কোনো আর্থিক কারণে মামলা করা, প্রকল্পের পরিচালক বা প্রিন্সিপাল অফিসার নিয়োগ, বাতিল বা তাঁদের সম্মানী নির্ধারণ, প্রকল্পের কোনো সহযোগী প্রতিষ্ঠান তৈরি, পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া, আইপিও ছাড়া যাবে না এনটিপিসির অনুমোদন ছাড়া।

এ ছাড়া পাঁচ মিলিয়ন (৫০ লাখ) ডলার মূল্যের বেশি কার্যাদেশ দেওয়া, পাঁচ লাখ ডলারের বেশি ব্যয়ে পরামর্শক সংস্থার কার্যাদেশ, ২০ হাজার ডলারের বেশি নয় এমন স্টোরের সামগ্রী, যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ ইত্যাদির অবলোপন বা রাইট অফ, এক হাজার ডলারের বেশি নয় এমন নগদ অর্থের অবলোপন, প্রকল্পের কোনো স্টাফের ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ ১০ হাজার ডলারের বেশি দেওয়া ইত্যাদি ক্ষেত্রেও ভারতীয় কম্পানি এনটিপিসির অনুমোদন নিতে হবে।

ভারতীয় পক্ষে প্রকল্পের স্বার্থে এনটিপিসির অনুমোদন নেওয়ার যেসব শর্ত প্রস্তাব করা হয়েছে, সে রকম শর্ত পিডিবির পক্ষে প্রযোজ্য হলেও তা করা হয়নি খসড়ায়। অর্থাৎ যৌথ ব্যবস্থাপনার এ প্রকল্পে পিডিবির কোনো বিষয়ে আপত্তি করার কোনো বিধান রাখা হয়নি খসড়ায়।


[সূত্র]

কয়েকদিন আগে শাহরুখ খান বাংলাদেশে এসে মঞ্চে নৃত্য ও রঙ্গ পরিবেশন করে গেছেন, এ নিয়ে সচলায়তনে দু'টি প্রতিক্রিয়া প্রকাশিত হয়েছে [প্রতিক্রিয়া ১প্রতিক্রিয়া ২]

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কিংবা মান নির্ধারক যন্ত্রপাতির সাথে হিন্দি বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান বা হিন্দি সিনেমার কী সম্পর্ক, এটা পাঠক আমাকে করতেই পারেন। সম্পর্ক আছে। আমি ভারতের এক্সিম ব্যাঙ্ক, এনটিপিসি কিংবা শাহরুখ খানকেও কোনো দোষারোপ করতে চাই না। আমি শুধু কৌশলী ভারতের বাণিজ্যফ্রন্টের তিনটি শাখা পাঠকের সামনে তুলে ধরলাম।

আজ থেকে ঠিক তিন বছর আগে সচলায়তনে একটি পোস্ট প্রকাশ করেছিলেন সচল বিপ্রতীপ। "বাঙ্গালী কি হুজুগে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলো?" শিরোনামের ঐ পোস্টে তিনি গত শতাব্দীর চল্লিশের দশকে জনৈক বি. আর. মোল্লার লেখা একটি পোস্টকার্ডের স্ক্যান্ড কপি প্রকাশ করেছিলেন। আজ থেকে সত্তর বছরেরও বেশি সময় আগে মোল্লা সাহেব তাঁর এক আত্মীয়কে লিখেছিলেন,

‘কিন্তু যা করি তাহা কিছুই ভালো লাগে না, কারন আমরা বাঙ্গালী খোদা তাল্লার কাছ হইতে যে কি আনিয়াছি তাহা বলতে পারি না, কারন মুসলমানের হাত হইতে গেল ইংরেজদের হাতে রাজত্ব শিখিতে হইলো ইংরেজি, আবার জোরে যে বাহু বলে আনিয়া স্বদেশ পাকিস্তান তাও আবার রাষ্ট্রভাষা উর্দু হবে। এখন দেখা যায় আমরা বাঙ্গালী চীর কাল শুধু রাষ্ট্রভাষাই শিখিয়া যাইতে হবে। কিসের সংসার উন্নতি কিসের চাকরি, শুধু আনিয়াছি আমার খোদা তাল্লার নিকট হইতে রাষ্ট্রভাষার কপাল। এই আমাদের কাজ কিন্তু খোদা তাল্লাই বিচার করিবে। তবে আমরা বীরের মতো পাঞ্জাবীর উপর আক্রমন করিতে প্রস্তুত হইতেছি। আপনারাও তৈয়ার হন, একবার তাহাদের সাথে লড়িব, জয় নাহয় পরাজয়।’


