Saturday, December 12, 2009

পিচ্চিতোষ গল্প ১৩: অনেক রকম গন্ধ

ঘুম থেকে উঠে পিপলু চোখ পিটপিট করে কিছুক্ষণ ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর হাত বাড়িয়ে তার কোলবালিশটাকে খোঁজে। কিছুক্ষণ কোলবালিশটাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে সে সকালের শব্দগুলো শোনে। তরকারিঅলা, মুরগিঅলা, ফেরিঅলা এসে ডাকাডাকি করে, রিকশা চলে যায় পাশের গলি দিয়ে টুংটাং করে, বারান্দায় চড়াই আর নারকেল গাছের ওপরে বসে কাক ডাকে।

পিপলু ঘুমমাখা চোখে বিছানায় শুয়েই আস্তে করে ডাক দেয়, "মা!"

আস্তে করে ডাকলে মা সাড়া দিতে পারে, যদি মা নিজের ঘরে থাকে। সাড়া পায় না পিপলু। তার মানে মা রান্নাঘরে, নাস্তা বানাচ্ছে। পিপলু আরো জোরে ডাকে, "মা! মা! মা!"

পিপলুর মা দূর রান্নাঘর থেকে সাড়া দেন, "এই যে আমি এখানে!"

পিপলু আরো কিছুক্ষণ শুয়ে থাকে তারপরও। পর্দা ঠেলে সকালের রোদ এসে পড়েছে বিছানায়। কেমন একটা ধূলো ধূলো ঘ্রাণ চারদিকে।

পিপলু উঠে পড়ে, তারপর সাবধানে বিছানা থেকে নামে। এরপর সে একছুটে রান্নাঘরে মায়ের কাছে গিয়ে হাজির হয়। পিপলুর মা আটা গুলে রুটি বানাচ্ছেন। পিপলু পেছন থেকে মা-কে জড়িয়ে ধরে।

রুটি বানানোর ব্যাপারটা পিপলুর খুব ভালো লাগে। একগাদা সাদা আটা নিয়ে গরম পানি দিয়ে একটু গুলে, কাঁই বানিয়ে, সেখান থেকে একদলা করে নিয়ে, কাঠের ওপর একটু সাদা আটা ছিটিয়ে, তারপর ডলে ডলে কী সুন্দর গোল এক একটা রুটি হয়! সেটাকে তারপর তাওয়ার ওপর সেঁকা হয়। মা মাঝে মাঝে পিপলুর জন্যে ছোটো করে রুটি বানিয়ে দেন। সেগুলোর পেটের কাছটা একটু ফুলে ওঠে, সারা ঘরটা রুটি আর কাঁচা আটার গন্ধে কেমন ঝনঝন করে ওঠে।

পিপলুকে দেখে পিপলুর মা নাক কুঁচকে হাসেন। বলেন, পিপলু যাও দাঁত মেজে এসো! মুখচোখ ধুয়ে এসো! ঘুম থেকে উঠে মুখ না ধুয়ে রান্নাঘরে এসেছো কেন?

পিপলু তবুও মায়ের কাছ ঘেঁষে কিছুক্ষণ রুটির গন্ধ শোঁকে। মায়ের শরীরটাই একটা বড় ফুলকো রুটির মতো ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে। সে বলে, আমাকে কয়েকটা ছোটো রুটি বানিয়ে দাও!

পিপলুর মা বলেন, হ্যাঁ হ্যাঁ তোমার ছোটো রুটিই বানাচ্ছি। মুখ ধোও এখন।

পিপলু এবার বাথরুমে চলে আসে মুখ ধুতে। বাথরুমে ঢুকে তার নাক কুঁচকে আসে, বাবা বাথরুমে সিগারেট খেয়েছে, গোটা বাথরুমটা সিগারেটের ভারি গন্ধে গম্ভীর হয়ে আছে। পিপলু পানির ট্যাপ ছাড়ে, বেসিনে সে মুখ ধুতে পারে না এখনও, শুধু কোনোমতে দাঁত মেজে পেস্ট ফেলতে পারে।

টুথব্রাশে অনেকখানি টুথপেস্ট নিয়ে পিপলু শুঁকে দেখে সেটা। মিষ্টি ঝাঁঝালো একটা গন্ধ। পিপলু চুপচাপ দাঁত মাজতে থাকে। তার মুখটা ফেনায় ভরে উঠছে আস্তে আস্তে। সাবধানে সে বেসিনে ফেনাগুলি থু করে ফেলে।

হাতমুখ ধুয়ে বেরিয়ে পিপলু রান্নাঘরে যায় আবার। বাবা নিজের ঘর থেকে ডাক দেন একবার, পিপলু উঠেছো? নাস্তা খেতে বসো!

