Wednesday, April 07, 2010

চতুর্ভুজ প্রেমের গপ্পোঃ মালিকের মালিকানা

১.

মালিকের দিন ভালোই কাটছিলো। ক্রিকেট খেলতো। কাচ্চু খেলতো। খেতো সব্জি, মাংস, বিক্কু, পান করতো কেবল দুদু।

হঠাৎ তার মাথায় বাই চাপলো বিয়ের। নিজের পাড়া মহল্লায় যোগাযোগের রিস্কে আর গেলো না সে, সেখানে সবাই সব কিছু জানে। তখন বিংশ শতাব্দীর নটে গাছ মুড়িয়ে যাচ্ছে, চারদিকে ইন্টারনেটের জয়জয়কার, মালিক অহরহ নেট থেকে নেংটু ছবি নামিয়ে দেখতো অবসরে, এক বন্ধু পরামর্শ দিলো, পাক-সর-জমিন-শাদী ডট কমে যোগাযোগ করতে।

মালিক নিজের অ্যাকাউন্ট খুলে একটি ভদ্রগোছের ছবি আপলোড করলো। বিশদ পরিচয় দিলে আবার লোকে অবিশ্বাস করতে পারে, তাই নাম লিখলো এস. মালিক, পেশা লিখলো মডেলিং। নেসলের কতশত দুধের বিজ্ঞাপন সে করেছে! মডেল হিসেবে নিজেকে সে দাবি করতেই পারে।

বেশিদিন অপেক্ষা করতে হলো না মালিককে। এক তরুণী তাকে মেইল ঠুকে বসলো। তরুণীর নাম সিদ্দিকা, সে দুশমন রাষ্ট্র হিন্দুস্তানের বাসিন্দা, তবে খাঁটি মুসলমান। অন্তঃপুরবাসিনী হলেও সে তেজস্বিনী, তাই একটি স্কিনটাইট বোরখা পরিহিত ছবি আপলোড করতে দ্বিধা করেনি।

ছবি দেখে মালিক ঐমানিক সঙ্কটে পতিত হলো মারাত্মকভাবে। এ কী হেরিলো সে? বোরখাটি একেবারে স্থানে স্থানে প্লাস্টারের মতো লেপ্টে গিয়ে এ কী অপরূপ জিসম-জৌলুশ ফুটিয়ে তুলেছে! তরুণীর নয়নযুগল আরবসাগরের গোয়াদার উপকূলের জলরাশির ন্যায় সবজেটে, কুচ পীন, ক্ষীণ কটি. গুরু নিতম্বের আভাস টের পাওয়া যায়, যদিও কমজাত ফোটোগ্রাফারের কারণে বাকিটা অনুমান করে নিতে হয়। কাফের শায়ের রবিন্দরনাথ এ কারণেই বলে গেছে, কুছ দিদার হায় ইশারেঁমে, কুছ মিলতা হায় আন্দাজসে।

স্থানীয় একটি প্যাকেটজাত তরল দুধ উৎপাদকের বিজ্ঞাপনে বল হাতে মডেল হয়েছিলো মালিক। তাদের স্লোগান তার মনে পড়ে গেলো, তৈয়ার হচ্ছে পাকিস্তান। বলিষ্ঠ ইসলামী রাষ্ট্র গড়তে অপরিহার্য তাদের দুধ। বিলবোর্ডে মালিকের ছবি। এক হাতে ক্রিকেটের বল মুঠো করে ধরা, অন্যহাতে ঝকঝকে পিত্তলনির্মিত দুগ্ধবাহী বদনা। ব্যাকগ্রাউন্ডে চৌচির স্টাম্পের ছবি।

মালিক সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করে না। চটজলদি যোগাযোগ করে মেয়ের বাবার সাথে। এমন খাপসুরাত জেনানা উৎপাদিত হচ্ছে হিন্দুস্তানের হায়দরাবাদে, আর পাকিস্তান ভর্তি শুধু বেঢপ জেনানা। বেনজির ভুট্টো ছাড়া আর কাউকেই তো পদের মনে হয় না!

দুবাইতে বিয়ের আয়োজন হয়। কাজি এসে মন্ত্র পড়ান, প্রবল উত্তেজনা চেপে রেখে মালিক সব কাগজপত্রে ঘ্যাঁচাঘ্যাঁচ সই করে যায়। কবুল কি না, জানতে চায় কাজি। মালিক হাসে। আবাজিগস!

