Tuesday, March 02, 2010

দ্বাদশ ক্রুদ্ধজন

ব্যাপারটা একটু কাকতালীয়, গত ২৪ ঘন্টায় তিনবার "টুয়েলভ অ্যাংরি মেন" চোখের সামনে এসে হাজির। একবার দুর্দান্তের লেখায়, একবার বঙ্কার মেসেজে, আরেকবার এক লুল ভিক্টিমার মুখে। টুয়েলভ অ্যাংরি মেন নিয়ে আগে কথাও শুনেছি, লেখাও পড়েছি, কিন্তু দেখার কৌতূহল জাগেনি। এমন জোরালো কাকতাল ঘটায় দেখতে বসে পড়লাম।

সিনেমা রিভিউ লেখার সমস্যা, যেটা নিয়ে প্রত্যেক সিনেমা রিভিউতে কথা বলি, হচ্ছে দুটো। এক, সিনেমা বুঝি কম, আর দুই, রসিয়ে লিখতে গেলে পণ্ডিকা [স্পয়লারের বাংলা করলাম] চলে আসে লেখায়। সিনেমামূর্খতা ঢেকে আর পণ্ডিকা এড়িয়ে লিখতে গেলে শেষমেশ জিনিসটা বেরসিক হয়।

পরিচালক সিডনি লুমে মার্কিন সিনেমার দিকপালদের একজন, চিত্রনাট্যকারের খোঁজে গুগল মেরে পেলাম রেজিনাল্ড রোজকে। নেটে ঘাঁটলে সিনেমাটা নিয়ে আরো একগাদা তথ্য আর কথাবার্তা পাওয়া যাবে, আগ্রহীরা খুঁজে দেখতে পারেন। আমি দর্শকপ্রতিক্রিয়াটুকুই লিখি।

পুরনো হলিউডি সিনেমাগুলোতে একটা কিছু ছিলো, যা এখনকার সিনেমায় নেই। সেটা কী, এক কথায় বলে বোঝানো সম্ভব না, হয়তো অনেকক্ষণ চিন্তা করেও যুৎসই শব্দ আসবে না মাথায়। কিন্তু পুরনো সিনেমা দেখতে বসার কয়েক মিনিটের মধ্যে ব্যাপারটা টের পাওয়া যায়। টুয়েলভ অ্যাংরি মেন শুরু হয়েছে সাদামাটা ভাবে, কিন্তু এই যে বিলুপ্ত মশলা, সে কিছুক্ষণের মধ্যেই দর্শকের মনের জিভে আসর করা শুরু করে।

মোটা দাগে কাহিনী এমন, এক তরুণ তার পিতাকে ছুরি মেরে খুনের দায়ে অভিযুক্ত। বারোজন জুররের কাঁধে দায়িত্ব পড়েছে, সমস্ত ফ্যাক্টস আর দুই পক্ষের যুক্তি শুনে রায় দেয়ার। পরিকল্পিত খুনের অভিযোগ, কাজেই শাস্তি গুরুতর, মৃত্যুদণ্ড। বারোজন জুরির রায় একই হতে হবে, দোষী বা নির্দোষ। করিডোর ধরে বিচারালয়ের ভেতরে এগোয় ক্যামেরা, নানা টুকিটাকি প্রাসঙ্গিক এবং ডিটেইলে ভরা দৃশ্য পেরিয়ে বিচারকক্ষে ঢুকে ক্যামেরা এই তথ্য জানায় দর্শককে। বারোজন জুরি উঠে চলে যান পাশের ঘরে, অভিযুক্ত তরুণের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে।

সিনেমাটা ঐ বারোজন জুররকে নিয়ে।

গোটা সিনেমাটা অভিনীত হয়েছে সেই পাশের ঘরে, দর্শককে যা ক্ষণিকের জন্যে হিচককের রোপ-এর কথা মনে করিয়ে দেয়। তবে রোপের মতো অতো দীর্ঘ শটের সিনেমা নয় এটি, বরং পরিচালক এই বারোজন জুররের গল্পটি ফুটিয়ে তুলতে ক্যামেরার কাছ থেকে কাজ আদায় করে নিয়েছেন ষোলো আনা। সংলাপবহুল সিনেমা বলে পরিচালক চেষ্টা করেছেন চরিত্রগুলোর অভিব্যক্তি যতটুকু সম্ভব ফুটিয়ে তুলতে, তাই শটের সংখ্যা স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি। কিন্তু স্বীকার করতেই হবে, লুমে শটগুলো সাজিয়েছেন দারুণ, দারুণ মুনশিয়ানায়। হিচককের মতো সাসপেন্স নেই, কিন্তু দর্শক এক মুহূর্তের জন্যেও চোখ সরাতে পারেন না পর্দা থেকে। কেন?