পিপলু রান্নাঘরে গিয়ে দেখে, মা চায়ের পানি বসিয়েছেন। গরম তেলে ডিমভাজার গন্ধে রান্নাঘর মাতোয়ারা। ডিমভাজা দিয়ে রুটি খেতে পিপলুর ভালো লাগে না, কিন্তু বাবা বকা দেবে না খেলে।

বাবার সাথে বসে নাস্তা খেতে খেতে পিপলু ভাবে, বড় হয়ে সে-ও চা খাবে নাস্তার সাথে। বাথরুমে একটা সিগারেটও খাবে। যদিও সিগারেটের গন্ধ পিপলুর সহ্য হয় না। কিন্তু বাবা যখন পারে, পিপলুও পারবে।

পিপলু মাঝে মাঝে বাবার চায়ের কাপের শেষ অর্ধেকটা চেয়ে নিয়ে খায়। বাবার মনমেজাজ ভালো থাকলে ঐটুকু তাকে দিয়ে দেয়, না থাকলে বকা দেয়, বলে বাচ্চাদের চা খেতে নেই। আজ বাবার মুখচোখের দিকে তাকিয়ে পিপলু ভরসা পেলো, বাবার মুখটা হাসি হাসি।

পিপলুর মা এক কাপ চা এনে রাখেন টেবিলে। চায়ের গন্ধটা পিপলুর বড় ভালো লাগে, গরম মিষ্টি চোখা একটা ঘ্রাণ, নাকে ঢুকলেই ভালো লাগে। বাবাও নিশ্চয়ই চা খেয়ে খুব মজা পায়, চোখ দুটো একেবারে বুঁজে হাসিমুখে এক একটা চুমুক দেয়। পিপলু বাবার কোল ঘেঁষে গিয়ে চা খাবার বায়না ধরে।

পিপলুর বাবা বলে, তুমি তোমার ছোটো কাপটা নিয়ে এসো, আমি ঢেলে দিই?

পিপলু বলে, না আমি তোমার কাপে খাবো!

পিপলুর বাবা হাসতে হাসতে পিপলুর মাথায় হাত বুলিয়ে কাপটা রেখে উঠে পড়েন। পিপলু বাবার চেয়ারে বসে বাবার মতো করে বসে চোখ বুঁজে চায়ের কাপে চুমুক দেয়। সেখানে চায়ের ঘ্রাণের পাশাপাশি হালকা তামাকের গন্ধ।

পিপলু এখনও স্কুলে যায় না। বাবা বলেছে আগামী বছরই তাকে স্কুলে ভর্তি করে দেবেন। স্কুলটা বাড়ির কাছেই, অফিসে যাবার পথে বাবা পিপলুকে নামিয়ে দেবেন, মা গিয়ে পরে নিয়ে আসবেন। আরেকটু বড় হলে নাকি পিপলু একাই যেতে পারবে।

বাবা চলে যাবার পর তাদের বাসাটা চুপচাপ। মা রান্নাঘরে টুকটাক কাজ করেন, নয়তো এক কাপ চা নিয়ে এসে বারান্দায় বসেন, নয়তো পিপলুকে একটু একা রেখে পাশের বাসার আন্টির সাথে গল্প করতে যান। পিপলু সারাটা দিন ঘরে খেলে, বিকেলে একটুক্ষণের জন্যে বাইরে খেলে, মা তখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে পাহারা দেন।

মা রান্নাঘর থেকে ডাকেন, পিপলু, তুমি দুষ্টুমি কোরো না কিন্তু, হ্যাঁ? আমি যাই একটু তোমার আন্টির কাছে?

পিপলু বলে, আমি খেলতে যাই নিচে?

মা রাজি হন না। বলেন, না এখন অনেক রোদ। তুমি বিকেলে খেলো। এখন ঘরে খেলো?

