Thursday, April 22, 2010

অস্বীকার

বানানটা আবারও খুঁটিয়ে দেখেন তিনি। চতুর্থবারের মতো। বিছানার পাশে ছোটো ড্রয়ার চেস্টের ওপর একটা অভিধান পড়ে আছে, সেদিকে হাত বাড়াতে গিয়েও থমকে যান তিনি।

কনফিডেন্স কমে যাচ্ছে। বয়সের লক্ষণ। এমনটা আগে হতো না। কী হয় অভিধান না দেখলে? তিনি কি জানেন না, সঠিক বানানটা কী? জানেন তো।

তারপরও, বানানের নিয়মকানুন নাকি পাল্টে যাচ্ছে। বাংলা একাডেমী কয়েক বছর পর পর বার করছে নতুন বানানবিধি।

ক্লান্ত একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন তিনি, পত্রিকাটা সরিয়ে রাখেন কোলের ওপর থেকে। পঁচিশ বছর আগে এ ধরনের কোনো খবর কাগজে বের হতো না। হলেও বানান নিয়ে সংশয় হতো না তাঁর। সেক্রেটারিকে ডেকে বলতেন না বিছানার পাশে হাতের নাগালে একটা অভিধান রেখে যেতে। তিনি একটা ফোন করতেন কোনো এক কর্নেল আবুল বা কর্নেল কুদ্দুস বা কর্নেল সোলায়মানকে, বাকিটা সে-ই করতো।

পঁচিশ বছর মানে এক পুরুষ। বালক হয়ে যায় বালকের পিতা, যুবক হয় শিশুর পিতামহ। তিনি হয়ে গেলেন পুরুষাধম।

ফোলা পা দু'টোর দিকে তাকিয়ে থাকেন তিনি। হাঁটতে পারছেন না কয়েকদিন ধরে। হাসপাতাল থেকে ফিরে এসেছেন, কিন্তু সুস্থ হননি পুরোপুরি। বিছানার পাশে উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে মুখ ব্যাদান করে রেখেছে হুইলচেয়ারটা। ভালো লাগে না তাঁর, হুইলচেয়ারে চড়ে কোথাও যেতে।

"হাঁটবো, হাঁটবো, হাঁটবো ...", বিড়বিড় করেন তিনি। পাশের ঘরে সোফায় মচমচ করে শব্দ হয়। নার্স মেয়েটা উঠে আসছে, স্যাণ্ডেল ঘষটাতে ঘষটাতে। অসহ্য একটা শব্দ। এরা কি মানুষের মতো একটু পা তুলে হাঁটতে শিখবে না কখনো?

দরজায় নক পড়ে, "স্যার?"

চোখ বুঁজে বড় করে একটা দম নেন তিনি। দুর্বল গলায় কথা বলা যাবে না। প্রয়োজনে নৈঃশব্দ্য দিয়ে কাজ চালাতে হবে। কিন্তু কম্পিত কণ্ঠস্বরে কাউকে ডাকা যাবে না। সেটা দুর্লক্ষণ। বছরের পর বছর ধরে সঞ্চিত ভাবমূর্তি এক দিনে চুরমার হয়ে যায় মিনমিন করে কিছু বললে।

অতি কষ্টে চড়া গলায় ডাকেন তিনি, "কাম ইন!"

দরজা ঠেলে ভেতরে ঢোকে মেয়েটা। পুরোদস্তুর ইউনিফর্ম পরা, শ্যামলা, বড় বড় চোখ, সাতাশ-আটাশ বছর বয়স হবে। তিনি ঘাড় ঘুরিয়ে তাকান মেয়েটার দিকে।

"স্যার, কোনো সমস্যা?" মেয়েটা ভীতু, তার কণ্ঠস্বরে সেটা লুকোনোর কোনো চেষ্টা দেখা যায় না।

ভালো লাগে তাঁর। এই দ্বিধা, সঙ্কোচের দূরত্বটুকু তৈরি করতে পারা জরুরি। হাসপাতালে একটা নার্স দুমদাম চাদর সরিয়ে প্যান গুঁজে দিচ্ছিলো, তাঁর মাথায় আগুন ধরে গিয়েছিলো তখন। অনুমতি নিতে কি পয়সা লাগে? বলতে পারতো না, মিস্টার প্রেসিডেন্ট, আমি কি একটা প্যান রেখে যেতে পারি অ্যাট ইওর সার্ভিস?

প্রেসিডেন্ট! মলিন একটা হাসি দমিয়ে রাখতে পারেন না তিনি। এখন নেই, কিন্তু ছিলেন তো? আবারও হয়তো হবেন কোনো একদিন, কে জানে?

নার্স মেয়েটা দাঁড়িয়ে থাকে জড়োসড়ো হয়ে। রেসিডেন্ট ডক্টর রেখে যেতে চেয়েছিলো মহাসচিব, তিনি নিষেধ করে দিয়েছেন। বলেছেন কোনো সমস্যা হলে নার্স হাসপাতালে ফোন করে অ্যামবুলেন্স আনিয়ে নেবে সাথে সাথে। ঘরে বসে ডাক্তার কী হাতিঘোড়া মারবে?

