Tuesday, August 03, 2010

মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে লাভ কী?

মুহম্মদ জাফর ইকবাল "সাদাসিধে কথা" নামে একটি কলাম লেখেন দৈনিক প্রথম আলোতে। সেটি প্রথম আলোর অল্পবয়স্ক পাঠকেরা নিয়মিত পাঠ করে বলেই বিশ্বাস করি। সৈয়দ আবুল মকসুদীয় গান্ধা ধান্ধাবাজি কিংবা আসিফ নজরুলের নির্লজ্জ জামাততোষণের চেয়ে জাফর ইকবালের কলাম অনেক বেশি সুপাঠ্য।

এই প্রথম স্যারের কথায় দ্বিমত করছি।

তিনি বলেছেন,

সভাশেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বুয়েটের দুজন প্রফেসরের সঙ্গে আমি হেঁটে হেঁটে বের হয়ে আসছি। সভায় আলোচনা করা হয়েছে এ রকম একটা বিষয় আমাকে খানিকটা দুশ্চিন্তার মধ্যে ঠেলে দিয়েছে এবং আমি আবিষ্কার করলাম সেই একই ব্যাপার অন্য দুজন প্রফেসরকেও খানিকটা দ্বিধার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। আমি শুনলাম একজন বললেন, ‘সবার ধারণা, স্কুলে স্কুলে ল্যাপটপ এবং মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর দিয়ে দিলেই সেই স্কুলে প্রচণ্ড লেখাপড়া শুরু হয়ে যাবে! ল্যাপটপ আর মাল্টিমিডিয়ার সঙ্গে লেখাপড়ার কোনো সম্পর্ক নেই—ভালো লেখাপড়ার জন্য দরকার ভালো শিক্ষক, এই সহজ ব্যাপারটা কেউ বোঝে না কেন?’

অন্য প্রফেসর হেসে বললেন, ‘আমার কাছে সব ছাত্র দলবেঁধে এসে অনুরোধ করেছে আমি যেন শিক্ষকদের মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর ব্যবহার করে ক্লাস নেওয়া বন্ধ করে দিই।’

আমি দুজনের কথা শুনে একটুও অবাক হলাম না। আমি অন্য দুজন প্রফেসরের মতো সৌভাগ্যবান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর নই। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে তীব্র শিক্ষকসংকট। আমি সপ্তাহের ৪০ ঘণ্টার মধ্যে ৩৪ ঘণ্টাও ক্লাস নিয়েছি! কিন্তু আমার কখনোই মনে হয়নি মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর ব্যবহার করে ক্লাস নেওয়া যাক। একজন শিক্ষক যখন ক্লাসে পড়ান তখন তাঁর প্রয়োজন ব্ল্যাকবোর্ড ও চক এবং পৃথিবীর এই আদি ও অকৃত্রিম পদ্ধতির কোনো বিকল্প নেই। আমি যখন পড়াই তখন ছাত্রছাত্রীদের মুখের দিকে তাকিয়ে অনুমান করার চেষ্টা করি তারা আমার কথা বুঝেছে কি না। যদি মনে হয় বোঝেনি, তখন বোর্ডে আমি আরও কিছু লিখি, আরও ব্যাখ্যা করি, আরও ছবি আঁকি। দরকার হলে পুরোটা মুছে ফেলে আবার অন্যভাবে শুরু করি। মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরে এগুলো কিছু করা যায় না। ঘরে বসে চকচকে ফন্ট ব্যবহার করে যে কথাগুলো লেখা হয়, ছাত্রদের দর্শক হয়ে সেগুলো দেখতে হয়। তাদেরও আর কিছু করার নেই। কিন্তু বোর্ডে আমি যখন লিখি, ছাত্রছাত্রীরাও সেটা তাদের খাতায় লেখে। মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরে যেটা দেখানো হয়, সেটা কেউ কখনো লিখতে পারে না। তার কারণ, সেটা তাদের দেখার কথা, লেখার কথা নয়। শুধু তা-ই নয়, সেমিনার দেওয়ার জন্য আমি যে কয়েকবার মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর ব্যবহার করেছি, ততবারই লক্ষ করেছি, আমার কথা শোনার জন্য কেউ ভুলেও আমার মুখের দিকে তাকাচ্ছে না, সবাই তাকিয়ে আছে স্ক্রিনের দিকে। পৃথিবীর যেকোনো শিক্ষক জানেন, ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় না করে কোনো দিন ক্লাসে পড়ানো যায় না। মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর অত্যন্ত চমকপ্রদ একটি যন্ত্র, কিন্তু সবাইকে মনে রাখতে হবে, এটি ক্লাসে ছাত্রছাত্রী পড়ানোর যন্ত্র নয়।

