Sunday, November 28, 2010

বংশলতিকা

১.
ভোরবেলা কুকুরের গম্ভীর হিংস্র ডাকে ঘুম ভেঙে গিয়েছিলো, আবছাভাবে মনে করতে পারলেন চৌধুরী মেহমুদউল্লাহ সিকান্দার। সম্ভবত তখনই চিঠিটা রেখে গেছে কোনো শালা শুয়ারের বাচ্চা, মনে মনে ভাবলেন তিনি।

কালু ডাকাতের কাজ, কোনো সন্দেহ নেই। বড় তুলোট কাগজে গোটা গোটা হরফে ফারসীতে লেখা চিঠি। কালু ডাকাতের দলে শিক্ষিত মুনশি আছে একজন, শুনেছিলেন তিনি রায়পাহাড়ের জমিদার অনিন্দ্য রায়চৌধুরীর কাছে। তবে হাতের লেখা দেখে নয়, কালু ডাকাতকে সনাক্ত করার সহজ উপায় হচ্ছে মরা হাঁস। হুমকি চিঠির সাথে একটা হাঁসের গলা কেটে পাঠায় সে।

নায়েব যতীনবাবু গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে আছেন পাশে। চৌধুরী সাহেব গলা খাঁকরে বললেন, "ফারসী পড়া আসে না আমার। চিঠিটা পড়ো সরকার।"

যতীন সরকার মুখের গাম্ভীর্য অটুট রেখে চিঠিটা পড়তে শুরু করলেন। সামান্য সুর করে একটি একটি ফারসী বাক্য পড়ে শেষ করে তার পর বাংলায় তর্জমা করে বলে যেতে লাগলেন, "জমিদার সাহেব, কুশল জানবেন। ... খোদার ইশারায় আমার বাইশ হাজার টাকার প্রয়োজন হইয়াছে। ... কার্তিক মাসের মধ্যেই টাকাটি সংগ্রহ করিব। ... অযথা বাধা প্রদান করিয়া গরীবকে কষ্ট দিবেন না। ... আপনার স্নেহধন্য, কালু শেখ।"

চৌধুরী সিকান্দারের মুখ অন্ধকার হয়ে এলো রাগে। কার্তিকের শেষ সপ্তাহে কোম্পানির খাজনা পরিশোধ করতে যাচ্ছেন তিনি। গুণে গুণে বাইশ হাজার টাকা।

ক্রোধান্ধ চৌধুরী হুঁকার নল মাটিতে আছড়ে ফেলে উঠে দাঁড়ালেন। "চার নৌকা লাঠিয়াল সঙ্গে নাও সরকার! বন্দুক যা আছে সব সাথে যাবে!"

যতীন সরকার গম্ভীর মুখে মাথা ঝোঁকালেন শুধু। নদীপথে কালু ডাকাত কালবৈশাখীর মতোই তীব্র আর পূর্বাভাসের অযোগ্য।

"রায়পাহাড়, সরিষাবন, মহুয়াকাঠি আর বারুদগাছার জমিদার সাহেবদের কাছে লোক পাঠাও। খবর পাঠাও, ধলিয়াদির জমিদার, সিকান্দার পরিবারের বড় ছেলে মেহমুদউল্লাহ কালু শেখের শির উপহার চান। যিনি দিতে পারবেন, তার আগামী বছরের খাজনা সিকান্দাররা শোধ করবে!"

যতীন সরকার অস্ফূটে বললেন, "কিন্তু ... সে যে অনেক খরচান্ত পড়বে রাজামশাই ...!"

চৌধুরী মেহমুদউল্লাহ বাঘের গর্জনে বললেন, "খরচকে সিকান্দাররা ভয় করে নাকি? কালু শেখের কল্লা তশতরিতে করে কাছারি ঘরে সাজানো দেখতে চাই আমি!"

যতীন সরকার ম্লান মুখে বললেন, "লোক পাঠাচ্ছি।"

২.
কার্তিকের এক কৃপণ চাঁদের ভোরে চৌধুরী সিকান্দারের বজরার সাথে চারটি বড় নৌকা বোঝাই পেশীবহুল লাঠিয়াল বাহিনী ভেসে পড়লো যমুনায়। চৌধুরী সাহেব তার গুলিভর্তি ফরাসী রাইফেলটি বজরার শয়নকক্ষে তৈরি রেখেছেন।

৩.
কালু ডাকাতের নাম অকারণেই কালু রাখা হয়েছে, দলের অন্য যে কোনো ডাকাতের চেয়ে তার গায়ের বর্ণ উজ্জ্বল। এ কারণেই ডাকাতি করার সময় কালু গায়ে কাঠকয়লার গুঁড়ো মেখে যায়।

সেদিন সন্ধ্যায় কালু কোনো অঙ্গারপ্রসাধন ছাড়াই বল্লম হাতে সংক্ষিপ্ত হুকুম দিলো শুধু, "চল!"

