Monday, July 26, 2010

চ্ছিলনা!

সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষিত হয়েছে, যদিও আদালত কিছু সামরিক ফরমানকে সংবিধানের চেতনানুগ বিবেচনা করে ক্ষমা করেছেন।

এই রায়ের বেশ ক'টি ইমপ্যাক্টের একটি হচ্ছে, দেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ হবে। এ নিয়ে নানারকম পরস্পরবিরোধী ও কিছু স্ববিরোধী কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে।
প্রথম আলোর এই খবরটি থেকে জানতে পারছি, নির্বাচন কমিশন[প্রথম আলোর মতো পত্রিকাও একে ইসি ডাকা শুরু করেছে, মনে হয় বেশি ফ্যাশনদুরস্ত শোনায়, ভবিষ্যতে হয়তো মুক্তিযোদ্ধাদের এফেফ লিখবে পত্রিকাটি, জিকে {জিকে মানে গড নৌজ}] "রায় কার্যকর হবার পর সিদ্ধান্ত নেবে", ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর নিবন্ধন থাকবে কি থাকবে না। এই রায় কার্যকর করবে সরকার।

ব্যাপারটা এখানেই ঘোলাটে। আপিল বিভাগের রায় কার্যকর নাকরার এখতিয়ার কি সরকারের আছে?

এদিকে সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা বলেছেন, সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা হবে না। রাজনৈতিক দলের রাজনীতি করার অধিকার থাকা না-থাকার বিষয়টি নির্ধারণ করবে নির্বাচন কমিশন।

ব্যাপারটা তৈলাধার পাত্র না পাত্রাধার তৈল গোছের তর্কে চলে গেলো না?

প্রধানমন্ত্রী আরো বলেছেন, ‘সংবিধানে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ থাকবে না বলে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এটি মোটেই সত্য নয়। নাগরিকের অনুভূতিতে আঘাত লাগবে—সংবিধানে এমন কোনো সংশোধনী আনা হবে না।

আপিল বিভাগের রায় যদি কার্যকর করা হয়, সংবিধানে অনির্বাচিত অগণতান্ত্রিক শক্তির জুড়ে দেয়া এই "বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম" বাক্যটিও বিলুপ্ত হবার কথা। এই রায় প্রয়োগে "নাগরিকের অনুভূতি"র মতো অসংজ্ঞায়িত বিষয় বিবেচনায় নেয়া হবে ঠিক কীভাবে?

আমি বাংলাদেশের একজন নাগরিক, এবং সংবিধানের শুরুতে "বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম" সংযোজনকে আমি অপ্রয়োজনীয় এবং সংবিধানে বর্ণিত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চার ভিত্তির একটি, ধর্মনিরপেক্ষতার লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করি। আরব বিশ্বে সিরিয়ার মতো দেশের সংবিধান, যেখানে প্রেসিডেন্টের ধর্ম ইসলাম নির্দিষ্ট করে দেয়া আছে, সেখানেও সংবিধানের শুরুতে "বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম" সংযোজন করা হয়নি। এর কারণ হতে পারে, রাষ্ট্রের কোনো ধর্ম প্রকৃত পক্ষে নেই। রাষ্ট্রের খৎনা দিতে হয় না, রাষ্ট্রকে মুতে এসে নুনুর আগায় কুলুখ এঁটে চল্লিশ কদম হাঁটতে হয় না, রাষ্ট্রকে অজু করে এসে নামাজ পড়তে হয় না, রাষ্ট্রকে রোজা রাখতে হয় না, রাষ্ট্রকে হজ করতেও যেতে হয় না, রাষ্ট্রের দুই কাঁধে ফেরেশতা বসানো থাকে না, কিংবা রাষ্ট্রের মৃত্যুর পর কবরে এসে কেউ তাকে রিমাণ্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে না। রাষ্ট্র একটি কাঠামো, এই কাঠামোর ভেতরে ধর্ম কীভাবে চর্চিত হবে, তা আলাদাভাবে বিবৃত থাকতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের ধর্ম থাকে না, যেভাবে ধর্ম থাকে না একটা চেয়ারের, একটা অপারেটিং সিস্টেমের, কিংবা একটা ব্রেসিয়ারের। এগুলো সবই কাঠামো মাত্র।

