Saturday, February 06, 2010

বইয়ের পাঠক আর ক্রেতা

বাংলাদেশে বইয়ের পাঠকসংখ্যা কত? কোন বয়সশ্রেণীর পাঠকের কাছে কোন ধরনের বইয়ের কদর বেশি? একটা বই একজন ক্রেতা কিনলে কয়জন পাঠক পড়েন? বই কেনার আগে একজন ক্রেতা কী কী দিক বিবেচনা করেন?

জানি না এর একটিরও উত্তর। ধারণা করতে পারি বড়জোর, আবছাভাবে। বই, ক্রেতা, পাঠক নিয়ে কথা বলতে গেলে আমাদের ঐ নিজস্ব আবছা ধারণার ওপর নির্ভর করেই থাকতে হবে হয়তো।

আমি জানি না, বাংলাদেশে বই নিয়ে কোনো বড় আকারের মার্কেট রিসার্চ হয়েছে কি না। সম্ভবত হয়নি। বই যে একটা পণ্য, একে ঘিরে যে সফল ব্যবসা হতে পারে, এই ধারণাটাই আস্তে আস্তে কার্পেটের নিচে চলে যাচ্ছে। নোট-গাইড আর রসময় গুপ্তের চটি চুরি করে হলেও বেচার আর কেনার লোক আছে, সাধারণ বইয়ের অত কদর নেই।

এর একটা কারণ হতে পারে সমন্বয়হীনতার অভাব। প্রকাশকের সাথে সম্পাদক আর লেখকের [কয়টা বই সম্পাদিত হয়ে বেরোয় বছরে?], কিংবা বিপণকের কোনো মান সমন্বয় ব্যবস্থা চোখে পড়ে না। প্রকাশক ও পুস্তক বিক্রেতাদের একটি সমিতি আছে, কিন্তু তারা কী করে আমি জানি না। শুধু টেক্সটবুক বোর্ডের কোনো সিদ্ধান্তের পর তাদের প্রতিক্রিয়া কাগজে পড়ে জানা যায়। কারণ নোট-গাইড আর রসময় গুপ্তের চটির মতো পাঠ্যবইয়ের বাজার দেশব্যাপী। সাধারণ বই ... আবারও কয়েক সারি পেছনে।

বইয়ের ব্যাপারটা অন্য যে কোন পণ্যের মতো করেই দেখা যেতে পারে, এর বড় চাহিদা তৈরি করতে পারলে এর মাথাপিছু খরচ কমে আসবে। একটি বই যদি ১০০ কপি ছাপা হয়, তাহলে তার যা খরচ, ১০০০ কপি ছাপালে হয়তো পার ইউনিট খরচ তার অর্ধেকে নেমে আসবে, ১০০০০ কপি ছাপালে হয়তো তারও অর্ধেকে [উদাহরণের খাতিরে লগ-স্কেল দিয়ে বলছি]। কিন্তু আমার মনে হয়, এক ধাক্কায় ১০ হাজার কপি বই ছাপা হবে, এমন লেখক বাংলাদেশে দুই তিনজন আছেন।

তাহলে বাকিরা কি পাতে ওঠার যোগ্য নন? মাহমুদুল হক কি একজন ফেলনা লেখক? কিংবা শহীদুল জহির? তাঁদের বই তাঁদের জীবদ্দশায় কয় কপি করে ছাপা হতো?

১০০ টাকা খরচ করে পাঠক অচেনা লেখকের লেখা না কিনে চেনা লেখকের বই কিনবেন। এটি পরীক্ষিত সত্য। অচেনা লেখককে পরিচিত করানোর দায় গ্রন্থবিপণনকারী প্রতিষ্ঠানের। এমন কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান আছে বলে আমার জানা নেই, প্রকাশক নিজেই সাধারণত বিপণনের কাজটি করেন। বেশির ভাগ প্রকাশক ঢাকাকেন্দ্রিক, তাঁদের সাথে ঢাকার বাইরে ছড়িয়ে থাকা গ্রন্থবিপণীগুলোর কেমন যোগাযোগ, বলা মুশকিল। সেবা প্রকাশনী বোধহয় এ ব্যাপারে সর্বাধিক এগিয়ে, দেশের একটা অখ্যাত রেলস্টেশনের বুকস্টলেও তাদের বই মেলে। অতখানি যোগাযোগের দায় বোধহয় আর কোনো প্রকাশক নিতে যান না।

