Monday, December 28, 2009

বাঙালিদের আর বেহেস্তে ঢুকতে দেয়া হয় না

১.
সগীরের ছোট মামার ইন্তেকালের বয়স এখনও হয়নি। কিন্তু তিনি শৈশব থেকেই একটু এঁচড়ে পাকা। ক্লাস এইটে থাকতেই তিনি একটি মাত্র টিকিট সম্বল করে অম্লানবদনে একাধিক সিনেমার আসর থেকে বেরিয়ে একটি স্টার ফিল্টার বিড়ি পান করতেন বলে আমাদের বহুবার জানিয়েছেন। কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে উঠে হুলুস্থুলু প্রেম শুরু করেছিলেন অনার্সের এক শেষবর্ষীয়ার সাথে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রথম বর্ষে উঠে এক ইস্কুলগামিনীকে ফুসলি দিয়ে জপিয়ে এক বিকেলে দু'জনেই ইলুপ্ত হন। ইলোপের এমন ঘটনায় ঢিঁঢিঁ পড়ে যাওয়ার পর দেখা গেলো তারা বিলুপ্ত হননি, আবার ঘাটের কলসী ঘাটে ফিরে এসেছেন, তবে বিবাহিত অবস্থায়। আর বিশ্ববিদ্যালয় পাশ করে বেরোনোর আগেই তিনি ব্যবসায় নেমে টেন্ডার-ফেন্ডার হেঁকে একেবারে দক্ষযজ্ঞ বাঁধিয়ে বসেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট তিনি সংগ্রহ করেন যখন, তখন সগীরের মামাতো ভাই বিল্লু কথা বলতে শিখে গেছে। নানা আড্ডায় সগীরের মামা বিড়িতে বজ্রাদপি কঠোর চুমুক দিয়ে বলতেন, আই ওয়াজ অলওয়েজ অ্যাহেড অফ মাই টাইম!

অতএব এমন আগুয়ান মামা যে কিছুটা অপরিণত বয়সেই মরণের দুয়ারে ঘা মারবেন, তা বিচিত্র কিছু নয়।

হাসপাতালে একেবারে খোদ আইসিইউ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো তাকে। ডাক্তাররা ৭২ ঘন্টার একটা অনিশ্চয়তার কথাও বলছিলেন। কিন্তু ২৪ ঘন্টা না পেরোতেই তিনি আবার বিপুল বিক্রমে ফিরে এলেন। অভ্যাস।

হাসপাতালে চোখ খুলে লোকে সাধারণত, আমি কে, আমি কই, আমি কেন, আমি কীভাবে জাতীয় প্রশ্ন করে থাকে। অন্তত সিনেমা নাটকে তেমনটাই দেখেছি। সগীরের মামা চোখ খুলেই বললেন, বাঙালি আর বেহেস্তে ঢুকতে পারবে না!

ঠিক উদ্বেগ নয়, সংশয় নয়, একটা বিষণ্ণ উপলব্ধির সুর তার গলায়। মামী ডুকরে উঠলেন, ওগো ... !

মামা ভুরু কুঁচকে ডানে বামে তাকিয়ে বললেন, এ কী? এত লোকজন কেন? তোমাদের কাজকাম কিছু নাই?

মিনিট পনেরো পরেই কেবিন খালি হয়ে গেলো। এমনকি মামীকেও হাঁকিয়ে দিলেন মামা। ঘরে কেবল আমি আর সগীর।

আমরা সমবেদনার সুরে জানতে চাইলাম, মামা ভালো আছেন?

মামা বিষাদমাখা চোখে আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, না রে! ভালো নাই! অনেক টেনশন!

সগীর বললো, কীসের টেনশন মামু?

মামা বললেন, একটা আয়না যোগাড় করতে পারবি?

আমি আর সগীর একটু অস্বস্তি নিয়ে একজন আরেকজনকে দেখে নিয়ে বলি, আয়না কেন মামা?

মামা বলেন, চেহারাটা খুঁটিয়ে দেখা দরকার। ... আচ্ছা, আমাকে দেখলে কি ভূটানি মনে হয় না?

মনে মনে ভাবি, যমের দুয়ার থেকে একেবারে অক্ষত ফিরতে পারেননি মামা। মস্তিষ্কে একটা কিছু গিয়ানজাম হয়েছে।

সগীর বলে, না ভূটানিরা এত কালা হয় না মামু!

