Monday, October 11, 2010

প্রায়নেভারেস্ট পোস্ট: আনিসুল হকের সাক্ষাৎকার ও বিশ্লেষণ

দৈনিক প্রথম আলোর উপসম্পাদক কলামিস্ট আনিসুল হক বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। মুসা ইব্রাহীমের এভারেস্ট জয়ের সংবাদ এবং তদপরবর্তী ঘটনাবলি আমরা পত্রিকায় তার বয়ানে জেনেছি। স্বভাবতই মুসা ইব্রাহীমের এভারেস্ট জয় নিয়ে সংশয় সময়ের সাথে চক্রবৃদ্ধিহারে বহুগুণিত হওয়ায় এ বিষয়ে তার বক্তব্য জানার কৌতূহল আমার জেগে উঠেছে। উদ্যোগ নিয়ে আমি তার মোবাইল নাম্বারটি সংগ্রহ করে তাকে ফোন করি গত ১৯ সেপ্টেম্বর। আনিসুল হক ফোন ধরেন, সাক্ষাৎকারের প্রস্তাবে সম্মত হন এবং একটি অসমাপ্ত সাক্ষাৎকার দেন।




এই সাক্ষাৎকারে কৌতূহলোদ্দীপক বেশ কিছু ব্যাপার উঠে এসেছে, সেই সঙ্গে এভারেস্ট-জয়ের-দাবি বিষয়টি সম্পর্কে সাংবাদিকদের একাংশের প্রচ্ছন্ন দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট হয়েছে।

যিনি নর্থ আলপাইন ক্লাবের সভাপতি, তিনিই যাচ্ছেন পত্রিকার হয়ে মুসার স্টোরি কাভার করতে, তাহলে সাংবাদিকসুলভ দূরত্ব আর বজায় রইলো কোথায়? আনিসুল হক স্বীকার করেছেন, মুসার এভারেস্ট জয়ের সংবাদের পর তিনি এত কিছু চিন্তা করেননি, স্টোরি কাভার করতে চলে গেছেন কাঠমাণ্ডু। আমরা এই চর্চাকে কীভাবে নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা বলে ধরে নেবো? এটির সাথে কি প্রথম আলোর উপসম্পাদকের ব্যক্তিগত স্বার্থও জড়িত নয়?

নিচের ভিডিওতে সাংবাদিকদের সাথে মুসাকে নেপাল তিব্বত সীমান্তে দেখা যাবে। সাংবাদিকসুলভ দূরত্বের ব্যাপারটিও ভিডিওতে স্পষ্ট হবে। সেখানে সকল দূরত্ব ঘুচিয়ে মুসাকে কে কার আগে আলিঙ্গন করবেন, সেই প্রতিযোগিতা চলছে। একে সাংবাদিক সমাবেশ না বলে বন্ধুসভা বলাই ভালো, এবং এই বন্ধুসভা থেকে কোনো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন আশা করা বাতুলতা মাত্র।




