Thursday, January 14, 2010

প্রবাসে দৈবের বশে ০৬০

বলাই আর বলাইনী চলে গেলেন কাসেল ছেড়ে।

কাসেল শহরে আমাদের অল্প কয়েকজনের একটা নিরিবিলি সমাবেশ ছিলো, এক এক করে চলে গেলেন অনেকেই। মুনশি চলে গেলেন গত গ্রীষ্মে আরো দক্ষিণে, রেহমান চলে গেলেন হেমন্তে, আরো পূর্বে। বলাই তাই বোধ করি উত্তরে যাবার সিদ্ধান্ত নিলেন। পশ্চিম দিকটার দিকে তাকিয়ে মাঝে মাঝে মনে হয়, আমার গন্তব্য হয়তো সেদিকেই।

একটা গোছানো সংসার একেবারে ঝেড়েঝুড়ে সরিয়ে নতুন জায়গায় স্থিত হওয়ার ব্যাপক হাঙ্গামা, সেটা আবারও টের পেলাম বহুদিন পর।

বলাই আক্ষরিক অর্থেই সবকিছু ফেলে দিয়ে গেছেন। আমরা গণিমতের মালের মতো নিজেদের যা দরকার টেনেটুনে নিয়ে এসেছি, বাকি সবকিছু বয়ে এনে ফেলে দিতে হয়েছে। এই ফেলে দেয়ার জন্যে আবার দস্তুরমতো পয়সা দিয়ে দরখাস্ত করতে হয়। নগর পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা জায়গা নির্দিষ্ট করে রাখেন, সেখানে গিয়ে মালসামানা গুণে গুণে ফেলে মালপিছু ইউরো গুণে দিতে হয়, মহা ভ্যাজাল। আর টুকিটাকি বহু জিনিস আবর্জনার বাক্সে ফেলা হয়েছে।

বলাই চলে গেছেন বলেই আমার অবশেষে একটা বৌবালিশ জুটেছে। একেবারে গ্যাদাকাল থেকেই আমি একাধিক বালিশকে শয্যাসঙ্গিনী হিসেবে পেয়ে অভ্যস্ত, আর জার্মানদের পালকের বালিশকে আমি বালিশ হিসাবে স্বীকৃতি দেই না। জার্মানিতে এসে বলাইয়ের কল্যাণেই একখানা দেশী কনফিগারেশনের বালিশ পেয়েছিলাম, সংসার তছনছ হয়ে যাবার পর বলাইনীকে বললাম, এইবার একটা হেস্তনেস্ত করতেই হবে, আর কত রাত একা থাকবো? বলাইনী দেখলাম দাঁত কিড়মিড় করে প্রচুর কোলবালিশ, পাশবালিশ, কানবালিশ, ঠ্যাংবালিশ আর গোটা তিনেক কম্বল সব সম্প্রদান কারকে তুলে দিলেন আমার হাতে। ধরা গলায় বললেন, ওদের দেখে শুনে রাইখেন হিম্ভাই, অযত্ন কৈরেন্না, আর মাঝেমধ্যে ধুইয়েন! আমিও ছলোছলো প্রতিজ্ঞা করে জানালাম, এরা আমার সম্পত্তি নয়, এরা আমার সম্পদ।

আমি জিনিসপত্রের অপচয় দেখে অভ্যস্ত নই। আমাদের বাসায় সবসময়ই দেখেছি জিনিসপত্র রিসাইকেলড হতে। তাই বলাইয়ের অস্থাবর সম্পত্তির মধ্যে যা কিছু বহনযোগ্য, সবই আমরা কাসেলের বাকিরা আলগাইতে-পারলে-লয়া-যামু নীতির ভিত্তিতে ভাগাভাগি করে নিয়ে গেছি। যেমন আমি এখন মনে হয় শ'খানেক হ্যাঙ্গারের মালিক। বলাইনীর সন্দেহ আমি অচিরেই বিয়েশাদী করবো কিংবা কোনো বান্ধবী জুটিয়ে যুগলজীবনযাপন শুরু করন ঘটন হওয়াবো, নাহলে এতো হ্যাঙ্গার দিয়ে করবোটা কী?

