Sunday, February 14, 2010

সরিষার তেল মেখে ভূতে খায় মুড়ি

পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিলের আবেদন নাকচ করে দিয়েছেন আপিল বিভাগ। ফলাফল? ১৯৭২ এর দালাল আইনকে বাতিল করে জারি করা সামরিক ফরমান এখন অবৈধ। দালাল আইন এখন পুনরায় সক্রিয়। যেমন সক্রিয় ১৯৭৩ এর আন্তর্জাতিক অপরাধসমূহ (ট্রাইবুন্যাল) আইন। শক্তিশালী এই দু'টি আইনের আওতায় ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে সংঘটিত মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধসমূহের বিচার সরকারের পদক্ষেপগ্রহণের অপেক্ষায় ক্যালেন্ডারে চোখ রেখে বসে আছে।

আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসেছে এই প্রতিশ্রুতি দিয়ে যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার তারা এবার করবে। ক্ষমতা গ্রহণের দিন থেকেই একদিক দিয়ে যেমন সরকারের উচ্চ পর্যায়ে এই ব্যাপারটি নিয়ে ঢিলামি লক্ষ করা গেছে [শেখ হাসিনা বলেছিলেন, জনগণ ভোট দিয়েই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করে ফেলেছে], অপরদিকে ফেব্রুয়ারির পিলখানা হত্যাকাণ্ডের মতো নির্মম ঘটনা সশস্ত্রবাহিনীতে তীব্র অসন্তোষের সৃষ্টি করেছে। সশস্ত্রবাহিনীকে সংযত করার দুরূহ কাজটি করতে গিয়ে সরকারের জনবল ও সময় ব্যয় হয়েছে পিলখানা হত্যাকাণ্ডে জড়িত কয়েক হাজার বিডিআর জওয়ান ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্তে। সরকারের টপ প্রায়োরিটি বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায় কার্যকর করাতেই ছিলো [শেখ হাসিনার কথাবার্তা শুনে মনে হয় দেশে এই একটি মাত্র সমস্যাই রয়েছে এবং এই বিচারকার্য সমাধা করতে পারলেই দেশটা ফুলেফলে ভরে যাবে]। ফলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারটি সরকারের টু-ডু লিস্টের কোনো একটি দুর্গম অবস্থানে পড়ে পড়ে গায়ে ফাঙ্গাস চড়াচ্ছে।

তবে আমার মনোযোগ সরিষা আর ভূতের মধ্যে সম্পর্কের টেনশনটি নিয়ে। কিন্তু শিরোনামে যা বলেছি, সেটিই আমি বিশ্বাস করি, ভূত সরিষা পিষে তেল বার করে তা দিয়ে মুড়ি মাখিয়ে খাচ্ছে।

পত্রিকা পড়ে আমরা জানতে পাই, খোদ রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব মেজর জেনারেল এহতেশামুল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা মামলায় জড়িত জঙ্গিদের সাথে সংশ্লিষ্টতার। পত্রিকার সাথে যোগাযোগে তিনি সাড়া দেননি। ব্যাপারটি পত্রিকায় প্রকাশিত হবার পর রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিবের পদ থেকে তাঁকে সরিয়ে দায়িত্ব দেয়া হয় রংপুর ৬৬ পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল অফিসার কম্যান্ডিং হিসেবে।

পিলখানা এলাকার সাংসদ ফজলে নূর তাপসের সাথে বিডিয়ার হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের একটি প্রতিনিধি দল ঘটনার আগে সাক্ষাত করেছিলো। আবার তাপস বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় আইনজীবী হিসেবেও সংশ্লিষ্ট। আরো কোনো কারণ আছে কি না আমরা জানি না, কিন্তু তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে আধুনিক প্রযুক্তির দূরনিয়ন্ত্রিত বোমা বিস্ফোরিত হয়, যার সাথে সেনাবাহিনীর একজন মেজর ও চারজন ক্যাপ্টেন জড়িত হিসেবে গোয়েন্দা তদন্তে ধরা পড়েন। তারা সেনাবাহিনীর নিজস্ব তদন্তাধীন আছেন, একজন স্বীকারোক্তি দিয়েছেন।

সেনাবাহিনীতে যা কিছু ঘটে, সবই খুব গোপন এবং স্পর্শকাতর ব্যাপার, কিন্তু যতদূর বুঝি, ওপরের দুটো ঘটনাই ভূতের ঢেঁকিতে সরিষা পেষার মতো।