আমরা যারা বাংলা ভাষাকে দৈনন্দিন জীবনে স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে ব্যবহারের অধিকারকে প্রাপ্য ধরে নিয়েছি, তাদের পক্ষে আরেকটি ভাষার আগ্রাসনের ব্যাপারটা অনুভব করা সম্ভবত একটু মুশকিলই।

গতবছর প্রাগে বেড়াতে গিয়ে অনুভব করেছি, একটা ভাষা না জানার কী সমস্যা। প্রাগ ইয়োরোপের ট্যুরিস্ট অধ্যূষিত শহরগুলোর অন্যতম, সারা দুনিয়া থেকে লোকজন গিয়ে গিজগিজ করে, সেখানে দোকানপাট যারা চালায়, তারা কিছু ইংরেজি জানবে, এটা আশা করা হয়তো ভুল ছিলো না। কিন্তু ইংরেজি, জার্মান, ভাঙাভাঙা ফরাসী বা স্প্যানিশ, চারটা ভাষার একটার জবাবেও প্রাগের দোকানদার খালাম্মারা চেক ভাষা ছাড়া অন্য কিছুতে জবাব দেননি। তাদের দেহভাষা পরিষ্কার ছিলো, কেনার ঠ্যাকা তোমার, কাজেই আমার কথা বোঝার ঠ্যাকাও তোমার। আমি আর আমার বন্ধুরা বোকা বনে গিয়েছিলাম, কিছুটা ক্রুদ্ধও। এটাকে ভাষার আগ্রাসন বলা যাবে না, বড়জোর ভাষাপ্রাচীর বলা যেতে পারে।

এবার উল্টো অভিজ্ঞতার কথা বলি। জার্মান সাংস্কৃতিক কেন্দ্রর পক্ষ থেকে একবার শেরাটনে এক শিক্ষামেলায় জার্মান শিক্ষা বিনিময় পরিষেবার [ডয়েচার আকাডেমিশার আউসটাউশডিন্সট] স্টলে কামলা খাটতে গিয়েছিলাম। সেখানে দিল্লি থেকে আগত জনৈকা জার্মান যুবতী এবং ভারতীয় যুবককে সাহায্য করতে হবে। এ দু'জনের সাথে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে জার্মানই ব্যবহার করছিলাম। শিক্ষামেলা কর্তৃপক্ষ [এরা হোলসেল ধান্দাবাজ] আমাদের সাথে সাদা চামড়ার লোক দেখে গলে গিয়ে এক তরুণ এবং এক তরুণীকে পাঠালেন সাহায্য করার জন্যে। আমার খাটনি তাতে একটু লাঘব হওয়ায় ভালোই লাগছিলো। একটু পর সেই ভারতীয় যুবক আমাকে এসে হাসিমুখে হিন্দিতে বললেন, বাহ, তোমাদের এখানে তো সবাই চমৎকার হিন্দি বলে! আমি তার হাসির আড়ালে দাঁত বার করা তাচ্ছিল্যটুকু দেখে অপমানিত হয়েছিলাম। এবং সত্যিই তাই, সেই তরুণ আর তরুণী ইংরেজিতে কাঁচা হলেও গড়গড়িয়ে হিন্দি বলে যাচ্ছিল সেই ভারতীয় ভদ্রলোকের সাথে। আমি দু'জনকে একটু তফাতে ডেকে নিয়ে বিনয়ের সাথে অনুরোধ করলাম, আপনারা একটু কষ্ট করে হলেও ইংরেজিতে কথা বলুন। তারা আমার অনুরোধ রাখলেন তো না-ই, ঝাঁঝিয়ে উঠলেন। আমি মানুষের সাথে সহজে দুর্ব্যবহার না করলেও প্রয়োজনের সময় পিছপা হই না, আমি তাদের প্রায় ঘাড়ধাক্কা দিয়ে স্টল থেকে বার করে দিয়েছিলাম। কাজটার জন্যে আমি গর্বিত নই, কিছুটা লজ্জিতই। তবে সেই ভারতীয় ভদ্রলোক পরবর্তী আটচল্লিশ ঘন্টায় আমার বা আমার সহপাঠীদের সাথে একটিও হিন্দি শব্দ ব্যবহারের আগ্রহ পাননি।

