Wednesday, June 23, 2010

ম্যারাডোনা জাতি

বাংলাদেশের মিডিয়াতে মানুষের আন্তর্জাতিক অর্জনগুলো যে বিস্তৃতি নিয়ে কাভার করা হয়, সেটি মনোযোগ দিয়ে দেখলে বাংলাদেশ সম্পর্কে ঠিক কী কী ধারণা হতে পারে? ধরা যাক, ভিনগ্রহ থেকে জনৈক আগন্তুক এসে হাজির হলো বাংলাদেশে, স্কাউটশিপ থেকে নেমে কোনো নিউজস্টল থেকে কিনলো এক কপি প্রথম আলো, কিংবা টিভি খুলে ধরলো এটিয়েনবাংলা। ডক্টর মোহাম্মদ ইউনুস নোবেল পেলেন, মুসা ইব্রাহীম এভারেস্ট জয় করলেন [এ নিয়ে আমার ব্যক্তিগত কিছু সংশয় আছে], মাকসুদুল আলম পাটের জিনোম সিকোয়েন্সিং প্রকল্পে সফল নেতৃত্ব দিলেন ... বিরাট বিকট কাভারেজ নিয়ে মিডিয়া ঝাঁপিয়ে পড়ছে এইসব সাফল্যের কাহিনীর ওপর।

কোনো সন্দেহ নেই, ভিনগ্রহী ভদ্রলোক তার লগবুকে লিখবেন, এই জাতির নসিবে অতীব দুষ্প্রাপ্য মাণিক্যযোগ ঘটেছে।

কথাটা মিথ্যেও নয়। আমরা তো আগে নোবেল পাইনি, আগে এভারেস্টেও চড়িনি, আগে কোনো শস্যের জিনোম সিকোয়েন্সিং করিনি। আমরা এ নিয়ে পত্রিকায় বীভৎস বিশাল ফন্টে খবর ছাপিয়ে কিছুটা আনন্দ উল্লাস করবো না কেন?

অবশ্যই করবো। কিন্তু আমরা ঠিক ওখানে থামতে জানি না। ডক্টর ইউনুস তাঁর নোবেলখানা বগলস্থ করে রাজনৈতিক নেতৃত্বে আসতে চান, আবার পরিস্থিতি প্রতিকূল দেখে রাজনীতির মাঠ থেকে সটকেও পড়েন। আলু-স্টার মিডিয়াগোষ্ঠীর আয়োজিত ও নিয়োজিত তারকা মুসা ইব্রাহীম ময়দানে নেমেছেন তরুণদের আইকন হিসেবে দুঃসাধ্য ইঁদুরদৌড়ে, তবে মাকসুদুল আলম এখন পর্যন্ত স্বীয় ধীশক্তির বলে ব্যবহৃত হওয়া থেকে দূরে আছেন।

এই যে কিছুদিন পর পর এক একটা মানুষের নাম ঝলক দিয়ে ওঠে আমাদের মিডিয়ার আকাশে, আমরা আসলে এঁদের বীরপূজা শুরু করি ঠিক কী ভাবনা থেকে? উচ্চশিক্ষিত প্রবাসীরা ডক্টর ইউনুসের রাজনৈতিক দলের পাণ্ডা হবার জন্যে কিলাকিলি করেন ঠিক কী ভেবে? মুসা ইব্রাহীমকে তরুণসমাজের রোল মডেল বানানোর চেষ্টায় আলু-গ্রুপ কেন ঘর্মাক্ত হয়?