বলাই একগাদা জামাকাপড়ও ফেলে দিতে চান, সেগুলি তিনি বয়ে নিয়ে যেতে পারবেন না। আমাকে ফিতা দিয়ে মেপেটেপে বললেন, ভুঁড়িটা ফেলে দিতে পারলে তার সব শার্টই আমাকে ঘ্যাম ফিট করবে। আমি নিজেও একগাদা শার্ট বয়ে এনেছি দেশ থেকে, কিন্তু সেগুলি পরা হয় না, উপরন্তু বলাইয়ের পাট করা শার্টের স্তুপ এখন আমার শ্রাঙ্কে। এমনকি আমার পানি গরম করার হিটারটা একটু হেজেমোনি শুরু করায় বলাইয়ের হিটারটাও আরো কিছু রান্নার সরঞ্জামাদিসহ বায়তুল মাল থেকে নিয়ে এসেছি।

বলাইয়ের বাড়িতে "চায়না টাউন" দেখতে দেখতে তাই বলছিলাম, আজ থেকে বছর কুড়ি পর যখন একটা গিয়ানজাম ঘটিয়ে সারা দুনিয়ায় বিখ্যাত হয়ে যাবো, তখন পত্রিকার সাংবাদিকরা বলাই পরিবারের সাক্ষাৎকার নেবে। বলাই বলতে পারবেন, আরে এই হিমু যখন জার্মানিতে প্রথম এলো, সেই কালরাতে সে কই ছিলো? এই বলাইয়ের বাড়িতে। তার তখন একটা বালিশও ছিলো না, কে দিয়েছিলো তাকে বালিশ? এই বলাইনী। অ্যাদ্দূর বলার পর বলাইনী ঠিক করলেন, অন্তত বলাইয়ের একটা টিশার্ট আমাকে নিতেই হবে, যাতে ইন্টারভিউতে কোনো ফাঁক না থাকে। কী পরতো আপনাদের হিমু? এই বলাইয়ের টিশার্ট! আর আজ সে এতো বিখ্যাত ইয়ে, সে কি এমনি এমনি?

তারপরও, শেষ বিচারে এ এক সংসারের লয়ই। চোখের সামনেই বলাইয়ের বসার ঘর থেকে এক এক করে সবকিছু তুলে ফেলে দিয়ে এলাম আমরা। বলাইয়ের শোবার ঘরের সব আসবাব টুকরো টুকরো করে সরিয়ে নয়তো ফেলে দেয়া হলো। একদিন গিয়ে দেখি শূন্যঘরে অল্প কয়েকটা বাক্স কেবল, ঘরে নতুন রং। এই ঘরে গত আড়াই বছরে আমরা অনেকগুলি আনন্দঘন আড্ডার সন্ধ্যা কাটিয়েছি, কাসেলে আমাদের অতিথিদের সৎকার করেছি। মুনশির সেই পুরনো গির্জার চিলেকোঠার গা ছমছমে বাসা আর কাঠের সিঁড়ির ক্যাঁচক্যাঁচ যেমন এখন স্মৃতি কেবল, যেমন স্মৃতি রেহমানের ভোনহাইমের জানালায় ভেসে ওঠা পাহাড়ের উপত্যকা। অথচ মাত্র কয়েক মাস আগেও ক্রিকেট খেলতাম আমরা, হইহুল্লোড় করে মোনোপোলি খেলতাম।

একদিন ভোরে বলাই আর বলাইনীকে ট্রেনে তুলে দিয়ে এসে অনুভব করলাম, মোনোপোলি শেষ পর্যন্ত থাকে একাকিত্বের। সঞ্চয়ের প্রতিটা মুহূর্তই আসলে অপ্রতিরোধ্য ক্ষয়ের প্রস্তুতি। এই প্রত্যেকটা ছেড়ে যাওয়ার মুহূর্তেই মনে মনে নিজেকে প্রবোধ দিই, এ-ই হয়তো স্বাভাবিক নিয়ম, যে নিয়মে আপেল নিচের দিকে পড়ে আর তেল জলে ভাসে। তারপরও মনে হয়, সঞ্চয়টুকু থিতু হোক, কোথাও দাঁড়িয়ে তাকে নিশ্চিন্তে দেখি। প্রেম ফুরিয়ে গেলে প্রেমিকা হারিয়ে যায়, সহোদর-সহোদরা চলে যায় অন্য দেশে অন্য জীবনে, পরিজনেরা সরে যায় নিজেদের কক্ষপথে পাল্টে, আর এ তো প্রবাসে ক্ষণিক দৈবের বশে জড়ো হওয়া আমরা কয়েকজন বন্ধু, মহাকর্ষ কি আমাদের টেনে আলাদা করবে না?

ফেরার পথে তুষারের আভায় অন্ধকার কাসেলকে দেখি। ভাবি, প্রবাসে আসলে প্রাপ্তিটা কী? উত্তর পাই ভেতর থেকে, প্রবাসে মানুষ সবচেয়ে ভালোভাবে পায় নিজেকে। আমি যে এমন আমি, কখনো তো দেখতে পাইনি আগে। নিজের ঘর ছেড়ে বহু দূরে অন্যের শূন্য হয়ে যাওয়া ঘরের জন্যে দুঃখ পাবো, এমনই কি মানুষ তবে আমি?

বাড়ি ফেরার পথে টের পাই, মাইনাস দশ ডিগ্রী তাপমাত্রায় আসলে পানি জমে বরফ হবেই। সে যতই লোনা হোক।


[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।