প্রাগের চেক দোকানদার খালাম্মার সাথে ঢাকা শেরাটনের সেই তরুণতরুণীর মানসপটের পার্থক্য থাকবেই। আমরা বিদেশীবৎসল জাতি, ভিনজাতির কাউকে হাতের কাছে পেলে তাকে নারায়ণজ্ঞানে আপন করে নিতে ক্ষেপে উঠি, চেকরা কমবেশি বিদেশীবিদ্বেষী।

ভাষার আগ্রাসনের দিকটা যদি আমরা এবার এভাবে কল্পনা করি, খোদ বাংলাদেশে বসেই একটা ভাষা না জানার কারণে আমাদের কোনো একটা সেবা বা পরিষেবা বা সুবিধা পেতে প্রবল সমস্যা হচ্ছে, তাহলে পরিস্থিতি কেমন দাঁড়ায়? ইতিমধ্যে এমন একটি ভাষা আগ্রাসী রূপে বাংলাদেশে বিরাজ করছে, ইংরেজি। কিন্তু ইংরেজি সারা পৃথিবীতেই লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কাগুলোর একটি বলে আমরা হয়তো গা করি না। ইংরেজি না জানলে আমরা বাংলাদেশে পড়ালেখা করতে পারবো না বেশিদূর, চাকরিবাকরি পেতে আর করতে অনেক সমস্যা হবে, সামাজিক পরিমণ্ডলে অচ্ছ্যুৎ হিসেবে বিবেচিত হবো, এমনকি হাইকোর্টের রায়ও পড়তে পারবো না, এরকম আরো নানা ভ্যাজাল আছে।
সমস্যা হচ্ছে, ইংরেজির পাশাপাশি প্রবাদের উটের মতো আমাদের তাঁবুতে মাথা গলিয়েছে হিন্দি উট।

hindiserial

আটচল্লিশ সালে জিন্নাহ টপ-ডাউন প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের সব প্রদেশের ওপর রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দু চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। বাঙালি বটম-আপ প্রক্রিয়ায় উর্দুর পাশাপাশি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে ছেড়েছিলো। উর্দুর আগ্রাসন আমাদের কাছে পরিষ্কার, কারণ উর্দুর স্বার্থে এদেশে রক্তপাত হয়েছে, রাষ্ট্র মানুষের ওপর গুলি চালিয়েছে। হিন্দির আগ্রাসন নীরব ও কোমল। ঘরে ঘরে কামানের বদলে টেলিভিশনগুলো গুলি ছুঁড়ছে, আমরা সোৎসাহে সেই গুলি সেবন করে যাচ্ছি আফিমের গুলির মতো। কার্টুন নেটওয়ার্ক নামের শিশুপ্রিয় চ্যানেলটির সম্পূর্ণ হিন্দি-ডাবড সংস্করণ এখন বাংলাদেশের শিশুরা বসে বসে দেখছে। তাদের বিনোদনের সুস্থ উপায়গুলো আমরা নষ্ট করছি এক এক করে, তাদের খেলার মাঠ নেই, বন্ধুদের সাথে মিলে হইচই আড্ডা এক্সকারশন নেই, তাদের আছে শুধু স্যারের বাসা, কোচিং সেন্টার আর লোডশেডিঙের ভিড়ে বিনোদনের একমাত্র জানালা, হিন্দিভাষী কার্টুন আর নাচগান। আমাদের অভিভাবকরাও কমবেশি গর্বিত, বাচ্চা গড়গড় করে হিন্দি বলা শিখে গেছে, শিলা কি জাওয়ানি নাচতে পারে এই বাচ্চা বয়সেই! বিয়ের অনুষ্ঠানে হিন্দি গানের সাথে নাচ এখন একটা অবশ্যপরিবেশনীয় আইটেম, দুইদিন পর এটা না করলে ইজ্জত থাকবে না। হিন্দি সিরিয়ালে দেখানো জামা বানানোর জন্যে গাউসিয়াতে লাইন দিচ্ছি আমরা, মোবাইল টেলিফোনে প্রেমাস্পদাকে গদগদ হিন্দিতে আমরাই ভালোবাসা জানাচ্ছি।