আমি অনুভব করছি, এই মর্মান্তিক উচ্ছ্বাস আমাদের অন্তর্লীন দারিদ্র্যকে উল্টোপিঠে বহন করে চলে। বিজ্ঞান, ক্রীড়া, কলা, কৃষ্টি, অর্থনীতি, প্রযুক্তি সবকিছুতেই আমরা একটু একটু করে পিছু হঠতে হঠতে এখন পৌঁছে গেছি এমন এক পশ্চাদভূমিতে, যেখানে আমাদের ভূমিকা কেবল দর্শকের। একটিবার তাকান আমাদের দেশে বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে উন্মত্ত মানুষের দিকে, দেখুন আর্জেন্টিনা বনাম ব্রাজিলের পতাকা নিয়ে তাদের উৎকট উদ্দীপনা, ওখানে ফুটনোটে খুদি খুদি হরফে কী লেখা আছে? ওখানে আছে সেই পশ্চাদভূমির নিরুপায় দর্শকের হতাশাটুকু। আমাদের চারপাশে জীবন আর পৃথিবী হয়ে চলছে, ঘটে চলছে, করে চলছে, আমরা তা থেকে দূরে পড়ে আছি বহু অতীতে, স্পর্শ আর সাধ্যের বাইরে কোনো প্রিজনার অব আজকাবান হয়ে। আমাদের এই একশো ষাট মিলিয়ন মানুষের বেশির ভাগের মনেই ফুঁসছে দুর্দমনীয় সাধ, আমরা কেবল দেখে চলতে চাই না, আমরা শামিল হতে চাই এই সময় আর এই পৃথিবীতে। পারি না বলেই আমরা অশালীন তিনশো মিটার দীর্ঘ আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের পতাকা ওড়াই আকাশে, দেখাতে চাই, আমরা আছি, সমর্থক হয়ে আমরা অংশ নিচ্ছি পৃথিবীর সবচেয়ে স্ফূরিত ঘটনায়। বিশ্বকাপ ক্রিকেটে যখন বাংলাদেশ খেলে, তিনশো মিটার দীর্ঘ একটি বাংলাদেশের পতাকা কি উড়েছে দেশে? ওড়েনি, কারণ যে সাধ আমাদের হৃদয়ে অভুক্ত বাঘের মতো গর্জন করে ফুঁসছে, তার নিবৃত্তি ঘটে, যখন তামিম ইকবাল প্যাড পরে মাঠে নামে।

আমাদের এই জাতিগত অনপনেয় তৃষ্ণা আর অতৃপ্তির কথা গোপন নয়, তার অস্ফূট অর্ধস্ফূট কল্লোলস্বর মিডিয়া কান পেতে শোনে। এই মিডিয়া তাই নোবেল গলায় ইউনুসকে জাতির ত্রাতা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করে, পর্বতারোহীকে বানাতে চায় তরুণের ঈশ্বর। হিমশৈলের দৃশ্যমান সফল অংশটুকুর নিচে যে বৃহদাকার নিমজ্জিত ব্যর্থতা, তা কি ভিনগ্রহীর চোখে গোপন থাকে?

একটি সাফল্য নিয়ে অনির্দিষ্টকাল একে অন্যের পিঠ চাপড়ে উল্লাসের বিলাসিতা আমাদের নেই, যদি আমরা আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে তাকাই। আমাদের একজন শান্তিতে নোবেলজয়ী আছে, কিন্তু দেশে শান্তির অনুকূল রাজনৈতিক সংস্কৃতি নেই। একজন এভারেস্টজয়ী [আমার সংশয়ের কথা পুনর্ব্যক্ত করি] পর্বতারোহী আছে, দেশে কোনো পর্বতারোহণ প্রশিক্ষণকেন্দ্র নেই। একজন জিনোম সিকোয়েন্সিঙে অভিজ্ঞ বিজ্ঞানী আছেন, দেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি আলট্রাসেন্ট্রিফিউজ নেই। সাফ গেমসে আমরা কারাতে ইভেন্টে চারটি সোনা জয় করি, দেশে কোনো কারাতে একাডেমি নেই। এভাবে প্রতিটি সাফল্যের পেছনে হাত দিলে আমরা লেজের মতো আবিষ্কার করি প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাবটুকু। কে জানে, হয়তো প্রতিষ্ঠানের জন্ম দিলেই আমাদের মধ্যে ব্যতিক্রম হিসেবে উঠে আসা সফল মানুষগুলো নষ্ট হয়ে যান। আমাদের আসল রোগ হয়তো প্রতিষ্ঠানের যত্ন নিতে না পারা। হয়তো আজীবন ব্যক্তি উদ্যোগেই আমরা বছরে একজন দু'জনের নাম শুনবো নানা ক্ষেত্রে, কিছুদিন চেঁচাবো, তার খবর ব্লগ আর ফেসবুকে শেয়ার করবো, তারপর ভুলে যাবো। হিমশৈলের চূড়ায় শুয়ে রোদের নিচে শরীর তাতাতে দিয়ে ভুলে যাবো কত নিমজ্জন ইতিহাস হয়ে চুপচাপ ভেসে চলছে আমাদের মনোযোগের আড়ালে।

বাংলাদেশের এই বিচ্ছিন্ন সাফল্য নিয়ে আনন্দ করতে এখন অভিমান হয়। কেন আমাদের একজন বিজ্ঞানী রসায়নে নোবেল পাবেন না? কেন এভারেস্টে পৃথিবীর কনিষ্ঠতম কিশোরীটি বাংলাদেশের পতাকা ওড়াবে না? কেন বাংলাদেশে এমন একটি ইনস্টিটিউট গড়ে উঠবে না, যা বাংলাদেশের সকল প্রধান খাদ্যশস্য আর অর্থকরী শস্যের জিন সিকোয়েন্স করবে আগামী দশ বছরে? কেন বাংলাদেশের একজন নভোচারী ফেলে আসা পৃথিবীর গায়ে বাংলাদেশকে খুঁজবে না?

