Thursday, September 16, 2010

বিদ্যুৎ বিলের কাঠামো: উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে

১.
ধরা যাক, মরুভূমিতে হারিয়ে গেছে পাঁচ পর্যটক। মাথার ওপর গনগনে সূর্য, পায়ের নিচে তপ্ত বালি। পিপাসায় প্রাণ ওষ্ঠাগত। হঠাৎ তাদের চোখে পড়লো, দূরে একটি তাঁবু। পড়িমড়ি করে তারা ছুটলো সেই তাঁবুর দিকে। তাঁবুর ভেতরে এক আরব শেখ তাকিয়ায় হেলান দিয়ে হুঁকা টানছে, তার সামনে ছয় কাপ পানি। কাপের আকার চায়ের কাপের মতোই।

পাঁচ পর্যটক ঝাঁপিয়ে পড়ে পানি খেতে চাইলে আরব শেখ বাধা দিলো। পানির দাম মেটাতে হবে, জানালো সে। দাম বেশি নয়, প্রতি কাপ পানির মূল্য পাঁচ টাকা। তৎক্ষণাৎ দাম মিটিয়ে পাঁচজনে পাঁচ কাপ পানি চোঁ চোঁ করে খেয়ে ফেললো। কিন্তু পিপাসা তাতে মিটলো না।

আরো এক কাপ পানি তখনও পড়ে আছে।

পাঠকের কাছে প্রশ্ন, ঐ এক কাপ পানির দাম কতো হওয়া উচিত?

২.
উদাহরণটি কিন্তু খুব অবান্তর নয়। বিদ্যুৎশক্তির সাথে ওপরের পরিস্থিতির সাদৃশ্য খুবই বেশি।

প্রতি বোরো সেচ মৌসুমে বাংলাদেশে বিদ্যুৎশক্তি নিয়ে যে অভাবনীয় পরিস্থিতি দেখা দেয়, এটি কেবলই আমাদের উৎপাদনে ঘাটতির জন্যেই নয়, বরং বিদ্যুৎ অর্থনীতি ও ব্যবস্থাপনার সাথেও জড়িত। আমাদের বিদ্যুতের মূল্য যে কাঠামো ধরে নির্ধারণ করা, সেটির একটি গুরুতর ত্রুটি নীতিনির্ধারকদের চোখ এড়িয়ে গেছে। সেই ত্রুটিটি চিহ্নিত করতেই মরুভূমিতে হারিয়ে যাওয়া পাঁচ পর্যটক আর ছয় কাপ পানির গল্পটি তুলে ধরলাম।

আমাদের বিদ্যুৎ অর্থনীতি বলছে, ঐ পাঁচ পর্যটকের মধ্যে যার হাঁ সবচেয়ে বড়, তাকে পাঁচ টাকার বিনিময়ে ঐ এক কাপ পানি বিক্রি করা হোক। প্রশ্ন রাখতে চাই, এই মূল্য নির্ধারণ বর্তমান বাস্তবতার নিরিখে কতটুকু যৌক্তিক।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার দিকে যদি আমরা তাকাই, দেখতে পাবো, এটি বহুলাংশে প্রাকৃতিক গ্যাসনির্ভর। আমাদের গ্যাসের মূল্যনীতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্যে ব্যবহৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের মূল্য লক্ষণীয়ভাবে কম।

