Wednesday, March 24, 2010

প্রোগ্রাম

ছোট্ট ছিমছাম একটা হাসপাতালের চেহারাই দেখা যায় বাইরে থেকে।

ভেতরে ঢুকুন। হাসপাতালই মনে হবে। আপনি রিসেপশনে যান, চশমার ওপর দিয়ে আপনার দিকে মিটমিট করে তাকাবে বয়স্কা রিসেপশন ক্লার্ক। ডানে বামে তাকান, দেখবেন ডাক্তার আর নার্সদের ছোটাছুটি, গার্নির আসাযাওয়া, ওষুধ আর জীবাণুনাশকের গন্ধ।

এমনকি রোগীও দেখতে পাবেন কয়েকজন।

কিন্তু হাসপাতাল নয় এটা।

যদি জিজ্ঞেস করে বসেন, "তবে কী?", তাহলে উত্তর দেয়া মুশকিল।

যদি জানতে চান "কেন", তাহলে হয়তো শুরুতে চোখ পাকিয়ে ধমকই দেবো একটা। বলবো, অত কিছু জানতে চান কেন? কিন্তু আপনি নাছোড়বান্দার মতো আমাকে চেপে ধরুন, দেখবেন এক সময় ঠিকই এদিক সেদিক তাকিয়ে, গলা নামিয়ে, আপনার কানের কাছে ফিসফিস করে বলবো, কারণ এর পেছনে আছে এ দেশের সরকার, আটলান্টিকের ওপারের আরেকটা দেশের সরকার, ভূমধ্যসাগরের তীরের সেই গিয়ানজামের দেশটার দুটো গবেষণা প্রতিষ্ঠান, মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটা দেশের বিলিয়ন পাউণ্ড স্টার্লিঙের ... এই যাহ দিলাম তো কারেন্সির কথা ফাঁস করে ... যাকগে ... ফান্ড। অনেক গেরো রে বাহে। সহজ কথা যায় কি বলা সহজে?

তারপরও আপনি ঝুলোঝুলি করতেই থাকবেন। করতেই থাকবেন। করতেই থাকবেন।

এক পর্যায়ে আবার ফিসফিসিয়ে বলবো, প্রত্যেক বছর বাংলাদেশ থেকে একটা লোক আসে লণ্ডনে, দেখেছেন? কখনো এমিরেটসে, কখনো সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স, কখনো বৃটিশ এয়ারওয়েজে ... দেখেছেন?

আপনি হাসবেন। বাংলাদেশ থেকে প্রত্যেক বছর কত লোকই তো ওভাবে আসছে যাচ্ছে। বিশ্বনাথ থানাটাই তো বলা যায় এই দৌড়ের ওপর আছে।

হাসবো আমিও। বলবো, উঁহু। একটা বিশেষ লোক।

আপনি আমার হাসার ধরন দেখে একটু মিইয়ে যাবেন। হাসিটা অর্ধেক ঝুলে থাকবে মুখে। অনিশ্চিত কণ্ঠে বলবেন, তাহলে?

আমি বলবো, একটা লোক। একটা বিশেষ লোক।

আপনি বলবেন, কী করে সে এখানে?

আমি হাসবো। তারপর চুপ করে বসে থাকবো কিছুক্ষণ।

আপনি কাছে ঘেঁষে বসবেন। একটু ঝুঁকে। আপনার জামার ফাঁক গলে কত কিছু চোখে পড়বে আমার। কিন্তু আড়চোখে সেদিকে তাকিয়ে থাকলেও আর কিছু বলবো না। আপনি ঘ্যানর ঘ্যানর করতেই থাকবেন। বলুন না, বলুন না, বলুন না ...।

আমি এবার একটা হাত আপনার ঘাড়ের ওপর দিয়ে কাঁধের ওপর আলতো করে রেখে বলবো, আচ্ছা, কিন্তু কাউকে বলা যাবে না কিন্তু ... খুব গোপন! ফর ইওর ইয়ারস ঔনলি!