সংবিধানের শুরুতে কোনো একটি ধর্মানুগ বাক্যাংশ বা রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে একটি বিশেষ ধর্মকে ঘোষণার এখতিয়ার খন্দকার মোশতাক, জিয়াউর রহমান বা এরশাদের চ্ছিলনা। তারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যেই এই অপ্রাসঙ্গিক সংযোজনগুলো করেছিলো। যারা বলে, এসব জুড়ে মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের শ্রমিক রপ্তানির সুবিধা হয়েছে, তারা আশা করি ভারত বা ফিলিপাইনের দিকেও তাকাবে। বিসমিল্লাহ বা রাষ্ট্রধর্ম কোনোটিই তাদের সংবিধানে নেই, মধ্যপ্রাচ্যে বিপুল সংখ্যক জনশক্তি রপ্তানিতে দু'টি দেশই এগিয়ে আছে। সংবিধানের আগায় বিসমিল্লাহ লাগালেও বাংলাদেশের মুসলমান নাগরিকের ধর্ম ইসলাম থাকবে, বিসমিল্লাহ না লাগালেও থাকবে। আসল উদ্দেশ্যটি রাজনীতির। এই দু'টি সংযোজন বস্তুত সংবিধানের ওপর বিষ্ঠাত্যাগের বাকি দৃষ্টান্তগুলোকে রক্ষা করার একটি কুচেষ্টা। জানা কথা, সংবিধানের পঞ্চম বা অষ্টম সংশোধনী বাতিল করলে এগুলোও বাতিল হয়ে যাবে, আর কোনো সরকারই এগুলো বাতিল করে নিজেকে "অজনপ্রিয়" করতে চাইবে না। এটা অনেকটা ধূলোর ওপর জরুরি ফোন নাম্বার লিখে রাখার মতো কাজ, ধূলো মুছতে গেলে নাম্বারও যাবে।

এই ধরনের সস্তা গ্রাম্য রাজনীতি যে কাজে দেয়, সেটা আমরা টের পাই, যখন সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করতে আমাদের ৩৩ বছর লেগে যায়।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য আপিল বিভাগের রায়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সম্ভবত আওয়ামী লীগের উচ্চনেতৃত্ব দু'টি আশঙ্কা করছেন। এক, সংবিধানের শুরুতে অপ্রয়োজনীয় বিসমিল্লাহ আর রায়ের সাথে সাংঘর্ষিক অষ্টম সংশোধনীতে বর্ণিত রাষ্ট্রধর্ম ইসলামকে সরিয়ে দিতে গেলে প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল প্রোপাগাণ্ডা চালিয়ে সরকারের জনভিত্তি দুর্বল করে দেবে। দুই, ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ করলে বহুধাবিভক্ত দলগুলো সব বিএনপির পেছনে কাতার বেঁধে দাঁড়াবে।

সরকারের প্রথম আশঙ্কাটি অমূলক নয়, কিন্তু এর মাত্রা অনেকখানি ওভাররেটেড। ২০০২ সালে সংসদ নির্বাচনের সময় বিসমিল্লাহ আর রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম জায়গামতোই ছিলো, তাতে কোনো লাভ হয়নি। ভোটের আগে মানুষের বিবেচনায় থাকে চালের দাম, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আর স্থানীয় ইস্যু। ৯৬ এর নির্বাচনে জিতে আসা আওয়ামী লীগ প্রথমটি ঈষৎ সামাল দিতে পারলেও বাকি দু'টোতে হাল ধরতে পারেনি। বিএনপি-জামায়াতের আলবদর সরকারও কিন্তু আল্লাহ আর ভারতের নাম জপে গত সংসদ নির্বাচনে কিছু করতে পারেনি, গোহারা হেরেছে। তার কারণ একটিই, সংবিধানের গোড়ায় বিসমিল্লাহ আছে কি নাই, সেটি বাংলাদেশের মুসলমান সম্প্রদায়ের ধর্মপরিচয় বা ধর্মচর্চার স্বাধীনতাকে ক্ষুণ্ণ করে না [ক্ষুণ্ণ করে অপর ধর্মের অনুসারীদের]।

