Monday, January 25, 2010

সুন্দরবন, বাঘ আর আমরা

সুন্দরবন নিয়ে কিছু লিখতে যাওয়া ঈশ্বরকে নিয়ে কিছু লিখতে যাবার মতোই। আমি সুন্দরবনে যাইনি কখনো। কিন্তু যেতে চাই। সে যাত্রার আগেই সুন্দরবন নামের ব্যাপারটা ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাক, সেটা চাই না। তাই সুন্দরবন নিয়ে খুব জোরেসোরে চিৎকার চলুক চারদিকে, এমনটা চাই।

আমার আরো দুর্বলতা বাঘের প্রতি। বাঘ আমাদের প্রতীকই কেবল নয়, মানুষকে বাদ দিলে বাঘই সুন্দরবনের সুপ্রিম প্রিডেইটর, সুন্দরবনের সংবেদনশীল পরিবেশব্যবস্থায় বাঘ এক বিরাট চরিত্রে আছে। আরো জরুরি দিক হচ্ছে, বাঘের এই প্রজাতি সংকটাপন্ন। আমাদের বন বিভাগের সর্বোচ্চ মনোযোগ দেয়া উচিত সুন্দরবন আর তার বাঘের ব্যাপারে।

আমি প্রস্তাব করছি, সুন্দরবনের অভিভাবক হিসেবে একটি পৃথক, শক্তিশালী কর্তৃপক্ষ তৈরি করা হোক। এর সদর দপ্তর হবে সাতক্ষীরায়। সুন্দরবন সম্পর্কে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত আসবে এই কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে।

খবরের কাগজে পড়লাম, বাঘকে চেতনানাশক ডার্ট ছুঁড়ে নিশ্চল করার প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে ৩০ জন বনকর্মীকে। খবরটা পড়ে আরেকটা চিন্তা আমার মাথায় এলো। সুন্দরবনে কেউ বেড়াতে গেলে সাথে বনরক্ষী দেয়া হয়, তাদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র থাকে, যেহেতু সুন্দরবনে বাঘের চেয়ে ভয়ঙ্কর মানুষও থাকে। কিন্তু কিছুদিন আগে মুস্তাফিজ ভাইয়ের অভিজ্ঞতা পড়ে আমরা জানলাম, বাঘ যদি সত্যি সত্যি পর্যটকদের ওপর আক্রমণ করে, এই বনরক্ষীদের হাতে শেষ পর্যন্ত একটি আগ্নেয়াস্ত্রই থাকবে তাকে নিরস্ত করার জন্যে। অর্থাৎ, শেষ বিচারে বাঘকে বন্দুকের গুলির মুখোমুখিই করা হচ্ছে। আমি তাই আরো প্রস্তাব করছি, জঙ্গলে বেড়াতে যান যেসব পর্যটক, তাঁদের সাথে ট্র্যাংকুইলাইজার গানসহ একজন বনকর্মী নিয়োগ করা হোক। এর ব্যয় পর্যটকরা বহন করবেন।

বাঘ লোকালয়ে এসে মানুষের গরু ছাগল মারে, মানুষ মারে, আবার মানুষের পিটুনি খেয়ে মারা পড়ে, কিন্তু বাঘ লোকালয়ে আসে কেন? সুন্দরবনে সাম্প্রতিক সময়ে সুপেয় পানির একটা ভয়ঙ্কর সঙ্কট চলছে সিডরের কারণে, খসরু চৌধুরীর এক লেখা পড়ে জেনেছিলাম। কাজেই বাঘের প্রধান খাদ্য হরিণ জড়ো হয়েছে সেইসব এলাকায়, যেখানে মিষ্টি পানি আছে। ফলে যেসব বাঘের এলাকায় লোনা পানি ঢুকে পড়ে আটকে আছে, তারা নিজেদের এলাকা ছেড়ে অন্য বাঘের এলাকা বা মানুষের এলাকায় ঢুকে পড়তে বাধ্য হচ্ছে। এ ব্যাপারে বন বিশেষজ্ঞরা কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেন কি না, আমি জানি না। খসরু চৌধুরী আরো একটা প্রস্তাব দিয়েছিলেন। উপকূলীয় বনাঞ্চলে অগ্রপশ্চাৎ না ভেবে ছেড়ে দেয়া চিত্রা হরিণ সেখানকার খাদ্য শৃঙ্খলের চূড়ার অবস্থান করছে, অর্থাৎ হরিণের কোনো খাদক সেখানে নেই। সেখানেও সুপেয় পানি ও আহার্যের তীব্র সঙ্কট, চৌধুরী প্রস্তাব করেছিলেন, এই হরিণের একটা বড় অংশ আবার সুন্দরবনে এনে ছেড়ে দিতে। আমি পাশাপাশি আরো প্রস্তাব করছি, কিছু বাঘকে ঐ উপকূলীয় বনে ছেড়ে দিয়ে কিছু "পকেট সুন্দরবন" তৈরি করা হোক। সেইসাথে তাদের অভিভাবক হিসেবে বনরক্ষী ও বনকর্মী নিয়োগ করা হোক, যাতে কোনো শুয়োরের বাচ্চা গিয়ে চুরি করে বাঘ মারতে না পারে। এই উপকূলীয় বনাঞ্চলের "পকেট সুন্দরবন" তখন পর্যটকও টানতে সক্ষম হবে।

