Friday, May 07, 2010

প্ররক্ষা বনাম প্রতিযোগিতা

এক.

"ভারতীয়" সিনেমাকে বাংলাদেশের বাজারে উন্মুক্ত করা নিয়ে সম্প্রতি একচোট কথাবার্তা হয়ে গেছে সব জায়গায়। অচ্ছ্যুৎ বলাই একটি পোস্ট দিয়েছিলেন, সেখানে কিছু মত এসেছে, প্রথম আলোতে মশিউল আলম একটি আর্টিকেল লিখেছেন, কালের কণ্ঠে কলম ধরেছেন চলচ্চিত্রকার হুমায়ূন আহমেদ। তাঁদের বক্তব্যের সার কাছাকাছি, অনেকটা এমন ... এতদিন ধরে উপমহাদেশের অন্যান্য দেশের ও ভাষার সিনেমাকে বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশ করতে না দিয়ে যে প্রতিযোগিতাহীন নিরাপদ বাজারের সুযোগ দেয়া হয়েছে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পকে, তা কোনো কাজে আসেনি। চলচ্চিত্র শিল্পের মান নেমে গেছে। অতএব এই নিষেধাজ্ঞা তুলে দিয়ে অন্যান্য দেশের সিনেমাকে বাংলাদেশে বড় পর্দায় দেখার সুযোগ করে দেয়া হোক।


পটভূমিটা আমরা স্পষ্টভাবে দেখলে মতবিনিময়ে সুবিধা হবে। ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের প্রেক্ষিতে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার ভারতীয় চলচ্চিত্রের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। স্বাধীনতার পরও এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকে সদ্যস্বাধীন দেশের চলচ্চিত্র শিল্পের বিকাশের স্বার্থে। আমদানি নীতিতে লেখা বাক্যটি মশিউল আলম উদ্ধৃত করেছেন,

‘উপমহাদেশের ভাষায় প্রস্তুতকৃত কোনো ছায়াছবি (সাব-টাইটেলসহ বা সাব-টাইটেল ব্যতীত) আমদানি করা যাইবে না।’[/color]

আমরা এ কারণে বাণিজ্যিকভাবে দেশে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভূটান, শ্রীলঙ্কা বা মালদ্বীপের কোনো চলচ্চিত্র প্রদর্শন করতে পারি না। কাণ্ডজ্ঞান যা বলে, এ নিষেধাজ্ঞা না থাকলে আমাদের দেশে পশ্চিমবঙ্গ, মুম্বাই আর পাকিস্তানে নির্মিত বাংলা, হিন্দু আর উর্দু চলচ্চিত্রই চলতো, ভাষার কারণে বাকিগুলো মার খেয়ে যেতো (দক্ষিণ ভারতের কিছু গরম সিনেমা হয়তো ব্যতিক্রম হতো)।

বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান আমদানি নীতি থেকে এই ধারাটি বিলোপের উদ্যোগ নিয়েছিলো। সিনেমাহল মালিকবৃন্দ তার এই উদ্যোগকে স্বাগত জানায়। কিন্তু চলচ্চিত্র শিল্পের যারা মা-বাপ, তারা এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আন্দোলনের প্রস্তুতি নেন। তারপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণিজ্যমন্ত্রীকে বিরত করেন, এবং নিষেধাজ্ঞাটি জারি থাকে।

দুই.

মশিউল আলম ও হুমায়ূন আহমেদের আর্টিকেল দু'টি থেকে আমরা যা পাই, তা হচ্ছেঃ

১. বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে ৩৮ বছর ধরে যথেষ্ঠ প্ররক্ষা দেয়া হয়েছে।

২. কিন্তু এই নিশ্চ্যালেঞ্জ বাজারে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র বিকশিত হয়নি।

৩. চলচ্চিত্রশিল্পের ক্ষয়ের কারণে এর একটি পক্ষ, অর্থাৎ সিনেমা হল মালিকদের জন্যে বাণিজ্যের সুযোগ ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে।

৪. এই সামগ্রিক ক্ষয়ের কারণ এই নিষেধাজ্ঞাজনিত প্ররক্ষা।

৫. দর্শকরা বড় পর্দায় ভালো ছবি দেখতে চায়।

৬. যখন এ নিষেধাজ্ঞা ছিলো না (১৯৬৫ সালের আগে), তখন দেশে যেসব ছবি নির্মিত হতো, সেগুলোর মান অনেক উন্নত ছিলো।

৭. চলচ্চিত্র শিল্পের উত্তরণ ও বিকাশ, সিনেমা হল মালিকদের বাণিজ্যের সুযোগবৃদ্ধি এবং দর্শকদের ভালো সিনেমা দেখার সুযোগ সৃষ্টির জন্যে ঐ নিষেধাজ্ঞাটি তুলে নেয়া উচিত।


তিন.