[সূত্র]


মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের বদলে ব্ল্যাকবোর্ড-চকের প্রতি এই সাদাসিধে ভক্তি সমর্থনযোগ্য নয়।

জার্মানিতে পড়তে এসে এদের এই একটি ব্যাপারে আমার ভক্তি জন্মেছে। একটি লেকচার ম্যাটেরিয়াল পিডিএফ আকারে ক্লাসের পর [কখনো কখনো ক্লাসের আগেই] নেটে আপলোড করে দেয়া হয়। ক্লাসে এসে প্রফেসর লেকচার শুরু করেন, এবং যে জিনিসগুলো তাঁকে বোর্ডে লিখে দেখানোর দরকার হতো, সেগুলো তিনি প্রজেক্টরে দেখান। ছাত্রছাত্রীরা হুড়োহুড়ি করে সেগুলো নোট করে না, কারণ তাদের কাজ লেকচার শোনা এবং শুনে-দেখে বোঝা, নির্বোধ যন্ত্রের মতো ব্ল্যাকবোর্ড কপি করা নয়।

প্রফেসররাও যন্ত্রের মতো সেই প্রজেক্টরে প্রদ্রষ্টব্য কথাবার্তা আউড়ে যান না, তারা এর সাথে নানারকম তথ্য, অ্যানেকডোটস, কখনো কখনো গল্প যোগ করেন। কেউ কিছু না বুঝলে নির্দিষ্ট সময় পর আঙুল তোলে, এবং প্রজেক্টরের পর্দার পাশে যে সবুজ কাঠের বোর্ড বা সাদা মার্কার বোর্ড থাকে, সেখানে প্রফেসর বাবাজি লিখে বুঝিয়ে দেন।

ছাত্রছাত্রীদের এতে সুবিধা হচ্ছে, নোট তুলবার ধান্ধায় তাদের গলদঘর্ম হতে হয় না। ব্ল্যাকবোর্ডে একটা কিছু লেখা চলছে, ছাত্রছাত্রীরা সেই জিনিস টুকছে খাতায়, এ-ই যদি হয় শিক্ষাদান পদ্ধতি, তাহলে এক ধাপ থেকে পরের ধাপের চিন্তাটা তারা করবে কীভাবে বা কখন? যন্ত্রের মতো বোর্ড থেকে খাতায় টোকার নাম শিক্ষা?

প্রজেক্টরে শুধু স্লাইড দেখালেই চলবে না, সেই স্লাইডগুলো শিক্ষার্থীদের ক্লাসের পর সরবরাহ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের তো কোনো "গুপ্ত নোট" কনসেপ্ট জিইয়ে রাখার মানে হয় না। তিনি লেকচার ম্যাটেরিয়াল অকাতরে বিলিয়ে দেবেন, ক্লাসে স্লাইডে এক একটি ধাপ দেখাবেন, আর নিজের লেকচারে যোগ করবেন সে বিষয় সম্পর্কে আরো বিস্তৃত ব্যাখ্যা, টীকা, টীপ্পনী।

শুধু মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর দিয়ে ভালো ক্লাস নেয়া যায় না, এ জানা কথা। ভালো শিক্ষকের তো কোনো বিকল্প নেই। তাই বলে অযথা মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের নিন্দা করে বোর্ড কপি করাকে ক্লাসরুমে শিক্ষার্থীর কর্তব্য বলাও অনুচিত। ঐ পদ্ধতিতেও সারাক্ষণ হাঁ করে শিক্ষকের সাথে দৃষ্টি বিনিময় করার সুযোগ নেই, ব্ল্যাকবোর্ড থেকে লাইন টুকতে টুকতে হাত ব্যথা হয়।

কোনো কিছুর বিরোধিতা করতে গেলে জোরালো যুক্তি লাগে। সাদাসিধে নাইভ বিরোধিতা বিরক্তি উদ্রেক করে।

8 comments:

  1. সহমত। একটা এনিমেশন দশটা কথার সাশ্রয় করে। কিন্তু আমাদের দেশে স্লাইড দিয়ে যারা পড়ান তাদের টেকনিকে সমস্যা আছে। তারা ধরে নেন স্লাইড ব্ল্যাকবোর্ডের বিকল্প। বোর্ডে যা যা লেখা যেত সবকিছুই তারা স্লাইডে লিখে আনেন। তার ফলে ছাত্র-শিক্ষক দু'পক্ষকেই বইয়ের আস্ত আস্ত চাপ্টার এক ঘণ্টার মধ্যে 'রিডিং পড়ে' শেষ করতে হয়। তাহলে আর ক্লাসে আসার দরকার কী?