কুড়িজন ভয়ঙ্করদর্শন ডাকাত ক্ষয়াটে চাঁদের নিচে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে এলো ধলিয়াদীর জমিদারের কাঁঠালবাগান ছেড়ে। গত তিনদিন ধরে তারা এই বিরাট বাগানের ভেতরে লুকিয়ে আছে মানুষের চোখ ফাঁকি দিয়ে।

চারদিক অন্ধকার, বহু দূরে রাক্ষসপুরীর মতো জেগে চোখ মিটমিট করছে জমিদারবাড়ি। কালুর সাগরেদদের মধ্যে চাঁই খগা ফিসফিস করে বললো, "ওস্তাদ, টাকাপয়সা তো সব নিয়ে বেরিয়ে গেছে জমিদার। খালি বাড়িতে কী ডাকাতি করবেন?"

আরেক সাগরেদ আলি মিয়া হিসহিস করে বাতাসের স্বরে বললো, "সোনাদানা আছে না? যতো সোনার গহনা আছে সব লুটে আনবো!"

কালু হাসে নিঃশব্দে। অন্ধকার রাতের বুকে ফুটে ওঠে একসারি ঝকঝকে দাঁত।

৪.

জমিদারবাড়ির নিজস্ব প্রহরীরা কালু শেখের ডাকাতদলের মুখোমুখি হবার যোগ্য নয়। তাদের একজন পেটে বর্শা নিয়ে লুটিয়ে পড়লো, একজনের মস্তক প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো হাঁসুয়ার কোপে, বাকিরা ঊর্ধ্বশ্বাসে পালালো। বিনা শোরগোলো।

কালু বল্লম হাতে মস্ত কয়েক লাফে সিঁড়ি ভেঙে উঠে গেলো দোতলায়। জমিদারের ছোটো বউ রুখসানার ঘর সেখানেই, সে জানে।

ছোটো একটা বিষের শিশি আঁচলে রাখা দস্তুর জমিদারগৃহিণীদের, রুখসানা নিতান্ত নবীনা বলে চর্চাটা আত্মস্থ করে উঠতে পারেনি। কালুর প্রচণ্ড লাথিতে দরজার শিথিল খিল ভাঙার শব্দে বিছানায় জেগে উঠে সে অনুভব করলো, ভুল হয়ে গেছে।

ঘরের ভেতর একটা প্রদীপ টিমটিম করে জ্বলছে, মাটিয়ে শুয়ে থাকা বুড়ি দাসী রুখসানাকে জড়িয়ে থরথর করে কাঁপছে। কালু বুড়িকে দরজার বাহিরে বেরিয়ে যেতে ইশারা করলো হাত দিয়ে। বুড়ি নড়লো না।

কালু গমগমে স্বরে শুধু বললো, "যা!"

বুড়ি দাসী খোঁড়াতে খোঁড়াতে চোখের জল মুছতে মুছতে ছুটে বেরিয়ে গেলো। কালু হাতের বল্লমটা খিলের ঘাটে বসিয়ে দরজা বন্ধ করে ঘুরে দাঁড়ালো।

কালুর সঙ্গীরা যখন চৌধুরী মেহমুদউল্লাহর প্রথমা স্ত্রীর ঘরে ঢুকে সিন্দুক খোলার জন্য হুমকিধামকি দিচ্ছে, কালু তখন অন্যকিছু লুণ্ঠনে ব্যস্ত। সোনা লুট করতে সে আসেনি আজ।

৫.
রুখসানার শিশুপুত্রটির গায়ের বর্ণ উজ্জ্বল বলে আর তেমন শোরগোল হলো না। সাত বছরে পা দেয়ার পর মস্ত হাতিতে চড়ে তাজ মাথায় ধলিয়াদীর সীমানা ধরে এক চক্কর মেরে এসে পিতার পা ছুঁয়ে কদমবুসি করলো চৌধুরী মেহরাবউদ্দিন সিকান্দার।

৬.

সিকান্দার পরিবারের সন্তানেরা আজ যখন সংসদ নির্বাচনে নামেন, তখন যুগের ধারা অনুসরণ করতে ভোলেন না। ওয়েবসাইটে বিরাট বংশলতিকা ঝোলান, সম্রাট বাবরের বংশধর তারা। বাবর থেকে শুরু করে চৌধুরী মাশরুফ মোহসিন সিকান্দার পর্যন্ত একের পর এক দেদীপ্যমান গুম্ফবান সিংহপুরুষের নাম আর তৈলচিত্র শোভা পায় সেই ওয়েবপেজে।

দেশের লোকজনের বোঝা উচিত, চাকরবাকরদের ছানাপোনাদের দিয়ে রাজনীতি চলে না। দেশ চালাতে হলে আওকাৎ থাকতে হয়, রক্তে বহমান থাকতে হয় যথাযোগ্য খানদানের কণা। ধলিয়াদীর সিকান্দাররা এমনই এক পরিবার।

দলে দলে ভোট দিন।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।