পৃথিবীর অন্যতম শক্তিশালী দু'টি চলচ্চিত্র শিল্পকেন্দ্র, যথাক্রমে বলিউড ও দক্ষিণ ভারত বাংলাদেশের চলচ্চিত্র বাজারকে বিরাট চ্যালেঞ্জ দিতে পারতো, এ কথা খুবই সত্য। তবে চ্যালেঞ্জ যে তারা একেবারেই দেয়নি, সেটাও বলা যায় না। ভারতীয় চলচ্চিত্র বিকশিত হয়েছে কয়েকটি পর্যায়ে, এবং প্রতিটি পর্যায়ে একটি মন্থর কিন্তু নিশ্চিত ভরবেগ নিয়ে তাদের শিল্প বিস্তৃতি লাভ করেছে। ভারতে সিনেমার দর্শকের সংখ্যা বিপুল, শুধু দেশে নয়, দেশের বাইরেও। আমরা এক অর্থে ভারতীয় সিনেমার বাজারে ঢুকে বসেই আছি আশির দশকের শুরু থেকে, যখন ভিডিও ক্যাসেট ভাড়া করে আমাদের মা-খালারা জিতেন্দ্র-শ্রীদেবী-অমিতাভশোভিত নানা সিনেমা দেখতেন। তফাত খুব সামান্য, বিনোদনের বিনিময়ে টাকাটা যাচ্ছে আমাদের ভিসিডি-ডিভিডিঅলাদের কাছে। আমাদের কারো কাছে কি কোনো পরিসংখ্যান আছে, দেশে এই ডিভিডির বাজার কতটা বড়? আমার মনে হয় না। কিন্তু এ সংখ্যাটি খুব একটা ছোট নয়। হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করে বেরোনো কোনো তরুণী যখন তার বান্ধবীর সাথে অনর্গল হিন্দিতে কথা চালিয়ে যেতে পারে, তখন আরো একটি জিনিস বোঝা যায়, আমাদের বাজারে আনুষ্ঠানিকভাবে ঢোকার আগেই ভারতীয় সিনেমার প্রভাব ও প্রস্তুতি। পণ্য তার ক্রেতাকে সম্পূর্ণই বশে এনে রেখেছে, এখন ক্রেতা কেবল পকেটে হাত ঢুকিয়ে মানিব্যাগ থেকে পয়সা বার করে হাতবদল করাটা বাকি।

তাই যখন আমরা বলি, চলচ্চিত্রকে আমরা প্ররক্ষা দিয়ে এসেছি, কথাটা জেনেশুনে মিথ্যা বলা হয়। আমরা চলচ্চিত্রকে যথেষ্ঠ পরিমাণ প্ররক্ষা দিতে পারিনি। আমরা একটি মৌন প্রতিযোগিতার মুখে নিঃশব্দে হারতে ঠেলে পাঠিয়েছি আমাদের চলচ্চিত্রশিল্পকে, বলা যায় আশির দশক থেকেই। আমাদের দেশে ভারতীয় সিনেমার দর্শকগোষ্ঠী নিরবে, অথচ সবার গোচরেই স্ফীত হয়ে হয়ে বিপুলায়তন হয়েছে, সিনেমাগামী দর্শকের সংখ্যা কমেছে, আমরা কি কোনো ব্যবস্থা নিয়েছি?

কল্পনা করুন, একজন যোদ্ধা সম্মুখ সমরে নেমেছে, তার গায়ে বর্ম, কিন্তু শরীরে যক্ষার জীবাণু, কাশতে কাশতে মুখে গু তুলে মরার দশা তার। আপনি এসে বলছেন, এতোদিন বর্ম পরে থেকেও তুই বিকশিত হতে পারলি না, খানকির পোলা, এখন বর্ম খোল, ন্যাংটা হয়ে যুদ্ধ কর, দেখি প্রতিযোগিতা বাড়লে তুই বিকশিত হতে পারিস কি না। ঠিক একই যুক্তি কি আমরা দিচ্ছি না?


