Monday, September 20, 2010

বামন

লোকটা জ্বলজ্বলে চোখে তাকিয়ে বলে, "লোকে হয় জাম্বুরা খায়, নয় তরমুজ।"

আশেপাশে দুয়েকজন উৎসুক চোখে তাকায় তার দিকে।

লোকটা উৎসাহ পায়। ঠেলাগাড়ির ওপরে রাখা বইগুলো থেকে একটা তুলে আনমনে দেখায় সবাইকে। প্রচ্ছদে বড় বড় হরফে লেখা, দুই শ্যালকের নাও।

জাম্বুরা আর তরমুজের প্রতি উৎসুকেরা আগ্রহ হারাতে সময় নেয় আরো কিছুক্ষণ। লোকটা আড়ে আড়ে তাকিয়ে দেখে তাদের হাবভাব। মনটা একটু খারাপ হয় তার, সমাগত মানুষের দল চলে যাবার ঠিক আগ মুহূর্তে হাতে ধরা দুই শ্যালকের নাও গাড়িতে যত্ন করে নামিয়ে রেখে সে জোর গলায় বলে, "আমি তাদের বলেছিলুম, তোমাদের হয় মাইকেল মধু হতে হবে, নয়তো মাইকেল মুর। কিন্তু যদি মাইকেল জ্যাকসন হতে গিয়ে সাইকেল থামিয়ে দাও মেয়েদের ইস্কুলের সামনে, তাহলেই সব শেষ। তোমাদের ফায়ার ভরা জীবনের টায়ার পাংচার হয়ে যাবে সেই আকুপাংচারে।"

লোকগুলো আবার থামে। ভাবে, জাম্বুরার আলাপ আবার ফিরে আসবে। কিংবা তরমুজের। বস্তুত তাদের ভাবায় ফল দু'টির আকৃতিই। চোখের সামনে ভাসে লাহোরি সিনেমাদের নায়িকাদের বুকচ্ছবি।

কিন্তু লোকটা বকতে থাকে ক্রমাগত। "তারা ভেবেছিলো, আমরা কোনো ব্যাণ্ড সঙ্গীতের দল। অথচ কুষ্টিয়া থেকে আমার যত ক্যাডার বন্ধু ছিলো, সবক'টাকেই সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলুম।"

জনতার ভিড় দ্রুত ছত্রাখান হয়ে যায়। কত কাজ পড়ে আছে সামনে, কে শোনে জাম্বুরার প্রলাপ?

লোকটা মনমরা হয়ে নিজেই দেখে নিজের বইয়ের প্রচ্ছদ। দুই শ্যালকের নাও। কিনছে না কেউ। এই প্রজন্মকে ফ্রড করা, কিংবা ফ্রয়েড করা, দু'টোই কঠিন। সব বেটা শুয়ে শুয়ে বুদ্ধি বাড়িয়ে ফেলছে। একা তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় উদয়াস্ত।

"বাঙ্গি মাহমুদকে আমি বলেছিলাম," দূরে কয়েকজনকে আসতে দেখে গলা উঁচিয়ে বলে সে, "পারবে না তুমি বাঙ্গি। আমি ঠিকই মালয়েশিয়া যাবো। মৌমাছি পালবো রাবার বাগানে, রুটিফল দিয়ে মধু খাবো, বিকেলে চা খাবো নেদারল্যাণ্ডের রাণীর সঙ্গে। বাঙ্গি মাহমুদ আমার ফাইলখানা আটকে দিলো।"

বাঙ্গি শুনে কয়েকজন থামে, সাগ্রহে অপেক্ষা করে লাহোরডমের গল্প শুনতে।

লোকটা আবারও উঁচিয়ে ধরে দুই শ্যালকের নাও। "আমার ওয়েবসাইটেও আছে এক কপি।" সরু গলায় বলে সে। "কিন্তু অনলাইনের সাঁতারুদের বুঝতে হবে, অফলাইনের জঙ্গলে কী প্রকাণ্ড এক একটি ব্রন্টোসরাস ছিলুম আমরা। সেই ঊনিশশো বাষট্টি থেকে চরে খাচ্ছি। এমন কোনো বাঁশঝাড় নেই, যার মশার কামড় খাইনি।"

লোকজন উসখুস করে।

একটা গুবরে মাছি এসে ঘুরঘুর করতে থাকে লোকটার মাথার কাছে। সে ভীষণ ভ্রুকুটি করে তাকায় মাছিটার দিকে, তারপর বলতে থাকে আবার।

"শেষটায় পাইলস হবার পর ঢুকে পড়ি সরকারি চাকরিতে। কত কত রিপোর্ট লিখেছি, ঘাঁটলে এখনও পাওয়া যাবে। ভোটাররা ওসব যদি ভোট দিতে যাবার আগে পড়তো মন দিয়ে, তাহলে আর ভায়ে ভায়ে ঝগড়া হতো না।" লোকটা আনমনে তাকায় সমবেত জনতার দিকে। "হ্যাঁ, বারেক ভাইকে বলেছিলুম, রাহী ভায়ের সাথে জমি নিয়ে গণ্ডগোল মিটিয়ে নাও। আমরা আমরাই তো। সেই ছোটোবেলা থেকে এক রুটি তিন টুকরো করে ছিঁড়ে হালুয়া দিয়ে খেয়ে অ্যাদ্দূর এলুম।"

বাঙ্গির আলাপের আশা ছেড়ে দিয়ে চলে যায় কয়েকজন। যা হতে পারতো একটি ভিড়, সেটি হয়ে পড়ে রুগ্ন জটলা।