মামা বিরক্ত হন, আমার দিকে তাকিয়ে বলেন, কথাটা সত্য নাকি ভাইগ্না? ভূটানিরা নাকি এত কালা হয় না?

আমি আমতা আমতা করে বলি, জানি না মামা। কিন্তু আপনি তো অনেক দৌড়াদৌড়ি করেন ... রোদে রোদে ঘুরলে ভূটানি কেন, নরওয়ের লোকেও কালো হয়ে যাবে।

মামা একটা সন্তুষ্ট হাসি দেন। বলেন, যাক বাঁচলাম। এইবার নাগরিকত্বের জন্যে আবেদনটা করে ফেলতে হবে। বাঙালি আর থাকা যাবে না!

সগীর বলে, ক্যান, বাঙালি থাকা যাইবো না ক্যান?

মামা বলেন, কী বললাম? বাঙালিকে আর বেহেস্তে ঢুকতে দেয়া হবে না!

২.
গল্প যা শুনলাম, তা অতি জটিল।

মামা নাকি মরেই গিয়েছিলেন।

সগীর অবশ্য ত্যানা প্যাঁচানোর চেষ্টা করছিলো, মামা ধমকে থামিয়ে দিলেন, বললেন, ত্যানা প্যাচাইচ্চা!

আমি বললাম, মৃত্যু ব্যাপারটা কেমন মামা?

মামা ধরা গলায় বললেন, খুবই খারাপ কিসিমের ব্যাপার ভাইগ্না! আমারে প্রথমে নিয়া গেলো একটা পরীক্ষার হলে ...।

আমি চমকে উঠে বলি, কারা?

মামা বললেন, দুইটা লোক। একজনের গায়ের রং লাল, আরেকজনের গায়ের রং নীল। চেহারা সুরত খুব একটা সুবিধার না। একজন দেখতে অনেকটা শক্তি কাপুরের মতো, আরেকজন এই সগীরের বাতেন কাকার মতো। আমি খাড়াইয়া ছিলাম চুপচাপ, আইসা কয়, চলো, তোমার অ্যাডমিশন টেস্ট এখন!

সগীর আমার দিকে বিস্ফারিত চোখে তাকায়।

আমি বলি, তারপর?

মামা বললেন, খুব ভয় পাইসিলাম। কইলাম, আমার সাথে তো জ্যামিতি বক্স নাই! কলম নাই! পেন্সিল নাই! ইরেজার নাই! শার্পনার নাই! দুইজনই এই কথা শুইনা চেইতা গেলো। কয়, অ্যাডমিট কার্ড আনছো?

আমি বললাম, আপনার সাথে অ্যাডমিট কার্ডও ছিলো?

মামা বললেন, অ্যাডমিট কার্ডের কথা শুইনা খুব ভয় পাইসিলাম, কিন্তু পকেটে হাত দিয়া দেখি শক্তমতো কী জানি একটা ঠ্যাকে। বাইর কইরা দেখি একটা অ্যাডমিট কার্ড। আমার ছবি লাগানো!

সগীর অস্ফূটে বলে, তারপর?

মামা বললেন, তারপর আবার কী! নিয়া গেলো পরীক্ষার হলে! আরো আরো লোকজন সেইখানে। নানা লোক নানা দেশের। সবাইরে একটা কইরা কোশ্চেন ধরাইয়া দিলো।

আমি বললাম, বাংলা না ইংরেজি?

মামা বললেন, আমারটা বাংলাতেই আছিল!

সগীর বললো, কী কোশ্চেন আসছিলো, মনে আছে?

মামা মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, নাহ! কোশ্চেনগুলি ভুইলা গেছি। কিন্তু কঠিন কিসু ছিলো না। পাশে বসছিলো এক পাকিস্তানী, শুয়োরের বাচ্চা খালি একটু পর পর পেন্সিল দিয়া গুতায় আর উত্তর জিগায়।

আমি বললাম, সবাইকেই এক প্রশ্ন করে নাকি?

মামা বললেন, জানি না। শালার নামে কমপ্লেইন করছিলাম। এক্সপেল খাইছে তারপর। কানে ধইরা বাইর কইরা দিছে, হে হে হে।

সগীর বললো, তারপর?

