Wednesday, May 12, 2010

ইতিহাস রচনা

"কিছু পেলে, খান?"

ডঃ খান এতো চমকে উঠলেন যে তাঁর হাত থেকে পেন্সিলটা পড়ে গেলো। কার্লোস। লোকটা বেড়ালের মতো নিঃশব্দে হাঁটে। কখন যে পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে, টেরই পাননি তিনি।

"কাজ চলছে, কার্লোস।" গম্ভীর মুখে বলেন খান। কার্লোসের মুখে একটা বিরাট হাসি, চুপিচুপি এর ওর পেছনে হাজির হয়ে লোকজনকে চমকে দিয়ে একটা ছেলেমানুষি আনন্দ পায় সে। অনেকবার বলার পরও নিজেকে শোধরায়নি কার্লোস। মানচিত্র কেন্দ্রের প্রধান প্রশাসক অব্দি গড়িয়েছে ব্যাপারটা, তিনি ডেকে বকেছেন তাকে, কার্লোস গা করে না। লোকজনকে ভড়কে দেয়াই তার একমাত্র বিনোদন হয়তো।

"তুমি এত ঘাবড়ে গেলে, হা হা হা, এত ঘাবড়ে গেলে, মনে হচ্ছিলো তুমি চুরি করে নেংটু থ্রিডিগ্রাফ দেখছো। হি হি হি।"

ডঃ খান গম্ভীর মুখে তাকিয়ে থাকেন কার্লোসের দিকে, তার হাসি থামেই না। ঊরুতে চাপড় দিয়ে সে হেসেই চলে।

"কার্লোস, তোমার হাতে কোনো কাজ নাই?" গম্ভীরতর গলায় প্রশ্ন করেন খান। হাজার হোক, কার্লোস তাঁর সহকারী।

চোখের পানি মুছে কার্লোস বললো, "হো হো হো ... হ্যাঁ শেষ। ভাবলাম নিজেই এসে জানাই তোমাকে। হা হা হা, নেংটু থ্রিডিভিডি, হা হা হা ...।"

ডঃ খান গম্ভীর মুখে নেটওয়ার্ক থেকে কার্লোসের শেষ করা ম্যাপগুলো বেছে বের করেন। ফোল্ডার খুলতে গিয়ে তিনি দেখেন, বাংলায় লেখা, "পাছাপাহাড়"। কার্লোসের দিকে তাকিয়ে তিনি দেখেন, সে আবার নিঃশব্দে শরীর কাঁপিয়ে হাসছে তাঁর অভিব্যক্তির পরিবর্তন দেখে।

"এটা তুমি পেলে কোত্থেকে?" রুষ্ট গলায় প্রশ্ন করেন ডঃ খান।

কার্লোস মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে হাসতে হাসতে। "হা হা হা ... তুমি যদি তোমার চেহারাটা দেখতে পেতে খান ... এক সেকেণ্ডের মধ্যে তোমার চেহারাটা জেনারেল ফ্রাংকোর মতো কোষ্ঠকাঠিন্যমার্কা হয়ে গেলো! হো হো হো! পাছাপাহাড় ... হা হা হা ... পাছা পাহাড় ... লা সিয়েরা দে লোস কুলোস ... হা হা হা হা হা!"

ডঃ খান চুপচাপ ফাইলটা খোলেন। মন্স ক্লুনিস নামটা দিয়েছিলো তাঁর এই প্রজেক্টের আগের ডিরেক্টর, মারিয়া ভারগাস। কে জানে, মেক্সিকোর সবারই প্রত্যঙ্গভিত্তিক রসিকতা উপভোগ করে কি না। কার্লোস যে করে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সে ইন্টারনেট থেকে মন্স ক্লুনিসের বাংলা খুঁজে বার করে ফোল্ডারের নাম পাল্টে রেখেছে তাঁকে খ্যাপানোর জন্যে।

কার্লোস গম্ভীর মুখে একবার ক্রুশ আঁকে বুকে। "মারিয়া ... ঈশ্বর তাকে স্বর্গে রাখুক ... কী জোস একটা নাম দিয়েছিলো দেখেছো?"