Energymix

কিন্তু এই উৎপাদন কাঠামো আমাদের চাহিদার সবটুকু পূরণ করতে পারে না। বাড়তি চাহিদা পূরণের জন্যে সরকারী মালিকানায় বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের দিকেও সরকারের আগ্রহ কম, বরং শীর্ষ চাহিদার সময় বিদ্যুৎ যোগানোর জন্যে ব্যক্তিমালিকানাধীন ছোটো বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ কিনে ভর্তুকি দিয়ে জনগণের কাছে সরবরাহের একটা প্রবণতা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বোরো মৌসুমে যখন সেচের জন্যে বিদ্যুতের চাহিদা সেচকাতর এলাকায় তুঙ্গে থাকে, তখন শহরে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে গ্রামাঞ্চলে সরবরাহ বাড়ানো হয়ে থাকে। বোরো মৌসুম চলাকালীন এবং বোরো মৌসুম শেষ হবার পরও জুলাই-অগাস্ট পর্যন্ত ঢাকা শহর যে ভয়াবহ লোডশেডিঙের কবলে পড়ে, তা থেকে মানুষকে কিছুটা পরিত্রাণ দিতেই সরকার গ্যাস সঙ্কটের কারণে নিজস্ব গ্যাসভিত্তিক বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিবর্তে ব্যক্তিমালানাধীন ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলনির্ভর "কুইক রেন্টাল" পাওয়ার কেনার দিকে ঝুঁকে পড়েছে।

২৪ ডিসেম্বর, ২০০৯ তারিখে দৈনিক প্রথম আলোয় প্রকাশিত "ভাড়ায়চালিত পাঁচটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের দরপত্র অনুমোদন" শীর্ষক খবর থেকে আমরা জানতে পাই,

[i]ভাড়ায় চালিত ৩৩০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন পাঁচটি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য দরপত্রের অনুমোদন দিয়েছে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। ...বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ডিজেলচালিত কেন্দ্র থেকে প্রতি ইউনিট বিদ্যুত্ কিনবে ১২ টাকা ৫৮ পয়সা থেকে ১৩ টাকা ৭৪ পয়সায় এবং ফার্নেস তেলচালিত কেন্দ্রগুলো থেকে কিনবে সাত টাকা ১৪ পয়সা থেকে সাত টাকা ২৯ পয়সায়। পিডিবি এই বিদ্যুত্ প্রতি ইউনিট বিক্রি করে থাকে দুই টাকা ৩৭ পয়সায়। বার্তা সংস্থা ইউএনবি জানায়, এ জন্য সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে এক হাজার ৮৩৩ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।[i]

আমাদের বিদ্যুতের মূল্য কাঠামোতে আবাসিক ব্যবহারের জন্যে স্ল্যাব বা স্তর তিনটি। বাংলাদেশে সর্বশেষ মূল্য নির্ধারণের পর বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে নিম্নরূপ হারে,

০-১০০ ইউনিট: প্রতি ইউনিট ২.৬০ টাকা
১০১-৪০০ ইউনিট: প্রতি ইউনিট ৩.৩০ টাকা
৪০০+ ইউনিট: প্রতি ইউনিট ৫.৬৫ টাকা

বাংলাদেশের যে কোনো স্থানেই মাসে ১০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ খরচ হতে পারে দরিদ্র গ্রাহকের জন্যে। ১০০ থেকে ৪০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ খরচ হয় নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তের, উচ্চবিত্তের বিদ্যুৎ খরচ হতে পারে ৪০০ ইউনিটের বেশি। এমন একটি সরল স্তরীভবনের ওপর ভিত্তি করে কর্তৃপক্ষ দৃশ্যত দরিদ্রের কাছে বিদ্যুৎ মাত্র ২ টাকা ৬০ পয়সায়, মধ্যবিত্তের কাছে সর্বোচ্চ ৩ টাকা ৩০ পয়সায় এবং উচ্চবিত্তের কাছে সর্বোচ্চ ৫ টাকা ৬৫ পয়সায় সরবরাহ করছে। কিন্তু বাস্তব চিত্রটি ভিন্ন।