দ্বিতীয় আশঙ্কাটি সর্বাংশে সত্য, কিন্তু এ পরিস্থিতি কি নতুন কিছু? গত সংসদ নির্বাচনে কি প্রায় সবক'টি ইসলামের নাম বেচে খাওয়া রাজনৈতিক দলই বিএনপির পেছনে কাতার বেঁধে দাঁড়ায়নি? তারা ভবিষ্যতেও বিএনপির সাথেই দাঁড়াবে, যদি আওয়ামী লীগ কোনো কৌশলী রাজনীতি অবলম্বন না করে।

এই ভুঁইফোঁড় ধর্মবেচা দলগুলোর মিত্রতা অবলম্বন করেও মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসেনি।

ধর্মভিত্তিক রাজনীতি শুধু ভোটের হিসাবের জন্যেই নিষিদ্ধ করা বা না করার কথা বিবেচনা করা উচিত নয়। বাংলাদেশে গত ৩৯ বছরে একটি ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলও গণের কল্যাণে, মানুষের কল্যাণে কোনো কর্মসূচি হাতে নিয়ে মাঠে নামেনি। প্রতিটি ধর্মভিত্তিক দল বাংলাদেশকে ঠেলতে ঠেলতে একটি উদ্ভট উটের পিঠে তুলে দেয়ার চেষ্টা করেছে, বিরতিহীনভাবে। এই প্রচেষ্টাকে কখনও সামরিক শাসক, কখনও আওয়ামী লীগ, কখনও বিএনপি এসে সমর্থন দিয়ে সবল করেছে। ধর্মের নামে রাজনীতির সুযোগকে রূদ্ধ করতে হবে অনাগত সময়ের বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে। আমরা কি বাংলাদেশকে একটি অগ্রসর, উদারমনা, মেধাচালিত রাষ্ট্র হিসেবে নির্মাণের পরিবর্তে একে একটি উপপাকিস্তানে পরিণত করার পথে হাঁটবো?

আমাদের সংবিধান প্রণেতারা ঐ ক'টি মূলনীতি যোগ করেছিলেন অনেক মানুষের রক্তস্রোত সাঁতরে এসে। পাকিস্তান হতে চাইনি বলেই আমাদের পূর্বপুরুষেরা নিহত, ধর্ষিত, লুণ্ঠিত, বিতাড়িত, দগ্ধ, অপমানিত হয়েছিলেন। আজ ৩৩ বছর পর সংবিধানের গায়ে যত কাটাছেঁড়া হয়েছে, তার সবকিছু মুছে আবারও সেই স্বপ্নতাড়িত মানুষদের কাতারে দাঁড়ানোর সুযোগ আমাদের আছে। ভাবীকালের বাংলাদেশে যারা বেড়ে উঠবে, তাদের আমরা আবার যদি ভুল করে উপপাকিস্তানের দিকে ঠেলে দিই, চারপাশের নিষ্ঠুর পৃথিবী আমাদের ক্ষমা করবে না। একবার ভুল সবাই করে, বারবার করে নির্বোধ।

আমাদের বিবেচনাবোধ নিয়ে যেন ভাবীকালের তরুণ জিয়াউর রহমানের মতো অতীতের দিকে আঙুল তুলে "চ্ছিলনা" বলার সুযোগ না পায়, সে ব্যবস্থা নেয়ার জন্যে কাতর অনুরোধ করি।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।