আনিসুল হকের "কেন প্রমাণ করতে হবে আমাকে বলেন?" আর্তনাদের মধ্যেই এটি স্পষ্ট, এভারেস্ট জয়ের দাবি মানুষের সামনে উপস্থাপনে তাঁরা যত তৎপর, প্রমাণ উপস্থাপনে ঠিক ততটাই নিরুৎসুক। সংবাদপত্রে সাংবাদিকরা একটা কিছু লিখে দিয়ে বসে থাকবেন, সাধারণ মানুষ তার সপক্ষে প্রমাণ চাইলে শুনতে হবে ধমক, "কেন প্রমাণ করতে হবে?" তিনি বলেছেন, একটা দুটো ছবি তো নানা জায়গায় প্রকাশিত হয়েছে। এ কথা স্পষ্ট, প্রথম আলো বাদে এই নানা জায়গা বলতে তিনি বোঝাচ্ছেন সামহোয়্যারইনব্লগের কথা, যেখানে মুসার কতিপয় বন্ধু বেনামে সেসব অস্পষ্ট ছবি আপলোড করেছে। মুসা ইব্রাহীমের এভারেস্ট স্টোরি কি সামহোয়্যারইনব্লগে লিখেছিলেন আনিসুল হক? না, লিখেছিলেন প্রথম আলোয়। তাহলে সেই দাবির সপক্ষে প্রমাণ কেন প্রথম আলোয় প্রকাশিত হবে না? কারণ একটিই, সেসব অস্পষ্ট ছবি, যেগুলো আরো নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়, প্রকাশ করে মানুষের মনে সন্দেহ জাগিয়ে তুলতে চায় না পত্রিকাটি। যেহেতু প্রশ্ন আর সংশয় এখন পর্যন্ত অনলাইনেই সীমাবদ্ধ, মুসার সাংবাদিক বন্ধুরা সামহোয়্যারইনব্লগে বেনামে সক্রিয়তার সুযোগটি নিয়ে নানা নিকে সেসব ছবি দেখিয়ে সে সংশয় দূর করার কাজে নেমেছেন। সত্যই যদি এভারেস্ট জয় করে থাকেন মুসা, সেই ছবি তো ঘরে ঘরে শোভা পাওয়ার কথা, কেন এত লুকোচুরি?

পর্বতারোহণ নিয়ে ইতিপূর্বে বাংলাদেশের পর্বতারোহীদের নানা দাবি পরীক্ষা করে দেখা হয়েছিলো কি না, এই প্রসঙ্গটি আনিসুল হক পরিষ্কারভাবে এড়িয়ে গেছেন, তবে মুখ ফসকে এ নিয়ে আগে বিতর্ক হওয়ার কথা বলে ফেলেছেন। তিনি দায় চাপিয়েছেন ইতিপূর্বে যারা এসব খবর প্রকাশ করেছে, তাদের ঘাড়ে। কারা ইতিপূর্বে এসব খবর প্রকাশ করেছিলেন? প্রথম আলো, ডেইলি স্টার আর তার সাংবাদিকেরাই কি প্রকাশ করেননি? অথচ আনিসুল হকই ব্লগের সাথে সংবাদপত্রের পার্থক্য নিরূপণ করতে গিয়ে বলেছেন, সংবাদপত্রে প্রকাশিত কোনো আইটেম তিন-চার হাত ঘুরে সম্পাদিত হয়ে তারপর প্রকাশিত হয়, প্রতিষ্ঠান তার পেছনে দায় নেয়, ব্লগে দায় নেয় শুধু পোস্ট লেখক। এই কথা সত্য, এবং আমরা তাঁর কথা অনুসারেই ধরে নিতে পারি, ইতিপূর্বে পর্বতারোহণের যেসব সংবাদ সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলো তিন চার হাত ঘুরে সম্পাদিত হয়েই প্রকাশিত হয়েছে, এবং প্রতিষ্ঠান সেসব সংবাদের দায় নেবে। কিন্তু সেসব প্রকাশিত খবরে অনুসন্ধানের লেশমাত্র নেই, পর্বতারোহীরা যখন যা বলেছেন, সেটিই প্রকাশিত হয়েছে। কোনো অনুসন্ধান, কিংবা প্রমাণ উপস্থাপনেরও প্রয়োজন বোধ করেননি সাংবাদিকেরা। এভাবে তাদেরই প্রচ্ছন্ন সহযোগিতায় তৈরি হয়েছে নানা পর্বতজয়ের মিথ, যেগুলো একটু খতিয়ে দেখলেই হাজারো অসঙ্গতি বেরিয়ে আসে।

"তিন চার হাত ঘুরে সম্পাদিত হওয়া" একটি সংবাদের প্রতি আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এটি কাঠমাণ্ডু থেকে লিখেছেন সাংবাদিক আনিসুল হক [১], মুসা ইব্রাহীমের কাহিনি বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলছেন:

