Friday, July 02, 2010

অণ্ডকোষ

ছোট্ট একটা সেল। তাতে গাদাগাদি করে তিনজন।

দু'জন আবার উপুড় হয়ে শুয়ে।

বোঁ করে একটা মাছি এসে চক্কর খায় শায়িত দু'জনের ওপর, একজন দুর্বল হাত ঝাপটা দিয়ে সেটা তাড়ানোর চেষ্টা করে।

এক নম্বর ময়লা দেয়ালে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। মেঝেতে চিটচিটে কম্বলের ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে থাকা দুই নম্বর গোঙাতে গোঙাতে বলে, "এই সময় উকিলের বাচ্চা গেছে আম্রিকা! এইটা কি আম্রিকা যাওয়ার সময়? এদিকে কেয়ামত হয়ে যাচ্ছে!"

তিন নম্বর ডুকরে কেঁদে উঠে বলে, "কায়ামৎ হো চুকা মুজাভাই! কায়ামৎ তো বিলকুল হো চুকা!"

এক নম্বর মৃদু কিন্তু শক্ত গলায় বলে, "কী করছে তোমারে, দেলু?"

তিন নম্বর মেঝেতে হাত ঠেকিয়ে বহু কষ্টে হাঁটু আর হাতের ওপর ভর দিয়ে বসে। ফিসফিসে ধরা গলায় বলে, "ডিম।"

এক নম্বর একটু যেন কেঁপে ওঠে। গণ্ডগোলের পরের তিনটা বছর এরকম অস্থির সময় গিয়েছিলো। শেষদিকে অবশ্য অনেক কিছু গুছিয়ে এনেছিলো তাদের লোকজন। মওলানা সাহেবের পার্টি তখন বল যুগিয়েছে। আর জালেমের পতনের পর তো জেনারেল সাহেব সবকিছু আবার সুন্দর করে গড়ে তুলছিলেন। ওরকম মানুষ আর হয় না। পরের জেনারেলটা যদিও অনেক সুবিধা দিয়েছে তাদের, কিন্তু পয়লা জেনারেলটার মতো জেনারেল আর আসবে না দেশে।

হয়তো আসতো। তার আগের এক নম্বরের বড় বেটা অনেকদূর চলে গিয়েছিলো। হয়তো সে-ই হতো পরের সিপাহসালার। কিন্তু জালেমের দল দিলো না। অকালে খারিজ করে দিলো ওরকম একজন আলেম ফৌজদারকে।

তা দিক। ফৌজে বড় বেটার আসর কম নয়। নতুন ছানাপোনা থেকে শুরু করে পাকা জঙ্গ-ই-বাহাদুরেরা বড় বেটার গুণপনায় মশগুল। বাইরে থেকেও সে অনেক কলকাঠি নাড়তে পারবে, যখন উপরঅলার ইশারা আসবে। আর ভেতরের সাঙ্গাৎরা তো আছেই।

এক নম্বর মাথা ঝাঁকায়, দূর করে দিতে চায় এসব চিন্তা। ওয়াক্ত মাঝে মাঝে খারাপ যায়, জামানা মাঝে মাঝে রুখা হয়। কিন্তু আবার সব ঠিকও হয়ে যায়। আঁধার ফুঁড়ে আসে নওহিলালের রৌশনি। নারায়ে তাকবীর!

দুই নম্বর ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে।

এক নম্বর একটা চাপা ধমক দেয়। "খবরদার মুজা! রো মাৎ। রোনেকে লিয়ে ইতনে দূরতক নাহি পৌঁছা তুনে!"

দুই নম্বর ককিয়ে উঠে বলে, "তুমহারে লিয়ে তো অ্যায়সা বোলনা আহসান হায় নিজা ভাই। লেকিন হামারা গাঁড়কে লিয়ে তো নাহি! আরে কুছ করো ইয়ার! কুছ আইসক্রিম তো বুলা করো!"