পিপলুর ঘরে খেলতে খুব একটা ভালো লাগে না। আর খেলার তেমন কিছু নেই। দাদা-দিদি ছুটিতে বাড়িতে এলে পিপলুর সাথে খেলে, কিংবা তাকে বেড়াতে নিয়ে যায়, একা একা ঘরে বসে পিপলুর খেলার সুযোগ কম। পিপলু বসার ঘরে গিয়ে বই হাঁটকাতে থাকে ছবির বইয়ের খোঁজে।

পিপলু কিন্তু পড়তে পারে। স্কুলে গিয়ে তার সমস্যা হবে না। সে বানান করে বাংলা অনেক কিছু পড়তে পারে, তবে সব বোঝে না। সে দুয়েকটা বই নামিয়ে দেখে, সেগুলোতে কোনো ছবি নেই, খুদিখুদি অক্ষরে অনেক কিছু লেখা, সব সে বোঝে না। নাকের কাছে নিয়ে সে বইগুলো শুঁকে দেখে। বইয়ের ভেতরে একটা কেমন যেন গন্ধ। পিপলু একটা বই রেখে আরেকটা বই খোলে। সেটা দেখতে একটু ময়লা, গন্ধটাও অন্যরকম। আবার সাদা কাগজের বইগুলোর গন্ধ আলাদা। এক একটা বইয়ের গন্ধ এক একরকম।

পিপলু কিছুক্ষণ বই ঘেঁটে একটা বল নিয়ে বারান্দায় আসে। দাদা তাকে একটা খেলা শিখিয়ে গেছে, একটা ঝুড়ি শুইয়ে রেখে কিক করে বলটাকে তার মধ্যে ঢোকানো। মজার খেলা।

কিছুক্ষণ খেলার পর পিপলু দেখে, মা আবার ফিরে এসেছেন। সে মায়ের পিছুপিছু রান্নাঘরে ঢোকে।

কী রান্না করো? পিপলু জানতে চায়।

পিপলুর মা বলেন, শাকভাজা আর ডাল। আর মুরগির মাংস আছে, মুরগির মাংস দিয়ে ভাত খেও।

পিপলু রান্নাঘরে বসে বকবক করতে থাকে মায়ের সাথে। এটা কী, ওটা কী, এটা কী কাটো, ওটা কী বাটো? রোজই সে একই প্রশ্ন করে যায় মা-কে, মা-ও রোজই তাকে একই উত্তর দিয়ে যান।

ডালের জন্যে মশলা ভাজার সময় হতেই পিপলু বলে, আমি ঢালবো, আমি ঢালবো!

পিপলুর মা হাসতে হাসতে অল্প একটু ডালসেদ্ধ একটা বড় ডালের চামচে করে তুলে দেন পিপলুর হাতে, পিপলু সেটা নিয়ে ঢেলে দেয় কড়াইতে। ভুশভুশ করে শব্দ হয়, তারপর ছ্যাঁৎ করে জ্বলে ওঠে যেন সব। সারাটা ঘর ডালের কর্কশ গন্ধে ভরে যায়।

পিপলু মাকে জড়িয়ে ধরে বকবক করতে থাকে আবোলতাবোল। পিপলুর মা মুখ টিপে হাসেন আর পিপলুর কথায় তাল দিয়ে যান। পিপলু মায়ের শাড়ি শুঁকে দেখে, একদম ডালের গন্ধ, মনে হয় মা যেন একবাটি ডাল!

সেদিন বাবা অফিস থেকে ফেরার সময় সাথে একটা মাছ নিয়ে এসেছিলেন। মাছের গন্ধ পিপলুর ভালো লাগে না, মা মাছটা কাটার পর সে মাকে জাপটে ধরতে গিয়ে দেখে, মা-ও একটা মাছ হয়ে গেছে, মায়ের শাড়িতে হাতে মাছের গন্ধ। মা যা রাঁধে, তা-ই হয়ে যায়।

রান্নাবান্না শেষ হবার পর পিপলুর মা পিপলুকে বলে, এবার চলো তোমাকে গোসল করিয়ে দেই!

পিপলু সাথে সাথে ছুট লাগায়। মায়ের সাথে এটা তার একটা খেলা। সারাঘরে অনেক ছোটাছুটি দাপাদাপি শেষে মা তাকে পাকড়াও করেন, হুমহাম করে টেনে নিয়ে যান গোসল করিয়ে দিতে।

ঝর্ণা ছেড়ে ভিজতে ভিজতে পিপলু অনেক দুষ্টুমি করে, মাকে ভিজিয়ে দেয়, সাবান মাখাতে গেলে চিৎকার করে, চোখ জ্বলে গেলো, চোখ জ্বলে গেলো! পিপলুর মা তাকে আচ্ছা করে সাবান মাখিয়ে গোসল করিয়ে দেন। পিপলু বলে, শ্যাম্পু করে দাও?