... তারপর যন্ত্র সেরে গেলে আবার আমি অক্সিজেন টেনে নিলাম বুকের ভেতরে। আমি জীবন ফিরে পেলাম। আট হাজার ৬০০ ফুট পাড়ি দিয়েছি। আর মাত্র ২৪৮ ফুট।


পুরকৌশলী বলেই সম্ভবত আনিসুল হক সবকিছু ফুটে মেপে অভ্যস্ত। এই ত্রুটিটি খুব একটা বড় কিছু নয়, মিটারকে তিনি ফুট বলেছেন কেবল, কিন্তু এই সামান্য ত্রুটি কিন্তু শেষ পর্যন্ত সম্পাদনার মুখ দেখেনি, সরাসরি প্রকাশিত হয়েছে পত্রিকায়। এর অর্থ, হয় পত্রিকার তিন-চার হাত ঘুরে আনিসুল হকের লেখা সম্পাদিত হয় না, কিংবা সম্পাদিত হলেও যিনি বা যারা সম্পাদনা করছেন, তারা এভারেস্টের উচ্চতা সম্পর্কে ধারণা রাখেন না। এঁরাই এর আগে নির্বিকারে প্রকাশ করেছেন ফ্রে পিক জয়ের ভুল তথ্য, চুল্লু ওয়েস্টে তাঁবুতে বসে থাকার পরও সামিট জয়ের সংবাদ, লাংসিসা রি জয়ের মিথ্যা দাবি, অন্নপূর্ণা-৪ জয়ের রূপকথা এবং এখন এভারেস্ট জয়ের সংবাদ।

তরুণ কনট্রিবিউটরদের কথা বাদই দিলাম, ডাকসাইটে কলামিস্টদের কথাই ধরুন। তিন-চার হাত ঘুরে সম্পাদনার পরও দেখি প্রথম আলোতে সিনেমা না দেখেই রিভিউ লিখে ফেলেন সুমন রহমান [৯], আয়ারল্যাণ্ডকে স্ক্যাণ্ডিনেভিয়ায় পাঠিয়ে দেন আবুল মকসুদ [১০], মওদুদির বইকে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ বানিয়ে দেন হাসান ফেরদৌস [১১]। প্রথম আলোর এই তিন চার হাতের ওপর কতটুকু আস্থা রাখা যায়?

আনিসুল হক বলছেন, মুসার সাথে কথা বলার পর, দেখা হবার পর তিনি নিঃসন্দেহ, যে মুসা এভারেস্ট জয় করেছে। অথচ উইকিপিডিয়ায় রক্ষিত তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে, এই সংবাদ আসার পরপরই আনিসুল হকের চলচ্চিত্র "থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার" এর ওয়েবসাইটের ওয়েবমাস্টার দেওয়ান কামরুল হাসান মুসার জীবনী উইকিপিডিয়ায় সংরক্ষণের জন্যে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন [৮]। অর্থাৎ, এ তথ্য ভালোমতো যাচাই করার আগেই একটি মহল মুসার এই জয়ের দাবিকে ফ্যাক্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার কাজে নেমে পড়েছে।

