Friday, June 25, 2010

সমস্যা যখন ডিজাইনে

এবারের বাজেটে প্লাস্টিক আর রাবারের তৈরি স্যাণ্ডেলের আমদানি শুল্ক কমিয়ে দেয়া হয়েছে।

এই তথ্যটা পড়ে আমার একটু খটকা লাগলো। বাংলাদেশের প্লাস্টিক আর রাবার ইন্ডাস্ট্রি সম্পর্কে আমার ধারণা অপ্রতুল। বাংলাদেশে কাঁচামাল হিসেবে রাবারের অবস্থা সম্ভবত খুবই খারাপ, রাবার উন্নয়ন নিয়ে বহু বহুদিন কোনো কথা শুনি না। রামুর রাবার বনের কী অবস্থা, কে জানে? প্লাস্টিকের মতো একটা গুরুত্বপূর্ণ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ম্যাটেরিয়ালে বাংলাদেশের স্বয়ংসম্পূর্ণতা কতটুকু, আমি জানি না। তবে থাইল্যাণ্ড আর চীনের তৈরি স্যাণ্ডেল আর চপ্পল হুড়হুড় করে বাংলাদেশে ঢোকে [সমুদ্রপথেই বহুলাংশ ঢোকার কথা], এটা নিজের চোখেই দেখেছি। সেগুলো দামে সস্তা, সস্তা জিনিসের আয়ু যতটুকু, ততদিনই টেকে। বাংলাদেশেও প্লাস্টিকের স্যাণ্ডেল-চপ্পল উৎপাদন হয়, এমনকি টিভিতেও সেগুলোর বিজ্ঞাপন দেখা যায়। কাজেই বোঝা যায় বাংলাদেশে স্যাণ্ডেল আর চপ্পল শিল্প রুগ্ন নয়, গত পঁচিশ বছর ধরে তারা টিভিতে বিজ্ঞাপন যখন নিয়মিত হারে দিয়ে যেতে পারছে।

তাহলে এই প্লাস্টিকের স্যাণ্ডেল-চপ্পলের আমদানি শুল্ক কমানো হলো কেন? প্রতিবেশী রাষ্ট্রে উৎপাদিত পণ্যের ধর্ম হচ্ছে, বেশি শুল্কের মুখোমুখি হলে সে আর শুল্কের পথে হাঁটে না, চোরাচালানীর ঘাড়ে সওয়ার হয়ে মাঠঘাটখালবিলসমুন্দর পাড়ি দিয়ে পাশের দেশের বাজারে ঢুকে পড়ে। সরকারের মাথায় হয়তো এমন একটা চিন্তাই কাজ করে, এখন যারা চপ্পল চোরাচালান করে, শুল্ক কমিয়ে তাদের দুগ্ধধবল সিরাতুল মুস্তাকিমে টেনে হিঁচড়ে তোলা যায় কি না। কিন্তু এই চোরাচালানীরা কি আদৌ একটা প্রতিষ্ঠিত বাণিজ্য চ্যানেল ফেলে শুল্ক চুকিয়ে ভদ্রলোক হয়ে যাবে? আমার তো মনে হয় না। সীমান্তে সীমান্তরক্ষীরা কঠোর কোনো ব্যবস্থা না নিলে তারা যা করছিলো, তা করেই যাবে। শুল্ক কমিয়ে চোরাচালানীদের সাইজ করা কি সম্ভব?

নাকি সরকার ভেবেছে, স্যাণ্ডেলের শুল্ক বাড়াতে গেলে বা যেমন আছে তেমন রেখে দিতে গেলে আরো আরো লোক এই চপ্পল চোরাচালানের ব্যবসায় ঝাঁপিয়ে পড়বে? সেরকম সম্ভাবনাও থাকতে পারে, যদি দেশের বাজারে থাইল্যাণ্ড আর চীনের চপ্পলের বিপুল চাহিদা থাকে।

বাংলাদেশে চলতে ফিরতে স্যাণ্ডেল লাগবেই। ষোলোকোটি মানুষের দেশ, প্রতিবছর কয়েক কোটি স্যাণ্ডেলের চাহিদা থাকবে বাংলাদেশে। আমাদের নিজস্ব চপ্পল শিল্প কি এই চাহিদা যোগাতে অপারগ?