আর বাঘ আসলে সংখ্যায় কতো? এক এক গণনাকারী পক্ষ এক এক সংখ্যা বলে। আমি সবচে পেসিমিস্টিক গণনাফল ২৫০কে সত্য বলে ধরে নিয়ে পরিকল্পনা করার পক্ষপাতী। পরিবেশমন্ত্রী দেখলাম এক অনুষ্ঠানে বলছেন, সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বাড়ছে। তিনি কীসের ভিত্তিতে এ কথা বলছেন তা জানা যায়নি। ঢাকায় বসে এ ধরনের বিবৃতি না দেয়া সুন্দরবনের বাঘের জন্যে মঙ্গলকর হবে।

বাঘ টেরিটোরিয়াল বা এলাকাকাতর জীব। সুন্দরবনে গাইগরু পালার মতো করে বাঘের সংখ্যা বাড়ানো সম্ভব নয়। বাঘের সংখ্যা বেঁধে দেবে সুন্দরবনের জৈবভৌগলিক আয়তন। সেটা যতদূর জানি, নিয়তই কমছে মানুষ ঢুকে পড়ায়। তাই বাঘের সংখ্যাও কমতে বাধ্য। এই অনধিকার প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে যে কোনো মূল্যে।

আমি পাঠকদের কাছে অনুরোধ করবো, সুন্দরবনের পশুসম্পদ রক্ষার জন্যে কোনো আইনের কথা যদি জানেন, আমাকে অবহিত করুন। পাশাপাশি সুন্দরবন নিয়ে কী কী খয়রাতি প্রকল্প দেশে চলমান, সেটারও একটা তালিকা করে খতিয়ে দেখা উচিত, আসলে তাঁরা কী করেন।




পিপিদার সাথে আলাপ করছিলাম একটা আইডিয়া নিয়ে।

উপকূলে নতুন জেগে ওঠা চরগুলিতে প্যারাবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার, এমন একটা কিছু পড়েছিলাম কাগজে।

সরকার কি একটা মিনি-সুন্দরবন তৈরি করতে পারে না? ট্যুরিজম এবং গবেষণা, এই দুটোরই নতুন দুয়ার খুলে যেতো এমন কিছু করা গেলে।

সুন্দরবনকে টেমপ্লেট ধরে উপকূলীয় কোনো বড় চরে বনায়ন শুরু করা হোক। তারপর তাতে ছেড়ে দেয়া হোক কয়েক জাতের হরিণ, শূকর, বানর, সাপখোপ, পাখি, সরীসৃপ, কাঁকড়া ... আর একটা মদ্দা আর একটা মাদী বাঘ। জঙ্গলের ভেতরে পরিকল্পিত বেষ্টনীসহ মিষ্টি পানির পুকুর, ওয়াচটাওয়ার, রোপওয়ে, ফিল্মিঙের জন্যে বার্ডস নেস্ট নির্মাণ করা হবে।

এই জঙ্গলের ব্যয় উঠে আসবে ট্যুরিজম আর ফিল্মিং থেকে। বছরে নির্দিষ্ট সংখ্যক ট্যুরিস্ট এখানে আসতে পারবেন। টিকেট অনলাইনে নিলামে তোলা হবে, যে বেশি পয়সা দিতে পারবে, সে-ই আসবে। পর্যটকদের জন্যে অভিজ্ঞ গাইড, ক্যামেরাম্যান, বনরক্ষী, চিকিৎসক থাকবে এই ট্যুরে। সারা জঙ্গল ঘুরে দেখার পর রাতে জাহাজে থাকার ব্যবস্থা করা হবে, জঙ্গলের ভেতরে থাকার সুযোগ র‌্যাফল আউট করা হবে। টিকেট ছাড়া এই জঙ্গলে কেউ প্রবেশ করলে বনরক্ষীরা তাদের গ্রেপ্তার করে মোটা অঙ্কের টাকা জরিমানা করবে। প্রশিক্ষিত বনরক্ষীরা চোরাশিকারিদের হাত থেকে জঙ্গলকে রক্ষার জন্যে তৈরি থাকবে, কোস্টগার্ড তাদের সহায়তা করতে বাধ্য থাকবে।

আর কী কাজে লাগবে এই জঙ্গল? মেরিন বায়োলজি, বোটানি, জুওলজি, ফরেস্ট্রি, অর্নিথোলজির গবেষণার এক নিরাপদ অভয়ারণ্য হতে পারে এটি। এই প্রকল্পের সাথে যুক্ত করা হবে বিশ্ববিদ্যালয় আর গণমাধ্যমকে।

শৌখিন শিকারিদের জন্যে বছরের একটি সময় মোটা টাকার বিনিময়ে হরিণ শিকারের লাইসেন্স বিক্রির পরামর্শ দিলেন পিপিদা। আর এ-ও আশঙ্কা করলেন, এরকম কোনো বন ম্যাচিওর করতে ১০ বছর সময় লেগে যাবে, ততদিনে সরকার পাল্টাবে, সবকিছু আবার উলটপুরাণ হয়ে যাবে।

এরকম একটা প্রকল্প কি পাবলিক কোম্পানিতে পরিণত করে শেয়ার ছেড়ে একে আরো অনেক লোকের কাছে দায়বদ্ধ করে তোলা যায় না? দুবাইতে আরবরা সমুদ্রে বালু ফেলে খেজুরের আকৃতিতে দ্বীপ বানায়, আর আমরা জেগে ওঠা চরে একটা জঙ্গল বানিয়ে তাকে টিকিয়ে রাখতে পারবো না? এটা কি খুব কঠিন কাজ হবে? ভারতীয়রা চাঁদে নভোচারী পাঠাবে, আর আমরা একটা জঙ্গল তৈরি করতে পারবো না?


[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।