আনিসুল হক আরো জানাচ্ছেন, তার কখনও এই সন্দেহ হয়নি যে মুসা এভারেস্টে না উঠে এভারেস্ট জয়ের দাবি করছে। তিনি আরও জানাচ্ছেন, মুসার সাথে যারা উঠেছে তারা কেউ বলেনি যে মুসা ওঠেনি। আনিসুল হক বলছেন, একই বাসে করে তারা এসেছে, তাদের সাথে রেস্তোরাঁয় দেখা হয়েছে, এমব্যাসিতে তারা মুসাকে ফুল উপহার দিয়েছে। যুক্তির ধারাটি দেখুন পাঠক, কেউ কিছু বলেনি, অতএব প্রমাণিত হয়ে গেলো মুসা এভারেস্টে উঠেছে। কেউ যদি বলতো মুসা ওঠেনি, তাহলেই কি প্রমাণিত হয়ে যেতো যে মুসা ওঠেনি? নাকি এ নিয়ে অনুসন্ধানের অবকাশ থাকে? এখানে ফাঁকিটা আবারও সেই সঠিক সূত্র উপস্থাপন না করায়। কারা মুসার সাথে একই বাসে ফিরেছে? ওপরে ভিডিওতেই দেখা যাচ্ছে মুসার বাস থেকে নামার দৃশ্য। যারা মুসার সাথে একই বাসে ফিরেছে, তাদের কয়জন খোঁজ রাখে, মুসা এভারেস্ট জয় করেছে কি করেনি? তাদের কারো সাক্ষাৎকার কি তখন নেয়া হয়েছে? এমন কেউ কি সেখানে থাকার কথা, যে বাস থেকে নেমেই সাংবাদিকদের কাছে ঘোষণা দেবে, মুসা এভারেস্ট জয় করেছে, কিংবা মুসা এভারেস্ট জয় করেনি? মুসার সাথে একই বাসে ফেরা আরোহীরা যে সবাই এভারেস্টে গেছে, তারই বা কী প্রমাণ রয়েছে? আর ঘটনাচক্রে রামডুডল হোটেলে যাদের সাথে মুসার সাক্ষাৎ হয়েছে, তারা সেই ব্রেণ্ডান ও'ম্যাহোনি আর স্টিফেন গ্রিন [৬], সেদিন আচমকা দেখা হয়ে না গেলে তারা দূতাবাসের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিতও হতো না, এবং একটি রহস্যজনক অধ্যায় অন্ধকারেই থেকে যেতো। আর যারা তার প্রাণ বাঁচিয়েছে, তারা পরে আমন্ত্রিত হলে মুসাকে ফুল উপহার দিতেই পারে। আমাদের দেশেও যদি কেউ দাওয়াত দেয়, আমরা মিষ্টি নিয়ে হাজির হই, কিন্তু তার মানে এই নয়, মেজবানের সমস্ত বক্তব্যের প্রতি আমরা সমর্থন প্রকাশ করি। সেই অনুষ্ঠানে যখন কোনো ভিডিও আর ছবি প্রদর্শন না করেই উপস্থিত সাংবাদিক, এমনকি খোদ রাষ্ট্রদূতও মুসাকে অভিনন্দন জানাচ্ছেন এভারেস্ট জয়ের জন্যে, মাঝপথে অজ্ঞান অবস্থায় মুসার প্রাণরক্ষাকারী দুই যুবক কোন দুঃখে কোনো মত দিতে যাবে? তাদের উপস্থিতিকেই মুসার দাবির সপক্ষে প্রমাণ হিসেবে চালিয়ে দেয়ার এ চেষ্টা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

সাক্ষাৎকারটি যারা শুনলেন, তারা বুঝতে পারবেন, আনিসুল হক টাকাপয়সার প্রশ্ন উঠতেই খুব দ্রুত একটি কারণ দেখিয়ে সাক্ষাৎকারটিকে মাঝপথে রেখে প্রস্থান করেছেন।