২.
বাসর রাতে মালিকের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। এ কে তার খাটে? এ কী!

কোথায় সেই আরবসমুদ্রের শুক্তিবন্দী সবুজ মুক্তার মতো চোখ? তার পরিবর্তে দুই কপি ম্যাড়ম্যাড়ে ধূসর চোখ ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে। কোথায় সেই বিল্বফলের ন্যায় সুপুষ্ট, ক্রিকেট বলের ন্যায় পরিষ্কার সিমযুক্ত বর্তুল পীনদেশ? জেনানাটির বক্ষ আর উদর যে আলাদা করে চেনা মুশকিল। কোথায় সে ক্ষীণ কটি? কটিদেশ বলতেই তো কোনো কিছু চোখে পড়ছে না!

মালিক হাউমাউ করে কাঁদে। বলে, লুট লিয়া। পালঙ্কবর্তিনী সিদ্দিকা উত্তরে বিলুপ্ত গুজরাটি সিংহিনীর মতো বিপুল লম্ফে তার ওপর এসে পড়ে, মুখে এটিএম শামসুজ্জামানের ভিলেনি হাসির মহিলা সংস্করণ। কিন্তু মালিক পাক দলের ক্রিকেট খেলোয়াড়, হাজারো জুয়াবাজির প্যাঁচে পড়ে পড়ে সে ঝানু, সে পালানোর চেষ্টার ত্রুটি করে না। সিদ্দিকা তার পাৎলুন ধরে তাকে পাকড়ে ফেলে মাটিতে। মেঝেতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে মাধুরীর মতো করে হেঁচড়ে হেঁচড়ে দরজার দিকে এগোতে এগোতে মালিক কাঁদে সুর করে, মার ডালা ... মার ডালা ...। কিন্তু নিজেকে রক্ষা করতে পারে না।

ভোরবেলা ছিন্নবস্ত্র রক্তচক্ষু মালিক সকলের অগোচরে হোটেল ত্যাগ করে খোঁড়াতে খোঁড়াতে। করাচি ফিরে গিয়েই ফিজিও হতচ্ছাড়াটার সাথে যোগাযোগ করতে হবে।

পাক পেপারে মালিকের ইনজুরির কথা আসে, কিন্তু পাকজনতা হিসেব মেলাতে পারে না। তবে সবাই ধরে নেয়, নিশ্চয়ই কোনো বুকির হাত আছে এতে। পরবর্তী ক্রিকেট ম্যাচে বাজির দরে একটু ঢেউ খেলে, তবে তা নিতান্ত নগণ্য।

মাসখানেক পরেই ইন্টারনেটে একটি দক্ষিণ ভারতীয় নেংটু ছবির সাইটে অনুপ্রবেশ করে মালিক চমকে ওঠে। সিদ্দিকার পাঠানো মেইলে যে মেয়েটির ছবি সংযুক্ত ছিলো, সেই মেয়েটিই সেই ওয়েবসাইট আলো করে বসে। আজ তার পরনে একটি চোলি, এবং তার সাথে রংমেলানো হটপ্যান্ট। মালিক রূদ্ধশ্বাসে একের পর এক ছবি ডাউনলোড করতে থাকে, কোনোটিতে মেয়েটির পরনে ঘাগড়া কিন্তু ঊর্ধ্বাঙ্গ কলাজাতীয় কোনো উদ্ভিদের পাতায় আড়াল করা, কোনোটিতে আপন কেশরাশিতে বক্ষদ্বয় সুগোপন থাকলেও নিম্নাঙ্গে একটি প্রাইমারি স্কুলের বাচ্চার পরিধেয় প্যান্ট আব্রু রক্ষার গুরুভার নিয়েছে, আবার কোনো ছবিতে আপাদমস্তক কাপড়ে ঢাকা হলেও সেসব কাপড় মাকড়ের জালের মতো স্বচ্ছ ও আঁটোসাটো। তাড়াহুড়ো করে মালিক নাম পরীক্ষা করে এই রঙ্গিনীর, কিন্তু বিধি বাম, মেয়েটির নাম দুর্গম দুরুচ্চার্য তামিল, অতএব সে হিন্দু, পাক সংস্কৃতি অনুযায়ী ১৯৭১ সালের মতো পরিস্থিতিতে সম্ভোগযোগ্যা। রাগে দুঃখে মালিক মাথার চুল খামচায়। কত বড় পাপিষ্ঠা এই হায়দরাবাদিনী সিদ্দিকা, সে একটি নেংটু ছবির সাইট থেকে ছবি টুকে সম্পর্ক পাতিয়েছে! মালিক তড়িঘড়ি করে একটি লোশনের বোতল হাতে নিয়ে জনৈক বুকিকে ফোন করে জানায়, আগামী আরো একটি ম্যাচ সে ইনজুরড থাকতে ইচ্ছুক, এবার তার ঘা লেগেছে দিলে।

