Wednesday, December 30, 2009

প্রবাসে দৈবের বশে ০৫৯

অনেকদিন লিখি না আমার প্রবাস জীবনের হিজিবিজি দিনলিপি। নিরর্থক মনে হয়। শেষ লিখেছিলাম অনেক আগে, এর মধ্যে অনেক কিছু টুকিটাকি আর বড়সড় ঘটনা ঘটে গেছে, সেগুলো নিয়ে স্মৃতিচারণের ইচ্ছেও হয় না।

ফার্মভিল খেলতাম মাঝে খুব, বলাইনী একদিন এসে উঁকি মেরে দেখে নাক সিঁটকে "এগুলি কী খ্যালেন?" বলে চলে যাচ্ছিলেন, তাকে একটা ইনভাইটেশন পাঠালাম। কয়েকদিন পর দেখি তিনি স্নানাহার বাদ দিয়ে ফার্মভিল খেলছেন। ভোর রাতে ফেসবুকে হঠাৎ ঘটাশ করে শব্দ হয়, দেখি বলাইনী বলছেন, হিম্ভাই আমাকে একটা ছাগল গিফট করেন! ফেসবুকে বলাইনীকে অ্যাক্টিভ দেখলেই বুক কেঁপে ওঠে, এই বুঝি হাতিঘোড়া কিছু গিফট চায়! বলাইয়ের বাড়িতে গেলেই গঞ্জনা শুনতে হয়, আপনি গিফট দ্যান না ক্যান আপনি গিফট দ্যান না ক্যান? ভাবলাম বলাই নিশ্চয়ই বউকে অচিরেই এই হ্যাংলামো থেকে শাসনটাসন করে বার করে আনবে। কিন্তু কীসের কী! সেদিন গিয়ে দেখি তিনিও দুইটা অ্যাকাউন্ট খুলে তুমুল ফার্মভিল খেলায় মত্ত, একটা থেকে আরেকটায় সমানে গিফট পাঠিয়ে যাচ্ছেন। বলাইনী বিরাট ফিরিস্তি দিলেন, এই ক্রিসমাসে তিনি নতুন কোন কোন ডেকোরেশন পেয়েছেন। বরফজমাট লেক থেকে শুরু করে চকলেট দিয়ে সাজানো গেট, আরো কী কী হাবিজাবি যেন। আমার ক্রিসমাস গিফট খোলা হয়নি জেনে দুইজনই তদ্দণ্ডে আমাকে ফেসবুকে ঢুকিয়ে সেই গিফট খুলিয়ে ছাড়লেন। তারপর কী একটা আগে আসলে আগে পাবেন টাইপ জিনিস নিয়ে দুজনের মধ্যে একদফা মারপিটও হয়ে গেলো। আহত বলাই পরাজয় স্বীকার করে আমাকে দোষারোপ করতে লাগলেন, কেন তার বউয়ের সামনে এই গিফট খুললাম। ওদিকে ফেসবুকে আমার গোপন অ্যাকাউন্টে লুলুবৃত্তির ভিক্টিমারা এসে টোকা দিচ্ছে, শান্তিমতো যে দু'ফোঁটা লুলবর্ষণ করবো সে উপায়ও নাই!

অনেক রাতে ফিরছিলাম বদ্দার বাড়ি থেকে। সেখানে আমি, বলাই আর বলাইনী আজ অতিথি। বদ্দা কিঞ্চিৎ হাভানা ক্লাব সেবন করে পুরাই আউট অব টিউন, কী কী যেন খালি বলে! আমি বলাই আর বলাইনী হাসি শুধু, তাই দেখে সে আরো ক্ষ্যাপে, এবং আরো কী কী যেন বলে! শেষমেশ ফেসবুকে কিছু গোপন হাসির খোরাক বার করে অনেক হাসাহাসি করে তার বাড়ি থেকে বেরোলাম সবাই।

জিরো ডিগ্রীর সামান্য একটু ওপরে যখন ওঠে তাপমাত্রা, তখনকার মতো বিশ্রী পরিস্থিতি আর হয় না। বরফটা তখন গলে কাদা হয়ে যায়, তার তিন ভাগ জল এক ভাগ স্থল টাইপ অবস্থা, ভয়ঙ্কর পিচ্ছিল সবকিছু। হাতে ভারি ব্যাগ নিয়ে বহুদূর হেঁটে বাসের অপেক্ষায় আছি। একটা বাজে বাস আসার কথা, আর আসে না। এদিকে বাসস্টপে যেখানে চেয়ার আছে, তার ওপরে খোলা আকাশ, তুমুল বৃষ্টি পড়ছে। ছুটির মরশুম, একটা জনমনিষ্যি নাই আশেপাশে। পাঁচ মিনিট গেলো, দশ মিনিট গেলো, বাস আর আসে না। ভাবলাম, হয়তো বাস আগেই ছেড়ে দিয়েছে, পরের বাস আরো এক ঘন্টা পাঁচ মিনিট পর। একবার ভাবলাম হেঁটে চলে যাই, কিন্তু এই ভয়ঙ্কর কাদা গোটা শহর জুড়ে, সাহস হলো না। টিপটিপ বৃষ্টির মধ্যে বসে রইলাম।

একটা শহর যখন একেবারে নিরব হয়ে পড়ে, তখনই বোধহয় সেই শহরের আসল সুর কানে বেজে ওঠে। একটা কোনো গাড়ি নেই, মানুষ নেই, আলো নেই, চুপচাপ ভিজছে কাসেলের প্রধান চত্বরের পাশের রাস্তা, ল্যাম্পপোস্ট জ্বলছে দূরে অন্য রাস্তায়, একটু দূরে মাথায় গলতে থাকা বরফের চাঁই নিয়ে দাঁড়িয়ে সারি সারি গাড়ি। মাথার ওপর ঘড়িটাকে মনে হয় ভাসমান প্রেতের মতো, তার দু'টো হাত ভিজতে ভিজতে ঘুরছে। এই জঘন্য আবহাওয়ার মধ্যে হু হু বাতাসে কাসেল শহরের কান্না শুনতে পাই, মনে হয় সেও বসে আছে রাত দুটো পনেরোর বাসের আশায়।

ভুল জানতাম। রাতের বাস বন্ধ ছিলো আজ। এক ক্যাব ড্রাইভার চক্কর মেরে এসে দরজা খুলে বললো, আপনি হয়তো জানেন না, আজ আর বাস নেই। কোথায় যাবেন বলুন।

ক্যাবে চড়ে যখন ফিরছি বাসায়, ক্যাবচালকের বকবক শুনতে শুনতে হঠাৎ মনে হলো, আমার জীবনের সারমর্মটুকুই যেন পার করলাম এই পঞ্চাশ মিনিটে। যা কিছুর জন্যে অপেক্ষায় একা পড়ে পড়ে ভিজি, তা আর আসে না শেষ পর্যন্ত। গন্তব্য সে-ই একই, কিন্তু তাতে সঙ্গী হয় কেবল অনীপ্সিত, অপ্রতীক্ষিত কিছু।

[]

2 comments:

  1. বলাই আর বলাইনি কে?

    ReplyDelete
  2. দারুন লাগলো। এটা আগে পড়িনি!

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।