তিন নম্বরও আইসক্রিমের বায়নায় সমর্থন দেয়।

এক নম্বর বলে, "আইসক্রিম খাওগে তো টনসিল বিগাড় যায়েগি।"

দুই নম্বর বলে, "আরে খানেকে লিয়ে আইসক্রিম চাহতা হায় কওন বেহেনচোদ! গাঁড়মে ডালনেকে লিয়ে বুলানে কো কেহতা হুঁ!"

এক নম্বর থতমত খেয়ে চুপ করে যায়। তিন নম্বর কুঁ কুঁ শব্দ করতে থাকে।

এক নম্বর গলা খাঁকরে বলে, "কীসের আণ্ডা, দেলু?"

তিন নম্বর দুর্বল গলায় বলে, "মনে হয় মুরগা।"

দুই নম্বর দাঁতে দাঁত চেপে বলে, "মুরগার আবার আণ্ডা হয় নাকি? বলো মুরগির আণ্ডা!"

তিন নম্বর ধরা গলায় বলে, "আগার পুলিশ চাহে তো মুরগা ভি আণ্ডা দেগা।"

বাইরে ডেস্কে বসা ইনচার্জ বাঘের গলায় ধমক দেয়, "হুজুরেরা উর্দুতে কথাবার্তা বন্ধ করেন। উর্দু চোদাইবেন ইসলামাবাদে যাইয়া।"

এক নম্বরের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। সব কয়টা ঠোলা সাদা পোশাকে আছে, ব্যাজ নাই কারো, কিন্তু চেহারা তো সে ভুলবে না। আর তার সাহাবারা ঠিকই বের করবে আজ ডিউটিতে কারা ছিলো। মিনিস্ট্রিতে অনেক মুরিদ আছে তার। এই দিন দিন না, আরো দিন আছে।

ইনচার্জ চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ায়, তারপর খট খট শব্দ তুলে হেঁটে আসে সেলের কাছে।

"কোনো সমস্যা হচ্ছে না তো স্যারেরা?" হাসি-হাসি কণ্ঠে শুধায় সে।

এক নম্বর চুপ করে থাকে। তিন নম্বর ফুঁপিয়ে উঠে বলে, "তোমার চৌদ্দগুষ্টি এর খেসারত দিবে! তুমি জানো না তুমি কী করছো!"

ইনচার্জ খুশি গলায় বলে, "আমি আসলেই জানি না আমি কী করছি। আপনিই বলে দ্যান হুজুর। কী করছি আমি?"

তিন নম্বর চুপ করে যায়। দুই নম্বর চিৎকার করে অভিশাপ দ্যায়, "তোমার বালবাচ্চা সবাই এর খেসারত দিবে অফিসার! ঘুঘু দেখেছো ফাঁদ দেখো নাই ...!"

এক নম্বর নিবৃত্ত করার চেষ্টা করে দুই নম্বরকে, কিন্তু দুই নম্বর চিৎকার করে শাপশাপান্ত করে যায়।

ইনচার্জ একটা সিগারেট ধরায়, তারপর উদাস গলায় বলে, "কীসের ডিম গেছিল হুজুর?"

তিন নম্বরও গালাগালি শুরু করে আবার।

ইনচার্জ কাকে যেন হাতছানি দিয়ে ডাকে, "ওরে অ্যাসিস্ট্যান্ট, তোমার তো নাম ধইরা ডাকা বারণ, কীসের ডিম দিছিলাম?"

একটু দূর থেকে কে যেন খোনা গলায় বলে, "স্যার লালদাড়িরে দিছিলেন মুরগির ডিম, আর সাদাদাড়িরে হাঁসের ডিম।"

ইনচার্জ সেলের ভেতর উঁকি দিয়ে দাড়ির রং দেখে, আবার সোজা হয়ে দাঁড়ায়। সিগারেটে একটা টান দিয়ে বলে, "হ, হাঁসের ডিমের ম্যাজিকই আলাদা।"

এক নম্বর মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে। এই গাড্ডা থেকে জামিনে বেরিয়ে চট্টগ্রাম আর শরীয়তপুর থেকে কয়েকজন ক্যাডার আনিয়ে ডিউটিতে থাকা সবকয়টা অফিসারের বাড়িতে বোমা ফাটানোর ব্যবস্থা করবে সে।

ইনচার্জ ডেস্কে ফিরে গিয়ে টেলিফোন তুলে নেয়, "হ্যালো, আজম সাহেব, হ্যালো!"

