Friday, March 26, 2010

হামিদ মিরের জন্য

১.
হামিদ মির একজন পাঞ্জাবি সাংবাদিক, পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদকেন্দ্রিক জিও টেলিভিশনের তিনি কর্তাপদস্থ ব্যক্তি। প্রায়ই দৈনিক প্রথম আলোতে তাঁর লেখা ছাপা হয়। সেগুলো পাকিস্তান প্রসঙ্গে। তাঁর সেই লেখাগুলো পড়ে তাঁকে একজন স্বাভাবিক মানুষ ও অস্বাভাবিক পাকিস্তানী বলে মনে হয়েছে। প্রথম আলোতে আগে ডন এর সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী মোহাম্মদ বাকির নাকভির লেখা ছাপা হতো, ২০০৯ এর ৭ নভেম্বর নাকভির মৃত্যুর পর তাঁর স্থানটি মির দখল করেছেন বলে মনে হচ্ছে।

প্রথম আলোতে মির একটি লেখা দিয়েছেন সম্প্রতি। সেখানে তিনি পাকিস্তানীদের আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশীদের কাছে "দুঃখ প্রকাশ" করতে এবং এর মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক নতুনভাবে শুরু করতে।

যেহেতু মিরের লেখা ইংরেজিতে আসে, এবং সেটার একটি বাংলা অনুবাদ করা হয় প্রথম আলোতে, তাই আমরা ধরে নিতে পারি, মির দুঃখ প্রকাশ বলতে হয়তো রিগ্রেট বা সমার্থক শব্দ ব্যবহার করেছেন।

মিরের লেখায় আমরা তাঁর ব্যক্তিগত দুঃখ প্রকাশের কথা জেনেছি। তিনি এ-ও জানিয়েছেন, পাকিস্তানের অনেকে তাঁর এই অবস্থানের কারণে ক্ষিপ্ত।

পাকিস্তানের পক্ষ থেকে সরকারী পর্যায়ে "দুঃখ প্রকাশ" এর যেসব মৃদু উদ্যোগ নেয়া হয়েছে গত ৩৯ বছরে, সেগুলো সম্পর্কে আমরা একটা ধারণা পেতে পারি দৈনিকে প্রকাশিত হাসান ফেরদৌসের একটি লেখায়

২.
মির সাহেবের জন্যে এবার একটি ঘটনা তুলে ধরবো। ক্ষমতা জবরদখলকারী পাক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মুশাররফ বাংলাদেশ সফর করেছিলো ২০০২ এর জুলাই মাসে। পাকিস্তানী প্রেসিডেন্টের আগমন উপলক্ষে খুব স্বাভাবিকভাবেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের পক্ষ থেকে একটি জোর দাবি ওঠার কথা ছিলো, ১৯৭১ সালে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের জন্যে ক্ষমাপ্রার্থনা নিয়ে। ওঠেনি।

ওঠেনি তার কারণ এই পাক জেনারেল বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখার আগে বিনা কারণে শামসুন্নাহার হলে ছাত্রীদের ওপর মাঝরাতে পুলিশ আক্রমণ করে, মেয়েদের লাঠিপেটা করে এবং রমনা থানার হাজতে নিয়ে আটক করে। সারা বিশ্ববিদ্যালয় অপদার্থ উপাচার্য আনোয়ারউল্লার প্রত্যক্ষ মদদে ছাত্রীদের ওপর এই বর্বর পুলিশি হামলার প্রতিবাদে ফুঁসে ওঠে, আনোয়ার হোসেনের মতো বর্ষীয়ান অধ্যাপক পর্যন্ত প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে পুলিশের লাঠিপেটায় পা ভেঙে হাসপাতালে যান, বিশ্ববিদ্যালয় রণক্ষেত্রে পরিণত হয় এবং খুব সফলভাবে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার পাক জেনারেল পারভেজ মুশাররফের আগমন উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭১ সম্পর্কে যে কোনো বক্তব্য আসার প্রক্রিয়াকে ধামাচাপা দিতে সক্ষম হয়। ঢাকার কোনো রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন এই মনোযোগ দিকভ্রান্ত করার রাজনীতিটি ধরতে সমর্থ হয়নি, এবং জোট সরকারের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে সকলে তাদের নিয়মে খেলে গেছে। নিরিবিলি ঢাকায় নেমে পাক জেনারেল মুশাররফ স্মৃতিসৌধে যান, পুষ্পমাল্য অর্পণ করেন, এবং একটি মৃদু আপসোসবাণী উচ্চারণ করেন,

"We feel sorry for the tragedy which left deep scars on both our nations. But wounds do heal with time."

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এতেই খুশিতে গদোগদো হয়ে পাক জেনারেলের ঢাকা সফর অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছিলেন।

৩.
মির সাহেবকে এবার একটা ছোট্ট গল্প বলবো।

১৯৭০ সালের প্রলয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড় যখন বাংলাদেশের দক্ষিণভাগকে পিষে গেছে, সাহায্যের জন্যে গোটা উপকূলীয় অঞ্চল হাহাকার করছে, পাক জেনারেল ইয়াহিয়া যখন ঝড় আঘাত হানার চৌদ্দদিন পর নিতান্ত বাটে পড়ে সরজমিন পরিদর্শনে এসেছে স্বল্প সময়ের জন্যে, কাছাকাছি সময়ে তখন পূর্ব ইয়োরোপে রাজনৈতিক পরিবর্তনের তোড়জোড় চলছে। পূর্ব ইয়োরোপের দেশে তখন পা রেখেছেন পশ্চিম ইয়োরোপের এক নেতা। সীমান্ত বিষয়ক উত্তেজনা প্রশমন চুক্তি করতে তিনি এসেছেন এমন এক দেশে, যেখানে তাঁর দেশ পৃথিবীর ইতিহাসের নৃশংসতম বর্বর কীর্তিগুলোর একটি ঘটিয়েছিলো কয়েক দশক আগে।