ফোন রেখে মালিক ভাবতে থাকে, বর্তমান সেনাপ্রধান মুশাররফকে জপিয়ে ভারত আক্রমণের একটা ব্যবস্থা করা যায় কি না। দক্ষিণ ভারতে সৈন্য নামাতে পারলে সেও যুদ্ধে যোগদান করতো।

৩.
মির্জা যখন টেনিস খেলে, তখন সকলে রূদ্ধশ্বাসে দেখে। সে এক দেখার মতোই দৃশ্য বটে। বর্ণনা দেয়ার চেষ্টা করে কালিদাসকে বিব্রত না করে বরং তার সাথে সেই সময়টা আকাশে মেঘ দেখাই বরং শ্রেয়।

শুধু টেনিসবঞ্চিতদের খাতিরেই বলে রাখা যাক, মির্জা অত্যন্ত স্বাস্থ্যবতী। শৈশব থেকেই সে নিয়মিত কমপ্লান খায়, হরলিক্স খায়। তাকে বাংলাদেশের একটি প্যাকেটজাত তরল দুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানি তাদের সাম্প্রতিক বিজ্ঞাপনের মডেল হিসেবে চুক্তি করার জন্যে রুটিন করে আদাজল পান করে মাঠে নেমেছিলো, মির্জা টাকার অঙ্ক শুনে নথবিদ্ধ নাক সিঁটকেছে। বলেছে, একটা দেশলাই কাঠি জ্বালাও, তাতে আগুন পাবে ... ♪♫।

তবে এও জানানো প্রয়োজন যে মির্জা টেনিস খেলে রেগুলেশন লেংথের প্যান্ট পরিধান করেই। সালোয়ার পরে কে কবে টেনিস খেলে ম্যাচ জিতেছে?

আপনার মনে হতে পারে এ প্রসঙ্গ গল্পে কেন এলো? উত্তরে শুধু বলতে পারি, জ্যামিতির খাতিরেই।

৪.
মির্জা সিদ্ধান্ত নেয়, হায়দরাবাদের আর পাঁচটা খান্দানি মেয়ের মতো পাকিস্তানেরই কোনো তুলনামূলকভাবে কম দুশ্চরিত্র স্পোর্টসম্যানের কণ্ঠে বরমাল্য পরাবে সে।

সিদ্দিক পরিবারের সাথে মির্জা পরিবারের সম্পর্ক খুব একটা ভালো নয়। সিদ্দিকের প্রপিতামহ মির্জার প্রপিতামহের সাথে একত্রে এলাচের ব্যবসা করতেন, করোমণ্ডল উপকূলে তাদের বেশ কয়েকটি জাহাজ চলতো। সেই বৃদ্ধ সিদ্দিক একবার বৃদ্ধ মির্জার ভাইঝির বিয়ের দাওয়াতে পাতে মুসাল্লামের আকার একটু ক্ষীণ হওয়ার কারণে চোস্ত ফারসিতে কয়েকটি অপমানসূচক বাক্য উচ্চারণ করেছিলেন। অপমানিত মির্জা তখন শপথ নিয়েছিলেন, জমিন ফেটে চৌচির হবে, চন্দ্রসূর্য নিভে যাবে, কিন্তু হাজারিপ্রসাদ এই থাপ্পড় নেহি ভুলেগি ... বা এই ধরনের কিছু। হাজারিপ্রসাদ কে, এর উত্তর এ গল্পে পাবেন না। যাকগে, বংশপরম্পরায় এই পরস্পর খিটিমিটি ও অপমানের প্রচেষ্টাকে গুরুত্ব দিয়ে আসা হয়েছে। সিদ্দিকা পরিবারের মেয়েরা বেঢপ ও পর্দানশিন, তাই মির্জা পরিবারের মেয়েরা নিজেদের অবয়বসচেতনা, এবং টেনিস ভলিবল প্রভৃতি হাফপ্যান্ট-ক্রীড়ার প্রতি অনুরক্তা।