লোকটা আবার উঁচিয়ে ধরে দুই শ্যালকের নাও। "ক্রিকেটের জগতে যে কী ভীষণ অনিয়ম চলছে, তা ফাঁস করে দেয়ার জন্যেই জাতীয় ক্রিকেট দলে ঢুকতে চেয়েছিলুম। ইচ্ছা ছিলো সাংবাদিক জগতের মাসুদ রানা হবো। বাছাই পর্বেই আউট হয়ে গেলুম। পড়ুন দুই শ্যালকের নাও, পড়লে আরো জানতে পারবেন কী ঘটে আমাদের ক্রিকেট অঙ্গনে। একেবারে কাছ থেকে দেখা। ভাইসব, ভাইসব ...।"

লোকজন কেটে পড়তে চায়।

মরিয়া হয়ে পড়ে লোকটা। "মুরালিথরন আমার স্পিনের শিক্ষক। সে ঘোরায় বল, আমি ঘোরাই কথা। আর শচীন হাতে ব্যাট ধরিয়ে শিখিয়েছে কীভাবে যুক্তি-তক্কো-গল্পকে মেরে উড়িয়ে বার করে দিতে হয় মাঠ থেকে। সেদিন ফোন মেরেছিলুম শচনাদাকে। ফর্ম পড়ে যাচ্ছে, এ তো আর বলতে পারি না। বল্লুম খেলছো ভালোই, কিন্তু ক্রচ গার্ডটা তো ঠিক সাইজের নিয়ে নামছো না।"

কয়েকজন কাছে ঘেঁষে আসে শচীনের নাম শুনে।

"দুই শ্যালকের নাওয়ে আরো আছে আমার সোয়াজিল্যাণ্ড ভ্রমণের কথা। সেখানকার রাজা আমায় এসে বলে, তোমাদের দেশে এত বন্যা হয় কেন? আমিও কম যাই না, বললুম তুমি এতগুলো বিয়ে করো কেন? রাজা খুশি হয়ে একটা কলা দিলো খেতে।" লোকটা বাড়িয়ে ধরে তার বই।

লোকজন আবার ছটকে পিছিয়ে যায়।

এবার ক্ষেপে ওঠে সে। "যত্তসব বামন। বই কিনতে চাও না তো এসেছো কেন এ শহরে? যাও ভাগো! সোজা গ্রামে গিয়ে কলাপাতায় ছবি আঁকা শেখোগে! মূর্খ নব্য সেলিব্রিটি নির্বোধ ক্লাউন কোথাকার!"

লোকজন নিজেদের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। তারপর চলে যায়।

কয়েকজন দাঁড়িয়ে ছিলো, তাদের দিকে আবার সাগ্রহে দুই শ্যালকের নাও বাড়িয়ে ধরে সে। "পড়ে দেখো।"

তারা আগ্রহ দেখায় না। একজন শুধু বলে, "ঝাড়ু রেখে গেলাম এখানে, যাবার আগে সব সাফ করে যেও।"

সে একটা পাথর তুলে ছুঁড়ে মারে। "ফেলু গোয়েন্দা হয়েছো খুব, না? তোমার ফিতায় তো সবই ছাব্বিশ ইঞ্চি হয়। আস্তিন ছাব্বিশ ইঞ্চি, হাতা ছাব্বিশ ইঞ্চি, গলা ছাব্বিশ ইঞ্চি! ওসব রেসিজম চলবে না! এখানে আমি ঘুড়ি ওড়াবো আমার ইচ্ছেমতন! বাড়ির জানালার কাঁচ ভেঙে মাঞ্জা বানাবো! ভাগো!"

লোকগুলো তাকিয়ে থাকে।

সে সগর্বে বলে, "তিনটা বছর কাটুক, দেখবে কী প্যাঁচ পয়জার শিখেছি। আর দশটা বছর কাটুক, তখন তোমরাই এসে বলবে ওস্তাদ ফাডাইয়ালাইসেন! বইটা পড়লে তো এখনই বলতে!"

সবাই চলে যায়।

সে চিৎকার করে ওঠে, "বামনের দল!"

আস্তে আস্তে সূর্যটা একপাশে ঢলে পড়ে। অবিক্রীত পড়ে থাকে দুই শ্যালকের নাওয়ের সবক'টা কপি। লোকটা সন্ধ্যার দিকে তাকিয়ে মুঠো পাকায়, তারপর নেমে আসে নিজের মলস্তুপ থেকে। আকাশ, দিগন্ত সব তিরিশ ইঞ্চি ওপরে উঠে যায়।

লোকজনের রেখে যাওয়া ঝাড়ুর দিকে ভ্রুক্ষেপ করে না সে। আকাশে চাঁদ দেখা যাচ্ছে না মেঘের জন্যে, গাড়ির খুপরি থেকে একটা প্লাস্টিকের চানতারা বার করে গাড়ির সামনে পতাকার মতো ফিট করে নেয় সে। তারপর গাড়ি ঠেলতে ঠেলতে বাড়ি ফিরতে থাকে, আর মাঝে মাঝে হাত দেয় সেই প্লাস্টিকের চাঁদে।

গুবরে মাছিটা তার ফেলে যাওয়া তিরিশ ইঞ্চি উঁচু মলস্তুপের চারপাশে এক চক্কর মেরে ঊর্ধ্বশ্বাসে আবার উড়ে যায় বইঅলার পিছুপিছু, চক্কর কাটে তার মাথার চারপাশে, ছাব্বিশ ইঞ্চি উচ্চতায়।

শহরটা ভরে যায় বিষণ্ণতায়।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।