Wednesday, July 14, 2010

দেবে আর নেবে, মেলাবে মিলিবে

উমবের্তো একোর একটি বইও আমি পুরোটা পড়ে শেষ করতে পারিনি। দোষ একোর নয়, আমারও নয়, সময়ের। বইগুলো হাতে এসেছিলো এমন একটা সময়, যখন দেশ ছেড়ে চলে আসার তোড়জোড় নিচ্ছি। সঙ্গে করে আনার উপায়ও ছিলো না। খানিকটা ভগ্নমনে পেছনে ফেলে এসেছি আধপড়া দ্য নেইম অব দ্য রোজ, বোদোলিনো, দ্য মিস্টিরিয়াস ফ্লেইম অব কুইন লোআনা। আমার স্বভাব হচ্ছে একসঙ্গে কয়েকটা বই শুরু করা। প্রত্যেকটা কয়েক খাবলা করে পড়ে একটার শেষ দেখে ছাড়ি। তারপর আরেকটাকে ধরি। তারপর আরেকটা। এভাবে পড়তে গিয়ে অনেক বই আধপড়া থেকে যায়।

এতক্ষণ এই ঘ্যানা প্যাচাল পাড়লাম একোর দ্য নেইম অব দ্য রোজে পড়া পুঁথি কপির ঘটনাটা বলার জন্যেই। বিভিন্ন মঠগুলো একটা বড় সময় ধরে ছিলো হাতে লেখা বই কপি করার প্রতিষ্ঠান। সারা পৃথিবী থেকেই সেখানে ম্যানুস্ক্রিপ্ট আসতো, যাজকেরা সেসব কপি করতেন। এক বই এসে বহু হতো।

গুটেনবের্গ এসে এই গিয়ানজাম থেকে মানবজাতিকে মুক্তি দেন।

কিন্তু গুটেনবের্গই তো আর বইয়ের জগতে ইনোভেশনের শেষ কাণ্ডারি নন। এককালে লোকে পাথরে লিখতো, এক বাইট তথ্যের ওজন হয়তো তখন ছিলো এক কিলোগ্রাম। এখন লোকে গ্রামপিছু হয়তো এক গিগাবাইট তথ্য বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে, অর্থাৎ ওজনের হিসেবে পারফরম্যান্স বেড়েছে এক লক্ষ কোটিগুণ।

এবার গল্পের বাকি আধখানা শোনাই। আমি একটি বই প্রসব করেছি [তার বেদনা এখনও বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছি, টু বি প্রিসাইজ], একজন ভারতনিবাসী সচলবন্ধু আবার আমার সেই বইটির কয়েক কপি কিনতে চাইছেন। তিনি জানতে চেয়েছিলেন, দেশ থেকে ভারতের একটি শহরে সেই বইয়ের কয়েক কপি পাঠানো সম্ভব কি না। বাংলাদেশ বা ভারতের পোস্টাল সার্ভিস, কোনোটিই গদোগদোচিত্তে প্রশংসার উদ্দিষ্ট সম্ভবত নয়, দেশ থেকে ভারতে এক কেজিতে গোটা ছয়েক বই পাঠাতে হাজার দু'য়েক টাকা খরচ পড়ে যায়। খাজনার চেয়ে যখন বাজনা এভাবে বাড়ে, তখন বইলেখক আর বইপাঠকের ক্ষীণ আর্তনাদ চাপা পড়ে যায়।

খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম, দেশে নাকি ভারতে মুদ্রিত বই রূপির দ্বিগুণ টাকার মূল্যে বিক্রি হচ্ছে। স্পষ্টতই, ডিলাররা বইগুলো গায়ে বয়ে নিয়ে আসেন কোলকাতা থেকে, তারপর বাংলাদেশের বাজারে ছাড়েন। তাদের যাতায়াতের খরচটা বইয়ের দামে ঢুকলে দাম তো বাড়বেই।

আমি এই গুটেনবের্গোত্তর যুগে এই প্রক্রিয়াটিকে প্রাগৈতিহাসিক না বললেও প্রায়ৈতিহাসিক বলতে চাই। একটা বই কোলকাতায় ছাপা হবে, আর আমরা কুলিমজুরের মতো সেসব বই বয়ে বয়ে এনে বাংলাদেশে বেচবো [এবং উল্টোটাও], এই হাঙ্গামা পোহানোর কোনো অর্থ হয় না। পশ্চিমবঙ্গবাসী বাঙালি লেখকরা স্বচ্ছন্দে বাংলাদেশের কোনো প্রকাশকের সাথে চুক্তি করতে পারেন, তাঁদের বইয়ের বাংলাদেশ সংস্করণ তখন ঢাকা, যশোর বা বগুড়ায় ছাপা হতে পারে, সেখান থেকে সারা দেশে বিক্রি হতে পারে। বাংলাদেশে যেহেতু গেঁয়ো যোগীরা ভিক্ষা পায় না, তাই ওপারবঙ্গীয় বইয়ের সুস্থ চাহিদা দেশে রয়েছে, এতে লেখকরা লাভবান হবেন নিশ্চয়ই। আর বাংলাদেশের প্রকাশকরাও মূল্য সংযোজন দেশের ভেতরে করতে পারবেন। সবচেয়ে বড় সুবিধা হবে, পাঠক আরো অনেক কম মূল্যে বইগুলো কিনতে পারবে। ঢাকা-কোলকাতা-ঢাকার যাতায়াতের খরচ আর সীমান্তে ঘুষ-বকশিশ-নাস্তোপহারের খরচগুলো তার পকেট থেকে আর বের হবে না। একই ব্যবস্থা দেখতে চাই উল্টিয়ে, অর্থাৎ, পশ্চিমবঙ্গের কোনো প্রকাশককেও এগিয়ে আসতে দেখতে চাই বাংলাদেশের লেখকদের বইয়ের ভারত সংস্করণ প্রকাশের ক্ষেত্রে। কোলকাতা আর ঢাকায় বইমেলাগুলোর স্বাদ তখন একটু হলেও পাল্টাবে আশা করি। এই ব্যবস্থা উভয়ের মেরুদণ্ডের জন্যেই স্বাস্থ্যকর, বিশেষ করে বইয়ের ভার যখন এত দুর্বহ যে পোস্টাল সার্ভিসও ঠিকমতো আলগাতে পারে না। ব্যাপারটাকে উৎসাহ দেয়ার জন্যে সরকার বাহাদুর বিভিন্ন শুল্ক ও অশুল্কজনিত গিয়ানজাম বসিয়ে দুই পক্ষকে এই পদ্ধতিতে আসার জন্যে চাপও প্রয়োগ করতে পারেন। কয়েকটা ইমেইল বিনিময় করলেই কয়েক মেগাবাইটের এই ভার পলকেই যোজন যোজন দূরত্বের বাধা পার হতে পারবে।

এই ভাবনার নিশ্চয়ই কিছু নিরাশাব্যঞ্জক দিক আছে। সেগুলো কেন যেন চোখে পড়ছে না। আপনার ধরিয়ে দিতে পারবেন, সে আশা রাখি।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।