মামা বললেন, পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর অটোমেটিক মার্কিং হইয়া গেল, বুঝলি? দেখি খাতার উপরে আপনা থিকাই নম্বর ভাইসা উঠলো!

সগীর বললো, কত পাইসিলা মামা?!

মামা গর্বিত মুখে বলেন, বিরাশি! লেটার পাইয়া পাশ!

আমি বললাম, তারপর?

মামা বললেন, এরপর আমারে নিয়া গেলো ভাইভায়!

আমি বললাম, সেইখানে কী ঘটলো?

মামা গোমড়া মুখে বললেন, আরে সেইখানেই তো প্যাঁচ লাইগা গেলো!

সগীর বলে, কীসের প্যাঁচ?

মামা বলেন, আমার আমলনামা দেইখা কইলো, খুব ভালো স্কোর! কিছু লালকালি আছে, কিন্তু সেগুলি সমস্যা না। তোমার রিটেন ভালো হইছে! কিন্তু! তুমি তো বাঙালি। তোমারে বেহেস্তে পাঠান যাইবো না!

আমি বললাম, এই কথা বললো?!

সগীর ক্ষেপে যায়, বলে, এইরাম ডিসক্রিমিনেশান? ক্যাঠা ঐ হালায় নাটকার জানা ...?

মামা বলেন, সবুজ রঙের একটা লোক! দেখতে তোর মামীর ইয়াসিন মামার মতো অনেকটা, কিন্তু ধর তার দ্বিগুণ লম্বা!

আমি বললাম, কেন? বেহেস্তে ঢুকতে দিবে না কেন?

মামা বলেন, আমিও সেই কথাই জিগাইলাম। কইলাম, বেহেস্ত কি তুমার বাপের যে ঢুকতে দিবা না? সে কয়, না আমাগো উপর পরিষ্কার অর্ডার আছে, বেহেস্তে আর বাঙালি না!

সগীর বলে, ক্যান বাঙালি কী দুষ করছে?

মামা বলেন, আমিও এই কথাই জিগাইলাম! তারপরে সব খুইলা কইলো!

৩.
বেহেস্তে বাঙালি ঢুকতে না পারার পেছনে কারণ অবশ্য, মামার মুখে যা শুনলাম, অতিশয় গুরুতর।

আসল নামধাম প্রকাশ করা হয়নি, দুই বেহেস্তি, ধরা যাক তাদের নাম দবীর আর কবীর, তারা প্রতিবেশী ছিলো। দুইজনের ভাগেই সত্তরটা করে হুর আর সত্তরটা গেলমান। বাড়ির সামনে দুধের নহর। ফলমূলের গাছ। গাছের ডালে পাখি ডাকে।

একদিন দবীর এসে কবীরের দরজায় টোকা দিলেন। হাতে একটা বাক্স। বেহেস্তে মিষ্টি পাওয়া যায় না, তিনি নিজের গাছের কয়েকটা আম নিয়ে এসেছেন।

কবীর তখন ঘরের মেঝেতে শোয়া, এক হুর তার পিঠ মালিশ করে দিচ্ছিলো, তিনি বিরক্ত হয়ে উঠে এলেন গজগজ করতে করতে, শালার বেহেস্তেও লোকজন খালি অসময়ে দরজা ধাক্কায়!

দরজা খোলার পর দবীর লম্বা সালাম দিয়ে বললেন, ভাইসাহেব, কেমন আছেন? আমি দবীর, আপনার পাশেই থাকি। ভাবলাম চিনপরিচয় করি!

কবীর দবীরের সাথে পরিচিত হলেন, একটা গেলমানকে ডেকে বললেন, নুরু চা দিস! বিস্কুট দিস লগে! জাম্বুরা থাকলে ছুইল্যা দিস!

কন্দর্পকান্তি গেলমান একটু পরেই চা-বিস্কুট-জাম্বুরা নিয়ে হাজির।

দবীর চকচকে চোখে তাকে আপাদমস্তক দেখে নিয়ে কবীরকে চোখ টিপে বলেন, বাহ! আপনার ভাগের গেলমানগুলি তো খুবই ছুইট! আমারে কতগুলি দিছে, কোনো লছম নাই বুঝলেন ভাইসাব? সারাটা জীবন আমি শুধু বঞ্চিত হইলাম!