চুক্তি যেদিন স্বাক্ষরিত হয়ে, ৭ ডিসেম্বর, সেই নেতা একটি স্মৃতিসৌধে পুষ্পমাল্য অর্পণ করতে যান। মালাটি নামিয়ে রাখার পর উপস্থিত জনতাকে স্তম্ভিত করে দিয়ে তিনি মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে কিছুক্ষণ নিরবতা পালন করেন।

ঐ নেতার নাম ভিলি ব্রান্ট, আর ঐ দেশটির নাম পোল্যান্ড, যে পোল্যান্ডকে নাৎসি জার্মানি ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিলো। সেই স্মৃতিসৌধের নাম এয়রেনমাল ডের হেল্ডেন ডেস ঘেটোস [ওয়ারশ ঘেটোর বীরদের সম্মানে স্মৃতিসৌধ]। ভিলি ব্রান্ট পরাক্রান্ত পশ্চিম জার্মানির চ্যান্সেলর ছিলেন তখন। ঐ ঘটনাকে জার্মানরা বলে ক্নিফাল ফন ভারশাউ [ওয়ারশয়ে হাঁটু গেড়ে বসা], এবং এটি জার্মান রাজনীতির ইতিহাসে প্রবল আলোচিত একটি বিষয়।

ব্রান্ট প্রকাশ্যে ক্ষমা চাননি, ধোঁয়াটে দুঃখপ্রকাশ করে অতীতের পাপ ঢাকতে চাননি, কোনো কথাই বলেননি, শুধু নিঃশব্দে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছিলেন স্মৃতিসৌধের সামনে।

পশ্চিম জার্মানি-পোল্যান্ড শান্তিচুক্তির জন্যে ব্রান্ট পরের বছর, ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর, যখন আমরা বাংলাদেশে পাকিস্তান বাহিনীকে আঘাতের পর আঘাতে কাবু করে আনছি, শান্তিতে নোবেল পেয়েছিলেন। পোলিশরাও ব্রান্টের এই ভঙ্গিমার সম্মান দিয়েছিলো খানিকটা। সেই স্মৃতিসৌধ থেকে কয়েকশো মিটার দূরে তারা আরেকটি প্ল্যাকেট বসিয়েছিলো জার্মান নেতার এই হাঁটু গেড়ে বসাকে স্মরণীয় করে রাখতে।

পশ্চিম জার্মানির বিরোধী দল সিডিইউ-সিএসইউ তীব্র সমালোচনা করেছিলো ব্রান্টের এই ভঙ্গিমার; একটি জরিপে দেখা গিয়েছিলো ৪৮% জার্মান মনে করেন, এই আচরণ বাড়াবাড়ি। পোলিশরা একজন বুন্ডেসকানৎলারের এই ভঙ্গিমাকে গুরুত্ব দিয়েছিলো, কারণ ব্রান্ট কোনো ভুঁইফোঁড় ক্ষমতা জবরদখলকারী ছিলেন না, ১৯৫৭ থেকে ১৯৬৬ পর্যন্ত বার্লিনের নগরপাল ছিলেন, ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৯ পর্যন্ত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ভারপ্রাপ্ত চ্যান্সেলর এবং ১৯৬৯ সাল থেকে চ্যান্সেলর হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন। তাঁর এই ভঙ্গির মূল্য ছিলো।

ব্রান্টকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো, আপনি যে ওভাবে হাঁটু মুড়ে বসে পড়েছিলেন, এ কি পূর্বপরিকল্পিত ছিলো? ব্রান্ট উত্তর দিয়েছিলেন, „Ich hatte plötzlich das Gefühl, stehen reicht nicht!“ [আমার হঠাৎ এই অনুভূতি হয়েছিলো যে দাঁড়িয়ে থাকা যথেষ্ঠ নয়]।


৪.
মির সাহেব, "দুঃখ প্রকাশ" যথেষ্ঠ নয়। গোটা পাকিস্তান মিলে "দুঃখ প্রকাশ" করলেও না। আপনাদের নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে। কোনো ভুঁইফোঁড় ক্ষমতা জবরদখলকারীর মৃদু আপসোসবাণী গ্রহণযোগ্য নয়। পার্লামেন্টে এই ক্ষমাপ্রার্থনার প্রস্তাব পাশ করার পর আপনাদের উচ্চ পরিষদের প্রধান এবং তিন বাহিনীর প্রধানেরা ঢাকায় আসবেন, শহীদ মিনারের সামনে দাঁড়িয়ে বা হাঁটু গেড়ে বসে ক্ষমা চাইবেন। ইংরেজিতে অ্যাপলজি কথাটার মানে দেখাচ্ছে, অ্যাডমিশন অব গিল্ট অ্যাকমপ্যানিড বাই এক্সপ্রেশন অব রিগ্রেট। আপনারা ঐ চারজন স্বীকার করবেন, ১৯৭১ সালে আপনারা যা করেছেন, তা অন্যায় ও অপরাধ ছিলো এবং তারপর যে দুঃখ প্রকাশ করার কথা বলছেন, তা করবেন।

এরচেয়ে কম কোনো কিছু আমরা গ্রহণ করবো না।

সালাম।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।