এক নম্বর কান পাতে। নামগুলো শুনতে হবে, শুনে মনে রাখতে হবে।

"বাহ, পাইছেন? ... লোক গেছে? বাহ বাহ ... হ্যাঁ হ্যাঁ ... হ্যাঁ, তদন্তের কাজে দরকার ... না না না, আপনাদের কোনো ব্যাপার না আজম সাহেব ... না না ... হ্যাঁ, সেটাই ... হায়াৎ ফুরাইলে তো মরবেই ... সবই উপরঅলার মর্জি ... বুঝি রে ভাই বুঝি ... ঠিকমতো খাইতে দিয়েন ... হ্যাঁ হ্যাঁ, ওষুধপত্র দিয়েন ঠিকমতো ... আচ্ছা ঠিকাছে, রাখি এখন ... ওয়ালাইকুম সালাম।" ঘটাশ করে ফোন নামিয়ে রাখে ইনচার্জ।

এক নম্বরের মাথায় দ্রুত চিন্তা খেলতে থাকে। কে এই আজম? তদন্তের কাজে তার কাছে কেন লোক যাবে? কে মারা গেছে? কাকে ঠিকমতো খেতে দিতে হবে, ঔষধ দিতে হবে?

ইনচার্জ ডেস্কে বসে একটা কানখুষ্কি দিয়ে কান চুলকাতে থাকে। তিনটা শকুনকে ধরে আনা হয়েছিলো, এখন সেলের ভেতর বসে আছে তিনটা ডিম। ছাড়া পেলে আবার ডিম ফুটে বেরিয়ে আসবে শকুন।

দরজা খুলে ভেতরে ঢোকে আরেকজন কর্মকর্তা, তার হাতে একটা বড় কাগজের বাক্স। ভেতর থেকে খড় বেরিয়ে আছে।

ইনচার্জ উৎফুল্ল গলায় হাঁক ছাড়ে, "অ্যাসিস্ট্যান্ট! মাল পাইলা?"

অ্যাসিস্ট্যান্ট হাসে। "হ স্যার। একদম টাটকা। চোখের সামনেই বাইর হইল।"

ইনচার্জ সেলের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। উপুড় হয়ে শুয়ে আছে তিন নম্বর আর দুই নম্বর। এক নম্বর সোজা হয়ে বসে আছে অন্যদিকে তাকিয়ে।

ইনচার্জ অ্যাসিস্ট্যান্টকে জানায় তার উপলব্ধির কথা। "আনছিলাম তিনটা শকুন, এখন বইসা আছে তিনটা ডিম।"

অ্যাসিস্ট্যান্ট নিরুত্তাপ হাসে। তাদের কাজই শকুনদের ডিম বানানো।

ইনচার্জ ডেস্কের ওপর থেকে ব্যাটনটা তুলে নেয়, তারপর সেলের গরাদে বাড়ি মারে জোরে।

"বড় হুজুর, বাইরে আসেন। আপনার জন্য স্পেশ্যাল জিনিস।"

এক নম্বরের মুখ থেকে রক্ত সরে যায়। দুই আর তিন নম্বর ঘুরে বসে হাত আর হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে।

ইনচার্জ কাগজের বাক্সটা দেখায়। "খাঁটি উটপাখির ডিম হুজুর। চিড়িয়াখানা থেকে আনা। একদম গরমাগরম। তবে আমরা আরেকটু গরম করে নিবো। আসেন।"

এক নম্বরের মাথাটা চক্কর দিয়ে ওঠে। দুই আর তিন নম্বরের দিকে তাকায় সে। সামান্য একটা তুষ্টির হাসি কি তাদের মুখে খেলা করে? চোখে অন্ধকার দেখে এক নম্বর।

ইনচার্জ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, সেলের মধ্যে গাদাগাদি করে বসে আছে কুঁকড়ে যাওয়া তিনটি ঘর্মাক্ত ডিম। তার মনে পড়ে যায় ছেলেবেলার বায়োলজি ক্লাস।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।