Friday, July 30, 2010

ছাত্রের রাজনীতি

ছাত্ররাজনীতি "নিষিদ্ধ" করা, ছাত্ররাজনীতির "স্বর্ণযুগ", ছাত্ররাজনীতির "শোধন" ইত্যাদি নিয়ে পত্রপত্রিকায় লোকজনকে হড়হড় করে কলমে ফ্যানা তুলতে দেখে অশ্রদ্ধা চলে এসেছে। দেখলাম, সকলেই ছাত্ররাজনীতি নিয়ে দুই কলম লিখতে পারে। যে "ছাত্ররাজনীতি" করেছে, সে তো লেখেই, যে করেনি, সে আরো বেশি লেখে। কাজেই আমিও সাহস করে একটা কিছু লিখে ফেলছি। আমি দ্বিতীয় দলে, অর্থাৎ ছাত্রাবস্থায় কোনো রাজনৈতিক দলের সংশ্রবহীন ছিলাম।

শুরুতে একটা উপলব্ধির কথা জানাই, আমরা রাজনীতি শব্দটাকে এখন চূড়ান্তভাবেই পরস্পরের পশ্চাদ্দেশে মধ্যমাসঞ্চালনের ক্রিয়াবিশেষ্যের প্রতিশব্দ হিসেবে নিয়েছি। রাজনীতি শব্দটা আমার কাছে ব্যক্তিনীতির চেয়ে বৃহৎ অর্থে পলিসি হিসেবে অর্থ বহন করে। এটি পরিবারের মতো ক্ষুদ্র সমষ্টি থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের মতো বৃহৎ কাঠামো পর্যন্ত বিস্তৃত। আমার বাবা আমাকে স্কুলজীবনে সন্ধ্যেবেলা বাড়ির বাইরে থাকতে দিতেন না, এটা একটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। আবার টিভি দেখতেও নিষেধ করতেন না, সেটা আরেকটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। আমি ঢাকায় আমাদের বাসায় টিভিতে হিন্দি চ্যানেলগুলোকে প্যাঁচ মেরে সরিয়ে দিয়ে এসেছি, এটা একটা রাজনৈতিক সক্রিয়তা। আমাদের বাড়িঅলা কোনো ছম্মাকছল্লো কিশোরী বা তরুণী আছে এমন পরিবারকে বাসা ভাড়া দিতেন না, এটাও একটা রাজনৈতিক কর্ম।

এক কথায় বলতে গেলে, যে নীতি কোনো সমষ্টিভুক্ত ব্যক্তিবর্গের আচরণকে প্রভাবিত করে, সেটাই রাজনীতি। পরিসর ছোটো বলে আমরা পরিবাররাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বা ক্রিয়াকে "রাজনীতি" হিসেবে চিহ্নিত করতে পারি না হয়তো।

ছাত্ররাজনীতি শব্দটাকে আমরা তাহলে কীভাবে দেখবো? ছাত্র যে রাজনীতিতে সক্রিয়, সেটিই কি ছাত্ররাজনীতি? নাকি ছাত্রের জন্যে ছাত্রের অংশগ্রহণে ছাত্রত্বের খাতিরে যে রাজনীতি, সেটি ছাত্ররাজনীতি?

কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতির নামে যা কিছু বহুলাংশে মিডিয়ায় আসে, সেটি মূলত ছাত্রদের দিয়ে প্রধান রাজনৈতিক দলের দলীয় স্বার্থ উদ্ধারের পাণ্ডামির গল্প। এই পাণ্ডামির সপক্ষে পাণ্ডা আর গুণ্ডা আর তাদের পাণ্ডামোগুণ্ডামোর সুবিধাভোগী ছাড়া আর কেউ কথা বলে না। কিন্তু গালিটা যখন এসে পড়ে, তখন ছাত্ররাজনীতির পুরোটার ওপরেই এসে পড়ে। ফলে একটা প্রস্তাব চলে আসে, ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা হোক। ভুক্তভোগীরা কথাটা জোরেশোরে বলেন, মতলববাজরা বলেন ইনিয়ে-বিনিয়ে।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা বরাবরই পাবলিক আর প্রাইভেটে বিভক্ত। পাবলিক শিক্ষাব্যবস্থায় জনগণের করের পয়সা জনগণের মেধাবী সন্তানদের জন্যে ব্যয় করা হয়, আর প্রাইভেটে সেই ব্যয় সংকুলানে জনগণের করের পয়সা ব্যয় করা হয় না। প্রাইভেট শিক্ষা সেক্টরে আগে কওমী মাদ্রাসাই প্রধান ছিলো, এখন সেটি কিণ্ডারগার্টেন থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত গড়িয়েছে। মতলববাজরা বলে থাকেন, প্রাইভেট শিক্ষা ব্যবস্থায় ছাত্ররাজনীতি নেই, তাই তারা সুন্দরভাবে তাদের কোর্স সময়মতো সম্পন্ন করে জীবনের পথে নাক বরাবর যাত্রা শুরু করতে পারেন। আর পাবলিকে যেহেতু ছাত্ররাজনীতি আছে, তাই তারা দুইদিন পর পর গিয়ানজাম লাগিয়ে চার বছরের কোর্স সাত বছরে শেষ করে। অতএব ছাত্ররাজনীতি খারাপ, কুয়োড এরাট ডেমনস্ট্রানডুম।

এখানে সমস্যাটা অবধারিতভাবেই রাজনৈতিক, কারণ সমস্যাটা স্টেইকহোল্ডিঙে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজে ছাত্রদের সংগঠিত হবার প্রয়োজন যদি দেখা দেয়, তাহলে তাদের সংগঠিত হতে দিতে হবে কি হবে না, এটাই প্রশ্ন। এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা পদ্ধতিতে। সেটি পরিচালনার দায়িত্ব নেন শিক্ষকদের কাউন্সিল, তারাই সেখানে সর্বেসর্বা। তাদের কোনো সিদ্ধান্ত যদি ন্যায়ানুগ না হয়, ছাত্ররা কোথায়, কী পদ্ধতিতে প্রতিবাদ জানাবে?

ধরা যাক দবীর একজন "রাজনীতিবিমুখ" পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, সে চার বছরের কোর্স চার বছরে পড়ে শেষ করতে চায়। কিন্তু শিক্ষা শুধু কোর্সে সীমাবদ্ধ না, দবীর শুধু বইয়ের পাতা থেকে শিক্ষা নিয়েই জীবনে প্রবেশ করবে, এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যও নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে যেহেতু প্রতিনিয়ত নানা ঘটনা ঘটে চলেছে, সেসবকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কোনো সিদ্ধান্তের ন্যায্য প্রতিবাদ করার অধিকার দবীরের আছে কি নেই, সেই প্রশ্নের ফয়সালা আমরা করতে চাই। দবীর কী করতে পারে? সে কি প্রশাসনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে লিখিত প্রতিবাদ জমা দেবে কোথাও? কী পরিচয়ে? নিজ নামে? তার পরিণতি কী হতে পারে? প্রশাসনে তো থাকেন শিক্ষকরা, যারা দবীরের খাতা দেখবেন দু'দিন পর। কলমের এক খোঁচায় দবীরের গ্রেড দুই তিন ধাপ নেমে যেতে পারে, এ কথা দবীর জানে। বিজ্ঞ দবীর তাই নিজের একক পরিচয়ে প্রতিবাদ দাখিলের পথে হয়তো যাবে না। সে নিরাপত্তা খুঁজবে সমষ্টিতে। সে কবীর সবীর প্রবীর ম্যাকবীরদের নিয়ে প্রথমে একটি সমষ্টিতে পরিণত হয়ে প্রতিবাদ জানাতে চেষ্টা করবে। ভিড়ের মধ্যে একটি মুখের দায় কমে যায়, এমন একটি ধারণাই আমাদের দেশে প্রচলিত। এবং যে মুহূর্তে সে সংগঠিত হলো, সে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করলো। এই রাজনীতি পলিসি নির্মাণের সাথে জড়িত, এবং এই রাজনীতির অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখার পক্ষে আমি মত ব্যক্ত করি। এই সংগঠিত হওয়ার ব্যাপারটা কীভাবে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র শাখা লুন্ঠন করে নেয়, সে তর্ক ভিন্ন।