বোরো মৌসুমে এবং গ্রীষ্ম-বর্ষায় লোডশেডিঙের কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ থাকে। এ সময় ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে বিদ্যুতের বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হয়। এই বিকল্প বিদ্যুতের মূল্য [ডিজেল জেনারেটর] জেনারেটরের মডেলবিশেষে পনেরো থেকে তিরিশ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। একজন উচ্চবিত্তের জন্যে এই খরচ তুলনামূলকভাবে কম হবে, কারণ তিনি নিজের জন্যে একটি জেনারেটর কিনতে ও চালাতে পারবেন, অর্থাৎ এক ইউনিট বিদ্যুৎ তিনি পনেরো থেকে কুড়ি টাকার মধ্যে পাচ্ছেন। মধ্যবিত্ত বা দরিদ্রের কাছে পক্ষান্তরে এই বিকল্প বিদ্যুৎ তৃতীয় কোনো পক্ষ চড়া দামে বিক্রি করেন মাসিক ভাড়া হিসেবে, ফলে তাদের জন্যে এর মূল্য তিরিশ টাকার কাছাকাছি পড়ে। এর অর্থ, যখন বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকে, তখন দরিদ্রকে প্রায় দশ থেকে বারো গুণ বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনতে হবে, মধ্যবিত্তকে কিনতে হবে নয়গুণ বেশি দামে, আর উচ্চবিত্তকে কিনতে হবে মাত্র আড়াই গুণ বেশি দামে।

আমরা যদি বিদ্যুৎ ভোগের চিত্রটির দিকে তাকাই, তাহলে দেখবো, সরকারী বিদ্যুৎ সরবরাহের একটি তুলনামূলক বড় অংশ উচ্চবিত্ত ভোগ করেন। নিচের চিত্রটি পান্থপথের একটি ১১০০ বর্গফিটের অ্যাপার্টমেন্ট এবং ধানমণ্ডির একটি ১৬০০ বর্গফিটের অ্যাপার্টমেন্টের ২০০৯ সালের বছরভর বিদ্যুৎ বিলের তথ্যের ভিত্তিতে নির্মিত।

comparison

এ চিত্রটি থেকে আমরা দেখতে পাবো, পান্থপথনিবাসী পরিবারটি বিদ্যুৎসাশ্রয়ী আচরণ বেছে নিয়েছে। পক্ষান্তরে ধানমণ্ডি নিবাসী পরিবারটি বিদ্যুৎভোগের ব্যাপারে সাশ্রয় উদাসীন। মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরত্বের ব্যবধানে একই রকম আবহাওয়ায় ধানমণ্ডিনিবাসী পরিবারটি কয়েকগুণ বেশি বিদ্যুৎ খরচ করে চলেছে। সেপ্টেম্বর মাসে দু'টি পরিবারের ব্যবহৃত বিদ্যুৎশক্তির পার্থক্য ৮৯৭ ইউনিট!

সরকারের আবাসিক বিদ্যুতের জন্যে তিনটি স্তর এখানে তিন রঙে দেখানো হয়েছে। আমরা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, সরকারের মূল্য নির্ধারণ একটি উচ্চবিত্ত পরিবারকে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্যে উৎসাহিত করছে না, যেখানে মধ্যবিত্ত পরিবারটি সরকারের বেঁধে দেয়া একটি সীমার [৪০০ ইউনিট] নিচে থাকছে বা থাকার চেষ্টা করছে।

৩৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ঘাটতি পূরণ করতে গিয়ে সরকার যখন ১,৮৩৩ কোটি ৮৮ লক্ষ টাকা ভর্তুকি দেয়, তার মূল সুবিধাভোগী হিসেবে আমরা উচ্চবিত্তকেই দেখতে পাই, যারা বিদ্যুৎ যথেচ্ছ ব্যয় করেন। একটি এক কুলিং টনের এয়ার কণ্ডিশনার ৪৪টি সিলিং ফ্যানের সমান হারে বিদ্যুৎ খরচ করে। তাই বিদ্যুতের টানাটানিতে বিপর্যস্ত ঢাকায় একজন উচ্চবিত্ত যখন নিজের ঘরের এসি চালু করেন, অন্য কোথাও ৪৪টি সিলিং ফ্যান বন্ধ হয়ে যায়। এ চিত্র কি আমাদের চোখে পড়ে?

