Thursday, January 28, 2010

আইন তার নিজস্ব গতিতে চ......ল......বে

বঙ্গবন্ধু বড় মাপের ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁর নামটি দীর্ঘ, শরীরও দীর্ঘ ছিলো, বজ্রকণ্ঠে কথা বলতেন, তেমনি তাঁর মৃত্যুটিও প্রচণ্ড। জীবিত বঙ্গবন্ধুকে ভয় করতেন অনেকে, নিহত বঙ্গবন্ধুকেও কম ভয় পায়নি লোকে, তাঁর মৃত্যুর ২১ বছর পর তাঁর খুনীদের নামে প্রথম মামলা সক্রিয় করতে পেরেছে কেউ। ২১ বছর ধরে একজন নিহত মানুষকে একটি কালো অধ্যাদেশ জারি করে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে, এবং ২১ বছর পর জাতীয় সংসদে একমত হয়ে সে অধ্যাদেশ বাতিল করা সম্ভব হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু বড় মাপের ব্যক্তি ছিলেন বলেই হয়তো তাঁর হত্যা মামলাটি ১৩ বছর ধরে চলেছে। আইনের যতোগুলি চুল আছে, সবই বোধহয় পক্ষবিপক্ষের আইনজীবিগণ চিরে দেখিয়েছেন, কেন অভিযুক্তদের ছেড়ে দেয়া উচিত বনাম ফাঁসিতে ঝোলানো উচিত। আজ তাদের ৫ জনকে ঝুলিয়ে দিতে পেরেছে কারা কর্তৃপক্ষ। আইন তার নিজস্ব গতিতে চলে অপরাধীদের সাজা কার্যকর করতে পেরেছে।

এই যে নিজস্ব গতি আইনের, এ কি যথার্থ? কতগুলি মানুষকে খুন করার পর ৩৪ বছর যে সদম্ভ জীবন যাপন খুনীদের, আইনের গতি কি তা সমর্থন করে? যাদের ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছে, তারা তাদের জীবনের রূপরসগন্ধ তো ঠিকই নিয়েছে ২১ বছর, এবং পরবর্তী ১৩ বছরও কারাবন্দী জীবনে বেশ আয়েশের সাথেই কাটিয়েছে। মানি, জাস্টিস হারিড জাস্টিড বারিড, কিন্তু জাস্টিস ডিলেইড তো জাস্টিস ডিনাইড?

প্রথম আলোর এই আর্টিকেলটায় বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যা মামলায় অভিযুক্তদের বিচার কার্যক্রমের গতিপ্রকৃতি নিয়ে একটা সামারি দেয়া আছে। তাতে কী ঘটেছিলো, তা ধাপে ধাপে লেখা আছে। দায়মুক্তি অধ্যাদেশ বাতিলের বিরুদ্ধেও কে বা কাহারা যেন আদালতে মামলা ঠুকে দিয়েছিলো, বিস্তারিত মনে নেই এখন, অভিজ্ঞ পাঠক হয়তো স্মরণ করিয়ে দিতে পারবেন আমাকে। সেই মামলাও চলছে বছর দুয়েক ধরে। আইন এমনই প্রবল গতিসম্পন্ন।

আমাদের অনেক বিচারক মহোদয় বিব্রত হয়ে পড়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর মতো বড় মাপের লোকের খুনের মামলা সামলাতে গিয়ে। তোমার পতাকা যারে দাও, তারে বহিবারে দাও শকতি ... বোধ করি সেই শক্তি সবাই পান না সবসময়। হরলিক্স বা রবিনসন বার্লি খেয়ে সে শক্তি অর্জন করা যায় না। তাই শক্তপোক্ত বিচারকের অভাবে নাকি এই মামলাটি বিচারকশূন্যতায় পর্যন্ত ভুগেছে। আমরাও বিব্রত হয়েছিলাম আমাদের জাতিগত অপুষ্টির কথা ভেবে।

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত আরো অনেকে হয়তো ঠিকমতো মামলায় আসেনি। অজানা সংখ্যক ষড়যন্ত্রী হয়তো ইতিহাসে নিজেদের নামের সাথে জড়িয়ে থাকা এই অভিযোগ আর সন্দেহের লতাগুল্ম একটি একটি করে সরিয়ে একদিন নিষ্কলুষ আদম হিসেবেই স্থান করে নেবেন। কারণ আইন তার নিজস্ব গতিতে চলে। ইতিহাস চলে অন্যের গতিতে।

বঙ্গবন্ধুর মৃতদেহটির প্রকাণ্ড ভার কাঁধে নিয়ে আমাদের আইন আর বিচার ব্যবস্থা বোধকরি আরো শ্লথ হয়ে পড়েছিলো। ৩৪ বছর ধরে এই শবদেহ [আরো অনেক শবদেহের সাথে] বয়ে বেড়ানোর পর ক্ষণিক মুক্ত অ্যাটলাসের মতো আইন আর বিচার ব্যবস্থা হয়তো একটু হালকা বোধ করবে। পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে দেখি এই বিচারের কাজে সক্রিয়। মনে আশা জাগে, হয়তো বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের হত্যার বিচারেই রাষ্ট্র সমান আগ্রহ, উদ্যম আর ধৈর্য নিয়ে নিয়োজিত হবে। সুবিচারের যে দৈত্যটিকে বোতলে পুরে তার মুখে বঙ্গবন্ধুকে ছিপি হিসেবে আটকে দেয়া হয়েছিলো, সেই ছিপিটি হয়তো মাত্র অপসারিত হলো।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বাংলাদেশের সব মানুষের সাধ্য নাই, নিজেদের পিতার, ভায়ের, মায়ের, বোনের হত্যার বিচার প্রধানমন্ত্রীত্ব বরণ করে আদায় করার। আপনার আছে, আপনি পেরেছেন। জাতির পিতার হত্যার বিচার তো সরকারের আগ্রহে এগিয়ে গেলো, এবার জাতির হত্যার বিচারে উদ্যোগ নিন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই। ত্রিশ লক্ষ স্বজন হত্যার বিচার চাই। তারা সকলে আপনার পিতা, আপনার ভাই, আপনার মা, আপনার বোন। তাদের রক্তের তিলক লেগে আছে আইন আর বিচার ব্যবস্থার কপালে। এই তিলক দূর করতে উদ্যোগী হোন।

৩৮ বছর কেটে গেছে, কেউ কথা রাখেনি। আপনি রাখুন।


[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।