আপনি আরেকটু ঘেঁষে বসবেন।

আমি ফিসফিস করে বলবো, লোকটা আসে। নামে বিমান থেকে। হোটেলে ওঠে। যদিও লণ্ডনে তার একটা বাড়ি আছে। কিন্তু সরাসরি ওখানে সে যায় না।

তাহলে? ফিসফিসিয়ে জানতে চাইবেন আপনি।

হোটেলেই ওঠে সে। একটা দিন জিরোয়। তারপর যায় সেই হাসপাতালে। একটা কালো ক্যাডিলাকে চড়ে। তার কাঁচ আবার একটু অন্ধকার মতো। সে যখন নামে, তখন একটা ফেডোরা হ্যাট ঝুঁকিয়ে তার মুখটাকে খানিকটা আড়াল করে রাখে। তারপর চটপট ঢুকে পড়ে সেই না-হাসপাতালটার ভেতরে।

কেন? আবারও ফিসফিস করেন আপনি।

আমি এবার একটু চেপে ধরি আপনাকে। সামান্য চিপক্কে যাকে বলে। আপনি আপত্তি করেন না। আমি বলি, কেন আবার? ঐ না-হাসপাতালটা যে দু'দুটো সরকার, দু'দুটো ইনস্টিটিউট আর দু'দু বিলিয়ন পাউণ্ড স্টার্লিং কেবল প্রোগ্রামের পেছনেই ব্যয় করে?

প্রোগ্রাম?

আমি জিভ কাটি। সভয়ে তাকাই ডানে বায়ে। গুপ্তচরদের বিশ্বাস নেই, বলি আমি। বিনোকিউলারে ঠোঁটের নড়াচড়া দেখেই যা বোঝার বুঝে নেয় বেটারা।

প্রোগ্রাম কী? আপনি একটা হাত আমার ঊরুর ওপর রেখে জানতে চান সাগ্রহে।

আমি একটু দ্বিধা নিয়ে তাকাই আপনার চোখের দিকে, তারপর আড়চোখে আবার জামার ফাঁকের দিকে। বলি, উমমমমম, ওটাই কোডনেম।

কীসের?

আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলি। তারপর বলি, শুনুন আগে। সেই না-হাসপাতালে ঢুকে পড়ে লোকটা। তারপর সোজা চলে যায় একটা ঘরে। সে ঘরে কী আছে জানেন?

না! কী আছে? জানতে চান আপনি।

সে ঘরে একটা লিফট আছে।

কিন্তু হাসপাতালটা তো একতলা!

আমি হাসি। "হুঁ! এই তো ধরে ফেলেছেন। ওপরে ওঠে না সে লিফট, নিচে নামে।

নিচে কী আছে? আপনি চোখ বড় বড় করে জানতে চান।

আমি মুখ টিপে হাসি। তারপর বলি, এক বিরাট ল্যাব!

কী হয় সে ল্যাবে? রুদ্ধশ্বাসে জানতে চান আপনি।

আমি এবার বেশ কষে চেপে ধরি আপনাকে। বলি, জানতে চান? বলছি শুনুন! সেই ল্যাবে প্রথমে লোকটা খুলে রাখে নিজের ফেডোরা হ্যাট। তারপর ডাস্টকোট। তারপর খোলে গলায় বাঁধা রুমাল ...।

আহ, বললেই হয় সব জামা কাপড় খুলে রাখে! আপনি ক্ষেপে ওঠেন।

আমি বলি, হুঁ! কিন্তু আপনি কীভাবে জানলেন?

আপনি এবার কিল মারেন আমার বুকে। সত্যিকারের কিল নয়, ছদ্মকিল। আমি হাসি।

তারপর? নাঙ্গা হয়ে সে কোথায় যায়?

আমি গম্ভীর মুখে বলি, সে শুয়ে পড়ে একটা স্টিলের বিছানার ওপর। তার ওপর নরম গদি বিছানো আছে অবশ্য।

তারপর?? আপনি একটু সোজা হয়ে বসতে চান, কিন্তু হে হে, ওরকম চিপক্কে ধরে রেখেছি, সোজা হওয়া কি এত সোজা?