তিনি পত্রিকায় স্বহস্তে লিখে দাবি করেছেন, মুসার এভারেস্ট অভিযানের জন্যে প্রয়োজন ছিলো প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা [২]। পর্বতারোহী এম এ মুহিত এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, এভারেস্ট অভিযানে তাঁর ব্যয় হয়েছে ছত্রিশ হাজার ডলার, তিনি যদি সামিট জয় করতে পারতেন, তাহলে সামিট বোনাস দিতে হতো আরো দু'হাজার ডলার, সর্বমোট আটত্রিশ হাজার ডলার ব্যয় হতে পারতো [৫]। মুহিতের দেয়া তথ্যের সত্যতা পাওয়া যায় কমার্শিয়াল অফারগুলোতেও [৭]। মুহিতের বক্তব্য অনুযায়ী তাঁর অভিযানের ব্যয় ২৬ লক্ষ টাকার সমপরিমাণ। এর প্রায় দ্বিগুণ অর্থের কথা আনিসুল হক কেন লিখলেন কাগজে? তিনি নিজেই এই সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন, এই খরচ অডিটেড নয়। যে খরচের কোনো হিসাব নেয়া হয়নি, সে খরচ কেন কাগজে লিখে গ্রহণযোগ্য বানিয়ে দেয়া হচ্ছে? মুসা বলছেন, তার ব্যয় হয়েছে ৪৬ লক্ষ টাকা [৩]। আনিসুল হক টাকার পরিমাণের এই পার্থক্য প্রসঙ্গে বলছেন, এমনটি হতেই পারে, এমনও ব্যবস্থা আছে, যেটিতে পর্বতারোহীকে ঘাড়ে করে নিয়ে যাওয়া হয়, সবচে ভালো থাকার ও খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। অথচ তিনিই লিখেছেন [১],

১৮ এপ্রিল পর্যন্ত এই অন্তর্বর্তী ক্যাম্পে থাকলেন তাঁরা। ওখানে থাকতে হয় তাঁবুতে। সঙ্গের শেরপারা তাঁবু গাড়েন। রান্নাবান্না করার জন্যও লোক আছে ওই দলেই। খাওয়ার মধ্যে ভাত-ডাল-ডিম।
...

হিমবাহর ওপর দিয়ে যাওয়া। শেষের দিকে পাথর। খাওয়ার অবস্থা খুব খারাপ। বরফ গলিয়ে পানি খাওয়া। চা, চিঁড়া, চকলেট। এর বাইরে কোনো খাওয়া নেই।



মুসা কি তবে শেরপাদের ঘাড়ে চড়ে এভারেস্টে উঠেছিলেন? তিনি কি শেরপাদের ঘাড়ে চড়ে এভারেস্টে যাওয়ার জন্যে প্রায় কুড়ি লক্ষ টাকা বেশি খরচ করেছিলেন?

এই কথা পরিষ্কার যে লোকে ভালো খাওয়ার জন্যে পর্বতারোহণ অভিযানে যায় না। খরচ বাঁচানো যায় যদি হাই অলটিচ্যুডে পর্বতারোহীরা কিচেন শেয়ার করেন। মুসাও কিচেন শেয়ার করেছিলেন আরো এগারোজনের সাথে। একই রুট ধরে গেলেন তিনি আর মুহিত, দু'জনের সাথেই দু'জন করে হাই অলটিচ্যুড শেরপা [সোম বাহাদুর তামাং [১৩] হাই অলটিচ্যুড শেরপা নন, তিনি বেইস ক্যাম্পেই বসে ছিলেন, এই অভিযানে তার ভূমিকা কী, তা একমাত্র মুসা ইব্রাহীমই বলতে পারবেন], একজনের খরচ হলো ৪৬ লক্ষ, আরেকজনের ২৬ লক্ষ। কীভাবে সম্ভব?

মুসার ভাষ্যমতেই তার অভিযানের তিন চতুর্থাংশ টাকা তিনি সংগ্রহ করেছেন বোনের কাছ থেকে। এ তথ্য সত্য হলে, তার অবশ্যই গরজ থাকতো যতটুকু কম খরচে সম্ভব অভিযান পরিচালনার। মুহিত যদি ২৬ লক্ষ টাকা খরচ করে যেতে পারেন, মুসা কেন পারলেন না?