এই গল্পের পরবর্তী অংশটুকু কিন্তু দবীরদের ঐ সমষ্টির হাতে থাকবে না, প্রশাসন কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে, তার ওপরও নির্ভর করবে। শিক্ষকদের জোট ঐ প্রশাসন কীভাবে কয়েকজন ছাত্রদের ভেতর থেকে একজনকে নেতা হিসেবে চিনে নিয়ে তাকে ডেকে নেবেন, সিন্নি সাধবেন বা কোঁৎকা দেখাবেন, সেটি আমাদের চোখের সামনে বা মিডিয়াতে আসে না। এবং পাঠক, চিনে নিন, ওটাও রাজনীতি। ওটা প্রশাসনের রাজনীতি। ওটা নিষিদ্ধ করতে আপনি একবারও মুখ খোলেননি সারা জীবনে।

ছাত্রের কাজ ভাংচুর করা নয়, আমি এ কথা বিশ্বাস করি। কিন্তু ছাত্রদের ভাংচুরের মুখে যেতে দেখে যে প্রশাসন তাকে বিরত করে না, নিরস্ত করে না, সন্তানপ্রতিম ছাত্রটির কাঁধে হাত রেখে অতীতের নিজেকে স্পর্শ করতে পারে না, সে প্রশাসনও কিন্তু রাজনীতি করে যাচ্ছে ক্রমাগত। যে ছাত্রটি টেণ্ডার সন্ত্রাস করছে, সে একটি ফৌজদারি অপরাধে লিপ্ত। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নির্বিকারভাবে তাকে আড়াল করে যায়, শাস্তি দেয় না। এই মেরুদণ্ডহীন প্রশাসনকে দূর না করে ছাত্ররাজনীতি দূর করবেন কীভাবে?

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের কাজ শিক্ষকদের ওপর ন্যস্ত হওয়া উচিত নয়। প্রশাসকের কাজ আর শিক্ষকের কাজ ভিন্ন, এবং একটি কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট তাতে স্পষ্ট। শিক্ষকের পদোন্নতি যদি তাঁর অধ্যাপনার গুণগত মানের ওপর নির্ভর না করে প্রশাসনিক কাজে "দক্ষতা"র ওপর নির্ভর করে, তাহলে তিনি শিক্ষক হিসেবে কাজ না করে কেন "বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসক" নামে একটি পদে যোগ দেন না? আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজ পরিচালনার জন্যে কেন একটি আলাদা পেশার ধারা আমরা তৈরি করি না? বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা নামে একটি পৃথক ফ্যাকাল্টিও তো তৈরি হতে পারে, যেখান থেকে পাশ করে ছাত্রেরা যোগ দেবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে রিসার্চ গ্র্যান্ট সংগ্রহ, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়া ব্যবস্থাপনা, বিশ্ববিদ্যালয়ের গণসংযোগ ইত্যাদি কাজে? কেন একজন ছাত্র পাশ করে ক্ষমতাভিমুখী রাজনৈতিক চক্রে পা দেবেন শিক্ষক হওয়ার জন্যে, তারপর সেই অন্তহীন চক্রে ঘুরপাক খাবেন আর অন্যদেরকে টেনে নেবেন সেই কৃষ্ণগহ্বরে?

আজ আমরা ছাত্ররাজনীতির নামে যা কিছু শুনি, সব এই কৃষ্ণগহ্বরের ইভেন্ট হরাইজন থেকে উঠে আসা হকিং রেডিয়েশন। একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু ছাত্রই থাকে না, শিক্ষকও থাকেন, প্রশাসকও থাকেন। রাজনৈতিক চুতিয়ামিতে ছাত্ররা থাকলে ধরে নিতে হবে শিক্ষকরাও আছেন। এমন একটা বিশ্ববিদ্যালয় কেউ দেখাতে পারবেন দেশে, যেখানে সব শিক্ষক ধোয়া তুলসী পাতা, আর ছাত্রগুলো কতগুলো বাইনচোদ, খালি "রাজনীতি" করে বেড়ায়?

বিশ্ববিদ্যালয় যে আইনবলে পরিচালিত হয়, ওখানে হাত দিয়ে এর পরিচালনা আর প্রশাসন কাঠামো একটু পাল্টে দিতে বলবেন কেউ? যদি না পারেন, ছাত্ররাজনীতি সিলগালা মেরে বন্ধ করেও লাভ নেই, বিশৃঙ্খলা থাকবেই।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।