কবীর সাহেব বললেন, আপসোস করে আর কী করবেন বলেন? এ সবই তো আপনার কর্মফল। উপরওয়ালা যা করেন ভালোর জন্যই করেন।

দবীর অসন্তুষ্ট মুখে চায়ের কাপ তুলে নিয়ে বললেন, না না ভাইসাব, এতো সরল হলে বেহেস্তে টিকতে পারবেন না। বেহেস্ত খুব খারাপ জায়গা, পদে পদে সাবধান থাকতে হবে আপনাকে! নিজের ভালোটা আদায় করে নিতে হবে! আমি তো শুঞ্ছি প্রচুর দুই নাম্বারি হয় এইখানে! আমার এক বন্ধু সত্তরটার জায়গায় আশিটা হুর পাইছে! ক্যাম্নে পাইছে? কর্মফল দিয়া? মোটেও না! জায়গামতো লবিইং করতে পারলে বেহেস্তেও অনেক কিছু কইরা ফালানি সম্ভব!

কবীর শান্তশিষ্ট ভালোমানুষ, নিরুপদ্রব জীবনযাপন করে এসেছেন, তিনি এইসব গুহ্য তথ্য শুনে হতবাক হয়ে গেলেন।

চায়ে চুমুক দিয়েই দবীরের চোখ গোলগোল হয়ে গেলো! বাহ বাহ বাহ, কী ভালো চা! আহা! আপনার ভাগ্যটা সত্যই ভালো ভাইসাহেব! এইরকম ভালো গেলমান পাইছেন! আমারগুলি যদি চা বানাইতে পারতো! চা তো না, বানায় ঘোড়ার মুত!

কবীর সাহেব কিছু বলার আগেই দবীর গলা নামিয়ে চোখ টিপে বলেন, তা এই গেলমানগুলি খাটে কেমন?

কবীর সাহেব জিভ কেটে বলেন, ছি ছি ছি ছি ছি ... না না দবীর সাহেব, আমার ঐসব বদভ্যাস নাই! বালকপ্রেমে আমি নাই! মাঝে মাঝে আমার হুরদের নিয়ে একটু শুই ... কিন্তু ঐসব গেলমান টেলমানের মধ্যে আমি নাই! ওরা আমার ঘরটর সাফ করে দেয়, চা বানায়, রান্নাবান্না করে মাঝে মাঝে, ফলমূল পেড়ে দেয়, আর বাকিটা সময় নিজেদের মতো থাকে।

দবীর সাহেব উৎফুল্ল মুখে বলেন, আরে কাম অন ম্যান! এইটা বেহেস্ত! গেলমান কি চা বানানোর জন্য দেয়া হইছে আপনারে? আজকেই টেস্ট করে দেখেন। আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি, আপনার ভালো লাগবে!

কবীর সাহেব হাতজোড় করে বললেন, ভাই এইগুলি অভ্যাসের ব্যাপার। আমার অভ্যাস নাই। আপনার যদি ভালো লাগে, ভালো কথা। আমারে শুধু শুধু টাইনেন না।

দবীর সাহেব আরো কিছুক্ষণ চা খেয়ে, বিস্কুট খেয়ে, জাম্বুরা খেয়ে বাজে বকে বিদায় নিলেন।

পরদিন কবীর সাহেব কী কাজে যেন নুরুকে ডেকে আরে সাড়া পেলেন না। বার কয়েক ডাকাডাকি করে সাড়া না পেয়ে বিরক্ত হয়ে তিনি লুৎফা নামে এক হুরকে ডেকে বললেন এক কাপ চা বানিয়ে দিতে।

লুৎফা চা নিয়ে এলে পরে কবীর সাহেব জানতে চাইলেন, লুৎফা দ্যাখ তো নুরু কই? বেহেস্তেও যদি একটা কাজে কাউরে ডাইকা না পাই, দেশটা চলবে কীভাবে?

লুৎফা মুখ নিচু করে বললো, নুরুরে তো পাশের বাড়ির দবীর সাহেব ডেকে নিয়ে গেছে!