এই যথেচ্ছ বিদ্যুৎ ভোগ আমাদের সম্ভোগবিলাসের চিত্রই শুধু নয়, বরং সরকারী পর্যায়ে এ সম্ভোগবিলাসকে উৎসাহ দেয়ারও চিত্র। আসুন শ্রীলঙ্কার দিকে তাকাই।

srilankapower

শ্রীলঙ্কার বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ভূমিকা রাখে জলবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো, বাকি অংশ ডিজেলচালিত কেন্দ্র থেকে আসে। শ্রীলঙ্কায় আবাসিক ব্যবহারের জন্যে বিদ্যুৎ বিলে স্তর রয়েছে ছয়টি:

০-৩০ ইউনিট: প্রতি ইউনিট ৩.০০ রূপি
৩১-৬০ ইউনিট: প্রতি ইউনিট ৪.৭০ রূপি
৬১-৯০ ইউনিট: প্রতি ইউনিট ৭.৫০ রূপি
৯১-১৮০ ইউনিট: প্রতি ইউনিট ১৬.০০ রূপি
১৮১-৬০০ ইউনিট: প্রতি ইউনিট ২৫.০০ রূপি
৬০০+ ইউনিট: প্রতি ইউনিট ৩০.০০ রূপি

তাপবিদ্যুতের জন্যে ২০০৮ সাল পর্যন্ত শ্রীলঙ্কায় প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ ছিলো ১৬.৫৪ রূপি।

[সূত্রঃ সিলোন ইলেকট্রিসিটি বোর্ড]

আমরা দেখতে পাই, শ্রীলঙ্কায় আবাসিক বিদ্যুতের মূল্য সর্বনিম্ন স্তর থেকে সর্বোচ্চ স্তরে দশগুণ বেড়েছে। এই স্তরীভবন দরিদ্রকে স্বল্প মূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহের পাশাপাশি উচ্চবিত্তকেও সাশ্রয়ে উৎসাহিত এবং বিলাসে নিরুৎসাহিত করছে।

আসুন, বিভিন্ন বিদ্যুত খরচের জন্যে শ্রীলঙ্কার সাথে বাংলাদেশের বিদ্যুতের মূল্যের একটি তুলনা করে দেখি। এ তুলনার জন্যে শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশের মূল্য বিনিময়ের সাম্প্রতিক হার প্রয়োগ করা হয়েছে। লেখচিত্রে উল্লিখিত মূল্য দু'টিই টাকায় রূপান্তরিত।

comparison2

লেখচিত্র থেকে এ কথা স্পষ্ট, শ্রীলঙ্কার তুলনায় বাংলাদেশে তিনভাগের এক ভাগ মূল্যে যথেচ্ছ বিদ্যুৎ ভোগ করা সম্ভব।

ভর্তুকি দিয়ে বিদ্যুৎভোগের বিলাসকে সরকার কি আরো প্রশ্রয় দিয়ে যাবে? যার হাঁ বড়, সে-ই কি এই দুর্মূল্য বিদ্যুৎ গ্রাস করে বিশাল জনগোষ্ঠীকে লোডশেডিঙের দুর্ভোগের মুখে ক্রমাগত ঠেলে দেবে? নাকি শ্রীলঙ্কার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে আমাদের বিদ্যুতের বিলে আরো একটি বা একাধিক স্তর সৃষ্টি করে যথেচ্ছ বিদ্যুৎ ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করবে? বিদ্যুতের সামগ্রিক মূল্য বৃদ্ধি করে দরিদ্রের পিঠে বোঝা না বাড়িয়ে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তকে সাশ্রয়ের জন্যে চাপ প্রয়োগ করা খুব কঠিন হওয়ার কথা কি?

প্রশ্নগুলোর উত্তর জানার অপেক্ষায় রইলাম।



লেখাটি পাক্ষিক একপক্ষের বর্ষ ১, সংখ্যা ৪ এ প্রকাশিত হয়েছিলো।

3 comments:

  1. Khod pujibad er desh markin juktorashtreo dekhlam Lowest Tier ar Higher Tier er per unit electricity cost er ratio 3 (30 cents vs 11 cents per unit). Yearly income er upor base kore 20% porjonto rebate dewa hoi.

    BD te dekhchi ratio 2.

    ReplyDelete
  2. http://www.prothom-alo.com/detail/date/2012-02-02/news/221529

    ReplyDelete
  3. http://www.prothom-alo.com/detail/date/2012-09-21/news/291338

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।