"কিছু না মাই ডিয়ার।" মোলায়েম গলায় বলেন তিনি। "যাও তুমি। আয়্যাম ফাইন।"

মেয়েটা দেরি করে না একটুও, মাথা নেড়ে পিছিয়ে যায়, দরজাটা ভিড়িয়ে দেয় আলতো করে। নার্সের বয়স আরেকটু বেশি হলে তার সাথে কিছুক্ষণ গল্প করতেন হয়তো। তিরিশের নিচে যাদের বয়স, তারা বড় ছটফটে। তাদের এখন আর ভালো লাগে না তাঁর। পঁচিশ বছর আগে হলে একটা কথা ছিলো ...।

তিনি বিড়বিড় করেন, "মাঠে মাঠে মরে গেল ইঁদুর পেঁচারা!" হ্যাঁ, ইঁদুর পেঁচারা ঘুরে যায় মাঠে মাঠে, ক্ষুদ খেয়ে ওদের পিপাসা আজও মেটে, পঁচিশ বছর তবু গেছে কবে কেটে! কত ইঁদুর পেঁচা কত ক্ষুদ খেয়ে ক্ষুণ্নিবৃত্তি করে যাচ্ছে, মাঠ গরম করছে, আর তিনি শুয়ে আছে বিছানায়, হাঁটতে পারছেন না, অভিধান দেখে ঠিক করতে চাইছেন, অর্শ না অর্শ্ব।

অর্শ্ব বানানটা নিয়ে তিনি অসন্তুষ্ট নন অবশ্য। যে লিখেছে, সে ইচ্ছে করেই ভুল বানানে অর্শ্ব লিখলো কি না, কৌতূহল হচ্ছে কেবল। অর্শ্ব! এই ভুল বানানে লুকিয়ে আছে একটা ঘোড়ার ছবি। সেই ছবিটা তাঁর পছন্দ। একটা টগবগে কেশরওয়ালা ঘোড়া, গলায় একটা স্কার্ফ বাঁধা, প্রান্তরে প্রান্তরে সে ছুটে বেড়াচ্ছে তার প্রকাণ্ড শিশ্ন ঝুলিয়ে। অর্শ্ব, হা হা হা! ঐ সামান্য রেফটা একটা পাতলা পর্দার মতো, ও কি পারে ঘোড়াটাকে লুকিয়ে রাখতে? হ্যাঁ, একটা ঘোড়া! দড়ির মতো পাকানো তার শরীরের এক একটা পেশী! সে ছুটছে আর ছুটছে আর ছুটছে ...!

কাগজটা দলেমুচড়ে এক পাশে ছুঁড়ে ফেলেন তিনি। ফোলা পা দু'টো নাড়ানোর চেষ্টা করেন। হাঁটতে হবে একটু। অভিধান দেখবেন না তিনি। তিনি জানেন, ওখানে লেখা আছে অর্শ, যার ইংরেজি পাইলস, হেমরয়েডস। অর্শ্ব শব্দটা ভুল। ওর মধ্যে যে ছবিটা লুকিয়ে আছে, সেটাও ভুল, কিন্তু তৃপ্তিদায়ক। একটা জাতির প্রথম সারির দৈনিকে তিনি এখনও অদৃশ্য ঘোড়ার লাগাম পরিয়ে রেখেছেন, তাঁর কথা বলতে গিয়ে ওরা বলে বেড়াচ্ছে সেই পঁচিশ বছর আগের ঘোড়াটার কথা। ছুটছেন, তিনি এখনও দাবড়ে বেড়াচ্ছেন দেশের লোকের মনের জমিতে।

কিন্তু একটা প্রতিবাদলিপি পাঠাতে হবে। প্রেস কনফারেন্স করাতে হবে মহাসচিবকে দিয়ে। মোটেও তাঁর অর্শ হয়নি, হয়েছিলো রক্ত-আমাশা। ভদ্রলোকদের অর্শ হয় না। প্রেসিডেন্টদের অর্শ হয় না, ইউ ব্যাস্টার্ডস! অর্শ হয় তোদের, ছোটলোকদের। প্রেসিডেন্টদের অবস্থা খুব খারাপ হলে বড়জোর ডিসেন্ট্রি হতে পারে। হতেই পারে, দেশটা যেভাবে চলছে, তাতে প্রেসিডেন্টদেরও ডিসেন্ট্রি হতে পারে।

স্বীকার করবেন না তিনি অর্শের কথা। প্রতিবাদলিপি পাঠাবেন, তাতে একটা হুমকিও থাকবে। দৈনিকগুলো ভুল স্বীকার না করলে তিনি আইনগত ব্যবস্থা নেবেন। এই ভুল সংবাদ পরিবেশন করে তাঁর মর্যাদাহানির অপচেষ্টা করা হয়েছে।

তিনি গলা চড়িয়ে ডাকেন, "নার্স!"

সেই ডাকের বায়ুস্তম্ভ ধরেই যেন একটা সুতীব্র বেদনা তাঁর গোটা শরীর বেয়ে উঠে আসে মস্তিষ্কে। আবারও প্রচণ্ড ব্যথা, পেছনে। যান্ত্রিকভাবেই তাঁর হাত চলে যায় পেছনে। পায়জামাটা ভিজে উঠেছে, হাতটা ফিরে এলে তিনি দেখেন, গাঢ় লাল রক্ত বার্তা হিসেবে উঠে এসেছে আঙুলে। আবারও শুরু হয়েছে রক্তক্ষরণ। তাঁর শরীর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে রক্ত, আপন শক্তিতে, স্রোতস্বিনীর ধীর লয়ে। কাঞ্চনের, জয়নালের, জাফরের, দীপালি সাহার রক্ত নিজের মতো করে পথ খুঁজে বেরিয়ে যাচ্ছে তাঁর শরীর ছেড়ে।

নার্স মেয়েটা চিৎকার শুনে দরজা খোলে। দেখে, বৃদ্ধ লোকটি তার দিকে রক্তমাখা হাত বাড়িয়ে আকুল হয়ে চিৎকার করছে, বিকেলের রোদে ঝিকিয়ে উঠছে তার শ্বদন্ত দু'টি, "আমার হাতে রক্ত নাই! আমার হাতে রক্ত নাই! আমার হাতে রক্ত নাই ...!"

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।