    আর কিছু কিছু জিনিস (যেমন গাণিতিক সমস্যা) বোর্ডে করে দেখানোর বিকল্প আসলেই নাই। ধারণা করে নিচ্ছি, জাফর ইকবালকে হয়তো সেধরণের জিনিসই বেশি পড়াতে হয়। কিন্তু তা অন্য সব বিষয়ের জন্য প্রযোজ্য নাও হতে পারে। কাজেই তার লেখাটা অনেক বেশি জেনারালাইজড হয়ে গেছে।

    শিক্ষাদান প্রক্রিয়া নিয়ে আমাদের শিক্ষকদের আত্ম-উন্নয়নের প্রতি অনীহা অনেক পুরানো। এমনকি শিক্ষক নিয়োগের সময়ও এটা দেখা হয় না যে একজন প্রার্থী কিভাবে তার রিসোর্সগুলোকে ব্যবহার করছে। চকবোর্ডে আমরা অনেক অসাধারণ শিক্ষক পেয়েছি সত্য, কিন্তু তা উন্নততর প্রযুক্তি ব্যবহারের বিপক্ষে যুক্তি হতে পারে না!

    ReplyDelete
  2. এই প্রজেক্টর ভীতির কারণ আছে। কারণটা আপনি নিজেই বললেন। বুয়েটে যে দুএকজন প্রফেসর প্রজেক্টর দিয়ে ক্লাস করিয়েছে আমাদের, একজনের স্লাইডও চেয়ে পাইনাই কখনো। কেন কে জানে? হয়ত আমাদের দিয়ে দিলে একই নোট কোন আপডেট/ এডিটিং ছাড়া বছরের পর বছর পড়াতে পারবে না, এই ভয়ে। একটার পর একটা স্লাইড স্ক্রীনে দিয়ে মুখস্তের মত দ্রুত আউড়ে যাওয়া, আল্টিমেটলি বোর্ড-চকের চেয়ে বেশি স্পিডে স্লাইডের লেখা তুলতে গিয়ে গলদঘর্ম হওয়া বা আরও খারাপ, স্লাইড দেখাতে দেখাতে নিজের মত ব্যাখ্যা দেওয়া, যেটায় আরো কষ্ট (বলছি না খারাপ), একই সাথে স্লাইড, ব্যাখ্যা দুটাই নোট করতে হচ্ছে। সবকিছুর কারণ, স্লাইড পাইনা। যদি কপালে থাকেও, সেটা জানব টার্মের শেষের দিকে, যখন স্টুডেন্টরা প্রফেসরদের গুঁতানো শুরু করে সাজেশনের জন্য।

    প্রজেক্টরের মাহাত্ন্য বুঝছি বাইরে এসে, আপনি জার্মানীতে যেই অভিজ্ঞতার কথা বললেন। দেশে এইটা চালু করার আগে টিচারদের এইটা শিখাতে হবে। নাইলে চক-বোর্ডই ভাল। অ্যাটলিস্ট, ঐটায় লেকচার নোট করার টাইম পাওয়া যায়।

    -----------
    পল্লব

    ReplyDelete
  3. তবে হ্যাঁ, চক-বোর্ডে ক্লাস করানোর সময় (পরে নিজে ক্লাস নেওয়ার সময় আরো ভাল বুঝেছি), একটা জটিল সার্কিট বোর্ডে এঁকে শেষ করে বুঝাতে যে সময়টা খরচ হয়, সেই সময় আমি দুইটা সার্কিট পড়াতে পারতাম। যে কারণে পরে লেকচার নোটে সার্কিট এঁকে ছাত্রদের দিয়ে সেটা দেখিয়ে পড়াতাম। প্রজেক্টর পাইনাই, তাই কাগুজে সংস্করণ আর কি! :)