এই প্রজেক্টের ম্যাপ দিনে কয়েক হাজার বার খুলে দেখতে হয় ডঃ খানকে, সাদৃশ্যটা চোখ এড়িয়ে যাবার কোনো উপায়ই নেই। ওডিনিয়া গ্রহের অন্যতম ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য এই বিশাল পাহাড়, দেখতে হুবহু মানুষের নিতম্বের মতো। মারিয়া ভারগাসকে শুধু একটু খেটে একটা ল্যাটিন নাম বার করতে হয়েছে।

কার্লোস ফিসফিস করে বললো, "আমার কাছে এটাকে দেখতে মারিয়ার পাছার মতোই মনে হয় মাঝে মাঝে।"

ডঃ খান সন্দিগ্ধ চোখে কার্লোসের দিকে তাকান, সে গম্ভীর মুখে সম্মতির অপেক্ষায় তাকিয়ে আছে তাঁর দিকে। কোনো উত্তর না পেয়ে সে গোমড়া মুখে বলে, "দেখো, মারিয়া মারা গেছে, তার মানে এ-ই না যে তার সুন্দর পাছা নিয়ে আমি কিছু বলতে পারবো না।"

ডঃ খান বলেন, "কার্লোস, তুমি রিপোর্ট লেখোনি কেন?"

কার্লোস কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে, "নিজেই তো এলাম। পরে ডেস্কে গিয়ে লিখছি দাঁড়াও। আসল কথা দুইটা বলে যাই। তোমার পাছার পাহাড়ে ... হে হে হে, তোমার পাছার পাহাড় ... হা হা হা, মানে, বলতে চাইছি মন্স ক্লুনিসে একটা গিরিখাত আছে। হা হা হা হা ... আসলেই পাছার পাহাড় ... হো হো হো।"

ডঃ খান হতাশ মুখে বলেন, "কার্লোস, তোমাকে আমি মানুষ করতে পারবো না। ভাগো। ডেস্কে যাও, রিপোর্টটা দাও, আমি দেখছি ম্যাপটা।"

কার্লোস একটা টুল টেনে বসে পড়ে বলে, "যাচ্ছি যাচ্ছি ... তুমি তো পাত্তাই দিচ্ছো না ব্যাপারটা। এই ক্যানিয়নটা প্রাকৃতিক বলে আমার মনে হচ্ছে না। আমি টেরেইন ফিচারগুলো রেন্ডার করলাম গত কয়েক হপ্তা ধরে। একেবারে মসৃণ, জ্যামিতিক একটা ক্যানিয়ন দুই পাহাড়ের মাঝখানে। কিন্তু দুই প্রান্ত এবড়োখেবড়ো। এ কারণেই আমাদের প্লটার রোবটগুলো যখন সার্ভে করছিলো, শুরুতে ব্যাপারটাকে পাত্তা দেয়নি কেউ।"

ডঃ খান কয়েক সেকেন্ড কার্লোসের চেহারা পরীক্ষা করে নিশ্চিত হলেন, সে নতুন কোনো রসিকতা শুরু করছে না। কার্লোস এই প্রজেক্টের অন্যতম সেরা টেলিকার্টোগ্রাফার, তার বদমায়েশি যে মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র এতদিন ধরে সহ্য করে আসছে, সেটা এমনি এমনি নয়। তিনি প্রথম ম্যাপটা খুললেন।

"দ্যাখো।" একটা পেন্সিল তুলে ম্যাপের একটা অংশ জুম করে দেখালো কার্লোস। "গত সভায় এতটুকু পর্যন্ত কাজ করা হয়েছিলো। লারিসাকে চেনো না, ঐ যে লাটভিয়ার মেয়েটা, ও কাজ করছিলো এটা নিয়ে। কিচ্ছা খতম বলে জমা দিয়ে দিয়েছিলো প্রোজেক্ট। আমি এর পর থেকে কী ভেবে আবার শুরু করেছিলাম। এরপর দেখলাম আমার সন্দেহই ঠিক। একটা পুরো রাস্তা চলে গেছে দুই পাহাড়ের মাঝখানে। প্রাকৃতিকভাবে এরকম একটা রাস্তা তৈরি হবার সম্ভাবনা খুব কম। অন্তত সোলার সিস্টেমে কোথাও নেই, সেটা আমি প্রায় নিশ্চিত।"

ডঃ খান পরের ম্যাপটা খুলে চমকে উঠলেন। অবিশ্বাস্য রকমের নিখুঁত একটা পথ বিশাল দুই পাহাড়ের মাঝখানে। মসৃণ জ্যামিতিক রেখায় একটু বাঁকা হয়ে চলে গেছে সেটা পাহাড়ের অন্য প্রান্ত পর্যন্ত। তিনি রুদ্ধশ্বাসে বললেন, "তুমি নিশ্চিত, এটা প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হতে পারে না?"