শ্যাম্পুর গন্ধটা পিপলুর কাছে খুব ভালো লাগে, সাবানের গন্ধের চেয়েও। শ্যাম্পুর ফেনা চোখে গেলে আরো বেশি জ্বলে, কিন্তু তখন সে চুপ করে থাকে। মিষ্টি ভারি একটা গন্ধে তার মাথার চারপাশটা কেমন ডুবে যায়।

পিপলুকে গোসল করিয়ে দিয়ে মা বলেন, এবার তুমি মাথা মুছে বারান্দায় রোদে চুপ করে বসো। আমি গোসল করে আসি।

পিপলু উদোম গায়েই ছুটে গিয়ে বারান্দায় রোদের মধ্যে বসে। তার গা ভেজা, সে একটা টাওয়েল নিয়ে মাথায় ঘষতে থাকে। বাইরে ঝকঝকে রোদ, পরিষ্কার নীল আকাশ।

পিপলুর মা গোসল সেরে এসে বলেন, বললাম মাথাটা মুছতে, তুমি ভেজা মাথা নিয়েই রোদে বসে আছো? এই বলে পিপলুর মাথাটা গামছা দিয়ে কষে ডলতে ডলতে মুছে দেন তিনি। পিপলু মাকে জড়িয়ে ধরে শুধু শুধু চিৎকার করতে থাকে।

পিপলুকে নতুন একটা হাফপ্যান্ট পরতে দিয়ে এবার মা তাকে ভাত খাওয়াতে বসেন। মুরগির মাংস আগের দিন রান্না করা, সেটা আবার গরম করার পর রান্নাঘরটা ভরে ওঠে ঝোলের গন্ধে। পিপলু চুপচাপ চেয়ারে গিয়ে বসে। সে মায়ের সাথেই খায়, আলাদা প্লেটে তার খেতে ভালো লাগে না। মা নিজে খেতে খেতে তাকে খাইয়ে দেন।

পিপলুর মা প্রথমে শাক দিয়ে ভাত মাখেন, পিপলু মাথা নাড়ে, সে একেবারে মুরগি দিয়ে ভাত খাবে। পিপলুর মা গল্প করতে করতে একটা লোকমা মাখিয়ে আলগোছে পিপলুর মুখে তুলে দেন। পিপলু সেটা চিবিয়ে খেয়ে বলে, আর খাবো না। মুরগি খাবো।

পিপলুর মা বলেন, আচ্ছা আর একটা। তারপর কী হয়েছিলো কাল নাইট রাইডারে?

পিপলু উৎসাহ নিয়ে নাইট রাইডারের গল্প বলে যায়। পিপলুর মা মনোযোগ দিয়ে শোনেন আর একটু একটু করে শাক দিয়ে ভাত খাইয়ে দেন পিপলুকে। তারপর মুরগি দিয়ে ভাত মাখেন, তারপর ডাল দিয়ে। পিপলু গল্প বলতে বলতে সবই খায়।

ভাত খাবার পর পিপলুর চোখ একটু ভারি ভারি হয়ে আসে। সে নিজেই গিয়ে মায়ের বিছানায় শুয়ে পড়ে। পিপলুর মা বলেন, পিপলু সোনা বই পড়ে শোনাবে না মা-কে?

পিপলু উঠে গিয়ে আবার "নীল হাতি" নিয়ে আসে। পিপলুর মা পিপলুকে জড়িয়ে ধরে বলেন, তুমি একটা পৃষ্ঠা পড়ো, আমি একটা পৃষ্ঠা পড়ি।

পিপলু শুয়ে শুয়ে বইটা খুলে জোরে জোরে পড়তে থাকে।

এক পৃষ্ঠা পড়া হয়ে যাবার পর পিপলু বইটা মায়ের হাতে দিয়ে বলে, এবার তুমি পড়ো আমি শুনি। মা বইটা নিয়ে পৃষ্ঠা ওল্টান, পিপলু মাকে জাপটে ধরে শোয়।

পিপলুর মা বই পড়ে যান, পিপলু চুপচাপ মায়ের গন্ধ নেয় শুয়ে শুয়ে। এই গন্ধটা মায়ের গন্ধ। এই গন্ধটা রুটিতে নেই, চায়ে নেই, বইতে নেই, মাছে নেই, মাংসে নেই, ডালে নেই, সাবানে নেই, শ্যাম্পুতে নেই। এই গন্ধটা শুধু তার মায়ের গায়ে আছে।

পরের পৃষ্ঠায় কী হয়, পিপলু শুনতে পায় না। সে চুপচাপ ঘুমিয়ে পড়ে।

[]

1 comment:

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।