আমার ধারণা, সমস্যাটা একান্তই ডিজাইনে। থাইল্যাণ্ড আর চীনে তৈরি চপ্পলগুলোর রং, নকশা, আকৃতি আমাদের ক্রেতাদের মনোহরণ করেছে। এই ডিজাইনের সাথে পাল্লা দিয়ে হরেক রকম ডিজাইনের চপ্পল কি তৈরি করতে পারছে না আমাদের চপ্পল ইন্ডাস্ট্রি? তাদের ডিজাইন সেক্টরে মনোযোগের অভাবেই কি আমাদের নিজেদের পা ঢাকার জন্যেও আমাদের তাকাতে হচ্ছে চীন আর থাইল্যাণ্ডের দিকে?

আমাদের চপ্পল ইন্ডাস্ট্রির উচিত এ ব্যাপারে একটু মনোযোগ দেয়া। তা না হলে ভবিষ্যতে তারা এমন এক কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়বেন, যা সামাল দিতে গিয়ে নাভিশ্বাস উঠবে। এর প্রমাণ মেলে হিন্দি সিনেমা আমদানির জন্যে গণহিস্টিরিয়ায় ভোগা কমিউনিটির দিকে তাকালে। একটা লোকও যদি চীনা চপ্পলের কারণে বাংলাদেশে কাজ হারায়, সে ব্যর্থতা আমাদের সকলের। একজন অভিজ্ঞ এর্গোনমিস্টও যদি চপ্পল নকশার ভার নেন, গোটা ইন্ডাস্ট্রিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলেই বিশ্বাস করি। আমদানিপাগল মুদিদের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে একের পর এক শিল্পকে ছারখার করার কোনো মানেই হয় না।

3 comments:

  1. problem ta design e na. design improve korlei jodi mass level market e penetrate kora jaito taile baki shob shilpeo eita hoito. ekta industry r pichone design charao pach sho rokomer other facts kaj kore. Shob kichu milanor por ekta optimum state achieve korlei lavjonok howa shomvob ebong market dhore rakha shomvob. tar age na.

    ReplyDelete
  2. আমার মনে হয় জিনিস টেকসই এবং দেখতে ভালো হলে বাংলাদেশের বাজারে তা চালানো খুব সহজ। নিজে জুতা বা ব্যাগ কিনতে গেলেও কতদিন টীকবে এই চিন্তাটা মাথায় থাকে।

    ReplyDelete
  3. @ফাহিম

    ইন্ডাস্ট্রির পেছনে ৫০০ বা ৫০০০ ফ্যাক্টর (ফ্যাক্টস এখানে প্রযোজ্য না) কাজ করুক, কিন্তু বাংলাদেশের বাজারে স্যাণ্ডেল-চপ্পলের ক্রেতার কাছে সবচে ডিসাইসিভ ফ্যাক্টর তিনটা, দাম-আয়ু-নকশা। এই ক্রমটা দরিদ্রের জন্যে, ধনীর জন্যে উল্টো হবে, নকশা-আয়ু-দাম।

    প্রবলেমটা কেবল ডিজাইনে না হতে পারে, কিন্তু ডিজাইনে তো অবশ্যই। চীনা চপ্পলের দাম বাংলাদেশী চপ্পলের চেয়ে অনেক বেশি, আয়ু সমান বা কম। তারপরও লোকে নিয়মিত কেনে। একই কথা খাটে থাই চপ্পলগুলোর ক্ষেত্রেও, যদিও সেগুলোর আয়ু চীনা বা বাংলাদেশি চপ্পলের চেয়ে বেশি [এমপিরি থেকে বলছি]। আমাদের মার্কেট ফসকে যাচ্ছে দাম বা আয়ুর সমস্যায় নয়, ডিজাইন সমস্যায়। উল্লেখ্য যে ম্যাটেরিয়াল গ্রেডও ডিজাইনের অন্তর্ভুক্ত।

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।