আমি ফিসফিস করে বলি, পাশের ঘর থেকে মুখে মাস্ক আর অ্যাপ্রন পরা দু'জন লোক বেরিয়ে আসে। তারা রয়েসয়ে এক জোড়া গ্লাভস পরে নেয়। তারপর একজন অ্যানেসথিশিয়ার যন্ত্রপাতি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যায়, আরেকজন বার করে একটা চকচকে ক্ষুর।

ক্ষুর কেন? আপনি শুধান।

মাথা কামানোর জন্যে।

কেন?

মাথার চুলগুলো না কামালে যন্ত্রটা মাথায় বসাবে কী করে?

কীসের যন্ত্র?

আরে, অজ্ঞান করার পর যেটা মাথায় বসানো হয়, সেটা?

আপনি আমতা আমতা করে কেবল বলেন, কোন যন্ত্রটা কোন যন্ত্রটা কোন যন্ত্রটা ...।

আরেকটু চেপে ধরি আপনার নরম শরীরটাকে। আপনি তেমন আপত্তিও করেন না, বলেন, বলুন না কোন যন্ত্রটা?

আমি হাসি আপনার চোখের দিকে তাকিয়ে। বেশ ডাগর কিন্তু। বলি, যেটা দিয়ে তার সমস্ত স্মৃতি শুষে নেয়া হয়, সেটা!

স্মৃতি কেন শুষে নেয়া হয়? আপনি জানতে চান অবোধ শিশুর মতো।

বলি, শুধু কি তাই? স্মৃতি শুষে নিয়ে জমা করা হয় একটা বিশেষ অর্ধতরলে ভরা বিশাল জারে।

আপনি বলেন, কীভাবে?

আমি বলি, আমাদের স্মৃতি আসলে কী? কিছু তড়িৎ-রাসায়নিক সংযোগেরই তো ফসল? সেটাই তৈরি করেছে সেই দু'দুটো সরকার, দু'দুটো ইনস্টিটিউট আর দু'দু' বিলিয়ন পাউন্ড স্টার্লিঙের ফান্ড মিলে।

আপনি কিছু বলেন না, চোখ গোল গোল করে শোনেন।

আ-র-ও চেপে ধরি এবার আপনাকে। বলি, মাই লেডি, এখানেই শেষ নয়। একটা বিশেষ ফ্রিজ থেকে কী বার করে আনা হয়েছে পাশের ঘরে, ঘন্টা খানেক আগে, জানেন?

আপনি মাথা নাড়েন বিস্ফারিত চোখে।

একটা শরীর। দড়ির মতো পাকানো পেশী আর কুচকুচে কালো চুল তার মাথায়। তবে ...।

আপনার শ্বাস একটু দ্রুত হয়, টের পাই। টের আবার পাবো না? আরো চিপক্কে যে!

আমি নখ দেখি।

আপনি আমাকে খামচে ধরেন এবার। তবে কী?

মুখের চামড়া একটু কোঁচকানো। কৃত্রিমভাবে বয়সের ছাপ ফুটিয়ে তোলা সে মুখে।

কিন্তু কেন?

বলছি। এরপর সে শরীরটাকে চাপানো হয় আরেকটা গদি মোড়ানো স্টিলের বিছানায়। তারপর আরেকটা যন্ত্র বসানো হয় তার মাথায়।

চুল কামালো না যে?

এই যন্ত্রে আর চুল কামাতে হয় না।

ও! আচ্ছা ... তারপর?

তারপর সেই যে অর্ধতরলে টইটম্বুর জার ... ওটা থেকে সমস্ত স্মৃতি আবার ঢোকানো হয় এই শরীরের মগজে।

কেন?

কারণ এই শরীরটা কৃত্রিমভাবে ক্লোন থেকে বড় করা। ওর মগজ আছে, কিন্তু স্মৃতি নেই।

তারপর?