চার

আমরা মশিউল আলম আর হুমায়ূন আহমেদ সাহেবের আর্টিকেলে যে ফ্যালাসিগুলো এড়িয়ে যাচ্ছি, সেগুলো হচ্ছে কোরিলেশন আর কজালিটির ধাঁধাঁ। এ কথা খুব সত্য, যখন ভারতীয় চলচ্চিত্র পূর্ব পাকিস্তানে প্রদর্শিত হতো, তখন পূর্ব পাকিস্তানেও মোটের ওপর ভালো সিনেমা বানানো হতো। কিন্তু তা কি কেবল প্রতিযোগিতার ফল? ঐ সময়ে চলচ্চিত্র শিল্পে যে নবীন নির্মাতারা প্রবেশ করেছিলেন, তাঁদের সাথে বরং চলচ্চিত্রের মানকে আমরা সরাসরি কোরিলেট করতে পারি। ঐ মানুষগুলো যখন সরে গেছেন বা মরে গেছেন, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের মানকে নিজেদের সাথে কবরে নিয়ে গেছেন বললে কি খুব ভুল বলা হবে? আমরা দ্বিতীয় জহির রায়হান পাইনি সিনেমায়, পাইনি দ্বিতীয় আলমগীর কবিরকে, পাইনি দ্বিতীয় এহতেশামকে, পাইনি দ্বিতীয় খান আতাউর রহমানকে। একটি প্রজন্ম আমাদের চলচ্চিত্রশিল্পকে নিজের হাতে জন্ম দিয়েছে, তারা হারিয়ে যাবার পর তাদের স্থান নেয়ার মতো কেউ আসেনি।

এর সাথে আরো যোগ করুন ভারতীয় টিভি চ্যানেলের প্রভাব। আমি হিন্দি ভাষাটি মুখে আর কানে প্রায় ইংরেজির মতোই দক্ষতা নিয়ে জানি, কেবল টিভি দেখে। আমার মতো বৃদ্ধ দামড়ার কথা বাদ দিলাম, যে শিশুটি এখন দিনে চার থেকে আট ঘন্টা টিভিতে হিন্দি ভাষায় "এক্সপোজড", তার কাছে কিন্তু হিন্দিভাষী সিনেমা অপরিচিত কিছু নয়। বরং চলমান বাংলা সিনেমায় নায়িকার আবেগ বা ভিলেনের আক্রোশ তার কাছে অযৌক্তিক মনে হয়, হিন্দি সিনেমায় নায়কের কোলে নিশ্চিন্ত নায়িকার সঙ্গীত পরিবেশনকে সে বেশি স্বাভাবিক মনে করে, কারণ সে ক্রমাগত এ দেখেই বড় হচ্ছে। আমরা এর প্রতিফলন দেখি আমাদের প্রতিদিনের জীবন আর উদযাপনে। কোনো বড় দাওয়াতে গেলে দেখা যায় সাম্প্রতিক হিন্দি সিনেমা বা সিরিয়ালে দেখানো কোনো একটি ধাঁচের জামা একাধিক তরুণীর (মাঝে মাঝে তার প্রৌঢ়া খালা) গায়ে, বিয়ের অনুষ্ঠানের আচার ক্রমশ হিন্দি সিরিয়ালে দেখানো বিয়ের অনুষ্ঠানের দুর্বল অনুকরণ, ঘনিষ্ঠ ফোনালাপে হিন্দি সংলাপ। গত পনেরো বছর ধরেই মধ্যবিত্তের বিনোদনে যোগ হয়েছে মূলত ভারতীয় টিভি চ্যানেলে উপস্থাপিত অনুষ্ঠান। আমরা নির্বিচারে গলাধকরণ করেছি যে যার রুচিমতো। কিন্তু তারপরও আমরা চোখ বুঁজে বলে যাচ্ছি, আমরা চলচ্চিত্রশিল্পকে প্ররক্ষা দিয়েছি। এটা ইস্পাতের স্যান্ডো গেঞ্জি পরে সিল্কের লুঙ্গি উল্টিয়ে পাছা বার করে দাঁড়িয়ে থেকে প্ররক্ষা প্ররক্ষা বলে চেঁচানোর সমতুল্য।

এবার আসুন, তাকাই আরেকদিকে। চলচ্চিত্রশিল্পে যে ক্ষয় শুরু হয়েছে, তাকে রোধ করতে কর্তৃপক্ষ কী করেছে? কয়টা "অশ্লীল" ছবি দেখানোর জন্যে এর নির্মাতা, কুশলী আর হলমালিককে শাস্তি পেতে হয়েছে গত ৩৮ বছরে? যোগ্যকে শুধু পুরস্কৃত করলেই চলে না, দুষ্কৃতীকে শাস্তি দিতে হয়। আমরা কি সেটা নিশ্চিত করতে পেরেছি? আমার ধারণা উত্তরটা নেতিবাচক। তারপরও আমরা বলছি, চলচ্চিত্রশিল্পকে আমরা প্ররক্ষা দিয়েছি।