ম্যারাডোনা জাতির সন্তান তো আমিও। ২০১০ এর বিশ্বকাপ ফুটবলে মাঠের পাশে স্যুটপরা ম্যারাডোনার চেহারা দেখায় একটু পর পর। একটা করে বল হঠাৎ ছিটকে আসে ম্যারাডোনার দিকে, বুড়ো লোকটা কী ক্ষুধা, কী আকুতি, কী বেদনা নিয়ে ঝট করে তৈরি হয়ে দাঁড়ায় সেই নিরুদ্দিষ্ট ভ্রষ্ট বলের কক্ষপথে, হয়তো পা ঘুরিয়ে বলটা ফিরিয়ে দেয়, নয়তো হাত দিয়ে লুফে বুকে চেপে ধরে। সবাই ভাবে ম্যারাডোনা নেমেছে কাপের লোভে, আমি এই বুড়ো দাড়িঅলা লোকটার ভেতরে দেখতে পাই একজন হঠে যাওয়া ফুটবলারকেই। ম্যারাডোনা এখনও খেলতে চায় মাঠে। ওকে একটা দশ নাম্বার জার্সি এনে দিন, মাঠে নামতে দিন, ও আজও গোল করবে। করতে পারবে, এ বিশ্বাস আমার আছে। ঐ যে স্পর্শ আর সাধ্যের বাইরে থেকে শুধু দর্শক হয়ে থাকা, ম্যারাডোনার এই বেদনা গরীব বাংলাদেশের ছেলে হয়ে আমি অনুভব করি নিজের রক্তস্রোতে। ঐ যে গর্জমান সাধটুকু, তার ক্ষয়চিহ্ন আমাদের সবার পাঁজরের ভেতর দিকে আছে।

8 comments:

  1. আপনার অনুমতি ছাড়ায় লেখাটি ফেইসবুকে শেয়ার করলাম।আশা করি অপরাধটুকু মার্জনীয়।

    ReplyDelete
  2. সব দেশেই তরুণেরা কিছু একটা নিয়ে মেতে থাকে। বাইরের দেশগুলোতে বিনোদনের হাজারো পদ, আমাদের দেশে? সিনেমা হলে যাওয়া যায় না, সিনেমাও নাই, পরিবেশও নাই। যে কয়েকবার খেলাধূলা উপলক্ষে স্টেডিয়ামে যেতে হয়, মুখ চুন করে ফিরে আসতে হয় বেশিরভাগ সময়। ঘুরে বেড়াবার জায়গা আছে, প্লানড ট্যুরিজম নাই। এতো নাই আর নাইয়ের মাঝে দূরদেশ আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের খেলা আর তা নিয়ে ঝগড়া-তর্ক-আড্ডায় মেতে কিছু সময় পার করা...

    ReplyDelete
  3. ভাল লিখেছেন...খুব ভাল। আমরা হুট করে সাফল্য পেতে পছন্দ করি; দীর্ঘমেয়াদী কোন পরিকল্পনার ধার ধারিনা...

    -------------------------------------
    কেউ যাহা জানে নাই- কোনো এক বাণী-
    আমি বহে আনি;

    ReplyDelete
  4. আপনার অন্যতম সেরা লেখা। :) খুউব ভাল লাগলো।

    - সিরাত

    ReplyDelete
  5. ভালো লাগলো ।

    ReplyDelete
  6. পড়ে মন খারাপ হয়ে গেল। মাঝে মাঝে খুব হতাশ লাগে। ভয় হয় আমাদের আজীবন বামনই থেকে যেতে হবে আর দূরদেশী জায়ান্টদের চাঁদে হাত দেয়ার চেষ্টা দেখে মিথ্যে আদিখ্যেতা করে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে হবে।

    ReplyDelete
  7. চমৎকার লেখা। কিছু একটা করার সাধ জাগলো লেখাটা পড়ে। ছোট হোক, তবু দেশের মঙ্গলের জন্য কিছু একটা।

    ReplyDelete
  8. আমি হলে কথাগুলো আরও রূঢ় ভাষায় বলতাম, তবে প্রতিটি কথাই সত্য। পড়ে খুব ভালো লাগলো।

    সজীব

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।