hindiserial3

এই সমালোচনার জবাবে যারা হিন্দি রসে মজে আছেন, তারা বলছেন, ভালো বাংলা কনটেন্ট তো নেই, হিন্দি দেখবেন না তো কী দেখবেন? এবং তারা রীতিমতো অপমানিত বোধ করেন এই প্রসঙ্গ তুললে। অনুমান করা কঠিন নয়, হিন্দি তাদের কাছে এখন একটি টোটেমে পরিণত হয়েছে। আমরা ইংরেজি পারি না বলে বিদেশী ভাষা হিসেবে হিন্দিকে গ্রহণ করছি উদার হাতে, এবং এ নিয়ে কথা উঠলে তেড়ে আসছি। সমস্যাটা প্রকট হবে তখন, যখন বটম-আপ পদ্ধতিতে আমরা হিন্দিকে দেশের দ্বিতীয় ভাষার কাছাকাছি তুলে আনবো। এখন যেভাবে চলছে, সেভাবে চলতে থাকলে এটা ঘটতে আর বছর আষ্টেক সময় লাগতে পারে। তখন হিন্দি না জানার পরিণতি হবে ইংরেজি না জানার পরিণতির মতোই। আমরা কাজ পাবো না, সমাজে মিশতে পারবো না। দেশ দখল নিয়ে বিম্পি খুব বড় বড় কথা বলে, ট্র্যানজিট করিডর ইত্যাদি বলে চিৎকার করতে থাকে, কখনও শুনিনি, ভারতের এই সংস্কৃতি-কামানের বিরুদ্ধে কোনো কথাবার্তা বলতে। রাজনীতিকদের নাতিপুতিরাও যে হিন্দিরসে হেজেমজে আছে, সেটার উদাহরণ শেখ হাসিনার নাতনি আলিফ লায়লা নানা ছাগলামিতে আমাদের সামনে স্পষ্ট করেছে।

hindiserial2

দেশ শুধু ভৌগোলিক সীমার ব্যাপার নয়, মানুষ নিয়েই দেশ। সেই মানুষের মনকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে ভূগোল কে চোদে?

আমাদের সচেতনতার অভাবে এই দেশে বটম-আপ প্রক্রিয়াতেই হিন্দির গোড়া শক্ত হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে এখন টপ-ডাউন প্রক্রিয়াতে ব্যবস্থা নিতে হবে। আমি চাই, সরকার এই দেশে হিন্দি চ্যানেলের সংখ্যা এবং এয়ার টাইম নিয়ন্ত্রণ করার জন্যে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করুক। শাশুড়ি তার পুত্রবধুর পোঁদে কী কী প্রক্রিয়ায় আঙুল দিচ্ছে, তা হিন্দি ভাষায় না দেখলে আমাদের বিনোদনজগতে কোনো ক্ষতি হবে বলে আমার মনে হয় না। সংবাদপত্রগুলো যে অশ্লীল মাত্রায় কাভারেজ দেয় হিন্দি চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনকে, সেটা বন্ধ করতে হবে। আমাদের দেশীয় চ্যানেলগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে, দেশী প্রোগ্রাম নির্মাতাদের আরো আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে ভালো অনুষ্ঠান নির্মাণে উৎসাহিত করতে হবে। আমরা যারা ভোক্তা, তাদের আনুগত্য স্থাপন করতে হবে দেশী অনুষ্ঠান ও কনটেন্টের ওপর।

যদি না করি?

নাদিম পাঞ্জেতান এসে ঠিক করে দেবেন, আমরা কার কাছ থেকে কী কিনবো। এনটিপিসি এসে ঠিক করে দেবে, আমাদের দেশে বিদ্যুৎ খাতে কে কীভাবে বিনিয়োগ করবে। আর শাহরুখ খান এসে হাসিমুখে রঙ্গ করে বলবেন, কোলকাতা নাইট রাইডার্সের জন্য বাচ্চা পয়দা করতে। আমরা সবই চুপ করে মেনে নেবো। কয়েকজন হয়তো বি. আর. মোল্লার মতো ইমেইল বা ব্লগ লিখবেন ইউনিকোড বাংলায়।

উটের পিঠ ভাঙে শেষ পর্যন্ত একটা খড়। আর উটপাখি বালুতে মুখ গুঁজে রাখতে পারে, তাতে ঝড় থামে না।



No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।