Thursday, November 18, 2010

আম যেভাবে জাতীয় বৃক্ষ হলো

১.

সচিব মহোদয় ফাইলটি খুললেন শুরুতে। তারপর চোখ খুললেন।

নাহ, সব ঠিকই আছে। ছয়টার কথাই বিশদ লেখা আছে। বৈজ্ঞানিক নামধাম, কোথায় জন্মে, কত উঁচু হয়, উপকারিতা কী, ইত্যাদি নানা হাবিজাবি গুছিয়ে লেখা আছে। দুই সপ্তাহ আগে এক অধিদপ্তরের কর্তা এই ফাইল পাঠিয়েছিলো, তাতে হিজল আর তাল ছিলো না। দুটো গাছকে ফাইলে ঢোকাতে মাত্র দুই সপ্তাহ লেগেছে। মনে মনে উপসচিবের প্রশংসা করলেন তিনি। ছেলেপেলে খুব কর্মঠ হয়ে উঠছে। প্রশাসনের কাজে গতি আসতে শুরু করেছে। তিনি যখন উপসচিব ছিলেন, তখন হিজলকে ফাইলে ঢোকাতে কমসে কম মাস তিনেক লাগতো। তালের জন্যে আরো দেড় মাস। তারপর আবার সব খুঁটিয়ে দেখে দুই ধাপ টপকে সচিবের হাতে ফাইল পৌঁছাতে পৌঁছাতে আরো মাস তিনেক। অধিদপ্তরের কর্তা উপসচিব সেদিনের ছোকরা, রক্ত গরম এখনও, সব কাজ চটজলদি সেরে ফেলতে চায়। আমলাদের হতে হয় কুমীরের মতো, সব শক্তি আর তাপ নিতে হয় চারপাশ থেকে, সময়মতো মওকা বুঝে তড়িৎগতিতে নড়তে কিংবা চড়তে হয়, বাকিটা সময় কাটিয়ে দিতে হয় চুপচাপ রোদ পোহানোতে। লাফঝাঁপ দেয় ব্যাং।

তার নিজের পছন্দ হিজল। গ্রামের বাড়িতে বাড়ির মেয়েদের গোসলের পুকুরের পাশে হিজলের সারি চোখে ভাসে এখনও। কী চমৎকার একটা গাছ, হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের চোদনাপনার কারণে।

সচিব মহোদয় একটু গম্ভীর হয়ে ওঠেন। মানুষের চোদনাপনার জন্যে নয় ... নচ্ছাড়পনার জন্যে, নিজেকে সংশোধন করেন তিনি মনে মনে। আ ম্যান ইজ অ্যাজ গুড অ্যাজ হিজ থটস।

বাকি পাঁচটা গাছও মন্দ নয়। আম। তাল। পলাশ। শিমুল। কদম। ঢাকা শহর থেকে বেরিয়ে খোলা বাংলাদেশের কোথাও তাকালে এদের একটা না একটা চোখে পড়বেই। আরিচা রোডের দুই পাশে একটু পর পর পলাশ আর শিমুল। তাদের সারি চলে গেছে পদ্মা পেরিয়ে সুদূর পটুয়াখালি পর্যন্ত। বসন্তের শুরুতে বাংলাদেশের মহাসড়কগুলো এই দুই গাছের শাসনে রঙিন হয়ে থাকে। কদমও খারাপ নয়, যদিও কদমগাছে সাপ থাকে। আম আর তালও চলে।

কিন্তু সবার সেরা হিজল।

সচিব মহোদয় ফাইল নিয়ে উঠে পড়েন। মন্ত্রিসভায় আজ আলোচনা হবে জাতীয় বৃক্ষ নিয়ে।

২.

মন্ত্রিসভায় পেঙ্গুইনের মতো সারি বেঁধে বসে আছেন সাদাকালো মন্ত্রীবৃন্দ। সবার সামনে ফাইলের একটি কপি।

সচিব মহোদয় বিনীত সুরে প্রস্তাবটি উঠিয়ে চুপ করে বসে থাকেন। বাকিটা মন্ত্রীরা বেছে নেবেন। ছয়টা থেকে একটা। ছক্কার দান।

এক মন্ত্রী গলা খাঁকরে বললেন, "জাতীয় ফল কাঁঠাল ছিল, জাতীয় বৃক্ষ আবার অন্য কিছু করার দরকার কী? কাঁঠাল কি বৃক্ষ হিসাবে খারাপ নাকি?"

সচিব মহোদয় ফিরে গেলেন শৈশবে। পুকুরের পারে হিজল গাছ। একটা মাছরাঙা বসে আছে তার ডালে। একটা চালতা খসে পড়লো পুকুরে। শব্দ উঠলো, টুলুব! একটা বোকা মাছ ঘাই দিয়ে উঠলো মাঝপুকুরে।

অপর মন্ত্রী বললেন, "কদম একটা ফালতু গাছ। লোফার ঈভ টিজাররা এর তলে বইসা বংশী বাজায়। কদম ফুল দেখতে সুন্দর, কিন্তু কদমের কাঠ দিয়া না হয় আসবাব, না হয় লাকড়ি। কদমের থিকা নিম গাছ বেশি উপকারী। এই ফাইলে নিমের কথা লেখা নাই কেন?"