    ----------
    পল্লব

    ReplyDelete
  4. একমত প্রকাশ করলাম।

    ReplyDelete
  5. হিমু, পশ্চিমে আমার চার সেমিস্টারে পড়ানোর অভিজ্ঞতায় দেখেছি মাল্টিমিডিয়া দিয়ে পড়ালে ছাত্ররা কিছু নিতে পারেনা। অবশ্য ম্যাথ বা পরিসংখ্যান বলে হয়তো এমন হয়েছে। ছাত্রদ্রের ফীডব্যাক নেগেটিভ ছিলো। এর পর থেকে আমি শুধুমাত্র চকবোর্ড ব্যবহার করি। স্লাইডে দেখালে ক্লাসে শিক্ষাটা হয়না। উল্লেখ্য যে স্লাইড আগেই থেকেই সরবরাহ করা হয়েছিল।

    ReplyDelete
  6. হিমু ভাই, আপনি জার্মানিতে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের যেমন ব্যবহারের কথা বললেন তেমনটা ফলপ্রসূ হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে প্রজেক্টর ব্যবহার করে পড়ানোর সাধারণ চিত্রটা পল্লব বলেছেন। প্রজেক্টর ব্যবহারকারী শিক্ষকদের কোন অজানা কারণে ব্ল্যাকবোর্ড (বা মার্কারবোর্ড)এর প্রতি বিদ্বেষ কাজ করে। ফলে যে অংশটুকু লিখে লিখে, ব্যাখ্যা করে না বোঝালেই নয় সেটা তারা প্রজেক্টরে স্লাইডের পর স্লাইড দেখিয়ে পড়িয়ে যান। প্রোগ্রামিং ও মেকানিক্স ক্লাসের সমস্যাও এভাবে পড়াতে দেখে বুঝি প্রজেক্টর দিয়ে সবকিছু পড়ানো যায় না। শেখার ব্যাপারটা আসলে এক্টু রয়েসয়ে হয় তো, তাই পুরোপুরি প্রজেক্টর নির্ভর না হওয়াই ভালো, বিশেষ করে বিজ্ঞান পাঠদানে।
    --চতুর্বর্গ

    ReplyDelete
  7. প্রজেক্টরের সুবিধা হচ্ছে, যে জিনিসটা আমরা বোর্ডে আর খাতায় লেখার পেছনে সময় ব্যয় করি, সেটা আগে থেকে লেখা থাকে আর বিতরণ করা যায়। ক্লাসে এই বাঁচানো সময়টা মনোযোগ দেয়া যায়।

    প্রজেক্টর শেষ বিচারে একটা টুল, যেমন টুল ব্ল্যাকবোর্ড-চক। এটার সর্বোত্তম উপযোগ সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক অনবগত হবেন কেন? বিদেশ থেকে লেখাপড়া করে যাওয়া লোকজনই তো বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক হন। তারা কি বিদেশে তাদের শিক্ষকদের দেখেননি?

    আমি দেশের ছাত্রজীবনটা বোর্ডেই কাটিয়েছি। সে কারণেই প্রজেক্টরের সঠিক ব্যবহার আমাকে স্বস্তি দিয়েছে। ক্লাসনোট ঠিকমতো তুলতে না পারার টেনশনে ভুগতে হয়নি।

    গলদ যখন শিক্ষকের পড়ানোতে, তখন দোষটা সেখানেই আরোপ করা উচিত। প্রজেক্টরের ঘাড়ে দোষ চাপানোর অর্থ শাক দিয়ে মাছ ঢাকা। জাফর ইকবাল স্যারের কাছ থেকে সেটা আশা করি না।

    লেখাটা তিনি সম্ভবত লিখেছেন প্রাইমারি স্কুলের বাচ্চাদের প্রজেক্টর দিয়ে পড়ানোর কোনো জব্বারীয় ছাগলামি প্রস্তাবের প্রতিবাদে। আমি মনে করি এসব ক্ষেত্রে আরো স্পষ্টভাষী হওয়া প্রয়োজন, পাত্রপাত্রীদের নাম উল্লেখ করে আরো প্রাসঙ্গিক অভিযোগ তুলে যুক্তি খণ্ডন করা। মাছ ধরতে গেলে পানি ছুঁতে হবে।

    ReplyDelete
  8. হিমু ভাই,
    আমার বুয়েটের প্রজেক্টর নির্ভর ক্লাশের অভিজ্ঞতা অনুসারে কোন স্লাইড-ই শিক্ষক নিজে বানিয়ে আনেন না।

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।