Tuesday, June 15, 2010

টিরোলযাত্রা

গত সপ্তাহে বোঁচকার মধ্যে ক্যামেরা আর হাতে ট্রাইপড নিয়ে ছাড়া আধঘন্টা রোদের মধ্যে দাঁড়িয়েছিলাম। পাশে ধূমায়মান হের চৌধুরী। তারও হাতে বোঁচকা।

জার্মানিতে মিটফার বলে একটা ব্যবস্থা চালু আছে, এটা জার্মানবাসী সচলের লেখা পড়লে টের পাওয়া যায়। ব্যবস্থাটা উপকারী। ধরুন আপনি একজন গাড়িঅলা [বা গাড়িঅলি], জার্মানির এক শহর থেকে আরেক শহরে [সেটা জার্মানির বাইরেও হতে পারে] যাচ্ছেন। ম্যালা তেল খরচা হবে। এরচে সস্তায় যাওয়া যায় ট্রেনে, কিন্তু আপনাকে গাড়ি নিয়ে নড়তে হবে। আপনি তখন যেটা করবেন, একটা অনলাইন ডেটাবেজে নিখরচায় বিজ্ঞাপন দেবেন, যে আমি অমুক দিন অমুক সময়ে অমুক শহর থেকে তমুক শহরের দিকে যাচ্ছি, পথে চমুক আর সমুক শহর হয়ে যাবো, কে কে যাবি রে তোরা আয়। ভাড়া মাত্র মাথাপিছু অ্যাতো ইউরো। এই ভাড়া স্বাভাবিকভাবেই গাড়ির হালহকিকত ভেদে ওঠেনামে, তবে একাকী ট্রেনের টিকিটের চেয়ে সেটা খানিকটা সাশ্রয়ী হয়। গাড়িঅলারও পয়সা উসুল হয়ে যায়। আমার এককালের চিংকু প্রতিবেশিনীও এ যাত্রায় আমাদের সঙ্গী ছিলো। পেছনের সিটে জায়গা কম ছিলো, একদম ঠাসাঠাসি করে বসে ... ভারি মধুর অভিজ্ঞতা, বিস্তারিত কহতব্য নয়।

আমরা দরিদ্র ছাত্র, তাই এই ব্যবস্থা আমাদের জন্যে ভালো, গন্তব্যটা যেহেতু মিউনিখ। সেখানে সচল তীরন্দাজ আর সচল পুতুল থাকেন, তাঁদের সাথে এক চক্কর আড্ডা মারতেই যাওয়া। সচল হাসিব যোগ দেবেন আরেক শহর থেকে।

যাত্রাপথে যা ঘটলো সেগুলো নিয়ে আরেকটা গল্প লিখবো নাহয়। পৌঁছে কী হলো, সেটা নিয়েও আরেকটা গল্প লেখা যাবে। তার পরদিন যে দাওয়াত ছিলো, সেখানে নাচগান খানাপিনা হলো, সেটা নিয়েও আরেকটা গল্প লেখা যায়। এমনকি ফেরার পথে এলিভেটরে আটকা পড়ে যে ধুন্ধুমার কাণ্ড হলো, সেটা নিয়েও আমরা পাঁচজনে [সচল মনিরোশেন যোগ দিয়েছিলো রোববার। এই ব্যাটা পুরাই কুফা। সাথে থাকলে পুলিশে ধরে, কুকুরে তাড়া করে, লিফট বন্ধ হয়ে যায়, গাড়ি নষ্ট হয়, ট্রেন মিস হয়, কবে যে মনিরোশেনের সান্নিধ্যগুণে উল্কাপাতের শিকার হই সে আশঙ্কায় আছি] পাঁচ রকম গল্প লিখতে পারি। কিন্তু সেসব না বলে টিরোলযাত্রার গল্পই বলি। তবে তার আগে বলি, তীরন্দাজ মারদাঙ্গা বাঁধাকপি ভাজি করেন। সেদিন রাতে বাটি থেকে চেঁছেপুছে খেয়েছি সবাই মিলে। সচল হাসিব যে এতগুলো বাঁধাকপি এভাবে কচমচিয়ে খেতে পারেন, না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না।