এই প্রশ্নের উত্তরটি সম্ভবত এমন, প্রকৃতপক্ষে ৪৬ লক্ষ টাকা মুসার এভারেস্ট অভিযানে খরচ হয়নি। কিন্তু আনিসুল হকের আর্টিকেল ও মুসার দাবির পর এই পরিমাণ অর্থই এখন সাধারণ মানুষ ও সম্ভাব্য স্পনসরদের চোখে স্ট্যাণ্ডার্ড হিসেবে বিবেচিত হবে। আর এভারেস্টবাণিজ্যের [১২] আভাসও মিলবে এই শুভঙ্করের ফাঁকি থেকেই। ইতিমধ্যেই শোনা যাচ্ছে, মুসা ইব্রাহীম একজন নারীকে এভারেস্ট অভিযানে পাঠানোর তোড়জোড় নিচ্ছেন, চ্যানেল আইয়ের একটি অনুষ্ঠানে মুসা দর্শকদের সামনে এই ঘোষণাও দিয়েছেন। সে উপলক্ষে স্পনসরদের কাছেও নিশ্চয়ই এই পরিমাণ অর্থই চাওয়া হবে। এই পরিমাণ টাকা যে খরচ হয় না, সেটা এম এ মুহিতের অভিযান থেকেই স্পষ্ট। বাকিটা কোথায় যাবে, কীভাবে ভাগ বাঁটোয়ারা হবে, আমরা শুধু অনুমান করতে পারি।

৪৬ লক্ষ টাকা প্রায় ৬৫ হাজার ইউএস ডলারের সমপরিমাণ। সবচেয়ে বড় যে প্রশ্নটি মনে জাগে, এত টাকা মুসা কী করে বাংলাদেশ থেকে নেপালে স্থানান্তর করলেন? দেশ থেকে আইনানুগ পদ্ধতিতে দেশের বাইরে ডলার নেয়া যায় কেবল ছাত্র অ্যাকাউন্টে, রোগীর চিকিৎসার জন্যে, আর এল/সির বিপরীতে। মুসার পর্বতারোহণ অভিযান তিনটির কোনটির জন্যেই খাটে না। বাংলাদেশ ব্যাঙ্কের মানি লণ্ডারিং মনিটরিং সেলের কর্তাব্যক্তিদের উচিত এই ব্যাপারটি অনুসন্ধান করে দেখা। কারণ এর আগেও বিপুল অঙ্কের অর্থের কথা মুসা নানা অভিযানের জন্যে উল্লেখ করেছেন, এবং ভবিষ্যতেও বাংলাদেশ থেকে আরো অনেকেই পর্বতারোহণে যাবেন। মুদ্রা স্থানান্তরের প্রক্রিয়াটি আইনী চ্যানেলে হওয়া বাঞ্ছনীয়, এবং অনিয়মের যথেষ্ঠ সুযোগ ও সম্ভাবনা আছে বলেই মনিটিরিং জরুরি।

আনিসুল হক টাকাপয়সার প্রসঙ্গ উঠতেই দ্রুত সাক্ষাৎকার ছেড়ে চলে গেলেন, নইলে আরো কিছু প্রশ্ন তাকে করার ছিলো। কিন্তু প্রশ্নকারীকে আনিসুল হক "আপনি একটি পক্ষ" বলে তিরস্কার করেন। যতদূর বুঝতে পারি, তিনি প্রশ্ন বা প্রমাণ জাতীয় বিষয় ভালোবাসেন না। তার নমুনা মেলে তাঁর লেখা একটি ছদ্মরম্য লেখায় [৪]:

রবি ঢাকায় যে আমাদের এভারেস্ট জয়ের খবর এসএমএস করে পাঠিয়েছিল, তা কেউ বিশ্বাস করল না। কিন্তু একজন করলেন। তাঁর নাম মিতু। তিনি রবির স্ত্রী।

রবি আমাদের জানালেন, ‘মিতু বিশ্বাস করছে আমরা এভারেস্ট জয় করছি। মিতু বিশ্বাস করছে।’

আমার চোখে জল। এই রকম স্ত্রীই তো দরকার, যে স্বামী যা বলবে তা-ই প্রশ্নহীন বিশ্বাস করবে। কেন আমাদের ঘরে ঘরে এই রকম স্ত্রী থাকে না?