তারপর একসময় সমস্ত স্মৃতি ডাউনলোড শেষ হয়।

ওহ! তারপর?

তারপর লোকটা পিটপিট করে চোখ মেলে তাকায়।

আচ্ছা! হুমমম!

পুরনো শরীরটাকে একটা চুলোতে ফেলে একদম পুড়িয়ে ছাই করা হয়।

আর নতুন শরীরটা বেরিয়ে আসে?

হুঁ। বিছানা থেকে উঠে প্রথমে গলায় রুমালটা বেধে নেয়। তারপর জাঙ্গিয়া, গেঞ্জি, প্যান্ট ...।

বুঝেছি বুঝেছি! এজন্যই ব্যাটা বুড়ো হয় না! আর মরে না! আর ওরকম কুচকুচে চুল দেখা যায় টিভিতে! আচ্ছাআআআআআ! তারপর কী হয় বলুন!

আপনি একটু যেন অধৈর্য হয়ে ওঠেন। অভয় দেয়ার জন্যে আরেকটু চেপে ধরি।

তারপর যায় লন্ডনে তার নিজের বাড়িতে। এবার তো পার্টি টাইম। নতুন শরীর, একটু খেলিয়ে দেখতে হবে না?

যাহ আপনি অসভ্য একটা!

আরে না সত্যি!

তাহলে বইতে যে পড়েছিলাম, কী সব পিল যেন খেতে হয় ব্যাটাকে?

হুঁ। কী করবে বলুন, ক্লোন তো। আসল শরীরের মতোই। একটু টাটকা, হার্ট-কিডনি-লিভার সব টনটনে, কিন্তু ঐ ডিপার্টমেন্টে তো সেই পুরনো শরীরটার মতোই গণ্ডগোল।

সে কী? দু'দুটো সরকার, দু'দুটো ইনস্টিটিউট, দু'দু বিলিয়ন ডলারের ফান্ড মিলে ঐ ডিপার্টমেন্টের জন্য কিছু করতে পারলো না?

আমি মাথা নাড়ি। ফান্ডে শর্ট পড়েছিলো বুঝলেন। সময়মতো কেউ খেয়াল করেনি ব্যাপারটা।

কী নাম সেই না-হাসপাতালের? আপনি জানতে চান।

আমি হাসি। কেন, যাবেন নাকি আপনিও?

আপনি কিল মারেন আমার বুকে। ছদ্মকিল, আগেরটার মতোই। এটায় জোর আরো কম অবশ্য। যেভাবে চিপক্কে ধরেছি বুকের সাথে, আয়েশ করে কিল মারার জায়গাই বা কোথায়?

বলেন না!

আমি মাথা নাড়ি।

কেন? প্লিজ প্লিজ প্লিজ।

না।

তাহলে ঐ প্রোজেক্টটার নাম বলেন। গুগল মেরে ঠিক বের করে ফেলবো।

এবার হাসি আমি হো হো করে। আরো চেপে ধরি আপনাকে। বলি, এরকম গোপন প্রোজেক্টের খবর কি আর গুগলে আছে রে বোকা সুন্দরী?

"প্রোগ্রাম" লিখে সার্চ করলে আসবে না? আপনি জানতে চান।

কে জানে! কখনো তো করে দেখিনি। তবে প্রোজেক্টের নামটা বলতে পারি।

আপনি আরো ঘনিয়ে আসেন। কী, কী, কী?

ইলেকট্রোকেমিক্যালি রিচার্জড সিমবায়োটিক হিউম্যানয়েড (অ্যানুয়ালি ডিকমিশন্ড)।

ওফফফ কী বিচ্ছিরি নাম! আপনি নাক কোঁচকান। অনেক কিউট লাগে ওভাবে আপনাকে, সত্যি।

ইংরেজিতে সহজ অবশ্য। আমি বলি।

কী?

সোজা। অ্যাক্রোনিমটা বানান। ERSH[AD] ।


[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।