প্রথম মন্ত্রী বললেন, "ভাইসাহেব হক কথা বলছেন। নিম বড়ই কাজের বৃক্ষ। মেসওয়াক হয়। নিমের কাষ্ঠ দিয়া ভালো দোতারা হয়। নিমের আসবাবের কথা আর কী বলবো, আমার দাদাজানের নিমের পালঙ্ক আষ্টজন জোয়ান মিল্লা তুইলা এক ঘর থিকা আরেক ঘরে নিতে গিয়া হয়রান হইয়া পড়ছিলেন। নিমগাছের ফল না, পাতাও কাজে লাগে। ছোটোকালে পড়ছিলাম, নিম পাতা জোড়া জোড়া ...।"

আরেক মন্ত্রী অবজ্ঞার সুরে বললেন, "নিম পাতা জোড়া জোড়া না, আম পাতা জোড়া জোড়া।"

চতুর্থ এক মন্ত্রী গলা খাঁকরে বললেন, "এইসব পলাশ শিমুল হিজল তমাল টাইপ ফুলবাবু নাম সাজেস্ট করার দরকার কী? বৃক্ষ যদি হইতে হয় জবরদস্ত বৃক্ষ হইতে হবে। পলাশ শিমুল হিজল কদম কবি আর বয়াতিদের জন্য ফালাইয়া থোন। বৃক্ষ করেন আম নাহয় কাঁঠাল। যেমন ফল তেমন পাতা তেমন কাঠ।"

সচিব মহোদয়ের মানসপটে ভেসে উঠলো গত কুরবানির দৃশ্য। নাতিটা ঘ্যান ঘ্যান করছিলো কাচ্চি বিরিয়ানি খাবে। দু'টো খাসি কুরবানি দিয়েছিলেন। খাসির সঙ্গে এক ব্যাগ কাঁঠালপাতাও এসেছিলো।

আরেক মন্ত্রী বললেন, "আমের সঙ্গে আমাদের নাড়ির বন্ধন। সেই সিরাজুদ্দৌলার আমল থেকে আম্রকাননে ঘুরপাক খাচ্ছি আমরা। আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণাও আমের বনে। জাতীয় সঙ্গীতও আমের বনের ঘ্রাণে পাগল। গতবছর রাজশাহী গেলাম, সাতদিন ছিলাম। আম খাইতে খাইতে পাগল হয়া গেছিলাম। আমার ছোটো মেয়েটা আমের এত ভক্ত, কী বলবো। সারাক্ষণ দেখি আঁটি নিয়ে চুষতেই আছে চুষতেই আছে। আমি বললাম মামণি তুমি আঁটিটা ফালাইয়া দিয়া আরেকটা আম ন্যাও ...।"

এক মন্ত্রী বললেন, "তাহইলে আমই ফাইনাল করেন। বাকি গাছপালা লতাপাতা বাদ।"

এক মন্ত্রী মিনমিন করে বললেন, "আমি অবশ্য তালগাছের পক্ষে মত দিতে চাই। তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে, সব গাছ ছাড়িয়ে, উঁকি মারে আকাশে ...।"

প্রথম মন্ত্রী বললেন, "সারাটা ইস্কুল জীবন তালগাছ হইতে হইছে কানে ধইরা। ডান পাটা এখনও টনটন করে অমাবস্যা পূর্ণিমায়। তালগাছ চলবে না। আর ... তালগাছ জাতীয়করণের তীব্র বিরোধিতা করি।"

খুব দ্রুত আমগাছের পক্ষে সিদ্ধান্ত জমতে শুরু করে। হিজল ফিরে যায় সচিব মহোদয়ের আবছা শৈশবের পুকুরপারে। শিমুল আর পলাশ মুখ লুকায় মহাসড়কের পাশে। কদম ছায়া দেয় গ্রামীণ বংশীকুশল ঈভ টিজারদের।
আর তালগাছের মালিকানা কী করে পুরো জাতির ওপর ছাড়া যায়? মন্ত্রীরা মন্ত্রী হলে কী হবে, বাঙালি তো? বাঙালি কখনও তালগাছ অন্যের হাতে ছাড়তে পারে? হোক সেই অন্যপক্ষ গোটা জাতি।

আম জাতীয় বৃক্ষ এখন। কেহ অন্ন রাঁধি খায়, কেহ পড়ি নিদ্রা যায় এ রাজ চরণে। সরকারী দলের মন্ত্রীদের মতোই। শুন ধনি রাজকাজ দরিদ্র পালন। আমার প্রসাদ ভুঞ্জে পথগামী জন।


বিশেষ দ্রষ্টব্য: সব চরিত্র কাল্পনিক। তালগাছটা বাদে। উহা আমার। আমার।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।