কবীর সাহেবের মাথায় আগুন ধরে যায়। তার বুঝতে বাকি থাকে না, দবীর কী উদ্দেশ্যে নুরুকে ডেকে নিয়ে গেছে। তিনি গর্জন করে বলেন, এতবড় সাহস দবীরার! সে আমার গেলমান ডেকে নিয়ে যায়! কেন, তারে কি গেলমান দেয়া হয় নাই? তুই এক্ষণি নুরুরে ডাইকা নিয়ায়!

লুৎফা হুকুম তামিল করতে চলে গেলো।

আধঘন্টা পরও যখন কোনো সাড়া তিনি পেলেন না, তখন বুঝলেন, লুৎফাও পাপিষ্ঠ দবীরের কবলে আক্রান্ত। তিনি পায়ে স্যান্ডেল পরে নিজেই ছড়িখানা হাতে নিয়ে বেরিয়ে দবীরের বাড়ির দরজায় ঘা মারলেন।

একটু পর দবীর হাঁপাতে হাঁপাতে দরজা খুলে দিলেন।

আরে কবীর সাহেব যে! আসেন আসেন বসেন! ওরে লিঙ্কন, দুই কাপ চা দে! দরাজ গলায় বলেন তিনি।

কবীর সাহেব গম্ভীর মুখে বলেন, দবীর সাহেব, আপনি আমার গেলমানকে ডেকে পাঠাইছেন কেন?

দবীর বলেন, হেঁ হেঁ হেঁ ... কী করবো বলেন? আপনি তো আপনার রিসোর্স যাকে বলে ঠিকমতো ইউটিলাইজ করবেন না। আপনার গেলমানরা দিনরাত ফ্রি থাকে, তারা দাড়িয়াবান্ধা খেলে, এইসব দেখে দেখে আমার গেলমানগুলিও ইদানীং বখে যাচ্ছে। তো ভাবলাম, এদের একটু শাসন করি। তাই দুইটা নীতিকথা শোনানোর জন্য ডাকলাম আর কি!

কবীর সাহেব গম্ভীরতর মুখে বললেন, নুরু এখন কই?

দবীর বলেন, নুরুকে তো আপনার হুর লুৎফা এসে ডেকে নিয়ে গেলো এই একটু আগে! দেখেন তারা আবার দুইজনে কোথায় কী খেলে! আপনি ভাইসাহেব এদের একদম শাসন করেন না, দুইটাই চরম বেয়াদব! মাঝে মাঝে আমি ওদের বকে দিবোনি!

কবীর আর সহ্য করতে পারলেন না, হুঙ্কার দিয়ে বললেন, চোপরাও জোচ্চোর! আর কোনোদিন যদি আমার হুর গেলমানকে তোমার কম্পাউন্ডের মধ্যে দেখি, পিটাইয়া তোমার হাড্ডি গুঁড়া করবো, বুচ্ছো?

দবীর থমথমে মুখে ক্রুর হাসি দিয়ে বললেন, বুঝলাম কবীর, প্রতিবেশীর সাথে সুসম্পর্কে তুমি বিশ্বাসী না! যাও বাইর হও, আমার বাড়িতে তোমার কপালে চা নাই!

কবীর বাড়ি ফিরে এলেন।

কিন্তু তাঁর কপালে শান্তি ছিলো না। দবীর বেহেস্তে বৃহত্তর নোয়াখালি সমিতির সদস্য, আবার কী কী সূত্রে যেন বৃহত্তর চট্টগ্রাম সমিতিতেও তার যাতায়াত আছে। কবীরের বাড়ি থেকে প্রায়ই তাঁর গেলমানরা নিখোঁজ হওয়া শুরু হলো।

তিনি একদিন সকালে বেহেস্তের কনস্ট্যাবুলারিতে গিয়ে অভিযোগ ঠুকলেন। দবীর তাঁর গেলমানদের বল ও প্রতারণাপূর্বক অপহরণ করে। তারপর কী হয় তা জানে শ্যামলাল।

হেড কনস্টেবল বয়স্ক লোক, তিনি বললেন, এ আর নতুন কী? বেহেস্তে এসেছেন বলে গা ছেড়ে দিয়ে বসে থাকলে তো চলবে না! জোর যার মুল্লুক তার। আপনার গেলমানদের আপনি দৌড়ের ওপর রাখলেই পারেন?