মশিউল আলমের আর্টিকেল থেকে জানা যায়, ২০০০ সালে সারা দেশে ১৬০০ সিনেমা হল ছিলো, আজ আছে ৬০০। গুগলে গুতা মেরে দেখলাম, ওদিকে এক অন্ধ্র প্রদেশেই ২৭০০ মুভি থিয়েটার আছে। ৭৮ বছর বয়সী তেলুগু সিনেমা যে পরিপক্কতা অর্জন করতে পেরেছে, আমরা ৩৯ বছরে তার ভগ্নাংশও অর্জন করতে পারিনি। কিন্তু এর কারণ কি কেবল "প্রতিযোগিতা"র অভাব, নাকি যত্নের? ভারতীয় চলচ্চিত্রশিল্পে কী বিপুল অঙ্কের পুঁজি বিনিয়োগ করা হয়, আমরা কি জেনেও না জানার ভান করে বসে আছি? এই যে সিনেমার মান গ্যালো, মান গ্যালো বলে এত চেঁচামেচি চলছে, কেন এত জ্ঞানীগুণী লোকজন থাকতেও ভালো স্ক্রিপ্ট আসছে না সিনেমায়, আসছে না ভালো গান, ভালো নৃত্য পরিচালনা, ভালো শব্দকৌশল, ভালো ল্যাব, ভালো স্টুডিও? আমরাই কি বারবার ভারতে ছুটে যাই না কারিগরি কাজে সাহায্য নিতে? আমাদের এই অমনোযোগই কি আমাদের দেশে চলচ্চিত্রপ্রযুক্তির বিকাশে সবচেয়ে বড় বাধা নয়? তারপরও আমরা পত্রিকায় কানতে কানতে লিখি, আমরা আমাদের চলচ্চিত্রশিল্পকে প্ররক্ষা দিয়ে আসছি।


পাঁচ

প্রতিযোগিতা হয় সমানে সমানে। অসমানে অসমানে যা হয়, তাকে বলা যেতে পারে ফিল্টারিং। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড আর আর্সেনালের মধ্যে প্রতিযোগিতা হতে পারে, কিন্তু বার্সেলোনা আর রহমতগঞ্জের মধ্যে যে ম্যাচ, সেটা রহমতগঞ্জের টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে পড়ার একটা আনুষ্ঠানিক সুযোগ মাত্র। বড় গলা করে বলা যায়, হারজিত ব্যাপার না, প্রতিযোগিতাই বড় কথা, কিন্তু আসল কথা আমরা সবাই জানি, খেলতে নামতে হয় জেতার জন্যেই, হারার জন্যে না।

যারা বলিউডের সিনেমার সাথে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকারদের প্রতিযোগিতার কথা বলেন, তারা তাদের মতলব চেপে যাচ্ছেন। বাংলাদেশের কোনো বাপের ব্যাটাই সিনেমা দিয়ে বলিউডের বিরাট, বিপুল সিনেমাযন্ত্রের মুখোমুখি হতে পারবে না। সেই সাধ্য বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের নাই। কেন নাই, তা নিয়ে বিশদ বিশ্লেষণ এবং সঠিক কারণ চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হয়, আসুন নিই, কিন্তু "প্রতিযোগিতা"র মাধ্যমে তার মান বাড়ানোর কথা যদি বলেন, তাহলে একবার তাকান পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্রশিল্প আর পাকিস্তানের চলচ্চিত্রশিল্পের দিকে। প্রবল বলিউডের সামনে তারা কুঁকড়ে গেছে। আমাদের চলচ্চিত্রশিল্পের পরিণতি তারচেয়ে ভিন্ন হবে না।

বর্তমান পৃথিবীতে চলচ্চিত্রে যেসব যান্ত্রিক কৌশল এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ঔৎকর্ষ্য এসেছে, তার সাথে আমাদের দর্শক কিন্তু সমাক্ষ। আমাদের দর্শক সিনেমার সাম্প্রতিকতম কলাকৌশলের তারিখ করতে শিখে গেছে, যেসব কৌশল বলিউডি সিনেমায় এখন নিতান্ত সাধারণ উপকরণ, কিন্তু আমাদের সাধ্যের বাইরে। এ পরিস্থিতিতে আমরা "প্রতিযোগিতা"র নাম করে তাঁবুর দরজা খুলে দিচ্ছি, ঢুকতে দিচ্ছি সেই প্রবাদের উটকে, যে একসময় আমাদেরই তাঁবুর বাইরে বার করে দিয়ে গোটা তাঁবু দখল করবে।

৬০০ সিনেমা হল মালিকের সাথে ঠিক কয়টি পরিবার সংশ্লিষ্ট? ৬ হাজার? আর চলচ্চিত্রশিল্পে জড়িত কয়টি পরিবার?