সংলাপ।

এই জায়গায় এসে মনে হয়, পুরনো হলিউডি সিনেমার সাথে নতুন দিনের সিনেমাগুলোর পার্থক্য কোথায়। এখন ঘটনার এতো বেশি ঘনঘটা, যে সংলাপ অনেক নির্ভার হয়ে পড়েছে। টুয়েলভ অ্যাংরি মেন এ প্রতিটি সংলাপ অভিনেতাদের কাছ থেকে যে নৈপুণ্য আর পারিপাট্য নিয়ে এসেছে, তা অসাধারণ। এক একটা বাক্য পরিমিত, কিন্তু আরোপিত মনে হবার জো নেই। খুব সাধারণ একটা কথা, ঐ মুহূর্তে ঐ রকম চরিত্রের মুখে ঐ রকম কথাই আমরা আশা করবো, কিন্তু এতো চমৎকার কৌশলে লেখা আর ডেলিভার করা যে অভিভূত হতে হয়।

সিনেমার কাহিনী এবার সামান্য একটু বলি, যতটুকু ঊরু না দেখালেই নয়। ঘরে ঢোকার পর বারোজনের মধ্যে এগারো জন জুরর মত দেন, অভিযুক্ত তরুণ দোষী। একজন মাথা নাড়েন। তিনি বলেন, আমি জানি না। রায় ফেঁসে যায়, কারণ বারোজনকে একমত হতে হবে দোষী অথবা নির্দোষ বিচারে।

বাকি এগারোজন চটে ওঠেন। জানেন না মানে কী? কী করতে চান আপনি?

সেই লোক বলে, আসুন কথা বলি।

হ্যাঁ, এরপর কথা শুরু হয় কেবল। এই কথা নিয়েই সিনেমা। একজন মানুষের প্রাণ বারোজন মানুষের হাতে, সে নিয়ে কথা। তর্ক। আলোচনা। খুনসুটি। ঝগড়া। অপমান। স্বগতোক্তি। একজন স্থপতি, একজন সেলসম্যান, একজন রংমিস্ত্রি, একজন শেয়ারদালাল, একজন ঘড়ি নির্মাতা, একজন বিজ্ঞাপন কপিরাইটার, একজন ফুটবল কোচ ... এরকম বিভিন্ন পেশার বিভিন্ন বয়সের বিভিন্ন রুচির বিভিন্ন শিক্ষার বিভিন্ন চরিত্রের বারোজন মানুষের মধ্যে একটি ঘরে এক অভূতপূর্ব টেনশন তৈরি হয়ে ত্রয়োদশ একটি মানুষের প্রাণের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে। এ কথার মধ্যে দিয়ে লুমে যে কী অসাধারণ একটি সিনেমা যে নির্মাণ করেছেন, শেষ দৃশ্যের আগে এসে দর্শকের সে উপলব্ধির ফুরসতও থাকে না। মৃদু কণ্ঠের সংলাপ, ক্রুদ্ধ কণ্ঠের চিৎকার, এক একটা বাক্য যেন আলাদা চরিত্রের চেহারা নিয়ে ঘুরপাক খায় সেই ঘরে, পর্দায়, দর্শকের মনে। মাত্র বারোজন মানুষ একটি ঘরে, কিন্তু তাদের সংলাপ ঘটনাকে কুমোরের চাকার মতো ক্ষণে ক্ষণে ভিন্ন চেহারা দেয়। যাঁরা রহস্যগল্প ভালোবাসেন, তাঁরা এক বাক্যে স্বীকার করবেন, এটি একটি রোমাঞ্চকর রহস্যকাহিনীও বটে। কিন্তু এখানে রহস্য একটি নয়, একাধিক। খুনের মামলা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে উঠে আসে আরো কয়েকটি ইস্যু, যা আদালতে ওঠে না, যা মানুষের পৃথিবীতে অমীমাংসিত থেকে যায় বেশিরভাগ সময়। চরিত্রগুলোর চেহারার ভাঁজ খুলে বেরিয়ে আসে ভিন্ন চেহারা, সংলাপের সুর আর স্বর আস্তে আস্তে তাদের নতুন রূপ দেয়, নতুন ছকে দর্শক তাঁদের পুনর্কল্পনা করেন।

সিনেমাটা দেখতে দেখতে ক্রিস্টির মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেসের কথা মনে পড়ছিলো, সিনেমা শেষ করে গুগল মেরে দেখি হায়, লুমে সেটারও পরিচালক!

সিনেমাটার সমাপ্তি আমার দেখা গত আটবছরে দেখা সব সিনেমা অভিজ্ঞতাকে ছাড়িয়ে গেছে। মালেনা দেখে খুব আবেগতাড়িত হয়েছিলাম, মনে আছে, মনে হয়েছিলো মানুষ এরকমই। টুয়েলভ অ্যাংরি মেন দেখে সজল চোখে অনুভব করলাম, মানুষ অনেকরকম। মানুষ কখনো সেই স্থপতির মতো রুখে দাঁড়াতে জানে, মানুষ সেই বিজ্ঞাপনের কপিরাইটারের মতো দ্বৈরথে ভুগতে জানে, মানুষ সেই বৃদ্ধ জুররের মতো চরিত্রবিচার করতে জানে, মানুষ সেই রেসিস্ট ইতালিয়ানের মতো নিজের ভেতরের অমানুষকে বের করে আনতে জানে, মানুষ সেই অভিবাসি শীর্ণকায় ঘড়ি নির্মাতার মতো নিজেকে অতিক্রম করে শক্তিশালী হয়ে উঠতে জানে, মানুষ ভুলটাকে গোঁয়ারের মতো আঁকড়ে ধরে চিৎকার করতে জানে, মানুষ ভুল স্বীকার করে বিপক্ষের যুক্তি মেনে নিতে জানে, কিন্তু সবকিছুর শেষে, সিনেমার শেষটুকুর শিক্ষা, মানুষ আসলে মানুষই।

টুয়েলভ অ্যাংরি মেন এর মতো একটা সিনেমার গল্প কি লিখতে পারবো কখনো? লিখবো। লিখতেই হবে। ... আহ, কত পরিতৃপ্তির স্বপ্ন দেখি!





দেখুন এখানে।




[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।