আশীফ এন্তাজ রবির এসএমএসের মতো সাংবাদিকরা একটি খবর প্রকাশ করবেন, আর পাঠকগোষ্ঠী রবির সরলস্বভাবা স্ত্রী মিতুর মতো বিনা প্রশ্নে সেই খবর গ্রহণ করে নেবে?

দিন শেষে যা বুঝতে পারি, আনিসুল হক ও তাঁর সমমনা সাংবাদিকেরা একটি প্রশ্নবিমুখ পাঠকজগত কামনা করেন, যেখানে মাদ্রাসার তালেবেলেমদের মতো বিনা প্রশ্নে তাদের লেখাগুলো ফুট-মিটার বিবেচনা না করে গলাধকরণ করা হবে।





প্রসঙ্গ বোঝার জন্যে নিচের দু'টি পোস্ট পাঠকের কাজে আসতে পারে।

নেভারেস্ট: পর্ব ১

নেভারেস্ট: পর্ব ২


তথ্যসূত্র:

[১] "মুসা যেভাবে উঠলেন এভারেস্টের চূড়ায়", ২৭-০৫-২০১০

[২] পাহাড়সমান প্রতিজ্ঞা হার মানল এভারেস্ট, ২৪-০৫-২০১০

[৩] মুসার সাক্ষাৎকার, দেশ টিভি, ৩:০৪

[৪] "আমরা এভারেস্টেরও উঁচুতে উঠেছিলাম...", ০৬-০৯-২০১০

[৫] প্রায়নেভারেস্ট পোস্ট: এম এ মুহিতের সাক্ষাৎকার

[৬] Hands of Australian saved Musa's life

[৭] তিব্বত অভিমুখ থেকে এভারেস্ট অভিযানের খরচ নিয়ে একটি কমার্শিয়াল অফারের তথ্য

[৮] প্রায়নেভারেস্ট পোস্ট: উইকিপিডিয়ায় মুসা এবং একজন দেওয়ান কামরুল হাসান

[৯] মাই নেইম ইজ খান - সুমন রহমানের চলচ্চিত্র রিভিউ (!!)

[১০] টনি ব্লেয়ার, ডিম-জুতা এবং প্রথম আলো

[১১] মওদুদির নিষিদ্ধ গ্রন্থ নিয়ে হাসান ফেরদৌসের কষ্টকথন

[১২] প্রায়নেভারেস্ট পোস্ট: মুসা ইব্রাহীমের এভারেস্টবাণিজ্য

[১৩] প্রায়নেভারেস্ট পোস্ট: সোম বাহাদুর তামাং

1 comment:

  1. জয়ন্ত11 October, 2010

    মুসা ইব্রাহীমের এভারেস্ট জয়ের সংবাদ জেনে আমি অন্যদের মতো আনন্দিত হয়েছিলাম। কিন্তু আপনি যা শোনাচ্ছেন তা গ্রহণ না করা কঠিন। প্রথম আলো'র উচিত হবে বিষয়টির একটি প্রমাণসাপেক্ষ সমাধান টানা। নইলে মুসা ইব্রাহীম নামটি একটি কলংকজনক ঘৃণ্য নাম হিসেবে আগামী প্রজন্মের মুখে উচ্চারিত হবে। একথাটি মুসা'রও বোঝা উচিত। তার, আনিসুল হকের এবং প্রথম আলোর জানা থাকার কথা সেই বিখ্যাত বাণীটি-"কিছু মানুষকে কিছু সময়ের জন্য বোকা রাখা যায়, কিন্তু সব মানুষকে সবসময়ের জন্য বোকা বানানো যায় না"। (হুবহু মনে নেই)

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।