হ্যাঁ, ভারতীয় তথা হিন্দি চলচ্চিত্র বাংলাদেশে ঢুকলে সিনেমাহলগামী হবে বহু লোকে। তবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র বিকশিত হবে না। আজ যারা চলচ্চিত্রে কালো টাকা ঢালছে, তারা বরং নতুন সিনেমা হল খুলবে। আজ একজন জেমস হিন্দি সিনেমায় গান গাইতে পেরে নিজেকে কৃতার্থ ভাবছে, কাল হয়তো ওরকম আরো তিনজন জাতে উঠবে বলিউডি সিনেমায় কোনো টুকিটাকি রোল করতে পেরে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের একটি ধারা শুকিয়ে না খেতে পেয়ে মৃত্যুবরণ করবে, আর অন্যটি হবে আমাদের চিবানোর জন্য হাড্ডির মতো, বছরে বা দু'বছরে শোরগোল করার সবেধন নীলমণি। বাকি দেশ গিলবে হিন্দি গাঁড় মারকে চলা নাহি যানা।

ছয়

এক লোক সিনেমা বানিয়েছে সম্প্রতি। তার নাম সম্ভবত আবদুল জলিল, সেটাকে ভদ্রোচিত এম এ জলিল বানিয়ে দেয়া হয়েছে, যাতে করে কেউ নিশ্চিত হতে না পারে ঐ এম আর ঐ এ-র আড়ালে কোন সেই গূঢ় নাম লুকিয়ে আছে। মুরুক্ষু বলে মোহাম্মদ আবদুল জলিল ভেবে বসি। জলিল সাহেবের স্ক্রিন নাম কী, নিশ্চিত নই, কিন্তু ফেসবুকে তিনি অনন্ত নামে খ্যাতি পেয়েছেন। তিনি তৈরি পোশাক ব্যবসায়ী, নেমেছেন সিনেমা করতে। ছবির কাহিনী হাস্যকর, নায়কের ভূমিকায় তার নড়াচড়া আর সংলাপ ডেলিভারি আরো হাস্যকর, কিন্তু তারপরও বলি, ভাই, আপনি চালিয়ে যান। খোঁজ দ্য সার্চের পর আপনি পাইছি দ্য ফাউন্ড বানান। দেশে থাকলে সবান্ধব দেখতে যাবো আপনার সিনেমা। আপনার সিরিয়াস ডায়লগের উপর খ্যাক করে হেসে দেয়ার জন্যেই যাবো। আমি চাই, আপনার মতো আরো পুঁজিপতি সিনেমায় বিনিয়োগের জন্য এগিয়ে আসুক। আমি নিশ্চিত, লাভের আশা দেখলে আপনারা নিজে নায়ক না হয়ে নায়কোচিত কোনো যুবককে ছেড়ে দিবেন নায়কের রোলখানা, স্ক্রিপ্ট লেখাবেন কোনো সত্যিকারের লেখককে দিয়ে, কোনো প্রতিভাবান নবীন পরিচালককে দেখা যাবে ক্যামেরার পাশে, কোনো ঝানু ক্যামেরাম্যান থাকবে ক্যামেরার পেছনে। ঢাকাতেই কোনো আধুনিক ল্যাবে প্রসেসড হয়ে বের হবে ঝকঝকে প্রিন্টে কোনো সিনেমা।

আর, নিজে না পারলে, এইরকম কিছু লোকের জন্যে খোঁজ দ্য সার্চ চালান।


সংযোজন
তিনজন চলচ্চিত্র নির্মাতা পত্রিকায় বক্তব্য দিয়েছেন এ ব্যাপারে। হলমালিক সমিতিও বক্তব্য দিয়েছে। চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি বক্তব্য দিয়েছে হুমায়ূন আহমেদের বক্তব্যের প্রতিবাদে। সাংবাদিক আনিসুল হক এই উদ্যোগের প্রতিবাদে কিছু কথা বলেছেন।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।