কবীর মহা বিরক্ত হয়ে বললেন, কী আপদ, আমার এসবের অভ্যাস নাই! আর এ কেমন কথা? আপনি আইনের লোক হয়ে আমাকে দুষছেন? দবীরকে গ্রেপ্তার করুন। জেলের লপসি খাওয়ান।

হেড কনস্টেবল কান চুলকাতে চুলকাতে বললেন, বেহেস্তে জেল সিস্টেম নাই তো। বিকল্প হিসাবে দোজখে পাঠানো যায়, কিন্তু ঐটার এখতিয়ার আমার নাই। আপনার কি উপরমহলে কারো সাথে চেনাজানা আছে? থাকলে একটু যোগাযোগ করেন।

কবীর বিহ্বল হয়ে ফিরে এলেন। বাড়ি ফিরে চা চাইলেন গলা চড়িয়ে, কিন্তু কোনো সাড়া পেলেন না।

রাগে কবীরের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এলো। তিনি একটা রূপালি ঘন্টা বাজিয়ে জেনারেল অ্যাসেম্বলি কল করলেন। এ ঘন্টা বাজালে তার সকল হুর আর গেলমানকে উঠানে ফল ইন করতে হবে।

বাইরে বেরিয়ে এসে কবীর দেখলেন, গুটি কয়েক হুর কেবল গুটি গুটি পায়ে এসে জড়ো হয়েছে। বাকিরা লাপাত্তা। মাথা গুণে তিনি দেখলেন, মোটে আটজন হুর উপস্থিত। বাকি বাষট্টিজন নিখোঁজ।

কবীর একটা শক্ত লাঠি সংগ্রহ করে তখনই দবীরের বাড়ি আক্রমণ করলেন।

৪.
আমি রূদ্ধশ্বাসে বলি, তারপর?

মামা বিরক্ত হয়ে বললেন, তারপর আর কী? লাগলো গণ্ডগোল। মাইর খাইয়া দবীর জাতীয়তাবাদী বেহেস্তি দলের ৮৭২ নাম্বার ওয়ার্ডের কমিশনারের কাছে গিয়া শেল্টার লইলো। সে তার মতো আরো কিছু গুণ্ডাগোছের বেহেস্তিরে নিয়া কবীরের বাড়ি আক্রমণ করলো। কবীর তার পরদিনই বেহেস্তি লীগে জয়েন করলো। তারপর তো বুঝসই কী হয় না হয়।

সগীর বলে, বেহেস্তে আর্মি নামছিলো নাকি তারপর?

মামা বলেন, আমিও এই কথা জিগাইছিলাম, হালার পুত কিসু কয় না, খালি কয়, তোমারে বেহেস্তে ঢুকান যাইবো না!

আমি বললাম, তারপর? দোজখে পাঠায় দিলো আপনাকে?

মামা বললেন, এহ, এতো সোজা নাকি? বিরাশি পাইছি রিটেনে! চাইলেও পাঠাইতে পারতো নিকি?

সগীর বললো, তাইলে সমাধান কী হইলো?

মামা বললেন, আমারে আরো হায়াত বরাদ্দ করা হইলো। বললো, যাও দুনিয়াতে আরো কিছুদিন কাটাইয়া আসো, এইদিকে পরিস্থিতির একটু উন্নতি হইলে তোমার ফাইল আবার বাইর করা হবে। এই বইলা আমার ফাইলে একটা লালফিতা গিট্টু মাইরা আলমারিতে রাইখা দিলো।

আমি বললাম, তারপর?

মামা বললেন, ফিরার পথে দেখলাম লাইন ধইরা বেহেস্তে যাইতেছে কিছু লোক। শুনলাম তারা ভূটানি। ঠিক করছি ভূটানের নাগরিকত্ব লইয়া লমু। আমি, তোর মামী, বিল্লু ... সবাই! তোরাও দেরি করিস না! ভূটানের এমবেসিতে একটা ফোন লাগাই খাড়া।

[সমাপ্ত]

1 comment:

  1. হাঃ হাঃ হাঃ
    দারুন লিখেছেন। আমাকে শ্রীলঙ্কান ভাবে অনেকেই তাই আমাকে বোধহয় আটকাবে না।

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।