টিরোল এখন দুই দেশে ভাগ হয়ে গেছে, অস্ট্রিয়া আর ইতালি। টিরোলে প্রচুর স্কি রিসোর্ট আছে, আর দুনিয়ার কিছু বাঘা বাঘা মাউন্টেনিয়ার এসেছে টিরোল থেকে। জার্মানির বাভারিয়া প্রদেশ থেকে সীমান্ত টপকে দক্ষিণে ঢুকলেই উত্তর টিরোল প্রদেশ। এর প্রধান শহরের নামটা সম্ভবত আমাদের অনেকেরই চেনা, ইনসব্রুক। ইন নামের একটা নদী টিরোলের বেশ খানিকটা জুড়ে এঁকেবেঁকে গেছে, উপত্যকামালার নামও এই নদীর নামে, ইনটাল। তীরন্দাজ আমাদের সেই ইনটালের এক নিভৃত কোণা [জায়গাটার নাম ৎসিয়ার্ল] ঘুরিয়ে দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। আমাদের উদ্দেশ্য ছিলো একটা খরস্রোতা ঝর্ণা দেখতে যাওয়া। জার্মান ভাষায় খাল বা ঝর্ণাকে বলে বাখ, এই ঝর্ণাটার নাম ফচশারবাখ।

যাবার পথে একটা দুর্ধর্ষ ঢাল ছিলো রাস্তায়, সেখানে গোটা রাস্তা ম ম করছে ব্রেক পোড়া গন্ধে। মাইল্ড স্টিল পুড়ে গেলে কেমন গন্ধ বের হয়, সেটা জানার আগ্রহ থাকলে ওখানে ভালো ব্রেকঅলা গাড়ি নিয়ে চক্কর দিয়ে আসতে পারেন, কিলোমিটার খানিক রাস্তা জুড়ে এই ঘ্রাণ। এবং ঢালের ওপাশে দুর্দান্ত সুন্দর একেকটা পাহাড়, আর তারচে সুন্দর উপত্যকা।

টিরোলের লোকজন মোটামুটি হাসিখুশি, শুধু তাই না, কফির সাথে এক গ্লাস পানি দেয়, যেটা বায়ার্নেও কেউ করে না। কফিঅলি চাচীকে একটা পাহাড়ের নাম জিজ্ঞেস করলাম, সে একেবারে এক পাহাড়ুকে ধরে আনলো নাম জানার জন্যে। জানলাম, সে ৎসিয়ার্লের সবচে নামকরা মাউন্টেনিয়ার এবং সে সর্বদাই সেই কফিশপে কফি খেতে আসে। মাউন্টেনিয়ার ভদ্রলোক বেশ রসিয়ে রসিয়ে সবক'টা চূড়ার নাম বললেন, ঐ যে দেখছেন গোলগালমতো ওটার নাম গোদা জলষ্টাইন [গ্রোসার জলষ্টাইন], আর ওরচে খানিক উঁচু ঐ যে ওটা দেখছেন ওটার নাম খোকা জলষ্টাইন [ক্লাইনার জলষ্টাইন] ... ইত্যাদি ইত্যাদি আরো অনেকগুলো নাম। আমি বুঝলাম, ইনি পাহাড়গুলো চড়ে চড়ে বাকি রাখেননি কিছু। যেখানে দু'টো পাহাড় আছে বলে আমি ভাবছিলাম, তিনি আট দশটা পিক শনাক্ত করলেন।

স্যান্ডউইচ বানিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম আমরা, কল্লোলিনী ফচশারবাখের পাশে কাপড় পেতে বসে সেটা দিয়ে লাঞ্চ হলো। জায়গাটা বেশ। ঝর্ণার কনকনে জলে পা ডুবিয়ে নিজের মোজার দুর্গন্ধ মারার জন্যে এক অসাধারণ জায়গা। গোটা যাত্রাই তীরুদার সৌজন্যে, আমাদের ভগরভগর সহ্য করে সারাটা দিন গাড়ি চালিয়ে বেচারা হয়রান হয়ে মিউনিখে ফিরেছেন। অবশ্য চোস্ত গরুর গোস্তো আর মুরগির গিলাকলিজা ছিলো রাতের মেন্যুতে, ফ্রাউ পুতুলের সৌজন্যে। মনিরোশেন এর কিছুই পায়নি। হতভাগা।

ছবি দেখেন, আর কী।
.
.
.

Created with flickr slideshow.

1 comment:

  1. বাক্কা সুন্দর জায়গা :)

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।