চারশো বিশ ধারায় সিদ্দিকা মালিকের ওপর আক্রমণ করেছে, এ ব্যাপারটা মিডিয়ায় ফুটিয়ে তোলার জন্যে মির্জা সিদ্ধান্ত নেয় বরমাল্য সে মালিকের কণ্ঠেই পরাবে। তাছাড়া মালিক ছোকরাটা দুবলা, একটু বলিষ্ঠও হওয়া প্রয়োজন তার। আকরামের প্রতি মির্জার একটু টান থাকলেও তার আব্বুজি জানিয়েছেন, আকরাম লোক সুবিধার নয়। নানা নষ্ট মেয়েছেলের সাথে তার ওঠবোস।

মির্জা ঘোষণা দেয়, সামনে তার বিয়ে, মালিককেই সে বিয়ে করবে।

অনেক রুগ্ন বলপিয়াসী ভারতবাসী ছেলেছোকরা এতে বেশক অসন্তুষ্ট হয়। কত বালকের স্বপ্ন চুরমার হয়, কত কিশোর বাথরুমের দরজার ভেতরের পাশ থেকে মির্জার পোস্টার টেনে ছেঁড়ে।

৫.
তারপর কী চলছে, আপনারা হয়তো জানেন। মামলা মকদ্দমা চলবে। মালিক এখন হায়দরাবাদে, পাসপোর্ট ঠোলারা জব্দ করেছে। কুকিলের ঘরে উকিল পরিস্থিতি, খুপ খ্রাপ।

মালিক মির্জা পরিবারের প্রস্তাব পেয়ে একটু ঘাবড়ে গিয়েছিলো। আবার হায়দরাবাদ! ওয়েবসাইট থেকে মির্জার কিছু ছবিও সে ডাউনলোড করেছিলো, সেগুলো পুনরায় হিডেন ফোল্ডার থেকে বার করে সে নিশ্চিত হয়, এগুলো ফোটোশপের কাজ। মেইলে অ্যাটাচ করা ছবিগুলো দেখে সে আরেকটু নিশ্চিন্ত হয়েছে। তবে সারা দক্ষিণ এশিয়ায় কত লোকে টেনিস দেখে, সেটার হিসাব ইন্টারনেটে দেখে তার মনটা একটু খারাপ। টেনিস না বাল, কী দেখতে বসে এই লম্পটগুলো, তার জানতে আর বাকি নেই। সে মনে মনে ঠিক করে রেখেছে, বিয়ে করেই হানিমুনে প্রথমে যাবে দুবাই, সেখান থেকে মক্কা। উমরাহ করে এসে মির্জার উমরাও জান য়াদা পাকাপোক্তভাবে ঢেকেঢুকে রাখার ব্যবস্থা সে হাতে নেবে। মুসলমানের মেয়ে খ্যালে খেলুক, মুসলমানের বউয়ের এত খ্যালাধূলা ঠিক নয়।

৬.
তবে শিরোনামখানা দেখে যারা ভাবলেন, চতুর্ভুজ প্রেম কী করে হলো, তাদের শুধাই, তিলে খচ্চর ধর্মব্যবসায়ী জোকার নায়েকের কথা কি ভুলেই গেলেন? ঐ যে প্রতিটি ওয়াজে যে কি না মির্জার প্যান্টের দৈর্ঘ্যের সাথে খোদার আরশের কম্পনাঙ্কের ব্যস্তানুপাতিক সম্পর্ক বার করে বলেছিলো,

L× f = ধ্রুবক

যেখানে, L = মির্জার প্যান্টের দৈর্ঘ্য [মিটার]
আর f = খোদার আরশের কম্পাঙ্ক [হার্টজ]

... সেই নায়েক হচ্ছে এই গল্পের চতুর্থ বিন্দু। হাপুশ নয়নে কাঁদছে বেচারা। পাকিস্তান দেশটার ওপরই অভক্তি চলে এসেছে তার। নিমকহারাম শালারা। আর মির্জা পরিবারের ওপর আরো কঠোর ফতোয়া হানার প্রস্তুতি নিচ্ছে সে কুরান পুরাণ ঘেঁটে। কিন্তু বারবার তার টুপির নিচে মাথায় আঘাত হানছে একটা হাদিস, বেড়াল নবীজির বড় প্রিয় জীব ছিলো।


[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।