কার্লোস নিজের ভুঁড়ির ওপর হাত বোলাতে বোলাতে বললো, "আমি সেটারই খোঁজ নিতে লাইব্রেরিতে পাঠিয়েছিলাম লারিসাকে। সে গতকাল পর্যন্ত পৃথিবী, চাঁদ বা মঙ্গলে এমন কোনো কিছু পায়নি।"

ডঃ খানের মুখ থেকে রক্ত নেমে গেলো। "তুমি ... তুমি বুঝতে পারছো এর মানে কী?"

কার্লোস বললো, "হ্যাঁ। আমরা এখন পর্যন্ত ওডিনিয়ায় যতগুলো প্রোবিং স্টেশন চালু করেছি, তার কোনোটা থেকেই কিন্তু প্রাণের অস্তিত্বের সপক্ষে কোনো কিছু আসেনি। এইটা প্রথম।"

ডঃ খান বললেন, "এর দুটো অর্থ থাকতে পারে। হয় ওখানে এরকম একটা গিরিখাত তৈরি করার মতো কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন কোনো কিছু আছে, অথবা ওরকম বুদ্ধিমান কোনো প্রাণী আমাদের আগে ওডিনিয়ায় নেমেছিলো।"

কার্লোস বুড়ো আঙুল দেখালো।

ডঃ খান কার্লোসের পিঠ চাপড়ে দিলেন। "সাবাশ ব্যাটা! দারুণ জিনিস বার করেছো!"

কার্লোস আবার গা দুলিয়ে হাসতে শুরু করলো। "হে হে হে হে ... খান, দারুণ জিনিসের কথা তো এখনও বলিনি!"

ডঃ খান নিশ্চিত হলেন, কার্লোসের কাজের কথা ফুরিয়েছে। সে একটা অশ্লীল রসিকতা গুছিয়ে এনেছে মনে মনে।

কার্লোস বহুকষ্টে হাসিটা দমিয়ে রেখে বললো, "এই গিরিখাতের এলিভেশন কনট্যুর ম্যাপটা দেখো। একটা প্ল্যান ভিউ রেডি করে রেখেছি তোমার জন্য।" পেন্সিল দিয়ে ম্যাপটা খোলে সে।

ডঃ খান আবারও নির্বাক হয়ে যান। গিরিখাতের ঠিক মাঝখানের অংশটা অন্য অংশের চেয়ে চওড়ায় কয়েকগুণ। সেখানে একটা বৃত্তাকার কালো অংশ দেখা যাচ্ছে। অর্থাৎ, কোনো একটা গুহা বা সুড়ঙ্গ চলে গেছে গ্রহটার মাটির নিচে।

কার্লোস এবার ঘর ফাটিয়ে হাসতে থাকে। "মারিয়া! মারিয়া! ও দিও মিও! আমি মরে যাবো হাসতে হাসতে! এটা আসলেই মন্স ক্লুনিস! পাছার পাহাড়! হো হো হো হো হো! শুধু পাছার পাহাড়ই নয়, এটার একটা পোঁদও আছে! হা হা হা হা হা হা!"

ডঃ খান আচমকা হেসে ফেলেন। কার্লোসের হাসিটা দপ করে নিভে যায় তাঁর মুখে হাসি দেখে।

খান বলেন, "কার্লোস, ওডিনিয়ার ম্যাপিং প্রজেক্টের প্রধান হিসেবে এই ডিপ্রেশনটার নাম নিশ্চয়ই আমি রাখতে পারি?"

কার্লোস আবার হাসতে শুরু করে। "অবশ্যই খান! নিশ্চয়ই পারো! তুমি তো ল্যাটিন জানো ভালো! কী রাখতে চাও? আনুস ক্লুনাই? হা হা হা হা হা! ইট লুকস লাইক অ্যান অ্যাসহোল ... ঈশ্বরের কসম!"

ডঃ খান কার্লোসের কাঁধে হাত রেখে বললেন, "না, কার্লোস, আমি এটার নাম ল্যাটিনে নয়, বাংলায় রাখতে চাই।"

কার্লোস সাগ্রহে বলে, "নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই! কী রাখতে চাও?"

খান বেশি ভাবেন না। ছেলেবেলায় বাবার মুখে প্রায়ই শোনা একটা প্রতিজ্ঞাবাক্য মনে পড়ে যায় তাঁর। ভাষা উন্মুক্ত হবেই।

কার্লোস বলে, "কী ভাবছো?"

ডঃ খান হাসিমুখে বলেন, "আমি এটার নাম রাখতে চাই মোস্তফা গহ্বর!"

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।