সেনাবাহিনীতে যুদ্ধাপরাধীদের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন একটি অংশ থাকা অস্বাভাবিক নয়, যেখানে ১৯৭৫ সালের পর থেকে অবৈধ ক্ষমতা দখলকারীরা ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলো, এবং এই পনেরো বছরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে ক্ষমতায় টিকে থাকার কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। গণতান্ত্রিক দেশের সেনাসংস্কৃতি অগণতান্ত্রিক দেশের সেনাসংস্কৃতির মতো নয়, পার্থক্য বুঝতে হলে ভারত আর পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর মধ্যে তুলনা করে দেখা যেতে পারে। আমরা গণতন্ত্রের পথে হাঁটছি বছর কুড়ি, কিন্তু সেনা নেতৃত্বের বিপুল অংশই ৭৫ থেকে ৯০, এই পনেরো বছরের সেনাশাসনের সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে অতিক্রান্ত হয়েছে, এবং এ সময় যুদ্ধাপরাধী জামায়াত-শিবিরপন্থীদের দলের হাইকম্যান্ড থেকে প্রবলভাবে উৎসাহিত করা হতো [এখনও হয়] সেনাবাহিনীতে যোগদানের জন্য। এই অফিসাররা এখনও অনেকেই বাহিনীতে থাকাই স্বাভাবিক, এবং মেধায় কোনো অংশে কম নয় বলে বিভিন্ন কম্যান্ড পদে তাদের আসীন হওয়াটিও বিচিত্র কিছু নয়। গোলাম আযমের পুত্র ব্রিগেডিয়ার [বাধ্যতামূলক অবসরপ্রাপ্ত] আযমী একজন চৌকস অফিসার হিসেবেই বাহিনীতে পরিচিত ছিলো। কঠোর সেনা প্রশিক্ষণ ও শৃঙ্খলা এই ভিন্ন আদর্শবাদ তাদের মন ও আচরণ থেকে মুছে দিতে পেরেছে কি না তা বলা মুশকিল।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীতে নবতর সংযোজন র‌্যাব এবং দেশের অন্যতম বৃহৎ বাহিনী, পুলিশে গত জোট সরকারের আমলে প্রচুর নিয়োগ ও পদোন্নতি [এবং পদচ্যুতি] হয়েছে, এবং তাদের ওপর জোট-সরকারের জুনিয়র পার্টনার জামায়াতের কতটা প্রভাব, এ নিয়ে খতিয়ে দেখা অতি জরুরি। সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের হামলায় ছাত্র নিহত হয়েছে পুলিশের চোখের সামনে, আহতদের অভিযোগ, পুলিশ নিষ্ক্রিয় থেকেছে। এ অভিযোগ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেও এসেছে।

চট্টগ্রামে শিবিরের মেসে অস্ত্র উদ্ধারের মামলায় খণ্ডিত ও দুর্বল অভিযোগপত্র দাখিল করেছে পুলিশ। কৌঁসুলি এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। অস্ত্র উদ্ধারের পর জামাতি আমীর নিজামী প্রকাশ্য জনসভায় হুমকি দিয়েছিলো, যে ঐ পুলিশি অভিযানে নিয়োজিত পুলিশ সদস্যদের জীবন সুখের হবে না।

আবারও ভূতকে দেখি সরিষা পিষতে।

সরকারের আমলাতন্ত্রেও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিরুদ্ধাচারী একটি অংশের কথা পত্রিকায় পড়েছি। তাদের ধারণা, সরকার অনেকগুলি ফ্রন্টে বিরোধিতার মুখোমুখি, তাদের আর শত্রুবৃদ্ধি করা উচিত নয় [ছাগল কোথাকার]।

এবার আসি ক্ষমতাসীন দলের কপিরাইট করা নির্বুদ্ধিতা নিয়ে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফের বক্তব্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের সমমনা ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগে শিবির ঢুকে পড়েছে। যদিও লীগ আর শিবিরের মধ্যে সম্পর্ক ঠিক সরিষা আর ভূতের মধ্যে সম্পর্কের মতো নয়, কারণ অতীতে লীগকে বহুবার শিবিরবান্ধব ভূমিকায় দেখা গেছে [আমি যখন ছাত্র ছিলাম তখন আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল আর ছাত্রফ্রন্টের ছেলেদের বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে দেখেছি শিবিরের বিরুদ্ধে, লীগ কী কী যেন উৎপাটন করতো বসে বসে]। একটা ছাত্র সংগঠন কতটুকু ছ্যাঁচড়া হলে সেখানে "অন্য দল" এর লোকজন কেন্দ্রীয় ও হল শাখার শীর্ষে আসীন হতে পারে, তার দারুণ উদাহরণ ছাত্র লীগ। এ প্রসঙ্গে শিবির সভাপতির বক্তব্য হচ্ছে, "সৈয়দ আশরাফের কথা শুনে আমরা হেসেছি। তিনি কী দল পরিচালনা করেন যে তাঁর দলে অন্য দল থেকে লোক ঢুকে?"

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে কোনো এক বিচিত্র কারণে জামায়াতের কোনো সমস্যাই হয় না, বিচার হওয়া তো দূরের কথা, তারা আরো শক্তিশালী হয়। এর ফল হয়তো ভুগতে হয় একজন আবু বকর, একজন ফারুক, একজন প্রফেসর ইউনুস, একজন প্রফেসর তাহের, একজন গোপালকৃষ্ণ মুহুরী, একজন হুমায়ূন আজাদকে। কারণ আওয়ামী লীগের আছে এক বান্ডিল সাহারা খাতুন, যারা সংসদে ঘুমিয়ে পড়ে আর দুই কুকুরের লড়াইয়ে নিরীহ ছাত্রের নিহত হবার ঘটনাকে "বিচ্ছিন্ন" বলে উড়িয়ে দেয়।

কোনো ঘটনাই বিচ্ছিন্ন না। মাননীয়া প্রধানমন্ত্রী, ডান কানটায় কি এখন একটু একটু শুনতে পান? কোনো ঘটনাই বিচ্ছিন্ন না।


[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।