একটা ছোটো সংখ্যা বলি। এজুকেশন বোর্ডের ওয়েবসাইটের স্ট্যাট ঘাঁটতে গেলাম [বিশ্রী ওয়েবসাইট, কোনো স্ট্যাট উদ্ধার করা যায় না ডেটাবেজ থেকে, স্ট্যাটিক একটা পেইজে ২০০৬ সালের তথ্য আছে শুধু], ঢাকা-চট্টগ্রাম-রাজশাহী-যশোর-সিলেট-কুমিল্লা-বরিশাল-মাদ্রাসা এই আটটি বোর্ডে মোট সাড়ে নয় লক্ষ পরীক্ষার্থী ছিলেন ২০০৬ সালে। যদি এঁদের মধ্যে ১০% সাধারণ বই পাঠক ধরা যায়, পঁচানব্বই হাজার পাঠককে আমরা পাই এই একটি ব্যাচ থেকেই। যদি কেবল শিক্ষার্থীদের সক্রিয় বই পাঠক ধরে নিই আমরা, তাহলে এর আগের চার ব্যাচ [ক্লাস এইট থেকে] এবং পরের চার ব্যাচ [অনার্স পর্যন্ত], মোট নয়টি ব্যাচে প্রায় আট লক্ষ পঞ্চাশ হাজার পাঠক আছে সারা দেশে। যদি একজন ধনবানের কেনা বই দশজন জ্ঞানবান পড়ে থাকেন, তাহলেও পঁচাশি হাজার বইয়ের ক্রেতা পাই আমরা, যে কোন এক বছরে। সারা বছরে বই কেনার পেছনে এঁরা যদি একশো টাকা খরচ করে থাকেন, তাহলে মাত্র পঁচাশি লক্ষ টাকার সাধারণ বইয়ের বাজার, বছরে। এই বাজারের একটা বড় অংশ দখল করে রাখেন হুমায়ূন আহমেদ এবং মুহম্মদ জাফর ইকবাল। বাকি লেখকরা কিছুমিছু পান।

বইয়ের বাজারটাকে আমরা মাছের বাজারের তো করে রেখেছি, যে ক্রেতা নিজেই উজিয়ে যাবেন। এখন বোধহয় সময় এসেছে একটু অন্যভাবে চিন্তা করার। বইয়ের বাজারকে পাঠক আর ক্রেতার সামনে নিয়ে যেতে হবে, সক্রিয়ভাবে। বইয়ের ব্যবহার খুব কমে গেছে, এটা বাড়াতে হবে। বড় কর্পোরেটগুলো এগিয়ে আসতে পারে পৃষ্ঠপোষকতার জন্যে। তাদের ভেন্ডররাও অনেক সময় টুকটাক এটাসেটা উপহার পাঠায় তাদের সন্তুষ্ট রাখার জন্যে, এ তালিকায় বইকে তোলা যেতে পারে। স্কুলকলেজ পর্যায়ে নানা কিসিমের প্রতিযোগিতা হয়, পুরস্কার হিসেবে বইকে অগ্রাধিকার দেয়া যেতে পারে। ভ্যালেন্টাইনস ডে-তে আমবুলি ছাপানো কার্ড না কিনে বই কিনে প্রথম সাদা পাতাটায় প্রেমার্থী লিখে জানাতে পারেন তাঁর মনের কথা। জন্মদিন থেকে শুরু করে বিয়ে পর্যন্ত উপহার দিতে পারেন বই [তবে বই অনেকেই পছন্দ করে না]। দশ লক্ষ টাকা সমপরিমাণ বইয়ের জন্যে দশ টাকা দামের টিকেটে লটারি ব্যবস্থা চালু করতে পারে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র।

প্রকাশকরা সবাই সম্মিলিতভাবে একটি শক্তিশালী বিপণন ও বিতরণ নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারেন। অথবা যেমন চলছে তেমন চলতে দিতে পারেন। সেক্ষেত্রে পাঠ্যবই বাদে অন্য বইয়ের ব্যবসা লাটে তোলার জন্যে আপনাদের হাতে মোটামুটি পাঁচ বছর সময় আছে।


[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।